পেনিনসুলার যুদ্ধ: স্পেন ও পর্তুগালে কীভাবে দুর্বল হয়েছিল নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য?
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
আইবেরীয় প্রতিরোধে নেপোলিয়নের বিজয় পরিণত হয় দীর্ঘ সামরিক ক্ষয়যুদ্ধে।
ব্রিটিশ বাণিজ্য বন্ধের জন্য ইউরোপের বন্দরগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার যে চেষ্টা নেপোলিয়ন করেছিলেন, তার সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরিণতি দেখা দেয় আইবেরীয় উপদ্বীপে। পর্তুগালকে বাধ্য করা এবং স্পেনকে আরও নির্ভরযোগ্য সহযোগীতে পরিণত করার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ দখলদারির যুদ্ধে রূপ নেয়। এখানে রাজধানী দখল করলেও প্রতিরোধ শেষ হতো না, একটি সেনাবাহিনী পরাজিত হলেও আরেকটি গড়ে উঠত। স্পেন ও পর্তুগালে নেপোলিয়নের বাহিনীকে একই সঙ্গে নিয়মিত সৈন্য, স্থানীয় গেরিলা এবং প্রতিকূল জনসমাজের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। এই সম্মিলিত চাপই পেনিনসুলার যুদ্ধকে সাম্রাজ্যের গভীর ক্ষতে পরিণত করে।
পর্তুগালের সঙ্গে ব্রিটেনের দীর্ঘ বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। দেশটিকে কন্টিনেন্টাল সিস্টেমে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করতে নেপোলিয়ন সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন। ১৮০৭ সালের অক্টোবরের ফন্তেনব্লোর চুক্তিতে ফ্রান্স ও স্পেন পর্তুগাল আক্রমণ ও ভাগ করার পরিকল্পনা করে। জেনারেল জুনোর বাহিনী স্পেনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নভেম্বরে লিসবনে প্রবেশ করে। কিন্তু পর্তুগিজ রাজপরিবার ব্রিটিশ নৌসহায়তায় ব্রাজিলের উদ্দেশে চলে যায়। ফলে রাজধানী দখল হলেও রাজবংশ, বৈদেশিক যোগাযোগ এবং সাম্রাজ্যের সমুদ্রপারের ভিত্তি ফরাসিদের হাতে আসেনি।
স্পেন তখন ফ্রান্সের সহযোগী হলেও ফরাসি সৈন্যরা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও দুর্গ দখল করতে থাকে। একই সময়ে রাজা চতুর্থ কার্লোস, তাঁর মন্ত্রী গোদোয় এবং যুবরাজ ফের্দিনান্দের মধ্যে ক্ষমতার সংঘাত চলছিল। ১৮০৮ সালের মার্চে আরানহুয়েসের বিদ্রোহের পর ফের্দিনান্দ রাজা হন। নেপোলিয়ন এই পারিবারিক সংকট কাজে লাগিয়ে তাঁদের বায়োনে নিয়ে যান এবং সিংহাসনের দাবি ত্যাগে বাধ্য করেন। এরপর নিজের ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে স্পেনের রাজা করেন। সহযোগী দেশের রাজবংশ সরিয়ে দেওয়া ফরাসি উপস্থিতিকে প্রকাশ্য বিদেশি আধিপত্যে পরিণত করে।
১৮০৮ সালের ২ মে মাদ্রিদে গণবিদ্রোহ শুরু হয়। ফরাসি বাহিনী তা দমন করে এবং পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড জনক্ষোভ আরও বাড়ায়। প্রতিরোধ দ্রুত বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় হুন্তাগুলো অনুপস্থিত ফের্দিনান্দের নামে কর্তৃত্ব দাবি করে সৈন্য ও অর্থ সংগ্রহ করতে থাকে। বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্য অভিন্ন ছিল না: কেউ রাজা ও ক্যাথলিক ধর্ম রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, কেউ বিদেশি দখলের বিরোধিতা করেছিলেন, আবার কেউ রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগ দেখেছিলেন। এই বহুমুখী প্রতিরোধকে শুধু রাজতন্ত্রী প্রতিক্রিয়া কিংবা শুধু আধুনিক জাতীয়তাবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
জুলাইয়ে বাইলেনের যুদ্ধে কাস্তানিয়োসের নেতৃত্বাধীন স্প্যানিশ বাহিনীর কাছে ফরাসি জেনারেল দুপোঁ আত্মসমর্পণ করেন। এটি দেখিয়ে দেয়, নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যিক বাহিনীও বড় পরাজয়ের শিকার হতে পারে। জোসেফ সাময়িকভাবে মাদ্রিদ ছাড়তে বাধ্য হন। পর্তুগালেও ব্রিটিশ বাহিনী নামে। আর্থার ওয়েলেসলি রোলিসা ও ভিমেইরোতে জুনোর সৈন্যদের পরাজিত করেন। পরবর্তী সিন্ত্রার চুক্তিতে ফরাসিরা ব্রিটিশ জাহাজে দেশে ফেরার সুযোগ পেলেও পর্তুগালে তাদের দখল ভেঙে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
নেপোলিয়ন নিজে ১৮০৮ সালের শেষদিকে স্পেনে এসে পরিস্থিতি পাল্টানোর চেষ্টা করেন। অতিরিক্ত অভিজ্ঞ সৈন্য নিয়ে তিনি স্প্যানিশ বাহিনীগুলোকে পরাজিত করেন এবং ডিসেম্বরে মাদ্রিদ পুনর্দখল করেন। উত্তরদিকে অগ্রসর ব্রিটিশ সেনাপতি জন মুর পরে পিছু হটেন; ১৮০৯ সালের জানুয়ারিতে কোরুনায় যুদ্ধ করে তাঁর বাহিনী সমুদ্রপথে সরে যায়। মুর সেখানে নিহত হন। কিন্তু ইউরোপের অন্যত্র অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় নেপোলিয়ন স্পেন ত্যাগ করেন। এরপর যুদ্ধের প্রধান দায়িত্ব পড়ে তাঁর মার্শাল ও জেনারেলদের ওপর।
ফরাসিরা বড় শহর ও প্রধান সড়ক দখল করতে পারলেও গ্রামাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। গেরিলারা দূত, ছোট সেনাদল, বিচ্ছিন্ন চৌকি এবং রসদবহরে আক্রমণ করত। স্থানীয় পথঘাটের পরিচয় ও জনসমাজের সহায়তা তাদের সুবিধা দিত। ফরাসিদের প্রতিটি বহরের সঙ্গে পাহারা দিতে, সেতু রক্ষা করতে এবং অসংখ্য অবস্থানে সৈন্য ছড়িয়ে রাখতে হতো। যে সৈন্যরা যোগাযোগপথ পাহারা দিচ্ছিল, তারা প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে একত্র হয়ে লড়তে পারছিল না। এভাবে প্রতিরোধ ফরাসি সংখ্যাধিক্যের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
গেরিলা যুদ্ধ অবশ্য একাই ফরাসিদের পরাজিত করেনি। স্প্যানিশ নিয়মিত বাহিনী বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যায় এবং ফরাসি শক্তিকে বিভিন্ন অঞ্চলে আটকে রাখে। সারাগোসার মতো শহরে অবরোধ ও রাস্তায় রাস্তায় প্রতিরোধ বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। অন্যদিকে ফরাসি প্রতিশোধ, খাদ্য সংগ্রহ, লুটপাট এবং বিদ্রোহীদের সহিংসতায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ে। সন্দেহের ভিত্তিতে শাস্তি ও গ্রাম ধ্বংস আরও শত্রুতা তৈরি করত। যুদ্ধ তাই শুধু সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ ছিল না; দখলদারি ও প্রতিরোধ সমাজের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করেছিল।
পর্তুগাল ব্রিটিশদের জন্য স্থায়ী ঘাঁটি হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী সৈন্য, অর্থ ও সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে পারত, যা ফরাসিদের স্থলপথনির্ভর সরবরাহের তুলনায় বড় সুবিধা ছিল। বেরেসফোর্ডের অধীনে পুনর্গঠিত পর্তুগিজ সেনাবাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ১৮০৯ সালে ওয়েলেসলি পর্তুগালে ফিরে পোর্তো থেকে সুলের বাহিনীকে সরিয়ে দেন। স্পেনের তালাভেরায় সাফল্যের পর তিনি ওয়েলিংটন উপাধি পান, যদিও সরবরাহ ও সহযোগিতার সমস্যায় তাঁকে আবার পর্তুগালে ফিরতে হয়। তাঁর অগ্রযাত্রাও সব সময় নিরবচ্ছিন্ন ছিল না।
১৮১০ সালে মার্শাল মাসেনা পর্তুগাল আক্রমণ করলে ওয়েলিংটনের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা কার্যকর হয়। বুসাকোর যুদ্ধের পর মিত্রবাহিনী লিসবনের উত্তরে তোরেস ভেদ্রাসের প্রস্তুত দুর্গরেখায় সরে যায়। দুর্গ, কামান, পাহাড়ি অবস্থান এবং সুরক্ষিত যোগাযোগপথ মিলে ফরাসিদের সামনে কঠিন বাধা তৈরি করে। আশপাশ থেকে খাদ্য ও ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ায় মাসেনার সৈন্যদের সরবরাহসংকট বাড়ে। এই নীতিতে পর্তুগিজ জনগণও কষ্ট পায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৮১১ সালে ফরাসিরা পিছু হটে; লিসবন দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল ফরাসি নেতৃত্বের বিভক্তি। রাজা জোসেফের কর্তৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন মার্শালের নিজস্ব সেনাবাহিনী ও সরাসরি নেপোলিয়নের নির্দেশ ছিল। ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব যৌথ অভিযান কঠিন করে তোলে। অন্যদিকে স্পেনের কাদিসে অবরোধের মধ্যেও কর্তেস রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কাজ চালায় এবং ১৮১২ সালের সংবিধান গ্রহণ করে। প্রতিরোধের ভেতরে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়াই চলতে থাকে। সামরিক দখল তাই গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
১৮১২ সালে ওয়েলিংটন সিউদাদ রদ্রিগো ও বাদাহোস দখল করেন; উভয় অবরোধের পর ব্রিটিশ সৈন্যদের লুট ও সহিংসতাও ঘটে। জুলাইয়ে সালামাঙ্কার বিজয় তাঁকে মাদ্রিদে প্রবেশের সুযোগ দেয়। কিন্তু বুর্গোস দখলে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে আবার পিছিয়ে যেতে হয়। একই সময়ে রাশিয়া অভিযানের জন্য নেপোলিয়নের সৈন্য ও মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া আইবেরীয় অবস্থানকে দুর্বল করছিল। ১৮১৩ সালের জুনে ভিতোরিয়ায় মিত্রবাহিনীর বিজয় জোসেফের শাসনের ভিত্তি ভেঙে দেয়। এরপর যুদ্ধ পিরেনিস পেরিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সে পৌঁছায়।
পেনিনসুলার যুদ্ধ নেপোলিয়নের পতনের একমাত্র কারণ ছিল না, কিন্তু এটি বহু বছর ধরে সৈন্য, অর্থ, ঘোড়া ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার শক্তি ক্ষয় করেছিল। ব্রিটেন মহাদেশে স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্র পায়, আর স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ প্রতিরোধ ফরাসি কর্তৃত্বের সীমা প্রকাশ করে। রাজধানী দখল, রাজা বসানো এবং যুদ্ধজয়—কোনোটিই জনগণের সহযোগিতার বিকল্প হতে পারেনি। এই অসমাপ্ত সংঘাত চলার মধ্যেই নেপোলিয়ন রাশিয়াকে বাধ্য করার জন্য আরও বৃহৎ অভিযান প্রস্তুত করেন। পশ্চিমের ক্ষয়যুদ্ধের বোঝা বহন করেই তাঁর সাম্রাজ্য এবার পূর্বের বিশাল দূরত্ব, সরবরাহসংকট ও বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যায়।
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ
কাহামার্কার যুদ্ধ: আতাহুয়ালপার বন্দিত্ব, মুক্তিপণ ও হত্যার ইতিহাস