রোমান পুরাণের উত্তরাধিকার: শিল্প, সাহিত্য ও আধুনিক সংস্কৃতি
সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি
প্রাচীন রোমের দেবদেবীরা নতুন অর্থে ফিরে আসেন শিল্প, সাহিত্য ও দৈনন্দিন ভাষায়।
লারেস ও পেনেটেসের ছোট বেদিতে রোমানরা পরিবারের নিরাপত্তা এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখত। সেই ঘরগুলো বদলে গেছে, অনেক বেদি পরিত্যক্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের বৃহত্তর পৌরাণিক জগৎ সম্পূর্ণ হারায়নি। জুপিটার এখন গ্রহের নাম, ভেনাস সৌন্দর্যের পরিচিত প্রতীক, আর কিউপিডের তীর প্রেমের কথায় ফিরে আসে। রোমান পুরাণের উত্তরাধিকার মূলত অপরিবর্তিত উপাসনার ইতিহাস নয়; পুরোনো কাহিনি নতুন ভাষা ও উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ইতিহাস। কখনো শিল্পী, কখনো কবি, কখনো রাষ্ট্র কিংবা সাধারণ মানুষ সেই কাহিনিকে নিজের সময়ের উপযোগী করে তুলেছে।
এই উত্তরাধিকারকে শুধু রোমের একক সৃষ্টি বললেও ভুল হবে। রোমান দেবদেবীর বহু গল্প গ্রিক পুরাণ থেকে গৃহীত, আবার ইতালীয় ও অন্য সাংস্কৃতিক পরম্পরাও সেখানে মিশেছে। ইউরোপের পরবর্তী শিল্পীরা প্রায়ই গ্রিক কাহিনি আঁকলেন রোমান নাম ব্যবহার করে। আফ্রোদিতি হলেন ভেনাস, হেরাক্লেস হলেন হারকিউলিস। ফলে গ্রিক ও রোমান উপাদানের সম্মিলিত ধ্রুপদি উত্তরাধিকার বোঝা জরুরি। রোমের বিশেষ ভূমিকা ছিল লাতিন সাহিত্য, সাম্রাজ্যের যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিক্ষার মাধ্যমে এসব কাহিনিকে বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
ভার্জিলের এনিয়েড এই প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রয় থেকে ইতালিতে এনিয়াসের যাত্রা যুদ্ধ, নির্বাসন, কর্তব্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্মকে এক কাহিনিতে বেঁধেছে। অন্যদিকে ওভিদের মেটামরফোসেস বা রূপান্তরের কাহিনিগুলো ইউরোপীয় শিল্পীদের জন্য অসাধারণ বিষয়ভাণ্ডার হয়ে ওঠে। মানুষ গাছে, পাখিতে বা অন্য সত্তায় বদলে যাওয়ার গল্প শিল্পে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখানোর সুযোগ দেয়। পুরাণের দীর্ঘ জীবন শুধু দেবতার জনপ্রিয়তার ফল নয়; শক্তিশালী সাহিত্যিক রচনার সংরক্ষণ ও পুনঃপাঠও তার প্রধান কারণ। পাণ্ডুলিপি এবং পরে মুদ্রিত বই সেই ধারাবাহিকতা বহন করেছে।
খ্রিস্টধর্মের বিস্তার ও প্রাচীন উপাসনার সংকোচনের পরেও এসব রচনা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। মধ্যযুগের লেখকেরা কখনো পৌরাণিক কাহিনিকে নৈতিক শিক্ষা, কখনো মানবিক দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। দান্তের ডিভাইন কমেডিতে ভার্জিল পথপ্রদর্শক হন, আর প্রাচীন পাতালকাহিনির কিছু চরিত্র নতুন খ্রিস্টীয় কাঠামোতে স্থান পায়। কিন্তু দান্তের নরককে রোমান পাতালজগতের সরাসরি অনুবাদ বলা যাবে না। পুরোনো চরিত্র নতুন বিশ্বাসের মধ্যে নতুন ভূমিকা পেয়েছে। এই গ্রহণ ও পরিবর্তনই কাহিনিগুলোকে টিকে থাকার সুযোগ দিয়েছে।
রেনেসাঁ যুগে প্রাচীন সাহিত্য ও শিল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়লে দেবদেবীরা নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। বত্তিচেল্লির ভেনাসের জন্ম তার বিখ্যাত উদাহরণ। সমুদ্র থেকে দেবীর আগমন গ্রিক-রোমান কাহিনির বিষয় হলেও ছবিটি প্রাচীন রোমের উপাসনার দৃশ্য নয়। এতে সৌন্দর্য, প্রেম এবং সমকালীন বৌদ্ধিক ব্যাখ্যা মিলেছে। ভেনাসের মানবদেহ শিল্পীকে আদর্শ অনুপাত, কোমলতা ও আবেগ প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। ধর্মীয় দেবী থেকে শিল্পের বিষয় হয়ে ওঠা মানে তাঁর অর্থ কমে যাওয়া নয়; অর্থের ক্ষেত্র বদলে যাওয়া।
কিউপিড ও সাইকির গল্পও এই নতুন শিল্পজীবনের অংশ। রোমের ভিলা ফারনেসিনায় রাফায়েলের পরিকল্পনায় নির্মিত চিত্রচক্রে তাঁদের দেবলোকের কাহিনি স্থান পায়। পরে আন্তোনিও কানোভার ভাস্কর্যে কিউপিডের দ্বারা সাইকির পুনর্জাগরণের মুহূর্ত কোমল মানবিক অনুভূতিতে প্রকাশিত হয়। একই গল্পে একজন শিল্পী দেবসভার মহিমা দেখাতে পারেন, অন্যজন স্পর্শ ও পুনর্মিলনের আবেগ। পৌরাণিক বিষয় তাই শিল্পীর জন্য নির্দিষ্ট উত্তর নয়, ব্যাখ্যার সুযোগ। সাইকির পরীক্ষা এবং মিলন বিভিন্ন যুগে প্রেম, আত্মা ও আশার আলাদা ভাষা হয়ে উঠেছে।
বারোক ভাস্কর্যে রূপান্তরের নাটকীয়তা বিশেষ শক্তি পায়। বের্নিনির অ্যাপোলো ও ড্যাফনেতে পালিয়ে যাওয়া নারীর শরীর গাছে পরিবর্তিত হচ্ছে—মার্বেলে যেন মুহূর্তটি আটকে আছে। বিষয়টি ওভিদের মাধ্যমে প্রচারিত গ্রিক কাহিনি। আধুনিক পাঠে এখানে একতরফা আকাঙ্ক্ষা, তাড়া এবং নারীর সম্মতির প্রশ্নও সামনে আসে। সুন্দর শিল্পকর্মের বিষয়বস্তুকে প্রশ্ন করা তার ঐতিহাসিক মূল্য অস্বীকার করা নয়। বরং পুরাণের নতুন পাঠ দেখায়, দর্শকের সামাজিক মূল্যবোধ বদলালে পরিচিত দৃশ্যের অর্থও বদলে যেতে পারে।
ইউরোপীয় সাহিত্যে একই পরিবর্তন দেখা যায়। শেক্সপিয়রের ভেনাস অ্যান্ড অ্যাডোনিস আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাখ্যান এবং মৃত্যুর পৌরাণিক উপাদানকে কাব্যে রূপ দেয়। কবি ও নাট্যকারেরা দেবতার নাম ব্যবহার করে মানুষের অভিজ্ঞতা গভীর করেছেন, আবার রাজনৈতিক ক্ষমতার সমালোচনাও করেছেন। এনিয়াসের কর্তব্য যেমন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ব্যাখ্যা করতে পারে, ডিডোর মৃত্যু তেমন সেই প্রতিষ্ঠার মানবিক মূল্য দেখাতে পারে। একটি কাহিনির মধ্যে মহিমা ও ক্ষতি পাশাপাশি থাকার কারণেই তা নতুন যুগে প্রাসঙ্গিক থাকে। পুরাণের স্থায়িত্ব অনেক সময় তার অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে।
দৈনন্দিন ভাষাতেও রোমান দেবতারা উপস্থিত। ইংরেজি জানুয়ারির নাম জানুসের সঙ্গে, মার্চের নাম মার্সের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফরাসি মঙ্গলবারের নাম মার্স, বুধবারের নাম মার্কারি এবং শুক্রবারের নাম ভেনাসের স্মৃতি বহন করে। তবে ইউরোপের সব ভাষায় একই ব্যবস্থা নেই; কোথাও অন্য দেবতার নাম বা ভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরা ব্যবহৃত হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে মার্কারি, ভেনাস, মার্স, জুপিটার ও স্যাটার্ন পরিচিত গ্রহের নাম। এই নামগুলো ব্যবহার করতে প্রাচীন দেবতাদের বিশ্বাস করা লাগে না—সাংস্কৃতিক স্মৃতি বিশ্বাসের বাইরেও টিকে থাকতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পুরাণের নামকে নতুন অর্থ দিয়েছে। নেপচুনের নাম সমুদ্রের দেবতাকে স্মরণ করায়, আর প্লুটোর নাম পাতালশাসককে। নাসার অ্যাপোলো কর্মসূচি ও স্যাটার্ন রকেটও ধ্রুপদি নামকে মহাকাশযাত্রার সঙ্গে যুক্ত করেছে। রসায়নের ‘মারকারি’ নামটি মার্কারির স্মৃতি বহন করে; ‘ভলকানাইজেশন’ শব্দে ভালকানের আগুনের সম্পর্ক ধরা পড়ে। এসব ক্ষেত্রে দেবতার পুরোনো চরিত্র সরাসরি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়। নামটি কখনো উপযুক্ত প্রতীক, কখনো মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত। পুরাণ এভাবে প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতের ভাষাতেও স্থান পেয়েছে।
রোমুলাস ও রেমাসকে দুধ খাওয়ানো নেকড়ে রোমের পরিচয়ের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আছে। নগর, ক্রীড়া এবং জনপরিসরের চিত্রে এই দৃশ্য দেখা যায়। হারকিউলিসের গদা ও সিংহচর্ম শক্তির চিহ্ন, মিনার্ভা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হন। আবার প্রেমের বিজ্ঞাপনে কিউপিডকে প্রায়ই ছোট ডানাওয়ালা শিশুরূপে দেখানো হয়, যদিও সাইকির প্রেমিকের প্রাচীন কাহিনি আরও জটিল। আধুনিক প্রতীক অনেক সময় পুরাণকে সংক্ষিপ্ত করে, একটি বৈশিষ্ট্য রেখে বেদনা, দ্বন্দ্ব ও বহুস্তরীয় পরিচয় বাদ দেয়।
উৎসবের উত্তরাধিকার নিয়ে বিশেষ সতর্কতা দরকার। স্যাটার্নালিয়ায় ভোজ, উপহার এবং সামাজিক নিয়ম শিথিল করার প্রথা ছিল; পরবর্তী শীতকালীন উৎসবেও মিল পাওয়া যায়। কিন্তু মিল থেকেই বড়দিনকে স্যাটার্নালিয়ার সরাসরি নতুন নাম বলা যায় না। ধর্মীয় বর্ষপঞ্জি, স্থানীয় লোকাচার এবং বহু ঐতিহাসিক পরিবর্তন এখানে কাজ করেছে। বাক্কানালিয়া শব্দটিও আধুনিক ভাষায় উচ্ছৃঙ্খল আনন্দ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, অথচ প্রাচীন উপাসনায় দীক্ষা ও ধর্মীয় সম্পর্ক ছিল। টিকে থাকা শব্দ সব সময় তার মূল অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিবরণ বহন করে না।
রোমান পুরাণের উত্তরাধিকার তাই জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তির চেয়ে বড়। এই ধারাবাহিক যাত্রায় রোমের জন্মকাহিনি পরিচয়ের প্রশ্ন তুলেছে, দেবদেবীরা ক্ষমতা ও জীবিকার সম্পর্ক দেখিয়েছেন, আর প্রেম ও পরীক্ষার গল্প মানুষের সীমা প্রকাশ করেছে। আজ আমরা তাঁদের কাছে নিবেদন না করেও তাঁদের নাম বলি, ছবি দেখি এবং কাহিনি নতুনভাবে লিখি। পুরাণ বেঁচে থাকে তখনই, যখন নতুন মানুষ পুরোনো গল্পের মধ্যে নিজের প্রশ্ন খুঁজে পায়। লারেসের ছোট গৃহবেদি থেকে আধুনিক বই, মঞ্চ ও পর্দা পর্যন্ত সেই প্রশ্নের যাত্রাই রোমের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য
প্রথম কনসাল থেকে সম্রাট: নেপোলিয়নিক কোড, সংস্কার ও ১৮০৪ সালের অভিষেক
কোকো শ্যানেল: পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে নারীর জীবনধারা বদলে দেওয়ার ইতিহাস
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট: আটলান্টিকজয়ী নারী বৈমানিকের জীবন ও অন্তর্ধানের রহস্য
রোজা লুক্সেমবার্গ: বিপ্লব, গণতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রামের অসাধারণ নারী