বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আক্যারশুস দুর্গ: অসলো রক্ষাকারী নরওয়ের সাতশ বছরের ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

আক্যারশুস দুর্গ: অসলো রক্ষাকারী নরওয়ের সাতশ বছরের ইতিহাস
আক্যারশুস দুর্গ

অসলোর ব্যস্ত বন্দরসংলগ্ন উঁচু পাথুরে ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা আক্যারশুস দুর্গ নরওয়ের সাতশ বছরের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের সাক্ষী। এর প্রাচীর দেখেছে সুইডিশ অবরোধ, রাজবংশের পরিবর্তন, কামানের যুগের আগমন এবং বিদেশি দখলদারত্ব। কখনো এটি ছিল রাজাকে নিরাপদ রাখার শক্ত ঘাঁটি, কখনো অভিজাত রাজপ্রাসাদ, আবার কখনো বন্দিদের কঠোর কারাগার। একই স্থাপনার মধ্যে প্রতিরক্ষা, শাসন ও জাতীয় স্মৃতির এতগুলো স্তর জমা হওয়াই আক্যারশুসকে বিশেষ করে তুলেছে। আজকের শান্ত প্রাঙ্গণ দেখে বোঝা কঠিন, অসলোকে নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে এই স্থান একসময় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আক্যারশুসের নির্মাণ সাধারণভাবে ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে রাজা পঞ্চম হোকনের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তিনি ১২৯৯ সালে নরওয়ের সিংহাসনে বসেন এবং অসলোকে রাজকীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করে তোলেন। দুর্গটির উল্লেখ ১৩০০ সালের একটি চিঠিতে পাওয়া যায়। আগের দশকগুলোতে অসলো আক্রমণের শিকার হওয়ায় একটি শক্তিশালী রাজকীয় আশ্রয় ও প্রতিরক্ষাকেন্দ্রের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়েছিল। তবে নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ের নির্ভুল তারিখ জানা যায় না। আক্যারশুস কোনো এক বছরে সম্পূর্ণ তৈরি হওয়া ভবন নয়; বহু শতকের নির্মাণ ও পরিবর্তনে গড়ে ওঠা একটি দুর্গসমষ্টি।

স্থান নির্বাচনে ছিল স্পষ্ট সামরিক যুক্তি। অসলোফিয়র্ডের কাছে উঁচু ভূমি থেকে জলপথ ও আশপাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যেত। খাড়া ঢাল আক্রমণকারীর অগ্রগতি কঠিন করত, আর সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রসদ আনার সুযোগ দিত। মধ্যযুগের অসলো নগরকেন্দ্র বর্তমান কেন্দ্রীয় অসলোর পূর্বদিকে ছিল; আক্যারশুস তার পাশের একটি শক্তিশালী রাজকীয় অবস্থান হিসেবে কাজ করত। ফলে দুর্গ দখল মানে শুধু একটি ভবন দখল করা ছিল না। এর মাধ্যমে বন্দর, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং রাজশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

মধ্যযুগীয় আক্যারশুসের মূল শক্তি ছিল পুরু পাথরের দেয়াল, সুরক্ষিত প্রবেশপথ এবং পরস্পরসংযুক্ত ভবন। এখানে রাজপরিবারের আবাসন, খাদ্যসংরক্ষণ ও সৈন্যদের অবস্থানের ব্যবস্থা ছিল। অবরোধের সময় প্রতিরক্ষাকারীদের দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে এসব সুবিধা অপরিহার্য। উঁচু দেয়াল থেকে নিচের আক্রমণকারীদের প্রতিহত করা যেত, আর সীমিত প্রবেশপথ শত্রুকে সংকীর্ণ জায়গায় আটকে দিত। তবে আজকের দৃশ্যমান সব প্রাচীরকে মধ্যযুগের বলে ধরে নেওয়া ভুল। কামান ব্যবহারের বিস্তার ঘটার পর দুর্গের বাইরের প্রতিরক্ষা বহুবার বদলানো হয়েছে।

১৩০৮ সালে সুইডিশ ডিউক এরিকের আক্রমণ আক্যারশুসের প্রাথমিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর বাহিনী দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী শতকগুলোতেও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রাজবংশীয় বিরোধ ও সীমান্তসংঘাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ থাকে। নরওয়ে কখনো অন্য রাজ্যের সঙ্গে একই রাজমুকুটের অধীনে এসেছে, আবার কখনো বৃহত্তর রাজনৈতিক ইউনিয়নের অংশ হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে দুর্গের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা শাসকদের জন্য জরুরি ছিল। আক্যারশুসের সামরিক গুরুত্ব তার দেয়ালের শক্তির পাশাপাশি এখানে প্রতিষ্ঠিত রাজকীয় কর্তৃত্বের মধ্যেও নিহিত ছিল।

ষোড়শ শতকে যুদ্ধের প্রযুক্তি বদলে যাওয়ায় পুরোনো দুর্গের দুর্বলতা স্পষ্ট হতে থাকে। কামানের গোলা উঁচু, সরু দেয়ালকে ভেঙে দিতে পারত। তাই নিচু ও মোটা প্রতিরক্ষা, মাটিভর্তি বাঁধ এবং বাইরে বেরিয়ে থাকা বুরুজের গুরুত্ব বাড়ে। আক্যারশুসেও ধাপে ধাপে এই পরিবর্তন আসে। একই সময়ে ডেনমার্ক-নরওয়ের রাজশক্তি ও সুইডেনের বিরোধ দুর্গটিকে বারবার সামরিক প্রস্তুতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরিবর্তিত প্রতিরক্ষা বিন্যাস দেখায়, একটি দুর্গকে কার্যকর রাখতে পুরোনো স্থাপত্য রক্ষা করাই যথেষ্ট ছিল না; নতুন অস্ত্রের বিরুদ্ধে সেটিকে মানিয়ে নিতে হতো।

১৫৬৭ সালের সুইডিশ আক্রমণ দুর্গ ও শহরের সম্পর্কের একটি কঠোর উদাহরণ। উত্তরাঞ্চলীয় সাত বছরের যুদ্ধ চলাকালে সুইডিশ বাহিনী অসলোর দিকে এগিয়ে আসে। প্রতিরক্ষার সুবিধার জন্য দুর্গের অধিনায়ক ক্রিস্টেন মুঙ্ক শহরের বসতির বড় অংশ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে শত্রু আশ্রয় ও সরবরাহের সুবিধা না পায়। দুর্গ টিকে যায়, কিন্তু নগরবাসীর ক্ষয়ক্ষতি ছিল বিপুল। একটি সামরিক ঘাঁটিকে রক্ষা করার সিদ্ধান্ত কখনো তার আশপাশের মানুষের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত—আক্যারশুসের ইতিহাস এই বাস্তবতাও তুলে ধরে।

সপ্তদশ শতকে চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের আমলে দুর্গটির বড় রূপান্তর ঘটে। মধ্যযুগীয় ঘাঁটির ভেতরে রেনেসাঁ রুচির রাজকীয় আবাস গড়ে তোলা হয়। কক্ষ, সাজসজ্জা ও টাওয়ারে পরিবর্তন আসে; পাশাপাশি বাইরের সামরিক প্রতিরক্ষাও শক্তিশালী করা হয়। ফলে আক্যারশুস একই সঙ্গে সুরক্ষিত দুর্গ ও রাজপ্রাসাদের ভূমিকা পালন করতে থাকে। এই দ্বৈত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। শাসক এখানে নিরাপত্তা চাইতেন, আবার অতিথি ও কর্মকর্তাদের সামনে নিজের মর্যাদাও প্রকাশ করতে চাইতেন। স্থাপত্যে তাই ব্যবহারিক প্রতিরক্ষা এবং রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব পাশাপাশি স্থান পায়।

১৬২৪ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর অসলোর নগরজীবনের সঙ্গে দুর্গের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান পুরোনো শহরের পরিবর্তে আক্যারশুসের কাছাকাছি নতুন শহর গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। নতুন শহরের নাম হয় ক্রিশ্চিয়ানিয়া। পরিকল্পিত রাস্তা এবং দুর্গের প্রতিরক্ষার সুবিধা নতুন নগরকে ঘিরে রাখে। আক্যারশুস তখন শহরের পাশের একটি ঘাঁটি থেকে নতুন রাজধানীর বিন্যাস নির্ধারণকারী কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমান অসলোর পুরোনো নিয়মিত রাস্তার এলাকায় সেই পরিকল্পনার ছাপ এখনও বোঝা যায়।

১৭১৬ সালে সুইডেনের দ্বাদশ চার্লস নরওয়ে আক্রমণ করলে আক্যারশুস আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুইডিশ বাহিনী ক্রিশ্চিয়ানিয়ায় প্রবেশ করলেও দুর্গ দখল করতে পারেনি। যথেষ্ট ভারী অবরোধসামগ্রী ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতা তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে। শহরে প্রবেশ করেও সুরক্ষিত দুর্গকে বশ করতে না পারা অভিযানের সাফল্য সীমিত করে দেয়। আক্যারশুস সম্পর্কে প্রায়ই বলা হয়, শত্রুর সরাসরি আক্রমণে এটি কখনো দখল হয়নি। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী আত্মসমর্পণ ও সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হস্তান্তরের ঘটনাগুলো আলাদা করে বুঝতে হয়।

দুর্গের ইতিহাসের আরেকটি কঠিন অধ্যায় তার কারাগার। বিভিন্ন সময়ে এখানে অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি, রাষ্ট্রের বিরোধী বলে বিবেচিত বন্দি এবং বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত মানুষ আটক ছিলেন। কঠোর শ্রম, সীমিত স্বাধীনতা ও সামরিক শৃঙ্খলা বন্দিজীবনকে দুর্বিষহ করত। ঊনবিংশ শতকের রাজনৈতিক আন্দোলনকারী মার্কুস থ্রানেও এখানে বন্দি ছিলেন। রাজকীয় কক্ষের ইতিহাসের পাশাপাশি এই বন্দিদের অভিজ্ঞতা মনে রাখা জরুরি। একই দেয়াল কারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, আবার অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আক্যারশুসকে নতুন এক অন্ধকার অধ্যায়ে নিয়ে যায়। ১৯৪০ সালের এপ্রিলে জার্মান আক্রমণের পর অসলো দখল হয় এবং দুর্গও জার্মান নিয়ন্ত্রণে আসে। এখানে জোরপূর্বক প্রাচীর ভেঙে প্রবেশের বদলে নরওয়েজীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হস্তান্তর ঘটে। দখলদারত্বের সময় দুর্গপ্রাঙ্গণ বন্দিত্ব ও নরওয়েজীয় প্রতিরোধকর্মীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৪৫ সালের মুক্তির পর সহযোগীদের বিচারেও স্থানটি ব্যবহৃত হয়; ভিডকুন কুইসলিংয়ের মৃত্যুদণ্ড এখানেই কার্যকর করা হয়। ফলে আক্যারশুস জাতীয় প্রতিরক্ষার পাশাপাশি দখলদারত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা ও ন্যায়বিচারের স্মৃতিও বহন করে।

দুর্গের রাজকীয় সমাধিস্থলে সপ্তম হোকন, রানি মড, পঞ্চম ওলাভ এবং ক্রাউন প্রিন্সেস মার্থার সমাধি রয়েছে। নরওয়ের প্রতিরোধ আন্দোলনের জাদুঘরও এই প্রাঙ্গণের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করে। সামরিক ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও ঐতিহাসিক সংরক্ষণ এখানে পাশাপাশি চলে। তাই আক্যারশুসকে শুধু অতীতের পরিত্যক্ত দুর্গ বলা যায় না। এর সাতশ বছরের ইতিহাস দেখায়, একটি প্রতিরক্ষা স্থাপনা কীভাবে বদলে যাওয়া রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের ভূমিকা বদলায়। অসলোফিয়র্ডের দিকে তাকিয়ে থাকা এর প্রাচীর আজও সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের সাক্ষ্য ধরে রেখেছে।