বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইউনিভার্স ২৫: ইঁদুরের জন্য তৈরি ‘স্বর্গ’ কেন শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছিল?

ইউনিভার্স ২৫: ইঁদুরের জন্য তৈরি ‘স্বর্গ’ কেন শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছিল?
প্রাচুর্যের মাঝেও ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক ইঁদুরসমাজ

১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে এমন এক অদ্ভুত জগৎ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে ইঁদুরের খাবারের অভাব নেই, পানির সংকট নেই, শিকারির ভয় নেই, প্রতিকূল আবহাওয়া নেই এবং বাসা তৈরির জন্যও রয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা। বাইরে থেকে দেখলে এটি যেন ইঁদুরের জন্য নির্মিত এক নিখুঁত স্বর্গ। সেখানে তাদের প্রধান কাজ ছিল খাওয়া, ঘুমানো, বংশবিস্তার করা এবং নিজেদের সামাজিক জীবন পরিচালনা করা। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই স্বর্গে দেখা দিল আক্রমণাত্মক আচরণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সন্তান পালনে অনীহা, প্রজননের পতন এবং শেষ পর্যন্ত পুরো জনসংখ্যার বিলুপ্তি। এই পরীক্ষাটিই ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ইউনিভার্স ২৫’ নামে।

পরীক্ষাটির নেপথ্যে ছিলেন মার্কিন প্রাণী-আচরণ গবেষক জন বি. ক্যালহাউন। বহু বছর ধরে তিনি ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণীর জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সামাজিক আচরণের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কোনো প্রাণীগোষ্ঠীকে যদি খাদ্য, পানি ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক সম্পদ প্রচুর পরিমাণে দেওয়া হয়, তাহলে জনসংখ্যা কি অনির্দিষ্টকাল বৃদ্ধি পেতে থাকবে? নাকি এমন একটি পর্যায় আসবে, যখন বস্তুগত সম্পদের অভাব না থাকলেও সামাজিক কাঠামোর ভেতর থেকেই সংকট সৃষ্টি হবে?

ইউনিভার্স ২৫ ছিল ক্যালহাউনের এ ধরনের ধারাবাহিক পরীক্ষাগুলোর একটি। নামের ‘২৫’ সংখ্যাটিও গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো পঁচিশটি মহাবিশ্বের তত্ত্ব নয়; বরং ক্যালহাউনের তৈরি পরীক্ষামূলক ইঁদুর-পরিবেশগুলোর ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত একটি নাম। পরবর্তী সময়ে এই একটি পরীক্ষাই এত বিখ্যাত হয়ে যায় যে জনসংখ্যা, নগরায়ণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় ‘ইউনিভার্স ২৫’ একটি প্রতীকে পরিণত হয়।

পরীক্ষার জন্য তৈরি পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। চারদিকে উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটি আবদ্ধ স্থানের ভেতরে ইঁদুরদের জন্য খাবার ও পানির নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বিভিন্ন স্তরে বাসা তৈরির স্থান এবং সেখানে পৌঁছানোর পথ ছিল। রোগ, শিকারি এবং বাইরের প্রতিকূলতার মতো প্রাকৃতিক জনসংখ্যা-নিয়ন্ত্রণকারী অনেক কারণ যতটা সম্ভব দূরে রাখা হয়েছিল। তাত্ত্বিকভাবে সেখানে কয়েক হাজার ইঁদুর থাকার মতো অবকাঠামো ছিল। অর্থাৎ শুরুতে বস্তুগত অর্থে এটি সত্যিই ছিল এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়।

১৯৬৮ সালের জুলাই মাসে পরীক্ষামূলক পরিবেশে চার জোড়া, অর্থাৎ মোট আটটি সুস্থ ইঁদুর ছাড়া হয়। প্রথম দিকে নতুন পরিবেশ বুঝে নেওয়া, নিজেদের এলাকা নির্বাচন করা এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়েনি। এই প্রাথমিক পর্যায়কে অভিযোজনের সময় হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

এরপর শুরু হয় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সময়। প্রায় প্রতি পঞ্চান্ন দিনে ইঁদুরের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে থাকে। খাবার ছিল, পানি ছিল, নিরাপদ বাসা ছিল এবং কোনো শিকারি ছিল না। ফলে সাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে মৃত্যুর যেসব কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে আটকে দেয়, তার অনেকগুলোই এখানে অনুপস্থিত ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকশ ইঁদুরে ভরে ওঠে পরীক্ষামূলক জগৎ।

কিন্তু এখানেই ইউনিভার্স ২৫-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসে। পুরো স্থানের ধারণক্ষমতা তখনও শেষ হয়ে যায়নি। খাদ্যও শেষ হয়ে যায়নি। তবু সব স্থান সামাজিকভাবে সমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল না। কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুরের ভিড় বাড়তে থাকে। খাওয়া, চলাচল এবং পারস্পরিক যোগাযোগের সময় ঘন ঘন অন্য ইঁদুরের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে কেবল ‘কতটুকু জায়গা আছে’—এই প্রশ্নের চেয়ে ‘সেই জায়গা কীভাবে সামাজিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে’—এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একটি স্বাভাবিক ইঁদুরসমাজে বিভিন্ন সামাজিক ভূমিকা থাকে। প্রভাবশালী পুরুষ ইঁদুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অন্য পুরুষেরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করে, স্ত্রী ইঁদুর বাসা বানায় এবং শাবকের যত্ন নেয়। কিন্তু জনসংখ্যা ও সামাজিক যোগাযোগের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পরিচিত কাঠামোতে অস্থিরতা দেখা দিতে শুরু করে। সব ইঁদুর নিজের জন্য অর্থপূর্ণ সামাজিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারছিল না।

বিশেষ করে কিছু পুরুষ ইঁদুর ক্রমাগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তারা নিজেদের এলাকা প্রতিষ্ঠা করতে বা স্বাভাবিক সামাজিক ভূমিকা ধরে রাখতে ব্যর্থ হতে থাকে। অনেককে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় এলাকায় সরে যেতে দেখা যায়। সেখানে প্রচুর ইঁদুর একসঙ্গে জমা হতে থাকে। সংঘর্ষের স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মও দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ইঁদুর অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, আবার অন্যরা ক্রমশ নিষ্ক্রিয় ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

স্ত্রী ইঁদুরদের মধ্যেও গুরুতর পরিবর্তন দেখা দেয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শাবকদের সুরক্ষা এবং পরিচর্যা তাদের আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ার পর কিছু মা যথাযথভাবে শাবকের যত্ন নিতে ব্যর্থ হতে থাকে। বাসা ছেড়ে যাওয়া, শাবককে অবহেলা করা কিংবা অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণের মতো ঘটনা দেখা যায়। ফলে জন্ম নেওয়া শাবকদের একটি অংশ এমন পরিবেশে বড় হতে থাকে, যেখানে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ শেখার সুযোগই সীমিত হয়ে পড়েছিল।

এই জায়গাতেই পরীক্ষাটি শুধু জনসংখ্যার গল্প না থেকে প্রজন্মান্তরে সামাজিক আচরণ ভেঙে পড়ার গল্পে পরিণত হয়। একটি নতুন ইঁদুর জন্ম নিলেই সে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ জানে না। বেড়ে ওঠার সময় অন্য ইঁদুরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, মায়ের পরিচর্যা, প্রতিযোগিতা, এলাকা রক্ষা এবং প্রজননের মাধ্যমে তার আচরণ গড়ে ওঠে। ইউনিভার্স ২৫-এর পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশ এমন একটি সমাজে বড় হচ্ছিল, যেখানে সেই স্বাভাবিক কাঠামো ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত।

ক্যালহাউনের গবেষণার সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি হলো ‘বিহেভিয়োরাল সিঙ্ক’ বা আচরণগত বিপর্যয়। অত্যধিক সামাজিক ঘনত্ব এবং অস্বাভাবিক মাত্রার অনিবার্য পারস্পরিক সংস্পর্শের মধ্যে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ ভেঙে পড়ার ঘটনাকে বোঝাতে তিনি এই ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। তবে ইউনিভার্স ২৫-কে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ‘অতিরিক্ত ইঁদুর মানেই উন্মাদনা’ বলা ভুল। এখানে সমস্যাটি ছিল সামাজিক স্থান, ভূমিকা, যোগাযোগের ধরন এবং অস্বাভাবিকভাবে আবদ্ধ পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাব।

পরীক্ষার সবচেয়ে অদ্ভুত পর্যায়ে আবির্ভূত হয় এমন কিছু ইঁদুর, যাদের ক্যালহাউন ‘বিউটিফুল ওয়ানস’ বা ‘সুন্দররা’ নামে বর্ণনা করেছিলেন। এদের মধ্যে বিশেষ করে কিছু পুরুষ ইঁদুর সামাজিক সংঘর্ষ থেকে কার্যত সরে গিয়েছিল। তারা এলাকা দখলের লড়াই করত না, স্ত্রী ইঁদুরের প্রতি স্বাভাবিক প্রজননমূলক আগ্রহও দেখাত না এবং সামাজিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিত না। তাদের দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল খাওয়া, ঘুমানো এবং নিজেদের শরীর পরিষ্কার রাখার মধ্যে।

এই ইঁদুরগুলোর শরীরে সংঘর্ষের ক্ষত তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এবং তারা নিজেদের পরিচর্যায় অনেক সময় ব্যয় করায় তাদের চেহারা ছিল পরিষ্কার ও সুস্থ। সেখান থেকেই ‘সুন্দররা’ নামটির উৎপত্তি। কিন্তু বাহ্যিকভাবে সুস্থ দেখালেও তারা কার্যকর সামাজিক ও প্রজননজীবন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। খাদ্য গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যা চলছিল, কিন্তু নতুন প্রজন্ম তৈরিতে তাদের ভূমিকা ছিল সামান্য বা অনুপস্থিত।

এই পর্যায়ে ইউনিভার্স ২৫-এর সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি প্রাণী শারীরিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু তার স্বাভাবিক সামাজিক ভূমিকা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ শুধু খাদ্য ও আশ্রয় একটি সামাজিক প্রাণীগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রজনন, সন্তান পালন, সামাজিক শিক্ষা, এলাকা ও ভূমিকার মতো বিষয়ও একটি জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একসময় জনসংখ্যা প্রায় দুই হাজার দুইশর কাছাকাছি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। অথচ পরীক্ষামূলক পরিবেশের তাত্ত্বিক ধারণক্ষমতা ছিল এর চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ ইঁদুরগুলো খাদ্যের অভাবে বা সব শারীরিক জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে সর্বোচ্চ সংখ্যায় পৌঁছায়নি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি থেমে যাওয়ার পেছনে প্রজনন ও সামাজিক আচরণের পতন বড় ভূমিকা রেখেছিল।

ধীরে ধীরে নতুন শাবকের সংখ্যা কমতে থাকে। সফলভাবে বেঁচে থাকা শাবকের সংখ্যাও হ্রাস পায়। একসময় নতুন জন্ম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তখনও খাদ্যের ভাণ্ডার ছিল এবং পানির ব্যবস্থা সচল ছিল। কিন্তু একটি জনসংখ্যা টিকে থাকার জন্য শুধু বর্তমান সদস্যদের জীবিত থাকা যথেষ্ট নয়। পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি না হলে সংখ্যাটি অনিবার্যভাবে কমতে থাকে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, পরিস্থিতি কেবল জনসংখ্যা কমিয়ে দিলেই আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। তাত্ত্বিকভাবে মনে হতে পারে, ইঁদুরের সংখ্যা কমলে ভিড় কমবে এবং তখন স্বাভাবিক আচরণ ফিরে আসবে। বাস্তবে তা ঘটেনি। যে প্রজন্ম সামাজিকভাবে অস্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিল, তাদের অনেকের মধ্যে স্বাভাবিক প্রজনন, সন্তান পালন এবং সামাজিক অংশগ্রহণের আচরণ আর কার্যকরভাবে ফিরে আসেনি।

ক্যালহাউন এই অবস্থাকে বোঝাতে অত্যন্ত নাটকীয় ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যায় প্রথমে সামাজিক ভূমিকা ও স্বাভাবিক আচরণের মৃত্যু ঘটে, পরে আসে শারীরিক মৃত্যু। অর্থাৎ কোনো প্রাণী তখনও খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে এবং শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু একটি কার্যকর সমাজের সদস্য হিসেবে তার ভূমিকা শেষ হয়ে গেছে। এই ধারণাই পরবর্তী সময়ে ইউনিভার্স ২৫-কে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সীমানা ছাড়িয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও সামাজিক আলোচনায় নিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত পরীক্ষামূলক জনসংখ্যাটি আর নিজেকে পুনরুৎপাদন করতে পারেনি। পুরোনো ইঁদুরগুলো একে একে মারা যায় এবং নতুন প্রজন্ম তাদের জায়গা নেওয়ার মতো সংখ্যায় জন্মায়নি। ফলে এমন একটি পরিবেশে পুরো উপনিবেশ বিলুপ্তির দিকে চলে যায়, যেখানে শেষ পর্যন্তও খাদ্য ও পানির মতো মৌলিক সম্পদের ঘাটতি ছিল না। এ কারণেই ইউনিভার্স ২৫ এতটা বিস্ময়কর—এখানে ধ্বংস এসেছিল প্রচলিত অর্থে অনাহার বা শিকারির আক্রমণ থেকে নয়।

তবে এই পরীক্ষাকে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিকভাবে সমস্যাজনক। সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, ক্যালহাউন নাকি প্রমাণ করেছিলেন যে অতিরিক্ত জনসংখ্যা হলেই মানবসভ্যতা ইউনিভার্স ২৫-এর মতো ধ্বংস হয়ে যাবে। পরীক্ষাটি এমন সরল সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে না।

মানুষ ও ইঁদুরের সামাজিক ব্যবস্থা এক নয়। মানুষ আইন তৈরি করে, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে, শহরের নকশা পরিবর্তন করে, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে, স্থানান্তরিত হয় এবং সাংস্কৃতিক নিয়ম বদলাতে পারে। ইউনিভার্স ২৫-এর ইঁদুরদের সামনে এ ধরনের বিকল্প ছিল না। তারা একটি বন্ধ পরীক্ষামূলক পরিবেশে আটকে ছিল এবং সেখান থেকে নতুন ভূখণ্ডে চলে যাওয়ার সুযোগও পায়নি।

‘জনসংখ্যার ঘনত্ব’ এবং ‘অতিরিক্ত ভিড়ের অনুভূতি’ও একই বিষয় নয়। কোনো শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অনেক মানুষ থাকলেও ভালো বাসস্থান, ব্যক্তিগত পরিসর, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং কার্যকর অবকাঠামো থাকলে জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। আবার তুলনামূলক কম জনসংখ্যার এলাকাতেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অনিরাপত্তা বা অর্থপূর্ণ সম্পর্কের অভাব দেখা দিতে পারে। তাই ইউনিভার্স ২৫ থেকে ‘ঘন শহর মানেই সামাজিক ধ্বংস’ ধরনের সিদ্ধান্ত টানা যুক্তিসঙ্গত নয়।

আরেকটি ভুল ধারণা হলো, পরীক্ষাটি নাকি প্রমাণ করেছিল যে প্রাচুর্য নিজেই সমাজকে ধ্বংস করে। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। খাবার ও পানি প্রচুর থাকলেও পরীক্ষার পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত কৃত্রিম। ইঁদুরদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, সামাজিক চাপ থেকে সম্পূর্ণ নতুন ভূখণ্ডে সরে যাওয়া সম্ভব ছিল না এবং তাদের জীবন একটি সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ ছিল। ফলে ‘সব প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ায় তারা অলস হয়ে ধ্বংস হয়েছে’—এমন ব্যাখ্যা পরীক্ষাটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

ইউনিভার্স ২৫ বরং দেখায়, একটি সামাজিক প্রাণীর জন্য সম্পদের মোট পরিমাণের পাশাপাশি সেই সম্পদ ও স্থান ব্যবহারের সামাজিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। একই জায়গায় খাবার থাকা এবং সেই খাবারে পৌঁছানোর সময় কেমন সামাজিক যোগাযোগ ঘটছে—দুটি ভিন্ন বিষয়। একইভাবে একটি বাসা খালি থাকা এবং কোনো প্রাণীর পক্ষে সেখানে নিরাপদ সামাজিক জীবন গড়ে তুলতে পারা এক নয়।

পরীক্ষাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—একটি সমাজে ভূমিকার প্রয়োজন কতটা? ইউনিভার্স ২৫-এর অনেক ইঁদুরের জন্য বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ ছিল, কিন্তু স্বাভাবিক সামাজিক ভূমিকা পালনের সুযোগ ক্রমে সংকুচিত হয়েছিল। বিশেষ করে যে প্রাণীরা প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক কাঠামো থেকে ছিটকে পড়েছিল, তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও অস্বাভাবিক আচরণ দেখা গিয়েছিল। আবার পরবর্তী প্রজন্ম স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ শেখার পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে সমস্যাটি শুধু সংখ্যার ছিল না; সমাজের কার্যকর সংগঠনও ভেঙে পড়েছিল।

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। ইউনিভার্স ২৫ কোনো মানুষের সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ ছিল না। এটি ছিল নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও কৃত্রিম পরিবেশে রেখে করা একটি আচরণগত পরীক্ষা। তাই আধুনিক নগরজীবন, জন্মহার কমে যাওয়া, একাকিত্ব, বিবাহে অনীহা কিংবা সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি এর ফলাফল মিলিয়ে দেওয়া আকর্ষণীয় হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে সাবধানতা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ইন্টারনেটে ‘সুন্দররা’কে আধুনিক মানুষের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতীক হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। কেউ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত মানুষের সঙ্গে তুলনা করেন, কেউ সন্তান নিতে অনিচ্ছুক মানুষের সঙ্গে, আবার কেউ আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে। এগুলো মূল পরীক্ষার ফল নয়; এগুলো পরবর্তী সময়ের সামাজিক ব্যাখ্যা। পরীক্ষার পর্যবেক্ষণ এবং সেই পর্যবেক্ষণ থেকে আধুনিক মানবসমাজ সম্পর্কে তৈরি মতামত—এই দুই বিষয় আলাদা রাখা জরুরি।

তারপরও ইউনিভার্স ২৫ আজও আলোচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পরীক্ষাটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে তাকাতে বাধ্য করে—বেঁচে থাকার জন্য কেবল ক্যালরি, পানি এবং মাথার ওপর ছাদই যথেষ্ট কি না। সামাজিক প্রাণীর জীবনে নিরাপদ সম্পর্ক, ব্যক্তিগত পরিসর, অর্থপূর্ণ ভূমিকা, সন্তান পালনের উপযুক্ত পরিবেশ এবং আচরণ শেখার সুযোগও গভীর গুরুত্ব বহন করতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো সমাজের সংকট সব সময় দৃশ্যমান সম্পদের সংকট দিয়ে শুরু হয় না। বাইরে থেকে প্রচুর খাবার, নিরাপত্তা ও অবকাঠামো দেখা গেলেও ভেতরের সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে। ইউনিভার্স ২৫-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য সম্ভবত এটাই—খাবারের পাত্র ভর্তি, পানির ব্যবস্থা সচল, বাসার কাঠামো অক্ষত; অথচ নতুন প্রজন্ম প্রায় নেই।

এই কারণেই পরীক্ষাটিকে কেবল ‘অতিরিক্ত জনসংখ্যার পরীক্ষা’ বললেও পুরো বিষয়টি ধরা যায় না। প্রথম দিকে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু শেষ অধ্যায়ে জনসংখ্যা আর বাড়ছিল না; বরং কমছিল। তবু সামাজিক স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর সমস্যাটি কেবল কতগুলো ইঁদুর একই স্থানে আছে—সেখানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের সামাজিক আচরণ এবং প্রজন্মান্তরে সেই আচরণ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইউনিভার্স ২৫ তাই একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং বিপজ্জনক একটি বৈজ্ঞানিক কাহিনি। আকর্ষণীয়, কারণ একটি আপাতদৃষ্টিতে আদর্শ পরিবেশ কীভাবে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত পরিণতির দিকে যেতে পারে তা এটি দেখিয়েছিল। বিপজ্জনক, কারণ পরীক্ষাটিকে প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানুষের সমাজ সম্পর্কে প্রায় যেকোনো মতবাদ প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব। কেউ এতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার বিপদ দেখেছেন, কেউ নগরায়ণের সমালোচনা, কেউ সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক, আবার কেউ আধুনিক সভ্যতার পতনের ভবিষ্যদ্বাণী খুঁজেছেন।

বাস্তবে এর সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা সম্ভবত অনেক বেশি সংযত। পর্যাপ্ত বস্তুগত সম্পদ একটি জনগোষ্ঠীর সুস্থ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা একাই যথেষ্ট নয়। পরিবেশের বিন্যাস, সামাজিক যোগাযোগের ধরন, নিরাপদ ব্যক্তিগত পরিসর, শেখা আচরণ, প্রজনন ও সন্তান পালনের সুযোগ এবং একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের কার্যকর সামাজিক ভূমিকা—সবকিছু মিলিয়েই একটি জটিল সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি হয়।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে ইউনিভার্স ২৫-এর ছবিগুলো তাই এখনও অস্বস্তি সৃষ্টি করে। কারণ সেখানে দুর্ভিক্ষপীড়িত কোনো জনপদ দেখা যায় না, দেখা যায় না শিকারির হাতে ধ্বংস হওয়া কোনো প্রাণীগোষ্ঠী। বরং দেখা যায় এমন একটি কৃত্রিম স্বর্গ, যেখানে জীবনের মৌলিক উপকরণ শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই সামাজিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছিল।

শেষ ইঁদুরটির মৃত্যু তাই শুধু একটি পরীক্ষার সমাপ্তি ছিল না। সেটি এমন একটি প্রশ্ন রেখে যায়, যার সহজ উত্তর আজও নেই—একটি সমাজকে সত্যিকার অর্থে টিকিয়ে রাখে কী? শুধু খাদ্য, পানি, নিরাপত্তা ও আশ্রয়, নাকি তার সঙ্গে প্রয়োজন সম্পর্ক, ভূমিকা, সামাজিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত পরিসর এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাভাবিক জীবনধারা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা?

ইউনিভার্স ২৫ মানুষের ভবিষ্যতের নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটি মানবসভ্যতার ধ্বংসের কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্রও নয়। কিন্তু একটি নিয়ন্ত্রিত ইঁদুরসমাজের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এমন একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করেছিল, যা আজও চিন্তার খোরাক দেয়—কোনো জীবন্ত সমাজের সাফল্য শুধু তার সদস্যদের বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতায় নয়; সেই সদস্যদের স্বাভাবিকভাবে সম্পর্ক গড়া, সামাজিক ভূমিকা পালন করা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে কার্যকর জীবনধারা শেখানোর ক্ষমতার ওপরও নির্ভর করতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই ইঁদুরের জন্য তৈরি সেই কথিত ‘স্বর্গ’ শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সামাজিক বিপর্যয়ের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে