বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান: বোরোদিনো, মস্কোর আগুন ও গ্র্যান্ড আর্মির ধ্বংস

সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন

নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান: বোরোদিনো, মস্কোর আগুন ও গ্র্যান্ড আর্মির ধ্বংস
মস্কো দখল করেও জয় আসেনি; ফেরার পথে ভেঙে পড়ে নেপোলিয়নের প্রধান সেনাবাহিনী।

ওয়াগ্রামের বিজয় এবং সাম্রাজ্যের বিস্তারের পর নেপোলিয়ন যে পূর্বমুখী অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে আবার নিজের ব্যবস্থায় বাধ্য করা। ১৮১১ সালের মধ্যে টিলসিটের সহযোগিতা ভেঙে পড়ছিল। ব্রিটেনবিরোধী বাণিজ্যনিষেধ রুশ অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল, আর ওয়ারশর ডাচির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথম আলেকজান্ডার উদ্বিগ্ন ছিলেন। নেপোলিয়নেরও আশঙ্কা ছিল, রাশিয়া নির্দেশ অমান্য করলে অন্য সহযোগীরা একই পথে যাবে। তাঁর লক্ষ্য শুরুতেই সমগ্র রাশিয়া দখল করা ছিল না; একটি নির্ণায়ক সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে সম্রাটকে রাজনৈতিক সমঝোতায় বাধ্য করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

১৮১২ সালের ২৪ জুন প্রধান ফরাসি বাহিনী নেমান নদী পার হয়ে অভিযান শুরু করে। বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিভিন্ন পথে অভিযানে অংশ নেওয়া সৈন্য মিলিয়ে সংখ্যা ছয় লক্ষের বেশি ছিল; সবাই একই দিনে নদী পার হয়নি কিংবা মস্কোর দিকে যায়নি। এই গ্র্যান্ড আর্মিতে ফরাসিদের পাশাপাশি পোলিশ, জার্মান, ইতালীয় এবং অন্যান্য জাতির সৈন্য ছিল। প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়াও পৃথক সহায়ক বাহিনী দেয়। বিশাল জনবল শক্তির পরিচয় হলেও এত সৈন্য, ঘোড়া ও গাড়ির খাদ্য এবং চলাচল নিশ্চিত করা ছিল অভূতপূর্ব প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।

নেপোলিয়ন সরবরাহের প্রস্তুতি একেবারেই নেননি—এমন ধারণা ভুল। খাদ্যভাণ্ডার, পরিবহনগাড়ি ও যোগাযোগপথের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা দ্রুত ও সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের প্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়েছিল। রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, দীর্ঘ দূরত্ব এবং একই পথে বিপুল সৈন্যের চাপ সরবরাহকে পিছিয়ে দেয়। স্থানীয় এলাকা থেকেও প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পশুখাদ্য পাওয়া যায়নি। গরম, পানির সমস্যা, আমাশয় ও অন্যান্য রোগে সৈন্য হারাতে থাকে। শীত আসার বহু আগেই গ্র্যান্ড আর্মির যুদ্ধক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছিল।

রুশ বাহিনী শুরুতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। বার্কলে দ্য তলি ও বাগ্রাতিওনের বাহিনীকে আলাদাভাবে ঘিরে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন নেপোলিয়ন। কিন্তু তারা সরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একত্র হতে সক্ষম হয়। পশ্চাদপসরণের সময় রুশরা অনেক সরঞ্জাম ও খাদ্য সরিয়ে নেয় অথবা ধ্বংস করে; স্থানীয় মানুষের পলায়নও ফরাসিদের সংগ্রহের সুযোগ কমায়। এটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত একটি নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল না। রুশ নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ ও রাজনৈতিক চাপ ছিল, কিন্তু সরে যাওয়ার ফলে নেপোলিয়ন প্রত্যাশিত দ্রুত নিষ্পত্তি পাননি।

আগস্টে স্মোলেনস্কের যুদ্ধে ফরাসিরা শহর দখল করে, অথচ রুশ প্রধান বাহিনী আবারও সরে যায়। আগুন ও ধ্বংসের মধ্যে পাওয়া শহর সরবরাহের সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। নেপোলিয়নকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এখানেই থামবেন নাকি আরও গভীরে যাবেন। তিনি মস্কোর দিকে অগ্রসর হন, কারণ মনে করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নগরীর কাছে রুশরা বড় যুদ্ধ দেবে এবং পরাজয়ের পর শান্তি চাইবে। এদিকে জনমতের চাপে রুশ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে; মিখাইল কুতুজভ প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৭ সেপ্টেম্বর বোরোদিনোর কাছে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। মস্কোর পশ্চিমে রুশরা মাটির দুর্গ, প্রতিরক্ষা বাঁধ ও কামানঘাঁটি তৈরি করেছিল। বাগ্রাতিওনের প্রতিরক্ষাস্থান এবং রায়েভস্কি দুর্গ দখলকে কেন্দ্র করে প্রচণ্ড লড়াই চলে। ফরাসি পদাতিক ও অশ্বারোহীরা বারবার আক্রমণ করে; রুশরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এক দিনে দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় সত্তর হাজার বা তারও বেশি হতাহত হয় বলে অনুমান করা হয়, যদিও হিসাবভেদে পার্থক্য আছে। বাগ্রাতিওন গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।

ফরাসিরা শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে এবং রুশরা পরে পিছু হটে। সেই অর্থে নেপোলিয়ন যুদ্ধক্ষেত্রের দখল পান, কিন্তু তাঁর প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। বোরোদিনো রুশ সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করেনি, আলেকজান্ডারকেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করেনি। নেপোলিয়ন তাঁর ইম্পেরিয়াল গার্ডের প্রধান পদাতিক শক্তিকে চূড়ান্ত আক্রমণে ব্যবহার করেননি; এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে বিতর্ক হয়েছে। তবে একটি অতিরিক্ত আক্রমণ নিশ্চিতভাবে সম্পূর্ণ বিজয় এনে দিত—এমন দাবিও প্রমাণ করা যায় না।

কুতুজভ মস্কো রক্ষায় আরেকটি বড় যুদ্ধ না করে সেনাবাহিনী বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৪ সেপ্টেম্বর নেপোলিয়ন শহরে প্রবেশ করেন। মস্কো তখন রাশিয়ার রাজধানী ছিল না—রাজধানী ছিল সেন্ট পিটার্সবার্গ—তবে ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব ছিল বিপুল। অধিকাংশ বাসিন্দা চলে গিয়েছিলেন। নেপোলিয়ন আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ ও শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাশা করেছিলেন, কিন্তু তা আসেনি। একটি বিশাল নগরী দখল করেও তিনি এমন কোনো রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ পাননি, যার সঙ্গে নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করা যায়।

প্রবেশের পরপরই মস্কোর বিভিন্ন স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কাঠের ঘরবাড়ি, প্রবল বাতাস এবং অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার দুর্বলতা ধ্বংস বাড়ায়। রুশদের ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের প্রমাণ আছে, আবার বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও দুর্ঘটনাও ভূমিকা রেখেছিল। পুরো অগ্নিকাণ্ডকে এক ব্যক্তির একক নির্দেশের ফল হিসেবে দেখানো অতিসরলীকরণ। শহরের বড় অংশ পুড়ে যায় এবং সম্ভাব্য আশ্রয় ও রসদের ক্ষতি হয়। তবে আগুন লাগামাত্র ফরাসিরা ফিরে যায়নি; নেপোলিয়ন প্রায় পাঁচ সপ্তাহ মস্কোয় অপেক্ষা করেন।

এই অপেক্ষা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি। আলেকজান্ডার শান্তি আলোচনায় আসেননি, আর রুশ বাহিনী তারুতিনোর দিকে অবস্থান নিয়ে নতুন সৈন্য ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করে। ফরাসিদের খাদ্যসংগ্রহ ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯ অক্টোবর নেপোলিয়ন মস্কো ছাড়েন। প্রথমে দক্ষিণের তুলনামূলক অক্ষত অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ২৪ অক্টোবর মালোইয়ারোস্লাভেৎসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং রুশ অবস্থান তাঁর সামনে ঝুঁকি বাড়ায়। তিনি ফিরে যান আগেই বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া স্মোলেনস্কের পথ ধরে।

পশ্চাদপসরণে খাদ্য ও পশুখাদ্যের অভাব দ্রুত বিপর্যয় ডেকে আনে। ঘোড়া মারা গেলে কামান ও রসদগাড়ি ফেলে দিতে হয়; অশ্বারোহী বাহিনীর নজরদারি ও প্রতিরক্ষাও দুর্বল হয়। ক্লান্ত সৈন্যরা দলছুট হয়ে পড়ে এবং কসাক ও অন্যান্য রুশ বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। নভেম্বরের তীব্র ঠান্ডা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাব, অনাহার ও অবসন্ন শরীরে হিমদংশন ও মৃত্যু বাড়ে। শীত ছিল বিপর্যয়ের শক্তিশালী ত্বরক; সেনাবাহিনীর ক্ষয় শুরু করেছিল রোগ, দূরত্ব, যুদ্ধ ও সরবরাহব্যর্থতা।

ভিয়াজমা ও ক্রাসনির লড়াইয়ে পশ্চাদপসরণকারী বাহিনী আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নভেম্বরের শেষদিকে বেরেজিনা নদীতে পৌঁছে ফরাসিরা ঘেরাওয়ের আশঙ্কায় পড়ে। নদী সম্পূর্ণ জমে না থাকায় সেতু ছাড়া পারাপার কঠিন ছিল। জেনারেল এবলের প্রকৌশলীরা শীতল জলে নেমে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করেন। ২৬–২৯ নভেম্বর লড়াই ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নেপোলিয়ন এবং অবশিষ্ট সংগঠিত বাহিনীর বড় অংশ নদী পার হয়। কিন্তু বহু দলছুট সৈন্য ও অসামরিক অনুসারী নিহত, বন্দি অথবা পেছনে আটকা পড়েন। বেরেজিনা একই সঙ্গে সামরিকভাবে পালিয়ে বাঁচা এবং মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।

ডিসেম্বরে নেপোলিয়ন সেনাবাহিনীর দায়িত্ব মুরার হাতে দিয়ে প্যারিসের উদ্দেশে রওনা হন। মাসের মাঝামাঝি অবশিষ্ট বাহিনী নেমান পেরিয়ে ফিরে আসে। কতজন বেঁচে ফিরেছিলেন, তা নির্ভর করে মূল অগ্রবর্তী বাহিনী, পার্শ্ববাহিনী, পরে ফেরা বন্দি ও আহতদের কীভাবে গণনা করা হচ্ছে তার ওপর। কিন্তু ফল নিয়ে সন্দেহ নেই: গ্র্যান্ড আর্মির প্রধান আক্রমণকারী শক্তি কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অভিজ্ঞ সৈন্য, কর্মকর্তা, ঘোড়া ও সরঞ্জামের ক্ষতি শুধু নতুন লোক নিয়োগ করে দ্রুত পূরণ করা সম্ভব ছিল না।

মস্কো দখলের পরও বিজয় অর্জিত না হওয়া নেপোলিয়নের যুদ্ধপদ্ধতির সীমা প্রকাশ করে। তিনি বড় যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর দখলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সমঝোতায় বাধ্য করতে অভ্যস্ত ছিলেন; রাশিয়ায় সেই সূত্র কাজ করেনি। প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনী টিকে ছিল, শাসক যুদ্ধ চালাতে দৃঢ় ছিলেন এবং দূরত্ব ফরাসি শক্তিকে ক্রমে ক্ষয় করেছিল। ১৮১২ সালের শেষে সাম্রাজ্য তখনো অস্তিত্ব হারায়নি, কিন্তু তার অপরাজেয়তার ভাবমূর্তি ভেঙে যায়। এই দুর্বলতার সুযোগে প্রুশিয়া, রাশিয়া এবং পরে অস্ট্রিয়া নতুনভাবে একত্র হবে—আর ইউরোপের যুদ্ধ এবার নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ফিরে যাবে।