বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার প্রোটোকল থেকে ১৯১১ সালের বিপ্লব: অসম চুক্তি কীভাবে চিং রাজবংশের পতন ত্বরান্বিত করেছিল

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 19, 2026
বক্সার প্রোটোকল থেকে ১৯১১ সালের বিপ্লব: অসম চুক্তি কীভাবে চিং রাজবংশের পতন ত্বরান্বিত করেছিল
বক্সার প্রোটোকল থেকে ১৯১১ সালের বিপ্লব

১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল এবং ১৯১১ সালের সিনহাই বিপ্লবের মধ্যে ব্যবধান মাত্র দশ বছর। কিন্তু এই এক দশকেই চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস আমূল বদলে যায়। ১৯০১ সালে চিং রাজবংশ বিদেশি শক্তির কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হয়ে এক কঠোর চুক্তি মেনে নিচ্ছিল; ১৯১১ সালে সেই একই রাজবংশের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক মাসের মধ্যে দুই শতাধিক বছরের চিং শাসনের অবসান ঘটে। বক্সার প্রোটোকল সরাসরি ১৯১১ সালের বিপ্লব সৃষ্টি করেনি, কিন্তু এটি চিং রাষ্ট্রের দুর্বলতা, আর্থিক সংকট, বৈধতার অভাব এবং সংস্কারের চাপকে এমনভাবে তীব্র করে তোলে যে রাজবংশের পতনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বক্সার প্রোটোকলের তাৎপর্য শুধু একটি যুদ্ধের সমাপ্তিতে ছিল না। ১৯০০ সালের বক্সার সংকটে চিং সরকার বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের পথে গিয়ে ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়ে। আট জাতির জোট বেইজিং দখল করে, সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি ও গুয়াংশু সম্রাট রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরাজয়ের পর চীনকে ১৯০১ সালের সেপ্টেম্বরে কঠোর শান্তিচুক্তি মেনে নিতে হয়।

চুক্তির শর্ত ছিল এমন, যা সাধারণ চীনা জনগণের চোখে চিং সরকারের অক্ষমতাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে। ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেল রুপার ক্ষতিপূরণ, তার ওপর সুদ, বেইজিংয়ের লেগেশন কোয়ার্টারে বিদেশি সেনা, রাজধানী ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পথে বিদেশি সামরিক পোস্ট, দাগু দুর্গ ধ্বংস এবং অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল চীনের নিজস্ব রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর বিদেশিদের সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এখানেই চিং রাজবংশের বৈধতার সংকট গভীর হয়। রাজবংশের ঐতিহ্যবাহী দাবি ছিল, তারা সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা, সীমান্ত, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার রক্ষক। কিন্তু ১৯০০–১৯০১ সালের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিল, সরকার নিজের রাজধানীও বিদেশি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

যে রাজবংশ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে ব্যর্থ, তাকে কেন জনগণ সমর্থন করবে—এই প্রশ্ন ক্রমেই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

বিদেশি অপমানের সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক চাপ। বক্সার ক্ষতিপূরণের কিস্তি রাষ্ট্রের রাজস্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করে। চিং সরকারকে একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ দিতে, পুরোনো ঋণ সামলাতে, প্রশাসন চালাতে এবং নতুন সংস্কারের অর্থ জোগাতে হচ্ছিল।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বক্সার বিপর্যয়ের পর চিং সরকার বুঝতে পারে রাষ্ট্রকে দ্রুত আধুনিক না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিদেশি হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে। ফলে শুরু হয় শিনঝেং বা নতুন নীতি সংস্কার

সেনাবাহিনী পুনর্গঠন, নতুন বিদ্যালয়, আধুনিক প্রশাসন, পুলিশ, আইন, অর্থনীতি এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তুতি—সবকিছু একসঙ্গে শুরু হয়। কিন্তু এসব সংস্কারের অর্থায়নের জন্য সরকারকে নতুন রাজস্ব সংগ্রহ করতে হয় এবং প্রাদেশিক সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে হয়।

এখানে বক্সার প্রোটোকল পরোক্ষভাবে চিং রাষ্ট্রকে এক বিপজ্জনক চক্রের মধ্যে ফেলে। পরাজয় সংস্কারের প্রয়োজন তৈরি করল, কিন্তু পরাজয়ের ক্ষতিপূরণই সংস্কারের অর্থ জোগানো কঠিন করে দিল।

চিং সরকার সামরিক সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। পুরোনো ব্যানার বাহিনী এবং গ্রিন স্ট্যান্ডার্ড সেনাবাহিনীর দুর্বলতা বহু আগেই স্পষ্ট ছিল। নতুনভাবে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ বাড়ে, যার মধ্যে ইউয়ান শিকাইয়ের নেতৃত্বাধীন বেইয়াং বাহিনী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নতুন সেনাবাহিনীর সদস্যরা আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক কৌশল শিখছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তারা আগের প্রজন্মের সৈন্যদের তুলনায় বেশি শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। সামরিক বিদ্যালয়, নতুন পাঠ্যক্রম এবং বিদেশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ, সাংবিধানিক রাজনীতি এবং বিপ্লবী মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে।

এই নতুন সেনাবাহিনীর একটি অংশই ১৯১১ সালের বিপ্লবে রাজবংশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। অর্থাৎ যে বাহিনী চিং সরকার বিদেশি শক্তির মোকাবিলায় নিজেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত রাজবংশের পতনের অন্যতম সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।

শিক্ষা সংস্কারের প্রভাব ছিল আরও বিস্তৃত। ১৯০৫ সালে চিং সরকার শতাব্দীপ্রাচীন সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। এই সিদ্ধান্ত চীনের সামাজিক কাঠামোয় বিশাল পরিবর্তন ঘটায়।

পুরোনো ব্যবস্থায় শিক্ষিত তরুণের সফল জীবনের প্রধান পথ ছিল কনফুসীয় শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সরকারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। পরীক্ষা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর নতুন বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশে শিক্ষার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে।

হাজার হাজার চীনা শিক্ষার্থী জাপানসহ বিদেশে পড়তে যায়। সেখানে তারা শুধু বিজ্ঞান, প্রকৌশল বা প্রশাসনই শেখেনি; তারা জাতীয়তাবাদ, প্রজাতন্ত্র, সাংবিধানিক সরকার, সমাজতন্ত্র এবং বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গেও পরিচিত হয়।

চিং সরকারের জন্য এটি ছিল আরেকটি বৈপরীত্য। আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে যে শিক্ষিত যুবসমাজ তৈরি করা হচ্ছিল, তার একটি অংশ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই চীনের দুর্বলতার কারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এই পরিবেশে সুন ইয়াত-সেনের মতো বিপ্লবী নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ে। তিনি বহু বছর ধরে চিং রাজবংশ উৎখাত করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন করছিলেন। ১৯০৫ সালে জাপানের টোকিওতে বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে তুংমেংহুই গঠন করে, যার নেতৃত্বে সুন ইয়াত-সেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এই সংগঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল মাঞ্চু চিং রাজবংশ উৎখাত, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নতুন জাতীয় রাষ্ট্র গঠন।

বক্সার প্রোটোকলের অপমান বিপ্লবীদের জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রচারের বিষয় হয়ে ওঠে। তারা যুক্তি দেয়, চিং সরকার শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত নয়; এটি বিদেশি শক্তির সামনে চীনের স্বাধীনতা রক্ষা করতেও অক্ষম।

এখানে জাতীয়তাবাদ এবং রাজবংশবিরোধিতা ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিদেশি আধিপত্যের বিরোধিতা করতে হলে শুধু বিদেশিদেরই প্রতিরোধ করলেই চলবে না, এমন সরকারকেও সরাতে হবে যে সেই আধিপত্য ঠেকাতে পারে না—এই ধারণা জনপ্রিয় হতে থাকে।

চিং সরকারের সাংবিধানিক সংস্কারের পরিকল্পনাও পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেনি। জাপানের মেইজি সংবিধানসহ বিভিন্ন বিদেশি মডেল অধ্যয়নের পর রাজদরবার সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দিকে ধীরে ধীরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

প্রাদেশিক পরামর্শ সভা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ভবিষ্যৎ সংসদের পরিকল্পনা সামনে আসে। কিন্তু রাজদরবার প্রথমে দীর্ঘ সময়সীমা নির্ধারণ করে। শিক্ষিত অভিজাত ও সংস্কারপন্থীদের কাছে এটি অত্যন্ত ধীর বলে মনে হয়।

যত বেশি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছিল, তত বেশি মানুষ প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতার দাবি তুলছিল।

এটি আধুনিকায়নের একটি স্বাভাবিক পরিণতিও ছিল। নতুন বিদ্যালয়, সংবাদপত্র, ব্যবসায়িক সংগঠন, প্রাদেশিক পরিষদ এবং বিদেশে শিক্ষিত মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক জনপরিসর তৈরি করেছিল, যেখানে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আর নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা হচ্ছিল না।

১৯০৮ সালে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়। গুয়াংশু সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি অল্প সময়ের ব্যবধানে মারা যান। শিশু পুয়ি চিং সিংহাসনে বসেন।

একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের সময় সাম্রাজ্যের শীর্ষে এখন একজন শিশু সম্রাট। বাস্তব ক্ষমতা রিজেন্ট এবং রাজপরিবারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের হাতে চলে যায়। কিন্তু ঠিক এই সময়েই চীন দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

রাজদরবারের নতুন নেতৃত্ব সংস্কার চালিয়ে গেলেও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়। বিশেষভাবে সমালোচিত হয় ১৯১১ সালে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা, যেখানে রাজপরিবারের সদস্যদের অত্যধিক উপস্থিতি ছিল। বিরোধীরা একে ব্যঙ্গ করে “রাজকীয় মন্ত্রিসভা” হিসেবে আখ্যা দেয়।

সংবিধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত রাজপরিবারই প্রধান পদগুলো ধরে রাখে, তাহলে সংস্কারের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাঞ্চু ও হান চীনা পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রশ্ন। চিং রাজবংশ ছিল মাঞ্চু বংশোদ্ভূত। দীর্ঘ শাসনকালে তারা বৃহত্তর চীনা সাম্রাজ্যিক কাঠামোর অংশ হয়ে গেলেও বিপ্লবী প্রচারে তাদের অনেক সময় বিদেশি মাঞ্চু শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের কাছে অপমানিত একটি মাঞ্চু রাজবংশ—এই রাজনৈতিক চিত্র বিপ্লবীদের প্রচারে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়।

তবে চিং রাজবংশের পতনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হয় রেলপথ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। বিশ শতকের শুরুতে রেলপথ আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান প্রতীক ছিল। বিভিন্ন প্রদেশে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা রেলওয়ে কোম্পানিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন।

১৯১১ সালে কেন্দ্রীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর একটি কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নির্মাণ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে।

সিচুয়ানে এই সিদ্ধান্ত তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা মনে করেন তাদের সম্পত্তি ও অর্থ কেন্দ্রীয় সরকার কেড়ে নিচ্ছে এবং আবারও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে জাতীয় অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

ফলে শুরু হয় রেলওয়ে সুরক্ষা আন্দোলন। ব্যবসায়ী, জমিদার, শিক্ষার্থী এবং প্রাদেশিক অভিজাতদের একটি বিস্তৃত অংশ এতে যুক্ত হয়।

এখানেও বক্সার-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘ ছায়া দেখা যায়। বিদেশি ঋণ ও বিদেশি অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই জাতীয় অপমানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে রেলপথের জন্য বিদেশি ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক বিষয় থাকেনি; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।

সিচুয়ানের আন্দোলন দমন করতে সরকার হুবেই থেকে সেনা সরিয়ে নেয়। এর ফলে উচাং অঞ্চলে চিং সামরিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়। এই সুযোগ বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯১১ সালের ১০ অক্টোবর উচাং বিদ্রোহ শুরু হয়। পরিকল্পিত সময়ের আগেই বিপ্লবীদের অস্ত্রভাণ্ডার ও সদস্যদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নতুন সেনাবাহিনীর বিপ্লবী সদস্যরা বিদ্রোহ শুরু করে।

চিং সরকার প্রথমে এটিকে স্থানীয় সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। হুবেইয়ের পর একের পর এক প্রদেশ চিং সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শুরু করে।

বিপ্লব তখন আর গোপন সংগঠনের ষড়যন্ত্র নয়; এটি সাম্রাজ্যের কাঠামোগত ভাঙনে পরিণত হয়।

প্রাদেশিক রাজনৈতিক অভিজাতদের একটি অংশও রাজবংশের বিরুদ্ধে চলে যায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিং সাম্রাজ্য শুধু বিপ্লবী যুবকদের বিদ্রোহে পতিত হয়নি। নতুন সেনাবাহিনী, প্রাদেশিক পরিষদ, ব্যবসায়ী, সংস্কারপন্থী এবং স্থানীয় অভিজাতদের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

চিং সরকার ইউয়ান শিকাইকে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়। তার নিয়ন্ত্রণে বেইয়াং সেনাবাহিনী ছিল দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আধুনিক সামরিক বাহিনী। রাজদরবার আশা করেছিল ইউয়ান বিপ্লব দমন করতে পারবেন।

কিন্তু ইউয়ান নিজেও রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝেছিলেন। একদিকে রাজদরবার, অন্যদিকে বিপ্লবী প্রদেশ—তিনি দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষির কেন্দ্রে উঠে আসেন।

এই সময় সুন ইয়াত-সেন বিদেশ থেকে চীনে ফিরে আসেন এবং বিপ্লবী প্রদেশগুলোর প্রতিনিধিরা নানজিংয়ে তাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। ১৯১২ সালের ১ জানুয়ারি চীনা প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।

তবে উত্তর চীনে ইউয়ান শিকাইয়ের সামরিক শক্তি তখনও বিশাল। গৃহযুদ্ধ এড়াতে বিপ্লবীরা সমঝোতার পথে যায়। শর্ত দাঁড়ায়—চিং সম্রাট সিংহাসন ত্যাগ করলে ইউয়ান নতুন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন।

শেষ পর্যন্ত ১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শিশু সম্রাট পুয়ির নামে সিংহাসন ত্যাগের ঘোষণা জারি হয়। এর মাধ্যমে ১৬৪৪ সাল থেকে চীন শাসন করা চিং রাজবংশের অবসান ঘটে এবং দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সাম্রাজ্যিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের একটি যুগ শেষ হয়।

বক্সার প্রোটোকল থেকে এই পতনের পথটি সরল কারণ-ফলের রেখা নয়। ১৯১১ সালের বিপ্লবের বহু কারণ ছিল—জাতীয়তাবাদ, মাঞ্চুবিরোধিতা, বিপ্লবী সংগঠন, নতুন সেনাবাহিনী, প্রাদেশিক রাজনৈতিক শক্তি, অর্থনৈতিক সমস্যা, রেলপথ সংকট এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রতি অসন্তোষ।

তবু বক্সার প্রোটোকল এই প্রতিটি সমস্যাকে কোনো না কোনোভাবে তীব্র করেছিল।

প্রথমত, এটি চিং সরকারের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ধ্বংস করে। বেইজিংয়ে বিদেশি সেনা এবং অপমানজনক চুক্তি জনগণের সামনে সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ করে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রের আর্থিক স্বাধীনতা কমিয়ে দেয়। আধুনিকায়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন বাড়লেও বিদেশি দাবিতে রাজস্বের বড় অংশ আটকে যায়।

তৃতীয়ত, পরাজয় সরকারকে দ্রুত সংস্কার করতে বাধ্য করে। কিন্তু এই সংস্কারই নতুন সেনাবাহিনী, আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, যারা পরে রাজবংশের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

চতুর্থত, অসম চুক্তি ও বিদেশি সামরিক উপস্থিতি জাতীয়তাবাদের ভাষা বদলে দেয়। চীনের পুনরুত্থান শুধু প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের প্রশ্ন নয়; পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্নে পরিণত হয়।

পঞ্চমত, চিং সরকারের সংস্কার ছিল এমন এক সময়ে শুরু, যখন জনগণের আস্থা ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। রাজবংশ আধুনিক হতে চাইছিল, কিন্তু সমাজের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ আর বিশ্বাস করছিল না যে রাজবংশের নেতৃত্বেই আধুনিক চীন গড়া সম্ভব।

এখানেই বক্সার প্রোটোকলের সবচেয়ে গভীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ১৯০১ সালে বিদেশি শক্তিগুলো চিং রাজবংশকে উৎখাত করেনি। বরং তাদের স্বার্থের জন্য একটি কার্যকর চীনা সরকার বহাল থাকাই সুবিধাজনক ছিল। তাই সিশির সরকার বেঁচে যায়।

কিন্তু সেই সরকার বেঁচে ছিল রাজনৈতিকভাবে আহত অবস্থায়। বিদেশি শক্তি তাকে ধ্বংস করেনি, কিন্তু তার দুর্বলতাকে পুরো জাতির সামনে প্রকাশ করে দিয়েছিল।

পরবর্তী দশকের সংস্কার এই ক্ষত সারাতে পারেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করে পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘাত বাড়িয়েছিল।

বক্সার সংকটের আগে চীনের অনেক সংস্কারপন্থী এখনও রাজবংশকে আধুনিক করে বাঁচানোর কথা ভাবতেন। ১৯১১ সালের দিকে এসে একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি মনে করতে শুরু করে, সমস্যা শুধু চিং সরকারের নীতি নয়; সমস্যার অংশ হয়ে উঠেছে রাজবংশ নিজেই।

এ কারণেই বক্সার প্রোটোকল এবং সিনহাই বিপ্লবের মধ্যকার দশককে চিং সাম্রাজ্যের শেষ রূপান্তরের যুগ বলা যায়। রাষ্ট্র একই সঙ্গে আধুনিক হচ্ছিল এবং ভেঙে পড়ছিল।

নতুন রেলপথ তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু রেলপথের অর্থায়ন বিদ্রোহ সৃষ্টি করছিল। নতুন সেনাবাহিনী গড়ে উঠছিল, কিন্তু সেই বাহিনীর সদস্যরা বিপ্লব করছে। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীরা রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু সেগুলো আরও দ্রুত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবি তৈরি করছিল।

চিং আধুনিকায়ন তাই রাজবংশের জন্য একই সঙ্গে ওষুধ এবং বিষে পরিণত হয়েছিল।

বক্সার প্রোটোকলের পর যে সংস্কারগুলো শুরু হয়েছিল, তার অনেকটাই পরবর্তী প্রজাতান্ত্রিক চীনে টিকে থাকে। ফলে চিং রাজবংশ নিজের পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও তার শেষ দশকের পরিবর্তন আধুনিক চীনা রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তির একটি অংশ হয়ে যায়।

এই কারণে ১৯০১ সালের প্রোটোকলকে শুধু চীনের অপমানের সমাপ্তি হিসেবে দেখা যায় না। এটি পুরোনো ব্যবস্থার সংকটকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখান থেকে আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

বক্সার প্রোটোকল চিং রাজবংশকে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করেনি; বরং তার পতনের রাজনৈতিক ঘড়িকে দ্রুত চালু করে দিয়েছিল। বিদেশি অপমান রাজবংশের মর্যাদা ক্ষয় করে, ক্ষতিপূরণ অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়, সামরিক পরাজয় সংস্কার বাধ্যতামূলক করে এবং সংস্কার নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়।

মাত্র দশ বছরের মধ্যে এই সব প্রবাহ একত্রিত হয়ে ১৯১১ সালের বিপ্লবে বিস্ফোরিত হয়। তাই বক্সার প্রোটোকল থেকে সিনহাই বিপ্লবের পথটি চীনের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যগুলোর একটি—চিং রাজবংশকে বাঁচাতে যে আধুনিকায়ন শুরু হয়েছিল, সেই আধুনিকায়নের জন্মদাতা পরাজয় এবং তার তৈরি নতুন শক্তিগুলোই শেষ পর্যন্ত রাজবংশের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।


You may also like