ওয়াগ্রামের যুদ্ধ ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের শিখর: ১৮০৯–১১ সালের ইউরোপ
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
ওয়াগ্রামের বিজয়ে সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলেও তার ভেতরে বাড়ছিল যুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণের চাপ।
স্পেন ও পর্তুগালে দীর্ঘ প্রতিরোধ যখন ফরাসি সাম্রাজ্যের সৈন্য ও অর্থ শুষে নিচ্ছিল, তখন মধ্য ইউরোপে আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু হয়। অস্ট্রিয়ার নেতৃত্ব বুঝেছিল, নেপোলিয়নের মনোযোগ বিভক্ত এবং তাঁর বহু অভিজ্ঞ সৈন্য আইবেরীয় উপদ্বীপে আটকে আছে। ১৮০৫ সালের পরাজয়ের অপমান, হারানো ভূখণ্ড এবং জার্মানিতে ফরাসি প্রভাব ভিয়েনাকে প্রতিশোধের দিকে ঠেলে দেয়। ১৮০৯ সালের এই সংঘাত প্রথমে নেপোলিয়নের দুর্বলতা প্রকাশ করলেও ওয়াগ্রামের বিজয় তাঁকে আবার সুবিধাজনক অবস্থানে আনে। পরবর্তী দুই বছরে তাঁর সাম্রাজ্য ভূখণ্ড ও রাজবংশীয় মর্যাদায় শিখরের কাছাকাছি পৌঁছায়।
অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনী আগের পরাজয়ের পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেছিল। আর্চডিউক কার্ল নেতৃত্ব ও সংগঠন উন্নত করার চেষ্টা করেন; অতিরিক্ত জনবল সংগ্রহের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। তবে পরিবর্তন অসম্পূর্ণ ছিল এবং অস্ট্রিয়া প্রত্যাশিত ব্যাপক জার্মান গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারেনি। ব্রিটেন সহযোগী হলেও প্রুশিয়া ও রাশিয়া সক্রিয়ভাবে অস্ট্রিয়ার পাশে দাঁড়ায়নি। ১৮০৯ সালের এপ্রিলে অস্ট্রীয় বাহিনী ফ্রান্সের সহযোগী বাভারিয়া আক্রমণ করে। অভিযান শুরুতে ফরাসি সেনাদলগুলোর বিচ্ছিন্ন অবস্থান সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু অস্ট্রীয় অগ্রযাত্রার ধীরগতি সেই সুবিধা কমিয়ে দেয়।
নেপোলিয়ন দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে এসে ছড়িয়ে থাকা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেন। আবেনসবের্গ ও একম্যুলের লড়াইয়ে অস্ট্রীয় পরিকল্পনা ভেঙে যায় এবং কার্লের বাহিনী সরে যেতে বাধ্য হয়। মে মাসে ফরাসিরা ভিয়েনায় প্রবেশ করে। কিন্তু রাজধানী দখল করাই যুদ্ধের সমাপ্তি ছিল না। অস্ট্রীয় প্রধান বাহিনী দানিয়ুবের উত্তর তীরে অবস্থান করছিল। তাদের পরাজিত করতে নেপোলিয়নকে বিশাল নদী পার হতে হতো, যেখানে সেতু, স্রোত ও সরবরাহের নিরাপত্তা যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করতে পারত।
মে মাসের ২১–২২ তারিখে আসপার্ন-এসলিংয়ে সেই ঝুঁকি স্পষ্ট হয়। লোবাউ দ্বীপের মাধ্যমে নদী পার হওয়া ফরাসি বাহিনীর যোগাযোগসেতু বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত সৈন্য ও গোলাবারুদ যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারায় তারা কঠিন চাপে পড়ে। কার্লের বাহিনী প্রবল আক্রমণ চালায় এবং নেপোলিয়ন শেষ পর্যন্ত লোবাউতে ফিরে আসেন। মার্শাল লান গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান। আসপার্ন-এসলিং প্রমাণ করেছিল, সম্রাটের ব্যক্তিগত উপস্থিতিও প্রতিটি যুদ্ধের বিজয় নিশ্চিত করে না। অস্ট্রিয়ার জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সাফল্য।
পরাজয়ের পর নেপোলিয়ন তাড়াহুড়ো করে একই প্রচেষ্টা পুনরাবৃত্তি করেননি। কয়েক সপ্তাহ ধরে লোবাউকে সুরক্ষিত ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়। আরও নির্ভরযোগ্য সেতু, কামানের অবস্থান, সরঞ্জাম এবং নৌচলাচলের ব্যবস্থা প্রস্তুত করা হয়। ইতালি থেকে তাঁর সৎপুত্র ইউজেনের বাহিনীসহ অতিরিক্ত সৈন্য আসে। ফরাসি নেতৃত্ব এবার বৃহত্তর শক্তি নিয়ে এবং ভিন্ন পারাপারস্থল ব্যবহার করে উত্তর তীরে ওঠার পরিকল্পনা করে। এই প্রস্তুতি দেখায়, ওয়াগ্রামের সাফল্যের ভিত্তি শুধু আক্রমণাত্মক সাহস নয়; প্রকৌশল ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নতিও ছিল।
৫ জুলাই রাতে ও ভোরে ফরাসি বাহিনী দানিয়ুব পেরিয়ে বিস্তৃত মার্শফেল্ড সমভূমিতে মোতায়েন হয়। দুই দিনের ওয়াগ্রামের যুদ্ধে উভয় পক্ষ মিলিয়ে তিন লক্ষের কাছাকাছি সৈন্য অংশ নেয়, যদিও হিসাবভেদে সংখ্যা বদলে যায়। প্রথম দিনের ফরাসি আক্রমণ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। অস্ট্রীয়রা রুসবাখের আড়ালের অবস্থান ও গ্রামগুলো ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাতের অন্ধকারে বিশৃঙ্খলা ও ভুল বোঝাবুঝিও ঘটে। অস্টারলিৎসের মতো দ্রুত কেন্দ্রীয় ফাঁদে শত্রুকে ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে এখানে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘর্ষ চলছিল।
৬ জুলাই কার্ল ফরাসি বাহিনীর দুই পাশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ফরাসি বাম অংশে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মাসেনার সৈন্যদের স্থানান্তর, বেসিয়েরের অশ্বারোহী আক্রমণ এবং কেন্দ্রীভূত কামানের গোলাবর্ষণ সংকট সামলাতে সাহায্য করে। ডানদিকে দাভুর অস্ট্রীয় বাম অংশের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। পরে মাকদোনালদের বড় পদাতিক আক্রমণ কেন্দ্রে চাপ বাড়ায়, যদিও সেটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ওয়াগ্রামের জয় আসে একাধিক আঘাত, রিজার্ভের ব্যবহার ও প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত চাপে রাখার মাধ্যমে।
অস্ট্রীয় বাহিনী শেষ পর্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পিছু হটে; তারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি। উভয় পক্ষের সম্মিলিত হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা কয়েক দশ হাজারে পৌঁছায়। জুলাইয়ে জ্নাইমের যুদ্ধবিরতি সংঘাত থামায় এবং ১৪ অক্টোবর শ্যোনব্রুনের চুক্তিতে অস্ট্রিয়া কঠোর শর্ত মেনে নেয়। সালৎসবুর্গসহ কিছু অঞ্চল বাভারিয়া পায়, গালিসিয়ার অংশ ওয়ারশর ডাচিতে যুক্ত হয় এবং আদ্রিয়াতিক উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ফরাসি ইলিরীয় প্রদেশ গঠিত হয়। ক্ষতিপূরণ, সেনাবাহিনীর সীমা এবং ব্রিটেনবিরোধী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ অস্ট্রিয়ার স্বাধীন পদক্ষেপের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
এরপর নেপোলিয়ন রাজবংশীয় নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেন। জোসেফিনের সঙ্গে তাঁর বিবাহে সন্তান না হওয়ায় উত্তরাধিকার নিয়ে উদ্বেগ ছিল। ১৮০৯ সালের শেষে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ১৮১০ সালে তিনি অস্ট্রীয় সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিসের কন্যা মারি লুইজকে বিয়ে করেন। বিপ্লব থেকে উঠে আসা শাসকের সঙ্গে ইউরোপের প্রাচীন হাবসবুর্গ রাজবংশের এই সম্পর্ক ছিল বড় কূটনৈতিক সাফল্য। ১৮১১ সালের মার্চে পুত্রের জন্ম হলে তাকে ‘রোমের রাজা’ উপাধি দেওয়া হয়। সাম্রাজ্য এখন নিজেকে স্থায়ী বংশগত শাসন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
১৮১০–১১ সালে সরাসরি ফরাসি সাম্রাজ্য ফ্রান্সের পুরোনো সীমানার অনেক বাইরে বিস্তৃত ছিল। বেলজিয়াম, রাইনের বাম তীর, নেদারল্যান্ডস এবং ইতালির পিয়েমন্ত, লিগুরিয়া, তুস্কানি ও রোমাঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত হয়। উত্তর জার্মানির উপকূলীয় অঞ্চল এবং হামবুর্গ, ব্রেমেন ও ল্যুবেকও সংযুক্ত করা হয়। এসব দখলের পেছনে কন্টিনেন্টাল সিস্টেম কার্যকর করার উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাম্রাজ্যের বিভাগসংখ্যা ১৩০-এ পৌঁছায়। তবে সরাসরি সংযুক্ত অঞ্চল, নির্ভরশীল রাজ্য ও সামরিক মিত্রকে একই ধরনের ফরাসি ভূখণ্ড বলা ভুল।
ইতালির রাজ্যে নেপোলিয়ন নিজে রাজা এবং ইউজেন তাঁর প্রতিনিধি ছিলেন। নেপলসে শাসন করতেন তাঁর ভগ্নিপতি মুরা; ওয়েস্টফালিয়ায় ভাই জেরোম। রাইন সংঘের জার্মান রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শাসক বজায় রাখলেও ফরাসি নেতৃত্বের অধীনে সৈন্য ও সহযোগিতা দিত। ওয়ারশর ডাচি পোলিশ প্রত্যাশার কেন্দ্র হলেও ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্পেনে জোসেফের রাজত্বের দাবি থাকলেও বাস্তব কর্তৃত্ব প্রবল প্রতিরোধে সীমিত ছিল। ফলে মানচিত্রে ফরাসি প্রভাব যত বিস্তৃত দেখাত, প্রতিটি অঞ্চলে শাসনের কার্যকারিতা ততটা সমান ছিল না।
এই ব্যবস্থায় স্থানীয় সংস্কার ও বিদেশি আধিপত্য পাশাপাশি চলত। কোথাও সামন্তীয় বাধা কমানো, আইনসংহিতা চালু এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। আবার কর, বাধ্যতামূলক সৈন্যসংগ্রহ, রসদ সরবরাহ ও বাণিজ্যনিষেধ স্থানীয় ক্ষোভ বাড়ায়। ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে বহু জার্মান, ইতালীয়, পোলিশ ও অন্যান্য জাতির সৈন্য যুদ্ধ করত। এই বহুজাতিক শক্তি নেপোলিয়নের সামরিক সামর্থ্য বাড়ালেও প্রত্যেক সহযোগীর স্বার্থ তাঁর নিজের স্বার্থের সমান ছিল না। আনুগত্য বজায় রাখতে বিজয় ও পুরস্কারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন হচ্ছিল।
সাম্রাজ্যের শিখরের সময়ই তার সীমাও স্পষ্ট ছিল। ব্রিটেন সমুদ্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থেকে যুদ্ধ চালাচ্ছিল, পর্তুগালে ফরাসি আক্রমণ ব্যর্থ হচ্ছিল এবং স্পেন শান্ত হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে টিলসিটের সম্পর্ক বাণিজ্য ও পূর্ব ইউরোপের প্রশ্নে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। নেপোলিয়নের ক্ষমতা বিস্তৃত হয়েছিল, কিন্তু সেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ব্যয়ও একই সঙ্গে বেড়েছিল। ওয়াগ্রাম তাঁকে ইউরোপে নতুন কর্তৃত্ব ও রাজবংশীয় মর্যাদা দিয়েছিল; স্থায়ী শান্তি দেয়নি। এই অসম্পূর্ণ আধিপত্যকে আরও নিরাপদ করার চেষ্টাতেই তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন এক অভিযান প্রস্তুত করবেন, যা সাম্রাজ্যের শিখরকে পতনের সূচনায় পরিণত করবে।
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ
কাহামার্কার যুদ্ধ: আতাহুয়ালপার বন্দিত্ব, মুক্তিপণ ও হত্যার ইতিহাস