বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গর্ভাবস্থায় পিঠব্যথা কেন হয়? নিরাপদে আরাম পাওয়ার উপায় ও সতর্কসংকেত

গর্ভাবস্থায় পিঠব্যথা কেন হয়? নিরাপদে আরাম পাওয়ার উপায় ও সতর্কসংকেত
সঠিক ভঙ্গি, সহনীয় চলাফেরা ও সময়মতো চিকিৎসায় পিঠব্যথা সামলান।

গর্ভাবস্থায় পিঠ বা কোমরে ব্যথা খুব পরিচিত সমস্যা। কারও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ালে অস্বস্তি হয়, কারও বিছানায় পাশ ফিরতে ব্যথা লাগে, আবার কারও দৈনন্দিন কাজও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে পরিচিত সমস্যা বলেই সব পিঠব্যথাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। ব্যথার ধরন এবং সঙ্গে থাকা লক্ষণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।

গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই হরমোনের প্রভাবে শরীরের সন্ধি ধরে রাখা বন্ধনী কিছুটা শিথিল হতে পারে। এতে কোমর ও শ্রোণির পেশিকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বেশি কাজ করতে হয়। পরে জরায়ু ও শিশুর আকার বাড়লে শরীরের ওজন এবং ভারসাম্যও বদলায়।

বাড়তি চাপ ও ভঙ্গির পরিবর্তন

পেট সামনে বাড়ায় অনেকে অজান্তেই কোমর বেশি বাঁকিয়ে দাঁড়ান। পেটের পেশিও প্রসারিত হয়। ফলে পিঠের পেশিতে বাড়তি চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকা, ভারী জিনিস তোলা বা ঝুঁকে কাজ করা সেই চাপ বাড়ায়।

আগে কোমরব্যথা, শ্রোণিতে আঘাত কিংবা আগের গর্ভাবস্থায় একই সমস্যা থাকলে আবার ব্যথার আশঙ্কা বাড়তে পারে। শারীরিক পরিশ্রমের কাজও প্রাসঙ্গিক। তবে ব্যথা মানেই মেরুদণ্ড নষ্ট হচ্ছে বা শিশুর ক্ষতি হচ্ছে—এমন নয়।

সাধারণ কোমরব্যথা ও শ্রোণির ব্যথা আলাদা করবেন কীভাবে?

পিঠের পেশিজনিত ব্যথায় কোমরের মাঝখানে বা দুই পাশে টান লাগতে পারে। কাজের পর ব্যথা বাড়া এবং অবস্থান বদলালে কিছুটা কমা দেখা যায়। তবে লক্ষণ দেখে নিজে নিশ্চিত রোগনির্ণয় করা সম্ভব নয়।

গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত শ্রোণিবেষ্টনীর ব্যথা কোমরের নিচে, নিতম্বে, কুঁচকিতে বা সামনের যৌনাস্থির কাছে অনুভূত হতে পারে। কখনো ব্যথা উরুর দিকেও ছড়ায়। শ্রোণির সন্ধি ও আশপাশের পেশির ওপর চাপের সঙ্গে এটি সম্পর্কিত।

কোন কাজে ব্যথা বাড়ছে, খেয়াল করুন

সিঁড়ি ওঠা, এক পায়ে দাঁড়িয়ে পোশাক পরা, গাড়ি থেকে নামা কিংবা বিছানায় পাশ ফেরার সময় ব্যথা হলে শ্রোণিবেষ্টনীর সমস্যার মূল্যায়ন দরকার হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে জোর করে পা বেশি ফাঁক করে প্রসারণ করলে আরাম নাও মিলতে পারে।

ব্যথায় হাঁটা বা ঘুম ব্যাহত হলে প্রসূতি চিকিৎসককে জানান। প্রয়োজনে গর্ভাবস্থার পেশি ও সন্ধির সমস্যা নিয়ে কাজ করেন এমন শারীরিক চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

এই ব্যথা থাকলেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে হবে—এমন নয়। অনেকেই স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেন। প্রসবের সময় আরামদায়ক অবস্থান ও পা নাড়ানোর সীমা নিয়ে আগেই আলোচনা করা ভালো।

বসা, দাঁড়ানো ও ঘুমানোর ভঙ্গিতে কী বদলাবেন?

সারা দিন একটিমাত্র নিখুঁত ভঙ্গি ধরে রাখার চেয়ে নিয়মিত অবস্থান বদলানো বেশি বাস্তবসম্মত। ব্যথা বাড়ার আগেই ছোট বিরতি নিন। একটানা দাঁড়িয়ে রান্না বা বসে কাজ করলে মাঝে অন্য অবস্থানে বিশ্রাম করুন।

বসার সময় পিঠের নিচে ছোট বালিশ বা গোটানো তোয়ালে দিতে পারেন। পা মেঝেতে বা উপযুক্ত পাদানিতে রাখুন। দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ে সমানভাবে ওজন দিন এবং আরামদায়ক, পায়ে ভালো সহায়তা দেয় এমন জুতা পরুন।

বাড়ির কাজে চাপ কমানোর উপায়

  • ভারী বাজারের ব্যাগ বা পানিভর্তি বালতি তোলার কাজে সাহায্য নিন।
  • হালকা জিনিস তুলতেও কোমর থেকে অতিরিক্ত না ঝুঁকে হাঁটু ভাঁজ করুন।
  • শরীর মোচড়ানোর বদলে পা সরিয়ে পুরো শরীর ঘোরান।
  • এক পায়ে দাঁড়িয়ে পোশাক পরার পরিবর্তে বসে পরুন।
  • শিশুকে দীর্ঘক্ষণ এক নিতম্বে ধরে রাখার অভ্যাস কমান।

কাত হয়ে শোয়ার সময় হাঁটুর মাঝে বালিশ দিলে শ্রোণিতে আরাম মিলতে পারে। প্রয়োজনে পেটের নিচেও ছোট বালিশ দিন। বিছানায় পাশ ফেরার সময় পা কাছাকাছি রেখে শরীর একসঙ্গে ঘোরানোর চেষ্টা করুন।

গাড়িতে ওঠানামার সময়ও হাঁটু কাছাকাছি রেখে পা একসঙ্গে সরানো কিছু মানুষের ব্যথা কমায়। কোনো কৌশলে ব্যথা বাড়লে সেটি বন্ধ করুন।

নিরাপদ নড়াচড়া, ব্যায়াম ও সহায়ক চিকিৎসা

ব্যথা হলেই সারাদিন বিছানায় থাকা সাধারণত সমাধান নয়। দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তায় পেশির সক্ষমতা কমতে পারে। তবে ব্যথা সহ্য করে অতিরিক্ত কাজ করাও ঠিক নয়। সহনীয় নড়াচড়া ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রাখুন।

জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় ছোট সময়ের হাঁটা বা উপযুক্ত পানিতে ব্যায়াম সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শ্রোণির ব্যথায় দীর্ঘ হাঁটা কিংবা পা বেশি ফাঁক করার নড়াচড়ায় অস্বস্তি বাড়তে পারে। নিজের অবস্থার উপযোগী পরিকল্পনা দরকার।

ব্যায়ামের ধরন ব্যক্তিভেদে আলাদা

গভীর পেটের পেশি, শ্রোণিতল এবং নিতম্বের পেশির নিয়ন্ত্রিত ব্যায়াম স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। অনলাইনের সাধারণ ব্যায়াম দেখে কঠিন ভঙ্গি শুরু করার পরিবর্তে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে সঠিক পদ্ধতি শিখুন।

ব্যায়ামের সময় ব্যথা বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, রক্তপাত বা অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণ হলে থামুন এবং চিকিৎসা নিন। গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম সীমিত রাখার নির্দেশ থাকলে সেটি অনুসরণ করুন।

শ্রোণির সহায়ক বেল্ট কিছু মানুষের চলাফেরায় আরাম দেয়। তবে সঠিক অবস্থান ও মাপ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যথায় চলাচল খুব সীমিত হলে অন্য সহায়ক উপকরণও লাগতে পারে। ব্যথা ঘুম, মন বা দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করলে সেটিও চিকিৎসকের কাছে বলুন।

সেঁক ও ব্যথার ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা

পেশির ব্যথায় হালকা উষ্ণ সেঁক বা কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা সেঁক কিছু মানুষের আরাম দেয়। সরাসরি ত্বকে অতিরিক্ত গরম বা বরফ দেবেন না। অল্প সময় ব্যবহার করুন এবং ত্বকে অস্বস্তি হলে বন্ধ করুন। গরম সেঁক নিয়ে ঘুমাবেন না।

আরামদায়ক উষ্ণ পানিতে গোসলও উপকারী হতে পারে। শরীর অতিরিক্ত গরম হয় এমন পরিবেশ এড়িয়ে চলুন। জোরে মালিশ বা ব্যথার জায়গায় প্রচণ্ড চাপ দেওয়ার পরিবর্তে মৃদু পদ্ধতি বেছে নিন।

নিজে থেকে ওষুধ বেছে নেবেন না

গর্ভাবস্থায় ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়। আপনার জন্য উপযুক্ত কি না, কতটা এবং কতদিন লাগবে—তা জেনে নিন। একই উপাদান থাকা একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খেয়ে ফেলবেন না।

ইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন বা ডাইক্লোফেনাকের মতো প্রদাহনাশক নিজে থেকে ব্যবহার করবেন না। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার বিশ সপ্তাহের পর এগুলো শিশুর কিডনি ও গর্ভের পানির পরিমাণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ব্যথার মলমেও ওষুধ থাকতে পারে; বাহ্যিকভাবে লাগালেই নিরাপদ ধরে নেবেন না। চিকিৎসকের দেওয়া কম মাত্রার অ্যাসপিরিন আলাদা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে—সেটি নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।

কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে?

নতুন, তীব্র, বাড়তে থাকা বা বিশ্রামেও না কমা পিঠব্যথা চিকিৎসককে জানান। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাগে নতুন ব্যথার সঙ্গে পেট শক্ত হওয়া বা অন্য প্রসবসংক্রান্ত লক্ষণ থাকলে দ্রুত যোগাযোগ করুন।

নিচের লক্ষণগুলোতে ঘরোয়া উপায়ের ফল দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন না:

  • পিঠব্যথার সঙ্গে যোনিপথে রক্তপাত বা পানি বের হওয়া।
  • নিয়মিত বিরতিতে পেট শক্ত হওয়া, তলপেটে চাপ বা প্রসবের মতো ব্যথা।
  • জ্বর, প্রস্রাবে জ্বালা কিংবা পাঁজরের নিচে এক পাশে ব্যথা।
  • শিশুর নড়াচড়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা কমে যাওয়া বা বদলে যাওয়া।
  • পড়ে যাওয়া বা আঘাতের পর তীব্র ব্যথা।

পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, নিতম্ব বা যৌনাঙ্গের আশপাশে অনুভূতি হারানো এবং প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা হলে জরুরি বিভাগে যান। এগুলো স্নায়ুর গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

চিকিৎসককে গর্ভের সপ্তাহ, ব্যথার স্থান, শুরুর সময় এবং কোন কাজে বাড়ে তা জানান। গর্ভাবস্থায় পিঠব্যথা সহ্য করতেই হবে—এমন নয়। সঠিক মূল্যায়ন, দৈনন্দিন কাজের পরিবর্তন ও উপযুক্ত চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রেই স্বস্তি পাওয়া যায়।