বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লারেস, পেনেটেস ও গৃহদেবতা: রোমান পরিবারের উপাসনার জগৎ

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

লারেস, পেনেটেস ও গৃহদেবতা: রোমান পরিবারের উপাসনার জগৎ
রোমান ঘরের ছোট উপাসনাস্থলে মিলত পরিবারের নিরাপত্তা, খাদ্য ও স্মৃতির প্রার্থনা।

কিউপিড ও সাইকির গল্প দেবলোকের বিবাহভোজে শেষ হয়েছিল, যেখানে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে একটি নতুন পরিবার গড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তব রোমান পরিবারের নিরাপত্তা শুধু ভালোবাসার ওপর নির্ভর করত না। খাদ্য, রোগ, জন্ম, মৃত্যু এবং বাড়ির স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মানুষ অতিপ্রাকৃত রক্ষকদের উপস্থিতি অনুভব করত। লারেস ও পেনেটেস ছিলেন সেই ঘনিষ্ঠ ধর্মীয় জগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জুপিটারের বিশাল মন্দিরের বাইরে, ছোট বেদি কিংবা দেয়ালের কুলুঙ্গিতে তাঁদের উদ্দেশে নিবেদন হতো। রোমান ধর্ম তাই শুধু রাষ্ট্রের উৎসব নয়; ঘরের প্রতিদিনের জীবনও ছিল তার ক্ষেত্র।

এই গৃহদেবতাদের বুঝতে প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল এড়ানো দরকার: লারেস, পেনেটেস এবং মৃত পূর্বপুরুষ একই সত্তার তিনটি নাম নয়। তাঁদের ভূমিকার মধ্যে মিল ও সংযোগ ছিল, কিন্তু পরিচয় আলাদা। লারেস গৃহ ও নির্দিষ্ট স্থানের রক্ষক হিসেবে পরিচিত; পেনেটেসের সঙ্গে খাদ্যভাণ্ডার এবং পরিবারের জীবিকা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভেস্তা গৃহের আগুনের পবিত্রতা প্রকাশ করতেন। আবার পরিবারের মৃত সদস্যদের স্মরণ ও সম্মানের নিজস্ব আচার ছিল। এই পৃথক সম্পর্কগুলো একত্রে রোমান বাড়িকে ধর্মীয় অর্থ দিত।

লারেসের উৎপত্তি নিয়ে প্রাচীন ব্যাখ্যা এবং আধুনিক গবেষণায় একমত সিদ্ধান্ত নেই। তাঁদের কখনো পূর্বপুরুষের আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত করে বোঝানো হয়েছে, কখনো স্থান ও গৃহের রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে। কিন্তু প্রত্যেক লারকে কোনো নির্দিষ্ট মৃত আত্মীয়ের আত্মা বলা যায় না। তাঁদের উপাসনা বাড়ির বাইরেও দেখা যায়—পাড়া, পথের সংযোগস্থল এবং বৃহত্তর জনসমাজে। লারেসের পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল কোনো স্থান বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্থায়ী রক্ষার সম্পর্ক। ফলে তাঁদের জগৎ পারিবারিক স্মৃতির চেয়েও বিস্তৃত।

পম্পেই ও অন্যান্য রোমান স্থানের গৃহচিত্রে লারেসকে প্রায়ই দুই তরুণ পুরুষের রূপে দেখা যায়। ছোট টিউনিক পরা, প্রাণবন্ত ভঙ্গির এই রক্ষকদের হাতে পানপাত্র ও নিবেদনের পাত্র থাকে। মাঝখানে কখনো টোগা পরা একটি ব্যক্তি বেদিতে নিবেদন করেন। তাঁকে সাধারণত গৃহকর্তার জিনিয়াস, অর্থাৎ তাঁর জীবনশক্তি ও ব্যক্তিগত রক্ষাকারী দৈব সত্তার প্রতিরূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। নিচে সাপও আঁকা থাকতে পারে। তবে সব বাড়ির ছবি একই নয়; একই প্রতীককে প্রত্যেক ক্ষেত্রে এক অর্থে ব্যাখ্যা করাও নিরাপদ নয়।

গৃহদেবতার উপাসনাস্থলকে সাধারণভাবে লারারিয়াম বলা হয়। তা কখনো ছোট মন্দিরসদৃশ কাঠামো, কখনো দেয়ালের কুলুঙ্গি, আবার কখনো আঁকা বেদি ও দেবতার ছবি। ধনী বাড়ির আঙিনা কিংবা রান্নাঘরে এমন স্থান থাকতে পারত। ছোট বাসস্থানে উপাসনার ব্যবস্থা আরও সরল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সংরক্ষিত নিদর্শনের বড় অংশ নির্দিষ্ট অঞ্চল ও তুলনামূলক সচ্ছল বাড়ি থেকে এসেছে। তাই পম্পেইয়ের সুন্দর লারারিয়াম দেখে সাম্রাজ্যের প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের ধর্মীয় জীবন একই রকম ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

পেনেটেসের পরিচয়ে খাদ্যভাণ্ডারের গুরুত্ব বিশেষভাবে ধরা পড়ে। ঘরে সংরক্ষিত শস্য ও অন্যান্য খাদ্য পরিবারকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে টিকিয়ে রাখত। সেই জীবিকার রক্ষক হিসেবে তাঁদের সম্মান করা হতো। কিন্তু পেনেটেসের জন্য সর্বত্র একই নির্দিষ্ট মুখ বা পোশাক ছিল না; গৃহের নির্বাচিত দেবমূর্তিও তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারত। পেনেটেসকে কেবল দুইটি স্থির চরিত্রবিশিষ্ট দেবতা মনে করা তাই ভুল। গৃহরক্ষার ধারণার মধ্যে তাঁদের স্থান বোঝা বেশি কার্যকর। পরিবারের খাদ্য ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কই ছিল মুখ্য।

এই ঘরোয়া বিশ্বাসের একটি রাষ্ট্রিক রূপও ছিল। রোমের নিজস্ব পেনেটেসের কথা বলা হতো, আর এনিয়াসের কাহিনিতে ট্রয় থেকে পবিত্র গৃহদেবতাদের ইতালিতে নিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আগুনে ধ্বংস হওয়া নগর থেকে তিনি শুধু আত্মীয়দের উদ্ধার করেননি; সঙ্গে এনেছিলেন এক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ধারাবাহিকতা। পুরোনো বাড়ি হারালেও তার পবিত্র সম্পর্ক নতুন ভূমিতে বহন করা যায়—এই ধারণা ট্রোজান নির্বাসনকে ভবিষ্যৎ রোমের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। পরিবারের দেবতা এভাবেই সমগ্র জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ভেস্তার উপস্থিতি এই ব্যবস্থাকে দৈনন্দিন আগুনের সঙ্গে যুক্ত করত। চুলায় খাবার প্রস্তুত হতো, উষ্ণতা পাওয়া যেত এবং পরিবারের সদস্যরা তার আশপাশে মিলিত হতেন। গৃহের আগুন তাই জীবনের স্থায়িত্বের দৃশ্যমান চিহ্ন। তবে প্রত্যেক বাড়িতে ভেস্টাল ভার্জিনদের মতো স্বতন্ত্র পুরোহিত্রী কিংবা রাষ্ট্রের পবিত্র আগুনের সমান আচার ছিল না। রাষ্ট্রের ভেস্তা-উপাসনা ও গৃহের চুলার ধর্মীয় মর্যাদা সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়। রোমান ধর্মে একই দেবী ঘরের অন্তরঙ্গতা এবং নগরের সম্মিলিত নিরাপত্তা—দুই স্তরেই অর্থ বহন করতে পারতেন।

গৃহপূজায় নিবেদন সাধারণত বড় আয়োজনের ওপর নির্ভর করত না। ধূপ, মদ, ফুল, খাদ্যের অংশ কিংবা ছোট প্রদীপ ব্যবহার করা হতো। খাবারের সময় দেবতাদের স্মরণ, বিশেষ দিনে বেদি সাজানো এবং পারিবারিক পরিবর্তনে নিবেদন করার প্রথা ছিল। মাসের গুরুত্বপূর্ণ দিন, জন্মদিন বা বিবাহের মতো উপলক্ষে উপাসনা বিশেষ অর্থ পেত। তবে প্রতিটি রোমান পরিবার প্রতিদিন একই নিয়মে পূজা করত, এমন দাবি করা যাবে না। স্থানীয় রীতি, আর্থিক সামর্থ্য এবং পরিবারের অভ্যাস অনুযায়ী আচারের ধরন বদলাত।

পরিবারের ধর্মীয় কর্তৃত্বে গৃহকর্তা বা পাতেরফামিলিয়াসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু রোমান ‘পরিবার’ বলতে শুধু স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান বোঝাত না; দাসসহ বৃহত্তর গৃহসম্প্রদায়ও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। নারী, দাস এবং গৃহপরিচালনায় যুক্ত অন্য সদস্যরা বিভিন্ন কাজে ও আচারে অংশ নিতে পারতেন। এই অংশগ্রহণের মধ্যে নিরাপত্তার যৌথ আকাঙ্ক্ষা ছিল, আবার ক্ষমতার অসমতাও ছিল। একই গৃহদেবতার সামনে দাঁড়ানো মানেই সামাজিক সমতা নয়। ঘরের ধর্মীয় ঐক্য কখনো তার বিদ্যমান কর্তৃত্বকেও দৃঢ় করত।

মৃত আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানেস—সম্মানিত মৃতদের বোঝাতে ব্যবহৃত একটি ধর্মীয় পরিচয়। রোমান সমাধিলিপিতে তাঁদের উদ্দেশে উৎসর্গের উল্লেখ পরিচিত। মৃত পরিবারের সদস্যদের স্মরণে সমাধিতে ফুল ও খাদ্য নিবেদন করা হতো। ফেব্রুয়ারির প্যারেন্টালিয়া এই স্মরণের বিশেষ সময়; তার সঙ্গে যুক্ত পারিবারিক পুনর্মিলনের পর্বও ছিল। এসব আচার মৃতদের ভুলে না যাওয়া এবং জীবিতদের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কাজ করত। পূর্বপুরুষের স্মৃতি এখানে আবেগের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বও ছিল।

অন্যদিকে, মে মাসের লেমুরিয়া উৎসবের সঙ্গে অশান্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত আত্মার উপস্থিতি দূর করার আচার যুক্ত ছিল। সাহিত্যিক বিবরণে গৃহকর্তার রাতের অনুষ্ঠান এবং কালো শিম ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু এই বিবরণকে রোমের সব যুগের সব বাড়ির সরাসরি নথি মনে করা ঠিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃতদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে কেবল শ্রদ্ধা ছিল না; ভয় এবং দূরত্বের প্রয়োজনও ছিল। সম্মানিত মৃত, অশান্ত আত্মা ও গৃহরক্ষক দেবতাকে একই শ্রেণিতে মিশিয়ে দিলে এই পার্থক্য হারিয়ে যায়।

কিছু অভিজাত রোমান পরিবারের বাড়িতে পূর্বপুরুষের মুখাবয়বসংবলিত প্রতিরূপ বা মুখোশ সংরক্ষণ করা হতো, যা অন্ত্যেষ্টির শোভাযাত্রা ও বংশের মর্যাদা প্রকাশে ব্যবহৃত হতে পারত। এগুলোকে প্রত্যেক পরিবারের সাধারণ লারারিয়ামের দেবমূর্তি মনে করা যাবে না। পূর্বপুরুষের স্মৃতিতে রাজনৈতিক দাবি থাকত: এই বংশ আগে রাষ্ট্রকে সেবা করেছে, তাই বর্তমান সদস্যও সম্মানের যোগ্য। গৃহের ধর্ম, বংশপরিচয় ও জনজীবন এভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতো। পাড়ার সংযোগস্থলের লারেস আবার ঘরের বাইরের প্রতিবেশী সম্পর্ককে ধর্মীয় রূপ দিতেন।

লারেস ও পেনেটেসের জগৎ তাই রোমান পুরাণের সবচেয়ে দৈনন্দিন অথচ গভীর অংশগুলোর একটি। এখানে দানববধ বা দেবলোকের বিবাহের চেয়ে বেশি জরুরি ছিল রুটি, নিরাপদ আশ্রয় এবং পরিবারের ধারাবাহিকতা। বাড়ি রোমানদের কাছে শুধু দেয়ালঘেরা সম্পত্তি নয়; জীবিত মানুষ, মৃতদের স্মৃতি এবং দেবতার রক্ষার সম্পর্ক দিয়ে গড়া স্থান। কিউপিড ও সাইকির মিলন একটি পরিবার গঠনের গল্প বলেছিল। গৃহদেবতাদের উপাসনা দেখায়, সেই পরিবারকে প্রতিদিন টিকিয়ে রাখতে মানুষ কীভাবে ছোট নিবেদন, স্মরণ এবং পারস্পরিক দায়িত্বের মধ্যে পবিত্রতা খুঁজে নিত।