বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের প্রতিষ্ঠা: ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার উদ্দেশ্য কী ছিল?

সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের প্রতিষ্ঠা: ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার উদ্দেশ্য কী ছিল?
পোপের অনুমোদন ও রাজকীয় কর্তৃত্বে স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের সূচনা।

সেভিলে প্রতিবেশীর সন্দেহ কীভাবে গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষমতায় পরিণত হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল ১৪৭৮ সালের একটি অনুমতিপত্রে। আগের কয়েক দশকে কনভার্সোদের বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষ জমেছিল, ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার সিদ্ধান্ত তাকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি দিল। তবে পোপের অনুমোদন পাওয়া এবং আদালত চালু হওয়া একই ঘটনা ছিল না। ১৪৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়; প্রথম ইনকুইজিটর নিয়োগ হয় ১৪৮০ সালে। এই ব্যবধানের মধ্যেই বোঝা যায়, ইনকুইজিশন কেবল উত্তেজিত জনতার দাবি ছিল না; তাকে কার্যকর করতে রাজদরবারের পরিকল্পনা, কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছিল।

ইসাবেলা ১৪৭৪ সালে কাস্তিলের সিংহাসনে বসেন, কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার শুরু থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিদার হুয়ানাকে সমর্থন করে পর্তুগাল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে; কাস্তিলের অভিজাতদের মধ্যেও বিভক্তি ছিল। ১৪৭৯ সালে সংঘাতের নিষ্পত্তি তাঁর অবস্থান শক্তিশালী করে। একই বছর ফার্দিনান্দ আরাগনের রাজা হন। তাঁদের ১৪৬৯ সালের বিবাহ দুই রাজবংশকে যুক্ত করলেও কাস্তিল ও আরাগনের আইন, প্রতিষ্ঠান ও রাজস্বব্যবস্থা পৃথক রয়ে যায়। ফলে তাঁদের সামনে প্রশ্ন ছিল, এই বিচিত্র ভূখণ্ডে রাজকীয় কর্তৃত্ব কীভাবে সুসংহত করা যাবে।

ধর্ম সেই কর্তৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল। শাসকের দায়িত্ব সম্পর্কে তৎকালীন খ্রিস্টীয় ধারণায় সঠিক বিশ্বাস রক্ষা, গির্জাকে সহযোগিতা এবং ধর্মদ্রোহ দমন পরস্পর সম্পর্কিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হতো। ইসাবেলার ধর্মীয় নিষ্ঠাকে কেবল রাজনৈতিক অভিনয় বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে ফার্দিনান্দকে শুধু অর্থলোভী ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখলেও ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের সিদ্ধান্তে একসঙ্গে কাজ করেছিল। তাঁরা এমন এক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, যা বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা রক্ষার দাবি করত এবং একই সঙ্গে রাজদরবারের হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র বাড়াত।

এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক কেন্দ্র ছিল আন্দালুসিয়া, বিশেষত সেভিল। সেখানে কনভার্সোদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং কিছু পরিবারের সামাজিক উত্থান দীর্ঘদিনের বিরোধকে তীব্র করেছিল। ১৪৭৭–১৪৭৮ সালে রাজদম্পতির সেভিল অবস্থানের সময় ডোমিনিকান যাজক আলোনসো দে ওহেদাসহ কয়েকজন ধর্মীয় ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বহু ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান গোপনে ইহুদি ধর্মাচার পালন করছেন। রাজদরবার এসব অভিযোগকে গুরুতর হিসেবে গ্রহণ করে। তবে অভিযোগের ব্যাপকতা এবং বাস্তবে গোপন ধর্মাচারের ব্যাপকতা এক বিষয় নয়। পরবর্তী আদালতের নথিও অভিযোগকারীর পক্ষপাত, চাপ ও আত্মরক্ষার কৌশল বিবেচনা করে পড়তে হয়।

কনভার্সো সমাজ নিজেই ছিল বৈচিত্র্যময়। কেউ আন্তরিক ক্যাথলিক, কেউ পূর্বপুরুষের বিশ্বাসের অনুসারী, আবার কেউ দুই ঐতিহ্যের মাঝামাঝি পারিবারিক অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন। খাবারের রীতি, বিশ্রামের দিন কিংবা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কোনো প্রথা নিয়ে প্রতিবেশীর সন্দেহ তৈরি হতে পারত। কিন্তু সাংস্কৃতিক অভ্যাস দেখেই একজনের ধর্মবিশ্বাস নিশ্চিত করা যায় না। সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছিল কারণ বহু ধর্মান্তর ঘটেছিল সহিংসতার মুখে। যে সমাজ মানুষকে বাপ্তিস্ম নিতে বাধ্য করেছিল, সেই সমাজের একটি অংশ আবার তাদের বাপ্তিস্মের আন্তরিকতা নিয়ে বিচার দাবি করছিল।

ইনকুইজিশনের বিচারিক যুক্তি এই বাপ্তিস্মের ওপর নির্ভর করত। ইহুদি হিসেবে বসবাসকারী অবাপ্তাইজিত ব্যক্তি এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর ইহুদি ধর্মাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অবস্থান এক ছিল না। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে খ্রিস্টীয় বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত বা ধর্মদ্রোহী হিসেবে বিচার করার সুযোগ ছিল। তাই প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠেন ইহুদি বংশোদ্ভূত খ্রিস্টানরা। ১৪৭৮ সালের ঘটনাকে সরাসরি সব ইহুদি ও মুসলিমের বিরুদ্ধে একই বিচার অভিযান হিসেবে দেখানো ভুল। মুসলিম বংশোদ্ভূত ধর্মান্তরিতদের বিরুদ্ধে ব্যাপক কার্যক্রম পরবর্তী পরিস্থিতিতে গুরুত্ব পায়।

এমন তদন্তব্যবস্থা ইউরোপে সম্পূর্ণ নতুন ছিল না। ত্রয়োদশ শতক থেকেই পোপীয় ইনকুইজিশন বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মদ্রোহ অনুসন্ধান করছিল; আরাগনেও তার পূর্বসূরি ছিল। বিশপদেরও বিশ্বাসসংক্রান্ত অপরাধ বিচারের ভূমিকা ছিল। কাস্তিলে নতুন প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব তাই শুধু ধর্মীয় অপরাধের তদন্ত নয়, ইনকুইজিটর নির্বাচনে রাজমুকুটের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা। রাজদম্পতি এমন একটি ধর্মীয় বিচারপ্রতিষ্ঠান চেয়েছিলেন, যার কর্মকর্তা নিয়োগে তাঁদের প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকবে। এই কাঠামো স্থানীয় ক্ষমতাসম্পর্কের মধ্যে রাজকীয় উপস্থিতি বাড়াতে পারত, যদিও শুরুতেই সমগ্র উপদ্বীপের জন্য পূর্ণাঙ্গ এক পরিকল্পনা তৈরি ছিল—এমন দাবি করা কঠিন।

১৪৭৮ সালের ১ নভেম্বর পোপ চতুর্থ সিক্সটাস এক্সিগিত সিনসেরে দেভোতিওনিস আফেক্তুস নামে পরিচিত পোপীয় অনুমতিপত্র জারি করেন। এতে রাজদম্পতিকে কাস্তিলের জন্য যোগ্য ধর্মযাজকদের ইনকুইজিটর হিসেবে বেছে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়। অনুমতিপত্রটি ধর্মীয় অপরাধ বিচার করার বৈধতা গির্জার কর্তৃত্ব থেকেই পেয়েছিল। ফলে ইনকুইজিশনকে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাজকীয় আদালত বলা যায় না। আবার একে রোম থেকে পরিচালিত সাধারণ পোপীয় আদালত ভাবাও যথার্থ নয়। এর শক্তি তৈরি হয়েছিল পোপীয় অনুমোদন, যাজকদের বিচারিক ভূমিকা ও রাজকীয় প্রশাসনের সহযোগিতা মিলিয়ে।

অনুমোদনের পরও প্রায় দুই বছর প্রথম নিয়োগ না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে ধর্মীয় শিক্ষা, প্রচার ও সংশোধনের উদ্যোগ চলেছিল। রাজদরবার তাৎক্ষণিকভাবে সর্বত্র আদালত বসায়নি। এই বিলম্বের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় পরিষ্কার: অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশাল আমলাতন্ত্র প্রস্তুত হয়ে যায়নি। ১৪৮০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মিগেল দে মোরিয়ো এবং হুয়ান দে সান মার্তিন নামের দুই ডোমিনিকানকে প্রথম ইনকুইজিটর নিযুক্ত করা হয়। তাঁদের কাজের কেন্দ্র হয় সেভিল, যেখানে অভিযোগ ও সামাজিক উত্তেজনা আগেই জমে ছিল।

সেভিলে আদালত কার্যক্রম শুরু করলে সন্দেহের প্রকৃতি বদলে যায়। আগে কোনো পরিবার সম্পর্কে বাজারে গুজব ছড়ালে সামাজিক অপমান বা সহিংসতার আশঙ্কা থাকত; এখন সেই অভিযোগ লিখিত সাক্ষ্য ও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হতে পারত। তদন্তকারীরা বক্তব্য সংগ্রহ করতেন, সন্দেহভাজনদের ডেকে পাঠাতেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা পেতেন। অভিযুক্তদের একটি অংশ পালিয়ে অভিজাতদের অধীন এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাজকীয় সহযোগিতা আদালতকে আশ্রয়দাতাদের ওপরও চাপ দেওয়ার সুযোগ দেয়। ধর্মীয় তদন্ত এভাবেই ব্যক্তির বিশ্বাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে সম্পত্তি, চলাচল ও পারিবারিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। বিচার ও দণ্ডের ফলে অভিযুক্ত পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হতে পারত; বাজেয়াপ্ত সম্পদের সঙ্গে আদালতের ব্যয় ও রাজকীয় আর্থিক স্বার্থও যুক্ত হয়। তবে ইনকুইজিশন শুধু ধনী কনভার্সোদের সম্পদ লুটের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—এমন একমাত্রিক ব্যাখ্যা প্রমাণের চেয়ে বেশি দাবি করে। ধর্মীয় উদ্বেগ, সামাজিক প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক প্রণোদনা পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল। কোনো পরিবারের সম্পদ ছিল না বলেই যে তারা অভিযোগ থেকে নিরাপদ থাকত, তাও নয়। ব্যবস্থাটি সম্পদের পাশাপাশি পরিচয় ও বিশ্বাসকেও লক্ষ্য করেছিল।

১৪৮১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সেভিলে প্রথম বহুল স্বীকৃত অটো দে ফে অনুষ্ঠিত হয়; সংশ্লিষ্ট দণ্ডপ্রক্রিয়ায় ছয়জনকে আগুনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এখানে অটো দে ফে বলতে প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘোষণা ও দণ্ড ঘোষণার ধর্মীয় অনুষ্ঠান বোঝায়, সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নাম নয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন ধর্মীয় আদালতের দায় দূর করে না; বরং দেখায়, শাস্তি কার্যকর করতে গির্জাভিত্তিক বিচার ও রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করছিল। সেভিলের ঘটনায় নতুন প্রতিষ্ঠানের কঠোরতা দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সেই কঠোরতা পোপীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও বিরোধ সৃষ্টি করে। অভিযুক্তদের প্রতি অবিচার, প্রক্রিয়াগত অনিয়ম ও আপিলের প্রশ্নে অভিযোগ রোমে পৌঁছালে সিক্সটাস ১৪৮২ সালে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন। তবে এটিকে পোপের নীতিগত ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ঘোষণা ভাবা ঠিক নয়; ন্যায়বিচারের অভিযোগের পাশাপাশি এখতিয়ার ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বও ছিল। রাজদরবার তাদের প্রভাব ছাড়তে প্রস্তুত ছিল না। পরবর্তী সমঝোতা ও নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আরও শক্ত হয়। ১৪৮৩ সালে তোরকেমাদা ইনকুইজিটর জেনারেল হন—অর্থাৎ ১৪৭৮ সালের শুরু থেকেই তিনি সর্বময় প্রধান ছিলেন না।

ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা তাই এমন এক বিচারব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা তাঁদের চোখে ধর্মীয় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপায় এবং রাজকীয় কর্তৃত্বের কার্যকর সহায়ক ছিল। কিন্তু তার মানবিক পরিণতি ছিল গভীর: খ্রিস্টান হিসেবে স্বীকৃত মানুষও বংশপরিচয় ও প্রতিবেশীর অভিযোগের কারণে অনিরাপদ হয়ে পড়লেন। অনুমতিপত্র থেকে কর্মকর্তা, কর্মকর্তা থেকে আদালত এবং আদালত থেকে প্রকাশ্য দণ্ড—এই ধারায় ইনকুইজিশন বাস্তব শক্তি অর্জন করল। এবার তার স্থায়িত্ব নির্ভর করছিল তদন্ত কীভাবে চলবে, সাক্ষ্য কীভাবে গ্রহণ করা হবে এবং অভিযুক্ত মানুষ নিজের পক্ষে কথা বলার কতটুকু সুযোগ পাবেন, তার ওপর।