বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মার্স: যুদ্ধের দেবতা ও রোমুলাসের পিতা কেন রোমে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন?

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

মার্স: যুদ্ধের দেবতা ও রোমুলাসের পিতা কেন রোমে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন?
যুদ্ধ, ভূমির সুরক্ষা ও রোমের জন্মকথায় দেবতা মার্স।

ক্যাপিটোলাইন পাহাড়ের জুপিটার, জুনো ও মিনার্ভা রোমের রাষ্ট্রক্ষমতা, সুরক্ষা এবং দক্ষতার দৈবপ্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু রোমানদের পরিচয়ের আরেকটি গভীর স্তরে উপস্থিত ছিলেন এমন এক দেবতা, যাঁর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি নগরের জন্মকথাও যুক্ত। তিনি মার্স। জুপিটার রাষ্ট্রের শপথ ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে রক্ষা করতেন; মার্সের মধ্যে রোমানরা নিজেদের সামরিক শক্তি, ভূখণ্ডের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠাতাদের বংশপরিচয় দেখতে পেয়েছিল। মার্স শুধু যুদ্ধের দেবতা ছিলেন না; তিনি রোমের অস্তিত্ব রক্ষা এবং তার জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত অন্যতম প্রধান দৈবশক্তি।

মার্সকে বুঝতে গেলে গ্রিক আরেসের সঙ্গে তাঁর সমীকরণ থেকে শুরু করে সেখানেই থেমে যাওয়া ঠিক নয়। দুই দেবতার যুদ্ধসংক্রান্ত পরিচয় মিললেও তাঁদের উপাসনার সামাজিক অবস্থান এক ছিল না। গ্রিক সাহিত্যের কিছু ধারায় আরেস যুদ্ধের উন্মত্ততা ও ধ্বংসের প্রতীক; রোমে মার্স ছিলেন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ রক্ষক। অবশ্য গ্রিক সমাজেও আরেসের উপাসনা ছিল, আর রোমান যুদ্ধও নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্ত ছিল না। পার্থক্যটি দেবতার চরিত্র ও রাষ্ট্রধর্মে তাঁর অবস্থানে। রোমানরা মার্সকে নিজেদের সামরিক সম্প্রদায়ের অভিভাবক এবং পৌরাণিক পিতৃপুরুষ হিসেবে সম্মান করত।

তাঁর এই পিতৃপরিচয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ভিত্তি রোমুলাস ও রেমাসের জন্মকাহিনি। আলবা লঙ্গার রাজপরিবারের কন্যা রেয়া সিলভিয়া ভেস্তার পুরোহিত্রী হওয়ার পর যমজ সন্তান জন্ম দেন; কিংবদন্তিতে তাদের পিতা মার্স। ফলে রোমের প্রতিষ্ঠাতারা মায়ের মাধ্যমে এনিয়াসের বংশধর এবং পিতার মাধ্যমে যুদ্ধদেবতার সন্তান। এই সম্পর্ক রোমের ভবিষ্যৎ সামরিক শক্তিকে জন্মের মুহূর্ত থেকেই দৈবমর্যাদা দেয়। তবে রেয়া সিলভিয়ার অভিজ্ঞতার বর্ণনা বিভিন্ন প্রাচীন রচনায় ভিন্ন, এবং দৈবপিতৃত্বকে ঐতিহাসিক পারিবারিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

নেকড়েমার হাতে শিশুদের জীবনরক্ষাও মার্সের পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। নেকড়ে তাঁর পবিত্র প্রাণীদের একটি; কিছু কাহিনিতে কাঠঠোকরাও যমজদের সাহায্য করে, যার সঙ্গেও মার্সের যোগ ছিল। এভাবে দেবতার সন্তানদের রক্ষায় তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাণীরা উপস্থিত হয়। গল্পটি রোমানদের বোঝায়, প্রতিষ্ঠাতাদের জীবন মানুষের হত্যার পরিকল্পনার চেয়েও বৃহত্তর দৈবউদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল। রোমুলাসের দেবত্বপ্রাপ্তির পর কুইরিনাসের পরিচয় সামনে এলেও তাঁর মার্স-পুত্র পরিচয় হারায়নি। নগরের প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠাতার উত্তরণ—দুই ক্ষেত্রেই মার্স রোমের পৌরাণিক পরিবারের অংশ।

কিন্তু মার্সের গুরুত্ব কেবল রোমুলাসের পিতৃত্ব থেকে আসেনি। তাঁর উপাসনা প্রাচীন ইতালীয় ধর্মীয় জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। রোমের বাইরেও বিভিন্ন ইতালীয় জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত দেবপরিচয় পাওয়া যায়। কৃষিজমি, পশুপাল এবং সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁর যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁকে প্রথমে নিছক কৃষিদেবতা, পরে যুদ্ধদেবতা বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ। কৃষি ও সামরিক রক্ষা প্রাচীন সমাজে ঘনিষ্ঠ ছিল: জমি উৎপাদন দিত, আর জনগোষ্ঠীকে সেই জমি বিপদ ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হতো।

কৃষিজীবনে মার্সের ভূমিকার একটি স্পষ্ট উদাহরণ জমি শুদ্ধিকরণের প্রার্থনা। কৃষিবিষয়ক প্রাচীন বিবরণে মার্সকে আহ্বান করে রোগ, বিপর্যয় এবং ক্ষতিকর প্রভাব দূরে রাখার অনুরোধ করা হয়। ফসল, গবাদিপশু এবং গৃহস্থালির কল্যাণ তাঁর কাছে চাওয়া হয়। এই প্রার্থনায় যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ের চেয়ে জীবিকার নিরাপত্তা সামনে আসে। মার্সের রক্ষাকর্তার শক্তি শত্রুসৈন্যের বিরুদ্ধে যেমন প্রয়োজনীয় ছিল, তেমনি শস্যক্ষেত্র ও পরিবারের ওপর নেমে আসা বিপদের বিরুদ্ধেও। তাঁর উপাসনা তাই নাগরিক জীবনের ভিত্তিকে সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা।

এই শুদ্ধিকরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল সুওভেতাউরিলিয়া নামে পরিচিত নিবেদন, যেখানে শূকর, ভেড়া ও বলদ ব্যবহৃত হতো। জমির চারদিকে প্রাণীদের নিয়ে ঘোরানোর আচার সুরক্ষার পরিধি নির্ধারণের ধারণা প্রকাশ করত। অনুরূপ প্রাণীনিবেদন বৃহত্তর জনসমাজ বা সামরিক শুদ্ধিকরণেও দেখা যায়। তবে প্রতিটি অনুষ্ঠান একই উদ্দেশ্যে এবং একই নিয়মে অনুষ্ঠিত হতো না। মূল তাৎপর্য হলো, দৈবসুরক্ষা শুধু ব্যক্তিগত প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ থাকত না; নির্দিষ্ট স্থান, মানুষ ও সম্পদকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেবতার রক্ষার অধীনে আনার চেষ্টা করা হতো।

মার্সের নাম রোমান বর্ষপঞ্জিতেও স্থায়ী হয়ে আছে। মার্চ মাসের নাম তাঁর নাম থেকেই এসেছে। প্রাচীন রোমান বর্ষপঞ্জির ঐতিহ্যে মার্চ বছরের সূচনামাস হিসেবে পরিচিত ছিল; পরে জানুয়ারি বছরের শুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। বসন্তে কৃষিকাজ এবং সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি বেড়ে যাওয়ায় মার্চের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মার্সের গুরুত্ব অর্থপূর্ণ। সময়ের বিন্যাসেও রোমানরা যুদ্ধ, কাজ এবং উপাসনাকে যুক্ত করেছিল। দেবতার মাস কেবল একটি নাম ছিল না; নাগরিক সম্প্রদায়ের প্রস্তুতি ও নবায়নের ধর্মীয় পর্বও ছিল।

মার্সের উপাসনায় সালিই নামে পরিচিত পুরোহিতদের অনুষ্ঠান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁরা ঢাল বহন করে আনুষ্ঠানিক নৃত্য ও প্রাচীন স্তোত্রগান করতেন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ ঢালগুলোর একটি ছিল আকাশ থেকে পতিত পবিত্র ঢাল—এমন কিংবদন্তি প্রচলিত। রাজা নুমার সময় তার অনুরূপ আরও ঢাল তৈরি করার গল্প রয়েছে, যাতে মূল ঢালটি শনাক্ত করে চুরি করা না যায়। এই ঐতিহ্যে রোমের নিরাপত্তা একটি পবিত্র বস্তুর সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। অস্ত্রসজ্জা তাই সামরিক সরঞ্জামের পাশাপাশি ধর্মীয় উত্তরাধিকারও হয়ে ওঠে।

মার্সের বিশেষ পুরোহিত, ফ্লামেন মার্তিয়ালিস, রোমের প্রধান পুরোহিতদের মধ্যে স্থান পেতেন। বৃহস্পতি ও কুইরিনাসের বিশেষ পুরোহিতদের সঙ্গে তাঁর উচ্চ মর্যাদা দেবতার প্রাচীন গুরুত্ব প্রকাশ করে। মার্সের পবিত্র অস্ত্রের সঙ্গে রেজিয়া নামে পরিচিত ধর্মীয় ভবনের সম্পর্কও ছিল। রোমান বিশ্বাসে অস্ত্রের অস্বাভাবিক নড়াচড়ার মতো ঘটনাকে অশুভ সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারত। অর্থাৎ অস্ত্র যুদ্ধের সময় ব্যবহারযোগ্য বস্তুই ছিল না; দেবতার উপস্থিতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংকেত বহনকারী পবিত্র সামগ্রীও হতে পারত।

টাইবার নদীর পাশের ক্যাম্পাস মার্তিয়ুস বা মার্সের ক্ষেত্র তাঁর সঙ্গে নগরের সামরিক সম্পর্ককে ভূদৃশ্যে প্রকাশ করেছিল। এখানে সামরিক সমাবেশ, প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন নাগরিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হতো। এলাকাটি পরবর্তী যুগে বহু স্থাপনা ও ব্যবহারে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু নামের মধ্যে দেবতার স্মৃতি টিকে থাকে। অস্ত্রধারী নাগরিকদের একত্র হওয়ার স্থান মার্সের নামে পরিচিত হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। রোমান সমাজে সেনাবাহিনী ও নাগরিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক গভীর ছিল; যুদ্ধে অংশ নেওয়া মানুষই আবার নগরের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ফিরে আসত।

বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘোড়া, অস্ত্র এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত অনুষ্ঠানও মার্সের ধর্মীয় জগৎকে সমৃদ্ধ করেছিল। মার্চের একুইরিয়া উৎসবে ঘোড়দৌড়ের যোগ ছিল, আর অক্টোবরে অস্ত্রশুদ্ধির অনুষ্ঠান সামরিক ঋতুর সমাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অক্টোবরের ঘোড়া নিবেদনের আচারও তাঁর উপাসনার বিখ্যাত অংশ। এসব অনুষ্ঠান দেখায়, যুদ্ধ শুরু ও শেষের মধ্যে ধর্মীয় নিয়ম বজায় রাখার গুরুত্ব ছিল। সামরিক শক্তিকে প্রস্তুত করা এবং যুদ্ধের পরে সম্প্রদায়কে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা—দুই ক্ষেত্রেই দেবতার সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন করা হতো।

পরবর্তী যুগে মার্সের রাজনৈতিক পরিচয় নতুন মাত্রা পায়। অগাস্টাস মার্স উল্তোর, অর্থাৎ প্রতিশোধগ্রহণকারী মার্সের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন; এর সঙ্গে জুলিয়াস সিজারের হত্যার প্রতিশোধের অঙ্গীকার যুক্ত ছিল। অগাস্টাসের ফোরামে এই উপাসনাকেন্দ্র সামরিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রতিশোধগ্রহণকারী এই পরিচয় মার্সের সম্পূর্ণ প্রাচীন চরিত্র নয়। এটি দেখায়, পুরোনো দেবতার উপাসনা নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশেষ অর্থ লাভ করতে পারে। রোমের প্রতিষ্ঠাতার পিতা এবার সাম্রাজ্যিক শাসনের স্মৃতি ও বৈধতার সঙ্গেও যুক্ত হন।

মার্সের গুরুত্ব তাই তাঁর হাতে বর্শা থাকার চেয়েও বিস্তৃত। তিনি রোমানদের ভূমি রক্ষা, সেনাবাহিনী প্রস্তুত, নাগরিক সমাজ শুদ্ধ করা এবং প্রতিষ্ঠার বংশকথা স্মরণ করার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। রোম তাঁকে সম্মান করেছিল কারণ যুদ্ধ, জীবিকা এবং জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ তাদের কাছে বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। মার্সের শক্তি সেই সম্পর্ককে দৈবরূপ দিয়েছিল। কিন্তু রোমের ধারাবাহিকতা শুধু যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ওপর নির্ভর করত না; বিবাহ, জন্ম এবং পরিবারের সুরক্ষাও তার ভিত্তি। মার্সের সামরিক ও পিতৃপরিচয় থেকে দেবজগতের গল্প তাই এগিয়ে যায় সেই শক্তিগুলোর দিকে, যারা মানুষের পারিবারিক জীবন এবং নতুন প্রজন্মের আগমনকে রক্ষা করত।