বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

থার্মোপাইলির উত্তরাধিকার: লিওনিডাসের আত্মত্যাগ কেন আজও স্মরণীয়?

সিরিজ: থার্মোপাইলির যুদ্ধ: পারস্য আক্রমণ ও গ্রিক প্রতিরোধ

থার্মোপাইলির উত্তরাধিকার: লিওনিডাসের আত্মত্যাগ কেন আজও স্মরণীয়?
পরাজিত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অমর প্রতিরোধের প্রতীক।

পাহাড়ি পথের ঘেরাও একটি যুদ্ধ শেষ করেছিল; কিন্তু এথেন্স, সালামিস এবং সমগ্র গ্রিক প্রতিরোধের ভবিষ্যৎ তখনো নির্ধারিত হয়নি। থার্মোপাইলির গিরিপথ পারস্যের হাতে চলে যাওয়ার পর জার্ক্সিসের দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রার প্রধান স্থলবাধা সরে যায়। লিওনিডাস নিহত, শেষ প্রতিরক্ষাকারীদের অধিকাংশ মৃত এবং গ্রিক মিত্রদের প্রথম সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অবস্থান ভেঙে পড়েছে। থার্মোপাইলির তাৎক্ষণিক ফল ছিল পারস্যের সামরিক বিজয়। অথচ এই পরাজয়ই পরে গ্রিক ইতিহাসে সাহস, কর্তব্য ও প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী স্মৃতি হয়ে ওঠে। সেই পরিবর্তন বুঝতে যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাগুলো এবং মানুষ কীভাবে নিহতদের স্মরণ করেছে, দুটোই দেখতে হয়।

প্রথম প্রভাব পড়ে আর্টেমিসিয়ামে অবস্থানরত গ্রিক নৌবহরের ওপর। সেখানে কয়েক দিনের সংঘর্ষে পারস্যের নৌবাহিনীকে বাধা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু থার্মোপাইলির পতনের সংবাদ আসার পর আগের অবস্থান ধরে রাখার কৌশলগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। স্থল ও নৌপ্রতিরক্ষা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল; একটির পতন অন্যটিকে বিপন্ন করল। গ্রিক জাহাজগুলো দক্ষিণে সরে আসে। এই প্রত্যাহার পুরো নৌবহরের ধ্বংসের সমান ছিল না। যুদ্ধ করার মতো জাহাজ, নাবিক ও নেতৃত্ব টিকে ছিল। পরবর্তী প্রতিরোধের জন্য শক্তি সংরক্ষণ এখন গিরিপথ ধরে রাখার চেয়েও জরুরি হয়ে উঠেছিল।

পারস্যের বাহিনী মধ্য গ্রিসে অগ্রসর হলে প্রতিরোধকারী অঞ্চলগুলোর ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। থেসপিয়া ও প্লাতেয়ার মতো নগর ধ্বংসের শিকার হয়। এথেন্সের সামনে তখন নিজের ভূখণ্ড রক্ষা এবং জনগণকে বাঁচানোর মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। নারী, শিশু ও অনেক অযোদ্ধাকে ত্রোয়েজেন, সালামিস ও অন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। শহর ছেড়ে যাওয়া ছিল গভীর আঘাত, কিন্তু এতে মানুষের জীবন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রক্ষা পায়। একটি নগরের স্থাপনা হারালেও তার নাগরিকসমাজ ও নৌবাহিনী টিকে থাকলে প্রতিরোধের সম্ভাবনা শেষ হয় না। এথেন্স সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল।

পারস্যের সৈন্যরা এথেন্স দখল করে এবং আক্রোপলিসের স্থাপনা ধ্বংস করে। তখনকার আক্রোপলিসকে আজকের বিখ্যাত পার্থেননসহ কল্পনা করা ভুল; সেই মন্দির পরে নির্মিত হয়। এথেন্সের ধ্বংস জার্ক্সিসের অভিযানের একটি বড় সাফল্য ছিল। ম্যারাথনে পরাজিত সাম্রাজ্য এবার এথেনীয় ভূখণ্ডে পৌঁছে শহর অধিকার করেছে। কিন্তু গ্রিক নৌবহর তখনো সক্রিয়, মিত্রজোটও পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। সম্রাটের বাহিনী যত দক্ষিণে এগোচ্ছিল, দীর্ঘ সরবরাহপথ এবং সমুদ্রের নিরাপত্তার গুরুত্ব তত বাড়ছিল। শহর দখলের সাফল্য তাই পুরো যুদ্ধের নিষ্পত্তি নিশ্চিত করেনি।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালের সালামিসের নৌযুদ্ধে পরিস্থিতি বদলে যায়। থেমিস্টোক্লিস সংকীর্ণ জলপথে লড়ার পক্ষে ছিলেন, যদিও মিত্রদের মধ্যে কোথায় যুদ্ধ করা উচিত, তা নিয়ে মতভেদ ছিল। সালামিসে পারস্যের বড় নৌবহর চলাচল ও বিন্যাস বজায় রাখতে সমস্যায় পড়ে। গ্রিক জাহাজগুলো স্থানীয় পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে আক্রমণ করে। থার্মোপাইলির সঙ্গে এখানে একটি সামরিক মিল আছে: সীমিত পরিসর শত্রুর সংখ্যাধিক্যের সুবিধা কমায়। তবে সালামিসের বিজয়কে লিওনিডাসের আত্মত্যাগের সরাসরি ফল বলা যায় না। নৌপ্রস্তুতি, নেতৃত্ব, জাহাজ পরিচালনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের সিদ্ধান্তের নিজস্ব গুরুত্ব ছিল।

সালামিসের পর জার্ক্সিস এশিয়ায় ফিরে যান, কিন্তু পারস্যের অভিযান সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। মার্দোনিয়ুসের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য স্থলবাহিনী গ্রিসে থেকে যায়। পরের বছর আবার রাজনৈতিক চাপ, সমঝোতার চেষ্টা এবং সামরিক অভিযান চলে। এথেন্সকে মিত্রজোট থেকে আলাদা করতে পারলে গ্রিক প্রতিরোধ অনেক দুর্বল হয়ে যেত। ফলে জোটের ঐক্য ধরে রাখা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। থার্মোপাইলির স্মৃতি নিশ্চয়ই আলোচনায় উপস্থিত ছিল, কিন্তু প্রতিরোধ চালানোর জন্য খাদ্য, সৈন্য, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক আস্থা দরকার হচ্ছিল। নিহতদের সম্মান বাস্তব সহযোগিতার বিকল্প হতে পারত না।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৯ সালে প্লাতেয়ার যুদ্ধে সেই বৃহত্তর সহযোগিতা ফল দেয়। স্পার্টান সেনানায়ক পাউসানিয়াসের নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীতে এথেনীয়সহ বিভিন্ন নগরের সৈন্য ছিল। সংঘর্ষে মার্দোনিয়ুস নিহত হন এবং পারস্যের প্রধান স্থলবাহিনী পরাজিত হয়। একই বছরের মিকালের যুদ্ধেও গ্রিকরা সাফল্য পায়। এই বিজয়গুলো জার্ক্সিসের গ্রিস দখলের অভিযান ব্যর্থ করে। থার্মোপাইলির শেষ প্রতিরোধ যুদ্ধের একটি স্মরণীয় অধ্যায়; আক্রমণ প্রতিহত করার চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে একাধিক যুদ্ধ ও বহু সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায়। পুরো ঘটনাপ্রবাহে স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত একসঙ্গে কাজ করেছে।

তাহলে থার্মোপাইলির বাস্তব অবদান কতটা ছিল? প্রতিরোধ পারস্যের অগ্রযাত্রা সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছিল এবং সম্মুখযুদ্ধে গ্রিক ভারী পদাতিকদের কার্যকারিতা দেখিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে থেকে যাওয়া যোদ্ধারা অন্যদের সরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল বলে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ‘এই কয়েক দিনই গ্রিসকে বাঁচিয়েছিল’—এমন নিশ্চিত দাবি অতিরঞ্জিত। প্রস্তুতি আগে থেকেই চলছিল, আর পরাজয়ের পরও বিপদ ছিল প্রবল। সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে বলা যায়, থার্মোপাইলি প্রমাণ করেছিল পারস্যের বিপুল শক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ সম্ভব। সেই অভিজ্ঞতা এবং নিহতদের স্মৃতি পরবর্তী গ্রিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

লিওনিডাসের মৃত্যু স্মরণীয় হওয়ার একটি কারণ ছিল তাঁর নেতৃত্বের অবস্থান। তিনি একজন রাজা হয়েও বিপদের শেষ পর্যায়ে থেকে যান। তাঁর সিদ্ধান্তে কর্তব্য, সম্মান, মিত্রদের নিরাপত্তা এবং স্পার্টার রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আছে। ইতিহাসে তাঁর মনের সব উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তবে নিজের জীবন দিয়ে অবস্থান রক্ষার সিদ্ধান্ত নেতৃত্বের ব্যক্তিগত দায়িত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। পরবর্তী মানুষ ঘটনাটিতে এমন এক নেতার ছবি খুঁজে পেয়েছে, যিনি অন্যদের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রেখে নিজের পরিণতি গ্রহণ করেছিলেন।

এই স্মৃতিকে স্থায়ী করেছে স্মৃতিস্তম্ভ, কবিতা ও ইতিহাসরচনা। থার্মোপাইলির নিহতদের স্মরণে স্থাপিত শিলালিপিগুলোর মধ্যে স্পার্টানদের উদ্দেশে লেখা সংক্ষিপ্ত পংক্তি বিশেষ বিখ্যাত। সিমোনিদেসের নামে প্রচলিত সেই স্মৃতিবাণীর ভাব হলো, পথিক যেন স্পার্টায় জানায়—তাঁরা কর্তব্য মেনে এখানে শায়িত। এর শক্তি বিজয়ের ঘোষণা বা শত্রুকে অপমান করার মধ্যে নেই। সেখানে রয়েছে মৃতদের নীরব উপস্থিতি এবং জীবিতদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার আবেদন। যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজয়কে কর্তব্যপালনের স্মৃতিতে রূপ দেওয়ার এই ভাষা থার্মোপাইলির দীর্ঘ উত্তরাধিকারে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

তবে জনপ্রিয় স্মৃতিতে তিনশ স্পার্টানের প্রাধান্য অন্যদের আড়াল করেছে। সাতশ থেসপীয় যোদ্ধার স্বেচ্ছায় থেকে যাওয়া এবং শেষ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ সমানভাবে স্মরণযোগ্য। প্রথম দুই দিনে অন্যান্য মিত্রদের যুদ্ধও প্রতিরোধ টিকিয়ে রেখেছিল। সহায়ক ও নির্ভরশীল মানুষের উপস্থিতি যুদ্ধের সামাজিক বাস্তবতাকে আরও বিস্তৃত করে। থার্মোপাইলির ইতিহাসকে শুধু একজন রাজা ও তিনশ যোদ্ধায় সীমিত করলে যৌথ আত্মত্যাগের বড় অংশ হারিয়ে যায়। একইভাবে থিবীয়দের জটিল অভিজ্ঞতাকে এক কথায় বিশ্বাসঘাতকতা বা বীরত্ব বলে বিচার করলে প্রাচীন বিবরণের অনিশ্চয়তা উপেক্ষিত হয়।

পরবর্তী সাহিত্য, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র থার্মোপাইলিকে নতুন নতুন অর্থ দিয়েছে। কখনো এটি দেশরক্ষা, কখনো কর্তব্য, কখনো অসম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক। কিন্তু ‘মুক্ত গ্রিস বনাম অমানবিক পারস্য’ ধরনের সরল ছবি ইতিহাসকে বিকৃত করে। স্পার্টার সমাজ হেলটদের বাধ্যতামূলক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল; সব গ্রিকও পারস্যবিরোধী ছিল না। অন্যদিকে পারস্য ছিল বহুজাতিক সাম্রাজ্য, যার সৈন্যদেরও নিজস্ব জীবন ও কর্তব্য ছিল। এই জটিলতা মনে রেখেই লিওনিডাস ও তাঁর সহযোদ্ধাদের সাহস মূল্যায়ন করা যায়। থার্মোপাইলির স্থায়ী উত্তরাধিকার হলো বিপর্যয়ের মুখেও মানুষের সংগঠিত প্রতিরোধের ক্ষমতা—আর সেই স্মৃতিকে নির্ভুলভাবে রক্ষা করার দায়িত্ব।


আপনার পছন্দ হতে পারে