বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধান: সমুদ্রসৈকত থেকে তিন ভাইবোন কীভাবে চিরতরে হারিয়ে গেল?

বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধান: সমুদ্রসৈকত থেকে তিন ভাইবোন কীভাবে চিরতরে হারিয়ে গেল?
গ্লেনেলগ সৈকত থেকে হারিয়ে যাওয়া তিন ভাইবোনের অমীমাংসিত রহস্য

১৯৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি। অস্ট্রেলিয়ায় দিনটি ছিল জাতীয় ছুটির দিন। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে গ্রীষ্মের উষ্ণ সকাল। শহরের উপকূলীয় গ্লেনেলগ এলাকায় সমুদ্রসৈকতে যাওয়া তখন স্থানীয় শিশুদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সেই সকালে বিউমন্ট পরিবারের তিন সন্তান—নয় বছর বয়সী জেন, সাত বছর বয়সী আর্না এবং চার বছর বয়সী গ্রান্ট—বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল গ্লেনেলগ সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার জন্য। পরিকল্পনা ছিল কয়েক ঘণ্টা আনন্দ করে দুপুরের মধ্যে বাড়ি ফিরে আসা। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত নিখোঁজ-শিশু রহস্যগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

বিউমন্ট পরিবার তখন অ্যাডিলেডের সোমারটন পার্ক এলাকায় বসবাস করত। বাবা জিম বিউমন্ট এবং মা ন্যান্সি বিউমন্টের কাছে সন্তানদের সৈকতে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। গ্লেনেলগ ছিল কাছাকাছি জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত, আর বড় সন্তান জেনকে যথেষ্ট দায়িত্বশীল বলে মনে করা হতো। বর্তমান সময়ে নয়, সাত ও চার বছরের তিন শিশুকে একা গণপরিবহনে সৈকতে পাঠানো অনেক অভিভাবকের কাছেই অকল্পনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু ষাটের দশকের অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক পরিবেশ ছিল ভিন্ন। শিশুদের একা বাইরে যাওয়া, কাছাকাছি দোকান বা সৈকতে যাওয়া কিংবা গণপরিবহন ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ছিল।

সকালে তিন ভাইবোন বাসে করে গ্লেনেলগের উদ্দেশে রওনা হয়। তাদের দুপুরের দিকে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তারা ফিরল না। প্রথমদিকে পরিবার হয়তো ভেবেছিল শিশুরা খেলতে গিয়ে কিছুটা দেরি করেছে। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, উদ্বেগ তত বাড়তে থাকে। বিকেল হয়ে গেলেও তিনজনের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিস্থিতি আর সাধারণ দেরি হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল না। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি, পরে পুলিশকে জানানো হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি সাধারণ পারিবারিক উদ্বেগ বিশাল অনুসন্ধানে পরিণত হয়।

ঘটনাটিকে বিশেষভাবে রহস্যময় করে তোলে তিন শিশুর শেষ কয়েক ঘণ্টার গতিবিধি। তারা যে গ্লেনেলগে পৌঁছেছিল, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যক্তি শিশুদের সৈকত ও আশপাশে দেখেছিলেন বলে জানান। কিন্তু তাদের সঙ্গে সম্ভবত একজন অজ্ঞাত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের উপস্থিতির কথাও উঠে আসে। এই মানুষটিই পরবর্তী তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্রে পরিণত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিন শিশুকে একজন লম্বা, পাতলা বা ছিপছিপে গড়নের, হালকা বা বাদামি ধরনের চুলের একজন পুরুষের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। কিছু বর্ণনায় তার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি বা ত্রিশের ঘরে বলে অনুমান করা হয়। সৈকতের কাছে শিশুদের তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে খেলতে বা কথা বলতে দেখা গেছে বলে সাক্ষ্য আসে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ যদি এই সাক্ষ্য সঠিক হয়ে থাকে, তবে শিশুরা লোকটিকে দেখে আতঙ্কিত ছিল না। বরং তাদের আচরণ থেকে মনে হতে পারে তারা তার সঙ্গে কিছুটা স্বচ্ছন্দ ছিল।

এখানেই তদন্তকারীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়—লোকটি কি তাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল, নাকি তারা তাকে আগে থেকেই চিনত?

এই প্রশ্ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে পরিবারের একটি পর্যবেক্ষণের কারণে। ঘটনার আগে শিশুদের কথাবার্তায় সৈকতে পরিচিত হওয়া কোনো ব্যক্তির প্রসঙ্গ এসেছিল বলে পরবর্তী বিবরণে উঠে আসে। ফলে তদন্তকারীদের একটি ধারণা ছিল, ২৬ জানুয়ারিই হয়তো অজ্ঞাত লোকটির সঙ্গে শিশুদের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেনি। সম্ভবত সে আগেই তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেছিল। যদি এমন হয়ে থাকে, তবে ঘটনাটি হঠাৎ সুযোগ পেয়ে সংঘটিত কোনো অপরাধের পরিবর্তে পরিকল্পিত প্রলুব্ধকরণের দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে। তবে এর পক্ষে কখনোই চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আসে কাছের একটি খাবারের দোকান থেকে। জানা যায়, জেন সেখানে খাবার কিনেছিল এবং কেনাকাটার পরিমাণ এমন ছিল যা শুধু তিন শিশুর জন্য স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বলে মনে হয়েছিল। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অর্থের বিষয়টি। পরিবার শিশুদের যে পরিমাণ টাকা দিয়েছিল, কেনাকাটায় ব্যবহৃত অর্থ তার চেয়ে বেশি ছিল বলে তদন্তে ধারণা তৈরি হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—অতিরিক্ত টাকা কোথা থেকে এসেছিল? কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কি তাদের টাকা দিয়েছিল?

এই ছোট্ট আর্থিক অসামঞ্জস্য তদন্তে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ শিশুদের সঙ্গে অজ্ঞাত পুরুষের উপস্থিতির সাক্ষ্য যদি সঠিক হয় এবং একই সময়ে তাদের কাছে পরিবারের দেওয়া অর্থের চেয়ে বেশি টাকা থেকে থাকে, তাহলে দুটি সূত্র পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। সেই অর্থ কে দিয়েছিল বা আদৌ কীভাবে তাদের কাছে এসেছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

তিন শিশুকে গ্লেনেলগের আশপাশে শেষবার কখন এবং কোথায় দেখা হয়েছিল, তা নিয়েও বিভিন্ন সাক্ষ্য পাওয়া যায়। কেউ তাদের সৈকতের দিকে দেখেছেন, কেউ আশপাশের রাস্তায় দেখেছেন বলে দাবি করেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণে তিন ভাইবোনকে সৈকত এলাকা ছেড়ে হাঁটতে দেখা যাওয়ার কথা উঠে আসে। কিন্তু এরপর তাদের গতিপথ যেন হঠাৎ করেই অন্ধকারে হারিয়ে যায়। তারা বাসে উঠেছিল কি না, অন্য কোনো গাড়িতে উঠেছিল কি না, কারও বাড়িতে গিয়েছিল কি না—কোনোটিই নিশ্চিত করা যায়নি।

এত বড় রহস্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো, তিনজন শিশু একই সঙ্গে নিখোঁজ হলেও ঘটনাস্থলে এমন কোনো নিশ্চিত চিহ্ন পাওয়া যায়নি যা তাদের পরিণতি ব্যাখ্যা করতে পারে। একজন শিশুকে গোপনে সরিয়ে নেওয়াই কঠিন; তিনজনকে একসঙ্গে এমনভাবে অদৃশ্য করে দেওয়া, যাতে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও কার্যকর সূত্র না থাকে, আরও কঠিন। এই কারণেই তদন্তকারীরা সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করতে বাধ্য হন।

শিশুরা কি সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল? প্রথমদিকে এটি স্বাভাবিকভাবেই বিবেচিত সম্ভাবনার একটি ছিল। সমুদ্রসৈকত থেকে তিন শিশু নিখোঁজ হলে দুর্ঘটনার ধারণা বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু ব্যাপক অনুসন্ধানের পরও সমুদ্রে দুর্ঘটনার পক্ষে প্রত্যাশিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনজন একই সঙ্গে পানিতে বিপদে পড়লে সাধারণত অন্তত কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী বা অন্য কোনো চিহ্ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তেমন নিশ্চিত প্রমাণ সামনে না আসায় অপরাধমূলক ঘটনার সম্ভাবনা ক্রমে বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে।

অন্যদিকে, যদি কোনো ব্যক্তি শিশুদের নিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সে কীভাবে তিনজনকেই নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল? এর সম্ভাব্য উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে শিশুদের তার প্রতি আস্থার মধ্যে। একজন অপরিচিত ব্যক্তি জোর করে তিন শিশুকে নিয়ে গেলে হৈচৈ বা প্রতিরোধের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পরিচিত বা বন্ধুত্বপূর্ণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক তাদের কোথাও নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে বড় বোন জেন যদি তাকে বিশ্বাস করে থাকে, ছোট দুই ভাইবোনও সম্ভবত জেনকে অনুসরণ করত।

নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াজুড়ে ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু হয়। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ মানুষ বিভিন্ন এলাকা তল্লাশি করে। সৈকত, সমুদ্র, আশপাশের ভবন, খোলা জমি এবং সম্ভাব্য পথ পরীক্ষা করা হয়। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। তিন শিশুর ছবি অস্ট্রেলিয়ার মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। কিন্তু বিপুল জনসম্পৃক্ততার একটি নেতিবাচক দিকও ছিল—পুলিশের কাছে অসংখ্য তথ্য, গুজব, সন্দেহ এবং তথাকথিত প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য আসতে থাকে। সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রকে অসংখ্য দুর্বল বা ভুল তথ্যের মধ্য থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঘটনার কিছু সময় পর রহস্য আরও গভীর করে একটি চিঠি। বিউমন্ট পরিবার এমন বার্তা পায়, যেখানে দাবি করা হয় শিশুরা জীবিত এবং তাদের ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে। পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশায় পরিবার নির্দেশনা অনুসরণ করে। কিন্তু শিশুরা ফেরেনি। পরে আরেকটি বার্তা আসে এবং পুরো ঘটনাটি নির্মম প্রতারণা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। বহু বছর পর সংশ্লিষ্ট চিঠির লেখক হিসেবে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছিল বলে জানা যায়; তখন বোঝা যায়, চিঠিগুলো প্রকৃত অপহরণকারীর বার্তা ছিল না।

এই প্রতারণা বিউমন্ট পরিবারের জন্য বিশেষভাবে নিষ্ঠুর ছিল। সন্তান হারানোর অনিশ্চয়তার সঙ্গে এমন মিথ্যা আশা যুক্ত হওয়া মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে তদন্তের মূল্যবান সময় ও মনোযোগও বিভ্রান্তিকর সূত্রের পেছনে ব্যয় হয়।

বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য ব্যক্তিকে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন হিসেবে পরীক্ষা করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অপরাধীর নাম এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য পরিচিত ছিল, কারও চলাফেরা বা চেহারা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার সঙ্গে কিছুটা মিলেছে, আবার কারও বিরুদ্ধে পরে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সন্দেহ যত শক্তিশালীই হোক, বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধানের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এই মামলার আলোচনায় বহু বছর পর ধনী ব্যবসায়ী হ্যারি ফিপসের নামও গুরুত্ব পায়। তার গ্লেনেলগ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং বিভিন্ন দাবি ও সাক্ষ্যের কারণে তাকে ঘিরে নতুন করে অনুসন্ধান চালানো হয়। একটি সম্পত্তিতে খননকাজও করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্ভাব্য মাটির অস্বাভাবিকতা পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট স্থানে অনুসন্ধান চালানো হলেও বিউমন্ট শিশুদের দেহাবশেষ বা তাদের অন্তর্ধানের সমাধান দিতে পারে এমন নির্ণায়ক প্রমাণ উদ্ধার হয়নি। ফলে বহুল আলোচিত এই সন্দেহও মামলার চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি।

বিউমন্ট শিশুদের ঘটনা অস্ট্রেলীয় সমাজে শুধু একটি অপরাধ রহস্য হিসেবেই প্রভাব ফেলেনি; এটি শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক ধারণাতেও গভীর পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের স্বাধীনভাবে বাইরে যাওয়া অনেক বেশি স্বাভাবিক ছিল। বিউমন্টদের অন্তর্ধানের পর অভিভাবকদের মধ্যে অপরিচিত ব্যক্তির সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে সচেতনতা ব্যাপকভাবে বাড়ে। একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বিপর্যয় ধীরে ধীরে পুরো দেশের যৌথ স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

মামলাটির দীর্ঘস্থায়ী রহস্যের আরেকটি কারণ হলো কোনো মৃতদেহ না পাওয়া। যদি দেহাবশেষ পাওয়া যেত, আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান হয়তো মৃত্যুর ধরন, স্থান কিংবা অপরাধীর সঙ্গে যুক্ত কোনো বস্তুগত সূত্র বিশ্লেষণ করতে পারত। কিন্তু এখানে তদন্তকারীদের হাতে ছিল প্রধানত মানুষের স্মৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, সময়রেখা এবং পরিস্থিতিগত সূত্র। সময় যত পেরিয়েছে, সাক্ষীদের স্মৃতি তত দুর্বল হয়েছে, সম্ভাব্য অপরাধীরা মারা গেছে এবং বহু ভৌত প্রমাণ স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নিয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। বহুল প্রচারিত মামলায় মানুষের স্মৃতি পরবর্তী সংবাদ, ছবি এবং অন্যের বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কেউ সত্যিই শিশুদের দেখে থাকতে পারেন, আবার কেউ একই রকম দেখতে অন্য শিশুদের বিউমন্ট ভাইবোন মনে করতে পারেন। অজ্ঞাত পুরুষটির বর্ণনাও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাকে নিশ্চিত অপরাধী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। তিনি আদৌ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, সেটিও প্রমাণিত নয়।

একই কারণে মামলাটি ঘিরে জন্ম নেওয়া অসংখ্য তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কোনো সংগঠিত অপরাধী দল, পরিচিত ব্যক্তি, একক যৌন অপরাধী, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো পরিস্থিতি—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কিন্তু একটি তত্ত্বকে গ্রহণযোগ্য হতে হলে তাকে তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়: তিন শিশুকে কে বা কীভাবে গ্লেনেলগ থেকে সরিয়ে নিল, এরপর তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হলো এবং কেন এত দীর্ঘ সময়েও কোনো নির্ণায়ক বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া গেল না? এখন পর্যন্ত কোনো তত্ত্বই এই তিনটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ প্রমাণভিত্তিক উত্তর দিতে পারেনি।

ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ সম্ভবত এই অনিশ্চয়তাই। কোনো পরিবারের সদস্য মারা গেলে শোকের অন্তত একটি নির্দিষ্ট বাস্তবতা থাকে। কিন্তু নিখোঁজ মানুষের ক্ষেত্রে আশা ও আশঙ্কা পাশাপাশি বেঁচে থাকে। জিম ও ন্যান্সি বিউমন্টকে বছরের পর বছর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই জীবন কাটাতে হয়েছে। সন্তানদের কী ঘটেছিল, তারা কতক্ষণ জীবিত ছিল, কোথায় গিয়েছিল কিংবা তাদের দেহ কোথায়—কোনো প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর তারা পাননি।

বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধান তাই শুধু ১৯৬৬ সালের একটি অমীমাংসিত ঘটনা নয়। এটি এমন একটি রহস্য যেখানে খুব সাধারণ একটি সকাল এবং খুব সাধারণ একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় বিপর্যয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। তিন শিশু পরিচিত একটি সৈকতে গিয়েছিল, জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় তাদের দেখা গিয়েছিল, তাদের সম্ভাব্য গতিবিধির কিছু অংশ সম্পর্কে সাক্ষ্যও পাওয়া গিয়েছিল—তারপরও তারা যেন মানুষের ভিড়ের মধ্যেই পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

দশকের পর দশক অনুসন্ধান, নতুন সন্দেহভাজন, পুরোনো সাক্ষ্যের পুনর্বিশ্লেষণ, সম্পত্তিতে খনন এবং আধুনিক তদন্তপদ্ধতি ব্যবহারের পরও মূল সত্যটি অধরাই থেকে গেছে। নিশ্চিতভাবে জানা যায় শুধু এটুকু—১৯৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি জেন, আর্না ও গ্রান্ট বিউমন্ট গ্লেনেলগে গিয়েছিল এবং আর কখনো তাদের পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি।

সমুদ্রসৈকতের সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন, তদন্তের পুরোনো নথি ইতিহাসে পরিণত হচ্ছে, আর ১৯৬৬ সালের শিশুদের পৃথিবীও বহু আগেই বদলে গেছে। তবু একটি প্রশ্ন একই রকম রয়ে গেছে—গ্লেনেলগের ব্যস্ত সৈকত থেকে তিন ভাইবোনকে এমনভাবে কে বা কী অদৃশ্য করে দিয়েছিল যে এত দশক পরও তাদের শেষ মুহূর্তগুলোর নির্ভরযোগ্য বিবরণ তৈরি করা সম্ভব হয়নি?

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধান অস্ট্রেলিয়ার অপরাধ ইতিহাসের শুধু একটি বিখ্যাত অমীমাংসিত মামলা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া তিন শিশুকে ঘিরে দীর্ঘতম ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক অপেক্ষাগুলোর একটি হয়েই থাকবে।

বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধান তাই শুধু ১৯৬৬ সালের একটি অমীমাংসিত ঘটনা নয়। এটি এমন একটি রহস্য যেখানে খুব সাধারণ একটি সকাল এবং খুব সাধারণ একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় বিপর্যয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। তিন শিশু পরিচিত একটি সৈকতে গিয়েছিল, জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় তাদের দেখা গিয়েছিল, তাদের সম্ভাব্য গতিবিধির কিছু অংশ সম্পর্কে সাক্ষ্যও পাওয়া গিয়েছিল—তারপরও তারা যেন মানুষের ভিড়ের মধ্যেই পৃথিবী থেকে মুছে যায়।

দশকের পর দশক অনুসন্ধান, নতুন সন্দেহভাজন, পুরোনো সাক্ষ্যের পুনর্বিশ্লেষণ, সম্পত্তিতে খনন এবং আধুনিক তদন্তপদ্ধতি ব্যবহারের পরও মূল সত্যটি অধরাই থেকে গেছে। নিশ্চিতভাবে জানা যায় শুধু এটুকু—১৯৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি জেন, আর্না ও গ্রান্ট বিউমন্ট গ্লেনেলগে গিয়েছিল এবং আর কখনো তাদের পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি।

সমুদ্রসৈকতের সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন, তদন্তের পুরোনো নথি ইতিহাসে পরিণত হচ্ছে, আর ১৯৬৬ সালের শিশুদের পৃথিবীও বহু আগেই বদলে গেছে। তবু একটি প্রশ্ন একই রকম রয়ে গেছে—গ্লেনেলগের ব্যস্ত সৈকত থেকে তিন ভাইবোনকে এমনভাবে কে বা কী অদৃশ্য করে দিয়েছিল যে এত দশক পরও তাদের শেষ মুহূর্তগুলোর নির্ভরযোগ্য বিবরণ তৈরি করা সম্ভব হয়নি?

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিউমন্ট শিশুদের অন্তর্ধান অস্ট্রেলিয়ার অপরাধ ইতিহাসের শুধু একটি বিখ্যাত অমীমাংসিত মামলা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া তিন শিশুকে ঘিরে দীর্ঘতম ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক অপেক্ষাগুলোর একটি হয়েই থাকবে।


আপনার পছন্দ হতে পারে