বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এফিয়াল্টিসের বিশ্বাসঘাতকতা: থার্মোপাইলিতে লিওনিডাসের শেষ প্রতিরোধ

সিরিজ: থার্মোপাইলির যুদ্ধ: পারস্য আক্রমণ ও গ্রিক প্রতিরোধ

এফিয়াল্টিসের বিশ্বাসঘাতকতা: থার্মোপাইলিতে লিওনিডাসের শেষ প্রতিরোধ
পাহাড়ি পথে ঘেরাওয়ের পর থার্মোপাইলিতে গ্রিকদের শেষ লড়াই।

দিনের আলোয় গ্রিকদের ঢালের সারি অটুট থাকলেও রাতে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নতুন অভিযান শুরু হতে যাচ্ছিল। সম্মুখ আক্রমণে দুই দিন ব্যর্থ হওয়ার পর জার্ক্সিসের সামনে এবার প্রতিরক্ষাকে পাশ কাটানোর সুযোগ আসে। মালিসের অধিবাসী এফিয়াল্টিস পাহাড়ের ওপর দিয়ে যাওয়া আনোপাইয়া পথের সংবাদ দিয়েছিল। সেই পথ ধরে এগোলে পারস্যের সৈন্যরা লিওনিডাসের অবস্থানের পেছনে নামতে পারবে। থার্মোপাইলিতে গ্রিকদের শক্তি ছিল শত্রুকে সামনে থেকে লড়তে বাধ্য করা; পাহাড়ি পথটি সেই সুবিধা ধ্বংস করার উপায় হয়ে উঠল। যুদ্ধের ফল এবার নির্ভর করছিল নিচের বর্শার সারির পাশাপাশি ওপরের প্রহরা কতক্ষণ টেকে, তার ওপরও।

এফিয়াল্টিসকে নিয়ে জনপ্রিয় কাহিনিতে নানা কল্পনা যোগ হয়েছে। কিন্তু তাঁর বিকৃত শরীর, স্পার্টান বাহিনীতে যোগ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা কিংবা লিওনিডাসের ব্যক্তিগত প্রত্যাখ্যানের গল্প প্রাচীন ঐতিহাসিক বিবরণে নেই। হেরোডোটাস তাঁকে ইউরিদেমোসের পুত্র, মালিসের একজন মানুষ হিসেবে পরিচয় দেন এবং পুরস্কারের আশাকে তাঁর উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। পথ দেখানোর দায় কার ছিল, তা নিয়ে অন্য দাবিও প্রচলিত ছিল; হেরোডোটাস এফিয়াল্টিসকেই দায়ী মনে করেছেন। ফলে ঘটনাটির মূল ইতিহাস ও পরবর্তী বিনোদনমূলক রূপ আলাদা করা জরুরি। ব্যক্তিগত অপমানের কাহিনি দিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।

পথটি গ্রিকদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল না। লিওনিডাস আগে থেকেই এর কথা জেনে প্রায় এক হাজার ফোকীয় সৈন্যকে পাহারায় পাঠিয়েছিলেন। স্থানীয় মানুষেরাও পথটি চিনত। তাই ‘গোপন পাহাড়ি পথ’ বলতে এমন রাস্তা বোঝানো উচিত, যার অবস্থান ও ব্যবহার সম্পর্কে পারস্যের বাহিনীকে কার্যকর তথ্য দিতে হয়েছে। এফিয়াল্টিসের ভূমিকা ছিল পরিচিত স্থানীয় ভূগোলকে আক্রমণকারীর সামরিক সুবিধায় পরিণত করা। পাহাড়ি পথে রাতের অগ্রযাত্রা পরিচালনা, সঠিক দিকে এগিয়ে নেওয়া এবং কোথায় নামলে গ্রিকদের পেছনে পৌঁছানো যাবে—এসব ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জার্ক্সিস হাইডারনেসের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাহাড়ে পাঠান। হাইডারনেসের অধীন অভিজাত পারসিক সৈন্যদের আগে সম্মুখযুদ্ধে দেখা গিয়েছিল। এবার তাঁদের কাজ ছিল গিরিপথের মূল বাধা ভাঙার বদলে ঘুরে যাওয়া। দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যার পর অভিযান শুরু হয় বলে প্রাচীন বিবরণে জানা যায়। পথটি আসোপোস নদীর আশপাশ থেকে পাহাড়ের দিকে উঠত এবং গ্রিক অবস্থানের পেছনের অঞ্চলে নেমে আসত। অন্ধকার ও গাছপালার আড়াল অগ্রযাত্রাকে ঢেকে রাখছিল। তবে এত সৈন্যকে পাহাড়ে পরিচালনা করা সহজ ছিল না; পথের নির্ভুল পরিচয় ও সামরিক শৃঙ্খলা দুটিই দরকার ছিল।

ভোরের দিকে পারস্যের সৈন্যরা ফোকীয় প্রহরীদের কাছে পৌঁছে যায়। হেরোডোটাসের বর্ণনায় ওকগাছে ঢাকা পাহাড়ে মাটির ওপর পড়ে থাকা পাতায় পদচারণার শব্দ শুনে প্রহরীরা সতর্ক হয়। তারা অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হতে থাকে। হাইডারনেস প্রথমে আশঙ্কা করেছিলেন, সামনে থাকা সৈন্যরা স্পার্টান কি না; এফিয়াল্টিস তাদের পরিচয় জানায়। এরপর পারসিক ধনুর্ধরদের আক্রমণে ফোকীয়রা উঁচু অবস্থানের দিকে সরে যায়। এই ছোট সংঘর্ষের গুরুত্ব ছিল বিরাট: পাহাড়ি পথের প্রতিরক্ষা আর পারস্যের অগ্রযাত্রা আটকে রাখতে পারছিল না।

ফোকীয়দের আচরণকে শুধু কাপুরুষতা বলে ব্যাখ্যা করলে ঘটনাটি সরল হয়ে যায়। হেরোডোটাস জানান, তারা ভেবেছিল পারস্যের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য তারাই। তাই পাহাড়ের ওপর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়ার প্রস্তুতি করে। কিন্তু হাইডারনেস তাদের ধ্বংস করার জন্য থামেননি; তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত নিচে নেমে লিওনিডাসের পেছনে পৌঁছানো। প্রহরীরা নিজেদের অবস্থান রক্ষায় মনোযোগী হলেও যে পথ বন্ধ রাখার দায়িত্ব পেয়েছিল, সেটি খোলা হয়ে গেল। উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা ও আকস্মিক আক্রমণ মিলিয়ে গ্রিক প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হয়।

নিচের শিবিরে বিপদের সংবাদ একাধিকভাবে পৌঁছায়। পারস্যের দিক থেকে আসা লোকজন পাহাড়ি অভিযানের খবর দেয় এবং পরে পাহাড়ের পর্যবেক্ষকেরাও নেমে আসে। প্রাচীন কাহিনিতে গণৎকার মেগিস্তিয়াস বলির লক্ষণ দেখে মৃত্যুর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। সেটি তখনকার ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ; সামরিক বাস্তবতা ছিল শত্রু পেছনে চলে আসছে। খবর পাওয়ার পর মিত্রদের মধ্যে আলোচনা হয়। সবাই সেখানে থেকে মরবে, নাকি অধিকাংশ সৈন্য সরে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রতিরোধে অংশ নেবে—এখন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। আগে কার্যকর অবস্থানটি অল্প সময়ের মধ্যে ঘেরাওয়ের ফাঁদে পরিণত হতে পারত।

মিত্রদের সরে যাওয়ার ঘটনায় প্রাচীন বিবরণ পুরোপুরি একমত নয়। কেউ কেউ চলে যেতে চেয়েছিল, আবার লিওনিডাস তাদের বিদায় দিয়েছিলেন—এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে। হেরোডোটাস মনে করেন, মিত্রদের রক্ষা করার জন্য লিওনিডাস নিজেই তাদের পাঠিয়ে দেন। শেষ প্রতিরোধ সরে যাওয়া সৈন্যদের সময় দেওয়ার কাজ করেছিল বলে সামরিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে এটিই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। রাজকীয় কর্তব্য, সম্মান এবং স্পার্টার ভাগ্য নিয়ে প্রচলিত দৈববাণীও প্রাচীন ব্যাখ্যায় এসেছে। লিওনিডাস কেন থেকে গেলেন, তার উত্তর ইতিহাসে একাধিক স্তরে রয়ে গেছে।

স্পার্টানদের সঙ্গে প্রায় সাতশ থেসপীয় যোদ্ধা থেকে যায়। তাঁদের নেতা ছিলেন দেমোফিলোস। হেরোডোটাস তাঁদের অবস্থানকে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই অংশটি থার্মোপাইলির স্মৃতিতে প্রায়ই যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। নিজের নগরের বিপদ জানা সত্ত্বেও তাঁরা শেষ লড়াইয়ে অংশ নেন। প্রায় চারশ থিবীয়ও রয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের কেন রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। হেরোডোটাসের বন্দীসদৃশ অবস্থানে রাখার বক্তব্যকে নিঃসংশয়ে গ্রহণ করা কঠিন। শেষ প্রতিরোধে স্পার্টানদের পাশাপাশি থেসপীয়দের আত্মত্যাগও কেন্দ্রীয় ঘটনা; সব মিত্রের অভিজ্ঞতা অবশ্য একই ছিল না।

তৃতীয় দিনের আক্রমণে গ্রিকরা আগের সংকীর্ণ অবস্থানের সামনে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত জায়গায় বেরিয়ে লড়ে। পেছন থেকে শত্রু আসছে জেনে দীর্ঘদিন অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা আর ছিল না। তাঁরা সামনে থাকা পারস্যের বাহিনীর ওপর প্রবল আঘাত হানতে চেষ্টা করেন। সংঘর্ষে অনেক বর্শা ভেঙে গেলে তরবারি দিয়ে যুদ্ধ চলতে থাকে। লিওনিডাস নিহত হন এবং তাঁর দেহের কাছে তীব্র লড়াই হয়। এই ঘটনায় ব্যক্তিগত বীরত্বের পাশাপাশি প্রতিরক্ষার ভাঙনের বাস্তবতাও ছিল: সেনানায়ক মারা গেছেন, অস্ত্র ক্ষয় হচ্ছে এবং দুই দিকের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

হাইডারনেসের বাহিনী কাছে এলে অবশিষ্ট গ্রিকরা প্রাচীরের ভেতর দিয়ে সরে একটি ছোট টিলায় জড়ো হয়। সাধারণভাবে এই শেষ অবস্থানকে কোলোনোস টিলার সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। সেখানে ঘেরাওয়ের মধ্যে প্রতিরোধ চলতে থাকে। পারস্যের তীর ও অন্যান্য নিক্ষিপ্ত অস্ত্রের আক্রমণে শেষ দলটি ধ্বংস হয়। থিবীয়দের অনেকেই আত্মসমর্পণ করেছিল বলে প্রাচীন বিবরণে আছে; তাঁদের সবাই স্পার্টান ও থেসপীয়দের মতো একই পরিণতি পায়নি। একইভাবে অভিযানে নির্বাচিত তিনশ স্পার্টানের প্রত্যেকে শেষ মুহূর্তে একই স্থানে উপস্থিত ছিলেন—এমন সরল ধারণাও অসুস্থতা ও বার্তাবাহকের দায়িত্বসংক্রান্ত বিবরণের সঙ্গে মেলে না।

থার্মোপাইলির পথ শেষ পর্যন্ত পারস্যের হাতে চলে যায়। এফিয়াল্টিস পরে পালিয়ে যায় এবং তার বিরুদ্ধে পুরস্কার ঘোষণা হয়; কয়েক বছর পর সে নিহত হলেও সেই হত্যার তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা ছিল বলে হেরোডোটাস জানান। যুদ্ধক্ষেত্রে লিওনিডাস ও তাঁর সহযোদ্ধাদের মৃত্যু জার্ক্সিসের দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারেনি। এটি ছিল গ্রিকদের সামরিক পরাজয়, যার প্রতিরোধ পরবর্তী স্মৃতিতে অসাধারণ মর্যাদা পায়। এখন আর্টেমিসিয়ামের নৌবহরকেও নতুন পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। পাহাড়ি পথের ঘেরাও একটি যুদ্ধ শেষ করেছিল; কিন্তু এথেন্স, সালামিস এবং সমগ্র গ্রিক প্রতিরোধের ভবিষ্যৎ তখনো নির্ধারিত হয়নি।


আপনার পছন্দ হতে পারে