বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

থার্মোপাইলির যুদ্ধ: ৩০০ স্পার্টান ও গ্রিক মিত্রদের অসাধারণ প্রতিরোধ

সিরিজ: থার্মোপাইলির যুদ্ধ: পারস্য আক্রমণ ও গ্রিক প্রতিরোধ

থার্মোপাইলির যুদ্ধ: ৩০০ স্পার্টান ও গ্রিক মিত্রদের অসাধারণ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির সংকীর্ণ পথে ঢাল-বর্শার অটুট গ্রিক প্রতিরোধ।

পাহাড়ে প্রহরা, নিচে মেরামত করা প্রাচীর এবং সামনে ঢাল-বর্শার সারি নিয়ে গ্রিকরা অপেক্ষা করছিল। দূরে জার্ক্সিসের বাহিনী এসে দাঁড়ালে পরিকল্পনার বাস্তব পরীক্ষা শুরু হওয়ার মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালের এই মুখোমুখি অবস্থানে শক্তির পার্থক্য ছিল প্রকট। পারস্যের সম্রাটের হাতে বিপুল জনবল, বিভিন্ন ধরনের সৈন্য এবং দীর্ঘ অভিযানের প্রস্তুতি; লিওনিডাসের হাতে কয়েক হাজার মিত্রযোদ্ধা ও একটি সুবিধাজনক প্রতিরক্ষাস্থল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সাম্রাজ্যের মোট সৈন্যসংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছিল, সংকীর্ণ পথে একসঙ্গে কতজন লড়তে পারবে। থার্মোপাইলির প্রথম দুই দিনের ইতিহাস সেই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগানোর ইতিহাস।

পারস্যের আগমনেই গ্রিক শিবিরের সবাই নির্ভীক ছিল, এমন ভাবলে বাস্তবতা হারিয়ে যায়। হেরোডোটাসের বিবরণে মিত্রদের মধ্যে অবস্থান ছেড়ে সরে যাওয়ার আলোচনা পাওয়া যায়। পেলোপনেসের কিছু যোদ্ধা আরও দক্ষিণে প্রতিরক্ষা গড়ার পক্ষে ছিল। কিন্তু ফোকীয় ও লোক্রীয়দের জন্য পিছু হটা মানে নিজেদের অঞ্চল শত্রুর সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া। লিওনিডাস অবস্থান ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। তাঁর নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষা তাই শত্রুর বর্শার সামনে নয়, নিজেদের শিবিরেই হয়েছিল। ভিন্ন নগরের সৈন্যদের বোঝাতে হচ্ছিল যে সম্মিলিত প্রতিরোধ এখনো কার্যকর হতে পারে।

হেরোডোটাস জানান, জার্ক্সিস প্রথমে চার দিন অপেক্ষা করেছিলেন; তাঁর ধারণা ছিল গ্রিকরা শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যাবে। একজন পারসিক অশ্বারোহী পর্যবেক্ষক স্পার্টানদের ব্যায়াম করতে ও চুল পরিচর্যা করতে দেখেছিল বলেও বিবরণ আছে। নির্বাসিত স্পার্টান রাজা দেমারাতুস সম্রাটকে বোঝান, এই আচরণ যুদ্ধের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘটনাটির নাটকীয় বর্ণনা গ্রিক সাহিত্যের মাধ্যমে এসেছে, তাই সম্রাটের মনোভাবের হুবহু নথি হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে মূল পরিস্থিতি পরিষ্কার: পারস্যের বাহিনী সামনে উপস্থিত হওয়ার পরও গ্রিকরা অবস্থান ত্যাগ করেনি। অপেক্ষার মাধ্যমে পথ খোলার আশা পূরণ হয়নি।

যুদ্ধের প্রথম দিনে মিদীয় ও কিসীয় সৈন্যদের আক্রমণে পাঠানো হয়। প্রাচীন বিবরণে জার্ক্সিস তাদের গ্রিকদের জীবিত ধরে আনতে বলেছিলেন। বাস্তবে সামনে এগোতেই আক্রমণকারীদের মুখোমুখি হতে হয় ঢাল ও বর্শার ঘন প্রতিরোধের। সংকীর্ণ পথ তাদের বিস্তৃত সারি গড়তে দিচ্ছিল না। পিছনে বহু সৈন্য থাকলেও সামনের সংঘর্ষে সীমিতসংখ্যক মানুষ অংশ নিতে পারছিল। গ্রিকদের পাশ ঘুরে আক্রমণের সুযোগও ছিল কম। পারস্যের সংখ্যাধিক্য হারিয়ে যায়নি; কিন্তু সেটিকে একসঙ্গে কার্যকর করার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। আক্রমণকারীদের বারবার একই সুরক্ষিত সম্মুখভাগ ভাঙার চেষ্টা করতে হচ্ছিল।

গ্রিক ভারী পদাতিকদের বড় গোলাকার ঢাল একেকজনকে রক্ষা করার পাশাপাশি সারির সামগ্রিক নিরাপত্তা বাড়াত। কাছাকাছি দাঁড়ানো যোদ্ধাদের ঢাল ও বর্শা সম্মিলিত বাধা তৈরি করত। পিছনের সারি বিন্যাস ধরে রাখতে সাহায্য করত এবং সামনের যোদ্ধা আহত হলে অন্যরা তার জায়গা নিতে পারত। হেরোডোটাস পারস্যের তুলনামূলক ছোট বর্শাকে অসুবিধার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। অস্ত্রের দৈর্ঘ্য কাছাকাছি সংঘর্ষে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু শুধু বর্শার মাপ দিয়েই ফল ব্যাখ্যা করা যায় না। অবস্থান, দেহরক্ষা, শৃঙ্খলা ও সমন্বয় মিলিয়ে গ্রিকদের সুবিধা তৈরি হচ্ছিল।

এই প্রতিরোধের কেন্দ্রে লিওনিডাসের তিনশ স্পার্টান থাকলেও যুদ্ধটি কেবল তাঁদের ছিল না। থেসপীয়, থিবীয়, করিন্থীয়, আর্কাডীয় এবং অন্যান্য মিত্রযোদ্ধা বৃহত্তর বাহিনীর অংশ ছিল। পাহাড়ি পথ পাহারার দায়িত্বে ছিল ফোকীয় সৈন্যরা। প্রাথমিক প্রতিরক্ষাবাহিনী সাধারণত প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার বলে ধরা হয়, যদিও গণনায় অনিশ্চয়তা রয়েছে। ‘তিনশ বনাম সমগ্র পারস্য’ জনপ্রিয় স্মৃতির ছবি; প্রথম দুই দিনের যুদ্ধ ছিল কয়েক হাজার গ্রিকের সম্মিলিত প্রতিরোধ। স্পার্টানদের বিশেষ খ্যাতি অন্য যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ আড়াল করলে যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়।

পালাক্রমে বিভিন্ন দল সামনে লড়াই করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারী ঢাল ধরে দীর্ঘ সময় ঘন সংঘর্ষে থাকা ক্লান্তিকর। একই ছোট দল সারাদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়লে শক্তি দ্রুত কমে যেত। হেরোডোটাসের বিবরণে গ্রিকরা নিজেদের দল অনুযায়ী সংগঠিত হয়ে পালা বদল করে যুদ্ধ করেছে। এতে সম্মুখভাগে তুলনামূলক সতেজ যোদ্ধা আনা সম্ভব হয়েছিল। কোন দল ঠিক কখন কোথায় দাঁড়িয়েছিল, তার পূর্ণ বিবরণ নেই; তবু পালা বদলের উল্লেখ প্রতিরোধের স্থায়িত্ব বোঝায়। সাহসের সঙ্গে বিশ্রাম, সংগঠন ও জনবল ব্যবহারের বাস্তব ব্যবস্থা যুক্ত ছিল।

প্রাথমিক আক্রমণ ব্যর্থ হলে পারস্যের অভিজাত বাহিনীকে সামনে আনা হয়। হেরোডোটাস এই দলকে ‘অমর’ নামে উল্লেখ করেছেন; তাদের নেতৃত্বে ছিলেন হাইডারনেস। নামটি অতিপ্রাকৃত কোনো ক্ষমতার নির্দেশ করে না, বরং অভিজাত সেনাদলের পরিচয়। সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে ব্যবহৃত এই যোদ্ধাদের কাছ থেকে দ্রুত সাফল্য প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তাদেরও একই ভূগোলের মধ্যে লড়তে হয়। দক্ষ সৈন্য পাঠালেই পথ প্রশস্ত হয়ে যায়নি, গ্রিকদের পাশ উন্মুক্ত হয়নি। অভিজাত বাহিনীর ব্যর্থতা দেখায়, সৈন্যের মান বাড়িয়েও প্রতিকূল যুদ্ধক্ষেত্রের সব সীমাবদ্ধতা দূর করা যায় না।

স্পার্টানদের একটি বিশেষ কৌশলের বর্ণনাও পাওয়া যায়: তারা কখনো পিছু হটার ভান করত, শত্রু ধাওয়া করলে ঘুরে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ করত। এমন কৌশল কার্যকর করতে পিছু হটার সময়ও দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ধাওয়াকারীদের সারি ছড়িয়ে পড়লে সংগঠিত প্রতিরক্ষাকারীরা সেই বিশৃঙ্খলা কাজে লাগাতে পারে। তবে প্রাচীন বর্ণনাকে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তারিত প্রতিবেদন ভাবা ঠিক হবে না; কতবার বা ঠিক কীভাবে এই কৌশল ব্যবহার হয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়। মূল শিক্ষা হলো, গ্রিকরা শুধু স্থির হয়ে আঘাত সহ্য করেনি—সুযোগ অনুযায়ী চলাচল ও পাল্টা আক্রমণও করেছে।

প্রথম দিনের শেষে পারস্য গিরিপথ ভাঙতে পারেনি। দ্বিতীয় দিনে আবার আক্রমণ শুরু হয়। দীর্ঘ সংঘর্ষে গ্রিকরা ক্লান্ত বা আহত হয়ে প্রতিরোধক্ষমতা হারাবে—এমন প্রত্যাশা ছিল বলে হেরোডোটাস জানান। কিন্তু মিত্রবাহিনীর সংগঠন তখনো টিকে ছিল। আবারও সামনের সৈন্যদের সংকীর্ণ পথ ধরে এগোতে হয় এবং ঢাল-বর্শার প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হয়। এই দুই দিনে গ্রিকদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল; যুদ্ধকে একতরফা, বিনা মূল্যের সাফল্য বলা যাবে না। তবু পরপর দুই দিন সম্মুখ আক্রমণ ব্যর্থ হওয়া জার্ক্সিসের দ্রুত অগ্রযাত্রাকে বাস্তব বাধার মুখে ফেলেছিল।

ক্ষয়ক্ষতির নির্ভুল সংখ্যা জানা যায় না। পরবর্তী বীরত্বগাথায় বিপুল পারসিক নিহতের কথা উঠে এলেও সেগুলোকে নিশ্চিত হিসাব হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। পারস্যের সৈন্যদের নির্বোধ বা যুদ্ধ করতে অক্ষম ভাবাও ভুল; তাদের বাহিনী বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যের বহু অভিযানে কার্যকর ছিল। থার্মোপাইলিতে সমস্যা ছিল একটি বিশেষ অবস্থান ভাঙা। অন্যদিকে গ্রিকদের সাফল্যও সীমিত উদ্দেশ্যের: তারা তখনো পারস্যকে গ্রিস থেকে বিতাড়িত করেনি। একই সময়ে আর্টেমিসিয়ামে নৌসংঘর্ষ চলছিল। স্থলপথ বন্ধ রাখা ও সমুদ্রপথে বাধা দেওয়ার যৌথ পরিকল্পনা আপাতত কার্যকর থাকলেও চূড়ান্ত ফল অনির্ধারিত ছিল।

দ্বিতীয় দিনের শেষে লিওনিডাসের প্রতিরক্ষা সম্মুখভাগে টিকে ছিল, কিন্তু পাহাড়ের ওপর দিয়ে যাওয়া আনোপাইয়া পথ বিপদের সম্ভাবনা ধরে রেখেছিল। সেখানে ফোকীয় প্রহরী থাকলেও শত্রু পথটি ব্যবহার করতে পারলে নিচের অবস্থান পেছন থেকে আক্রান্ত হতে পারত। এই পর্যায়ে মালিসের অধিবাসী এফিয়াল্তেস জার্ক্সিসের কাছে পাহাড়ি পথের সংবাদ দেয়—পুরস্কারের আশায়, হেরোডোটাসের বিবরণ অনুযায়ী। যে বাধা সম্মুখ আক্রমণে ভাঙা যাচ্ছিল না, এবার সেটিকে পাশ কাটানোর উপায় সামনে এল। দিনের আলোয় ঢালের সারি অটুট থাকলেও রাতে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নতুন অভিযান শুরু হতে যাচ্ছিল; থার্মোপাইলির যুদ্ধ তখন এক ভিন্ন পরিণতির দিকে মোড় নিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে