বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের পটভূমি: সহাবস্থান থেকে ধর্মীয় নিপীড়ন

সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের পটভূমি: সহাবস্থান থেকে ধর্মীয় নিপীড়ন
মধ্যযুগীয় স্পেনে সহাবস্থান থেকে সন্দেহ ও ধর্মীয় নিপীড়নের পথে যাত্রা।

মধ্যযুগীয় স্পেনের কোনো শহরে একই দিনে গির্জার ঘণ্টা, মসজিদের আজান ও সিনাগগের প্রার্থনা শোনা অস্বাভাবিক ছিল না। বাজারে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ কেনাবেচা করতেন, চিকিৎসকের কাছে যেতেন এবং কখনো একই শাসকের প্রশাসনে কাজ করতেন। অথচ পঞ্চদশ শতকের শেষে সেই সমাজেই প্রতিবেশীর খাবার, পারিবারিক প্রথা কিংবা পূর্বপুরুষের পরিচয় ধর্মীয় সন্দেহের বিষয় হয়ে উঠল। স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের জন্ম বুঝতে এই পরিবর্তনটি বোঝা জরুরি। এটি কোনো একদিনের সিদ্ধান্ত কিংবা তিন ধর্মের চিরস্থায়ী শত্রুতার ফল ছিল না; দীর্ঘদিনের আইনি বৈষম্য, সহিংসতা, ধর্মান্তর ও রাজকীয় স্বার্থ মিলে এর পথ তৈরি করেছিল।

শুরুতেই মনে রাখা দরকার, মধ্যযুগের অধিকাংশ সময়ে আজকের স্পেন একক রাষ্ট্র ছিল না। আইবেরীয় উপদ্বীপে বিভিন্ন খ্রিস্টান রাজ্য এবং মুসলিমশাসিত অঞ্চল পাশাপাশি অবস্থান করত। ৭১১ সাল থেকে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা আল-আন্দালুসের সীমানাও স্থির ছিল না। কর্দোবার আমিরাত ও খিলাফত, পরবর্তী ছোট ছোট তাইফা রাজ্য এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা শাসকদের অধীনে ধর্মীয় সম্পর্ক বদলেছে। ফলে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসকে কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কিংবা অবিরাম নিপীড়নের গল্প হিসেবে দেখলে বাস্তবের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো হারিয়ে যায়।

মুসলিম শাসনে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সাধারণত জিম্মি বা সুরক্ষাপ্রাপ্ত অমুসলিম সম্প্রদায় হিসেবে বসবাস করতেন। নির্দিষ্ট কর ও বিধিনিষেধের বিনিময়ে তাঁরা নিজস্ব ধর্মীয় জীবন এবং কিছু সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান বজায় রাখতে পারতেন। কিন্তু এই সুরক্ষা আধুনিক অর্থে সমান নাগরিকত্ব ছিল না। শাসক, অঞ্চল ও সময়ভেদে ধর্মীয় স্থাপনা, প্রকাশ্য আচার এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর বিধিনিষেধ পরিবর্তিত হতো। একই সঙ্গে কিছু ইহুদি ও খ্রিস্টান ব্যক্তি চিকিৎসা, অনুবাদ, বাণিজ্য ও প্রশাসনে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতেন। ব্যক্তিগত সাফল্য ও সাম্প্রদায়িক অধস্তনতা একই সমাজে পাশাপাশি থাকতে পারত।

এই সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার বাস্তব নিদর্শন ছিল ভাষা ও জ্ঞানচর্চা। আরবি ভাষায় শিক্ষিত ইহুদি পণ্ডিতেরা দর্শন ও চিকিৎসাবিদ্যায় কাজ করেছেন; আরবিভাষী খ্রিস্টানদেরও নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল। ১০৮৫ সালে তোলেদো খ্রিস্টান শাসনে আসার পরও সেখানে আরবি জ্ঞানভাণ্ডার হারিয়ে যায়নি। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে বিভিন্ন অনুবাদ উদ্যোগে আরবি গ্রন্থের জ্ঞান লাতিন ও কাস্তিলীয় ভাষায় পৌঁছায়। তবে এসব উদ্যোগ কোনো স্থায়ী আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির নিশ্চয়তা দেয়নি। জ্ঞানের আদানপ্রদান চললেও রাজনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও সামাজিক সুযোগ নিয়ে দ্বন্দ্ব বজায় ছিল।

মুসলিম শাসনের মধ্যেও সহিষ্ণুতার সীমা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ১০৬৬ সালে গ্রানাডায় ইহুদিবিরোধী হত্যাকাণ্ড এবং দ্বাদশ শতকে আলমোহাদদের কঠোর ধর্মনীতির কারণে বহু মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মান্তর, স্থানত্যাগ কিংবা পরিচয় গোপনের চাপের মুখে পড়তে হয়। কিছু পরিবার খ্রিস্টানশাসিত ভূখণ্ডে আশ্রয় নেয়। এসব ঘটনা দেখায়, নিপীড়ন কেবল একটি ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল না। তবে পরবর্তী স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের নির্দিষ্ট কারণ খুঁজতে হলে বিশেষভাবে খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের দিকে তাকাতে হয়।

খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর দক্ষিণমুখী ভূখণ্ড সম্প্রসারণকে সাধারণত রেকনকিস্তা বলা হয়। কিন্তু এটি শুরু থেকে পরিচালিত একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন জাতীয় যুদ্ধ ছিল না। খ্রিস্টান ও মুসলিম শাসকেরা কখনো যুদ্ধ করেছেন, কখনো কর, সন্ধি ও সামরিক জোটের সম্পর্ক গড়েছেন। বিজিত অঞ্চলে মুসলিম কৃষক ও কারিগরদের শ্রম শাসকদের দরকার ছিল। খ্রিস্টান শাসনের অধীনে থেকে ইসলাম পালনকারী মানুষ মুদেখার নামে পরিচিত হন। তাঁদের অবস্থান অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল; কোথাও চুক্তিতে ধর্মীয় অধিকার স্বীকৃত হলেও পরে সেগুলো সংকুচিত হয়েছে। সামরিক বিজয় তাই সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র এক ধর্মের সমাজ তৈরি করেনি।

খ্রিস্টান রাজ্যগুলোতে ইহুদিদের অবস্থানও ছিল দ্বৈত। তাঁরা রাজকীয় সুরক্ষা পেতে পারতেন এবং নিজস্ব সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। পেশাগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়—কারিগরি, চিকিৎসা, বাণিজ্য, কৃষিসংশ্লিষ্ট কাজ ও অর্থঋণ সবই এর অংশ। কিন্তু কর আদায় বা ঋণদানের সঙ্গে যুক্ত কিছু ইহুদির দৃশ্যমান ভূমিকা পুরো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে ব্যবহৃত হয়। রাজস্বনীতি ও ঋণের অসন্তোষ ধর্মীয় প্রচারের সঙ্গে মিশে যেত। অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তির অবস্থান দিয়ে সমগ্র ইহুদি জনগোষ্ঠীকে বিচার করা ছিল নিপীড়নের একটি কার্যকর অজুহাত।

চতুর্দশ শতকে মহামারি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং কাস্তিলের রাজবংশীয় সংঘাত সামাজিক উত্তেজনা বাড়ায়। ইহুদিবিরোধী ধর্মোপদেশ ও মিথ্যা অভিযোগ আগে থেকেই প্রচলিত ছিল; রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও সেগুলো ব্যবহার করত। কিছু রাজা ও নগর কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের রক্ষার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সুরক্ষা কার্যকর করার শক্তি বা সদিচ্ছা সবসময় ছিল না। এখানে অর্থনৈতিক সংকটকে একমাত্র ব্যাখ্যা ভাবাও ভুল। সংকট বিদ্বেষকে তীব্র করেছিল, কিন্তু কাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তা নির্ধারণে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ধারণা ও সামাজিক বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই পরিস্থিতির ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে ১৩৯১ সালে। সেভিলে আর্চডিকন ফেরান মার্তিনেসের দীর্ঘদিনের উসকানিমূলক প্রচারের পটভূমিতে ইহুদি মহল্লায় আক্রমণ শুরু হয়। সহিংসতা পরে কাস্তিল ও আরাগনের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ নিহত হন, সম্পত্তি লুট হয় এবং সম্প্রদায়গুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অসংখ্য ইহুদি প্রাণরক্ষার জন্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরের সব ঘটনা একই পরিস্থিতিতে ঘটেনি, কিন্তু এই সহিংসতা আইবেরীয় সমাজে বিপুলসংখ্যক নতুন খ্রিস্টান পরিবার তৈরি করে। তাদের উপস্থিতিই পরবর্তী শতকের ধর্মীয় ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে চলে আসে।

ইহুদি বংশোদ্ভূত এই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান ও তাঁদের উত্তরসূরিরা সাধারণভাবে কনভার্সো নামে পরিচিত হন। কেউ আন্তরিকভাবে খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করতেন, কেউ গোপনে ইহুদি বিশ্বাস বজায় রাখতেন, আবার কারও পারিবারিক জীবনে পুরোনো সংস্কৃতির অংশ থেকে গিয়েছিল। কনভার্সো পরিচয় মানেই গোপন ইহুদি ধর্মাচার ছিল না। কিন্তু সমালোচকেরা এই পার্থক্য মুছে দেন। বাপ্তিস্মের মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করার কথা থাকলেও বাস্তবে নতুন প্রশ্ন ওঠে: একজন খ্রিস্টানের পূর্বপুরুষ ইহুদি হলে তাঁকে কতটা বিশ্বাস করা হবে? ধর্মান্তর সন্দেহের অবসান ঘটানোর পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহকে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে।

এই সন্দেহের সঙ্গে সামাজিক প্রতিযোগিতাও যুক্ত হয়। খ্রিস্টান হওয়ার পর কিছু কনভার্সো পরিবার প্রশাসন, গির্জা, শিক্ষাক্ষেত্র ও নগরজীবনে উন্নতির সুযোগ পায়। পুরোনো খ্রিস্টান পরিচয়ধারী প্রতিদ্বন্দ্বীদের একাংশ তাদের উত্থানকে হুমকি হিসেবে দেখে। ১৪৪৯ সালে তোলেদোর বিদ্রোহের সময় ইহুদি বংশোদ্ভূত ধর্মান্তরিতদের নির্দিষ্ট পদ থেকে বাদ দেওয়ার বিধান জারি হয়। পরবর্তী লিম্পিয়েসা দে সাংগ্রে বা “রক্তের বিশুদ্ধতা” ধারণার ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। বিধানটি বিতর্কিত ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল; তবু এতে স্পষ্ট হয়, বৈষম্য এখন শুধু ব্যক্তির বিশ্বাসের বদলে বংশপরিচয়কেও স্থায়ী সন্দেহের ভিত্তি করছে।

এখানেই ইনকুইজিশনের বিচারিক যুক্তি বোঝা যায়। অবাপ্তাইজিত ইহুদি বা মুসলিমের নিজ ধর্ম পালন সাধারণভাবে খ্রিস্টীয় ধর্মদ্রোহের একই বিচারিক শ্রেণিতে পড়ত না। কিন্তু বাপ্তাইজিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে খ্রিস্টীয় বিশ্বাস ত্যাগ বা বিরোধী ধর্মাচারের অভিযোগ তোলা যেত। স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের প্রাথমিক প্রধান লক্ষ্য তাই ছিল সন্দেহভাজন কনভার্সো। মুসলিম বংশোদ্ভূত খ্রিস্টানদের ওপর ব্যাপক নজরদারি পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্ব পায়। শুরু থেকেই সব মুসলিম ও ইহুদিকে একই আদালতে বিচার করা হচ্ছিল—এমন ধারণা বিভ্রান্তিকর। ধর্মান্তরিতদের বিচার এবং অবাপ্তাইজিত সংখ্যালঘুদের ওপর অন্যান্য নিপীড়নের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

১৪৬৯ সালে কাস্তিলের ইসাবেলা ও আরাগনের ফের্দিনান্দের বিবাহ একটি শক্তিশালী রাজবংশীয় জোটের ভিত্তি গড়ে দেয়; দুই রাজ্য সঙ্গে সঙ্গে একক প্রশাসনে পরিণত হয়নি। ক্ষমতা সুসংহত করার সময় তাঁরা ধর্মীয় শৃঙ্খলাকেও শাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখেন। কনভার্সোদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যাজকদের চাপ এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব বিস্তারের সুযোগ মিলিত হয়। ১৪৭৮ সালের ১ নভেম্বর পোপ চতুর্থ সিক্সটাস তাঁদের কাস্তিলে ইনকুইজিটর নিয়োগের অনুমতি দেন। এর আগে ইউরোপে এবং আরাগনে ইনকুইজিশনের নজির ছিল; নতুন ব্যবস্থার বিশেষত্ব ছিল রাজদরবারের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ। বহুদিনের সামাজিক সন্দেহ এবার একটি স্থায়ী বিচারপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তি পেল। সেভিলে সেই প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে প্রতিবেশীর অভিযোগ কীভাবে গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষমতায় রূপ নেবে, ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ে সেটিই সামনে আসবে।