বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কিউবার বিপ্লব থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সংকট: পৃথিবী যখন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

কিউবার বিপ্লব থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সংকট: পৃথিবী যখন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে
তেরো দিনে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী

১৯৬২ সালের অক্টোবরের তেরো দিন পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক সময়, যখন কয়েকজন রাষ্ট্রনেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও সাবমেরিন অধিনায়কের সিদ্ধান্তের ওপর কোটি কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে মাত্র প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার দূরের কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কারের পর ওয়াশিংটন ও মস্কো এমন এক মুখোমুখি অবস্থানে পৌঁছায়, যেখানে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকেও পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারত। কিন্তু এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। কিউবার বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের কাস্ত্রোবিরোধী নীতি, বে অব পিগসের ব্যর্থ আক্রমণ এবং সোভিয়েত নিরাপত্তা-কৌশল—সব মিলিয়েই পৃথিবীকে সেই বিপজ্জনক মুহূর্তে নিয়ে গিয়েছিল।

১৯৫০-এর দশকে কিউবা শাসন করতেন ফুলহেনসিও বাতিস্তা। তাঁর স্বৈরশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেত এবং মার্কিন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিউবার চিনি, খনি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও পর্যটন খাতে বড় বিনিয়োগ ছিল। হাভানার বিলাসবহুল হোটেল ও জুয়ার আসরের বিপরীতে গ্রামীণ কিউবায় দারিদ্র্য, ভূমির অসম বণ্টন এবং মৌসুমি বেকারত্ব ছিল প্রকট। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন, দুর্নীতি ও নির্যাতনের কারণে বাতিস্তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই তরুণ আইনজীবী ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা মনকাদা সেনানিবাস আক্রমণ করে। অভিযান ব্যর্থ হয় এবং কাস্ত্রো বন্দী হন। পরে সাধারণ ক্ষমায় মুক্ত হয়ে তিনি মেক্সিকোতে যান, যেখানে চে গেভারাসহ অন্য বিপ্লবীদের নিয়ে নতুন বাহিনী গঠন করেন। ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে ‘গ্রানমা’ নৌযানে কিউবায় ফিরে তাঁদের অধিকাংশই সরকারি বাহিনীর হামলায় নিহত বা ছত্রভঙ্গ হন। অল্পসংখ্যক জীবিত যোদ্ধা সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে গেরিলা সংগ্রাম শুরু করেন।

কাস্ত্রোর আন্দোলন ভূমি সংস্কার, দুর্নীতির অবসান এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের সমর্থন অর্জন করে। শহরগুলোতেও বাতিস্তার বিরুদ্ধে গোপন আন্দোলন গড়ে ওঠে। সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দুর্বল হওয়ার মধ্যে বাতিস্তা ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি দেশ ছেড়ে পালান। কাস্ত্রোর বাহিনী হাভানায় প্রবেশ করলে বিপ্লব বিজয়ী হয়। প্রথম দিকে কাস্ত্রো নিজেকে প্রকাশ্যে সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করেননি; কিন্তু তাঁর সরকারের দ্রুত ও গভীর সংস্কার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য করে তোলে।

নতুন সরকার বৃহৎ জমিদারি ভেঙে ভূমি সংস্কার করে এবং মার্কিন মালিকানাধীন তেল শোধনাগার, চিনি কল, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ শুরু করে। ক্ষতিপূরণের শর্ত নিয়ে বিরোধ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার চিনি আমদানি সীমিত করে এবং পরে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবার চিনি কেনা, তেল সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওয়াশিংটনের চাপ কাস্ত্রোকে মস্কোর আরও কাছে ঠেলে দেয়, আর মস্কোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ ও শত্রুতা আরও বাড়ায়।

প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট আইজেনহাওয়ারের প্রশাসন সিআইএকে কাস্ত্রো সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করতে অনুমোদন দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া কিউবান নির্বাসিতদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কিউবায় নামানো হবে; ধারণা ছিল, তাদের উপস্থিতি দেশজুড়ে বিদ্রোহ সৃষ্টি করবে এবং কাস্ত্রোর সরকার দ্রুত পতন ঘটবে। ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া জন এফ. কেনেডি পরিকল্পনাটি উত্তরাধিকারসূত্রে পান। তিনি সরাসরি মার্কিন সংশ্লিষ্টতা আড়াল রেখে অভিযান অনুমোদন করেন, তবে প্রকাশ্য মার্কিন বিমান ও সেনা সহায়তা সীমিত রাখেন।

১৯৬১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রায় ১,৪০০ কিউবান নির্বাসিত যোদ্ধা কিউবার দক্ষিণ উপকূলের বে অব পিগস এলাকায় অবতরণ করে। কিন্তু অভিযান শুরু থেকেই সমস্যায় পড়ে। কাস্ত্রোর বিমানবাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, অবতরণস্থল ছিল জলাভূমি দ্বারা বিচ্ছিন্ন এবং প্রত্যাশিত গণবিদ্রোহ ঘটেনি। কাস্ত্রোর সরকার দ্রুত হাজার হাজার সন্দেহভাজন বিরোধীকে আটক করে এবং সেনা, মিলিশিয়া ও বিমান পাঠিয়ে আক্রমণকারীদের ঘিরে ফেলে। তিন দিনের মধ্যে অভিযান ভেঙে পড়ে; বহু যোদ্ধা নিহত এবং এক হাজারের বেশি বন্দী হন।

বে অব পিগসের ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপমান এবং কাস্ত্রোর জন্য রাজনৈতিক বিজয় ছিল। এটি প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন তাঁর সরকার উৎখাত করতে প্রস্তুত। কাস্ত্রো বিপ্লবকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজতান্ত্রিক ঘোষণা করেন এবং সোভিয়েত সুরক্ষার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কেনেডি প্রশাসনও গোপন অভিযান বন্ধ করেনি। ‘অপারেশন মঙ্গুস’-এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি, প্রচারণা এবং কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিভিন্ন পরিকল্পনা চালানো হয়। ফলে কিউবা ও সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছে দ্বিতীয়, আরও বড় মার্কিন আক্রমণের আশঙ্কা বাস্তব বলে মনে হয়।

এই পরিস্থিতিতে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কাস্ত্রো সরকারকে মার্কিন আক্রমণ থেকে রক্ষা করা, পশ্চিম গোলার্ধে সোভিয়েত শক্তি প্রদর্শন করা এবং পারমাণবিক ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা কমানো। তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। পাশাপাশি ইতালি ও তুরস্কে স্থাপিত মার্কিন জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র অল্প সময়ের মধ্যে সোভিয়েত ভূখণ্ডে আঘাত করতে পারত। কিউবায় মাঝারি ও মধ্যবর্তী পাল্লার সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র বসানো গেলে ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বহু শহর সরাসরি হুমকির মধ্যে পড়ত।

‘অপারেশন আনাদির’ নামে সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি কঠোর গোপনীয়তায় পরিচালিত হয়। নামটি সাইবেরিয়ার একটি নদী থেকে নেওয়া হয়েছিল, যাতে পরিকল্পনাটি শীতল উত্তরাঞ্চল সম্পর্কিত বলে মনে হয়। ১৯৬২ সালের গ্রীষ্ম থেকে সোভিয়েত জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র, বোমারু বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, পারমাণবিক অস্ত্র এবং প্রায় চল্লিশ হাজার সামরিক কর্মী কিউবায় পাঠানো হয়। সৈন্যদের অনেককে সাধারণ পোশাকে ভ্রমণ করানো হয় এবং জাহাজের মালামাল ঢেকে রাখা হয়। ক্রুশ্চেভ আশা করেছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কার্যকর হওয়ার পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পন্ন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য করবেন।

তবে ১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর একটি মার্কিন ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান কিউবার ওপর দিয়ে উড়ে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ছবি তোলে। বিশ্লেষকেরা আর-১২ মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের প্রস্তুতি শনাক্ত করেন। ১৬ অক্টোবর কেনেডিকে জানানো হয় এবং তিনি গোপনে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে নির্বাহী কমিটি গঠন করেন। শুরু হয় সেই বিখ্যাত তেরো দিনের সংকট। বিকল্পগুলোর মধ্যে ছিল কিছু না করা, কূটনৈতিক চাপ, শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে বিমান হামলা, পূর্ণাঙ্গ কিউবা আক্রমণ অথবা নৌ অবরোধ।

সামরিক নেতাদের অনেকে দ্রুত বিমান হামলা ও আক্রমণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সব ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ধ্বংস করা যাবে কি না, তা নিশ্চিত ছিল না। তাছাড়া কিউবায় সোভিয়েত সেনা নিহত হলে মস্কো পশ্চিম বার্লিনে পাল্টা আঘাত করতে পারত। কেনেডি শেষ পর্যন্ত কিউবার দিকে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক অস্ত্র পরিবহন ঠেকাতে নৌ ‘কোয়ারেন্টাইন’ বেছে নেন। ‘অবরোধ’ শব্দটি আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে অপেক্ষাকৃত সংযত শব্দ ব্যবহার করা হয়। ২২ অক্টোবর টেলিভিশন ভাষণে তিনি ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি প্রকাশ করে সেগুলো অপসারণের দাবি জানান।

মার্কিন সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কাবস্থায় যায়, কৌশলগত বোমারু বিমান আকাশে ও বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রস্তুত রাখা হয় এবং কিউবা আক্রমণের বাহিনী সংগঠিত হতে থাকে। সাধারণ মানুষ খাদ্য মজুত ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করতে শুরু করে। আটলান্টিক ও ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সোভিয়েত জাহাজের পথ রোধ করতে এগিয়ে যায়। পৃথিবী অপেক্ষা করছিল—সোভিয়েত জাহাজগুলো কি থামবে, নাকি অবরোধ ভেঙে সংঘর্ষ শুরু করবে? কিছু জাহাজ গতি কমায় বা ঘুরে যায়, কিন্তু কিউবায় ইতিমধ্যে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নির্মাণ চলতে থাকে।

সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিন ছিল ২৭ অক্টোবর, যা পরে ‘ব্ল্যাক স্যাটারডে’ নামে পরিচিত হয়। কিউবার ওপর একটি মার্কিন ইউ-২ বিমান সোভিয়েত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয় এবং চালক রুডলফ অ্যান্ডারসন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পাল্টা আক্রমণ না করে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই দিনে আরেকটি ইউ-২ নেভিগেশন ভুলে সোভিয়েত আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে; তাকে বাধা দিতে সোভিয়েত যুদ্ধবিমান ওঠে এবং মার্কিন বিমানও সুরক্ষায় এগিয়ে আসে। কয়েকটি পৃথক দুর্ঘটনা পারমাণবিক সংঘর্ষে মিলিত হতে পারত।

সমুদ্রের নিচে বিপদ ছিল আরও অদৃশ্য। মার্কিন নৌবাহিনী সংকেতমূলক গভীরতার বিস্ফোরক ব্যবহার করে সোভিয়েত বি-৫৯ সাবমেরিনকে ভেসে উঠতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। সাবমেরিনটির সঙ্গে মস্কোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং ভেতরে তাপ ও অক্সিজেনের সংকট দেখা দিয়েছিল। কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন যুদ্ধ হয়তো শুরু হয়ে গেছে। সাবমেরিনটিতে পারমাণবিক টর্পেডো ছিল। অধিনায়ক সেটি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করলেও বহরের কর্মকর্তা ভাসিলি আরখিপভ সম্মতি দেননি। শেষ পর্যন্ত সাবমেরিনটি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করে ভেসে ওঠে। একজন কর্মকর্তার সংযম সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার শৃঙ্খল থামিয়ে দিয়েছিল।

একই সময়ে ক্রুশ্চেভের কাছ থেকে দুটি ভিন্ন বার্তা আসে। প্রথম, তুলনামূলক আবেগপূর্ণ বার্তায় তিনি প্রতিশ্রুতি চান যে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা আক্রমণ করবে না; বিনিময়ে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। পরের কঠোর বার্তায় তুরস্কে থাকা মার্কিন জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণের দাবিও যোগ করা হয়। কেনেডি প্রশাসন প্রকাশ্যে প্রথম প্রস্তাবে সাড়া দেয়। গোপনে অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট কেনেডি সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আনাতোলি দোব্রিনিনকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাসের মধ্যে তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেবে, তবে এই সমঝোতা প্রকাশ করা যাবে না।

২৮ অক্টোবর ক্রুশ্চেভ বেতার বার্তায় কিউবার আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র খুলে সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা আক্রমণ না করার প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দেয় এবং পরে গোপন সমঝোতা অনুযায়ী তুরস্ক থেকে জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেয়। কিউবায় থাকা সোভিয়েত আইএল-২৮ বোমারু বিমান সরানো নিয়েও পরবর্তী আলোচনা হয়। কাস্ত্রো সমঝোতার সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ নিতে না পারায় ক্ষুব্ধ হন এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবু আকাশ থেকে মার্কিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণ নিশ্চিত করা হয়।

কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও বিজয়ের গল্পটি ছিল জটিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণ করিয়ে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করে। ক্রুশ্চেভ কিউবাকে মার্কিন আক্রমণ থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণ অর্জন করেন, যদিও গোপন সমঝোতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেননি। কাস্ত্রোর সরকার টিকে যায়, কিন্তু কিউবা পরবর্তী কয়েক দশক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সোভিয়েত নির্ভরতার মধ্যে অবস্থান করে।

সংকটের পর ওয়াশিংটন ও মস্কো বুঝতে পারে, ধীর ও অস্পষ্ট কূটনৈতিক যোগাযোগ পারমাণবিক যুগে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ১৯৬৩ সালে দুই রাজধানীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হয়, যা সাধারণভাবে ‘হটলাইন’ নামে পরিচিত। একই বছর যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেন বায়ুমণ্ডল, মহাকাশ ও পানির নিচে পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার আংশিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা থামেনি; বরং উভয় পক্ষ এমন প্রতিশোধক্ষমতা গড়ে তোলে, যাতে প্রথম আঘাতের পরও শত্রুকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়।

১৯৬২ সালে পৃথিবী পারমাণবিক যুদ্ধের যতটা কাছে পৌঁছেছিল, তার বিপদ শুধু কেনেডি ও ক্রুশ্চেভের ঘোষিত সিদ্ধান্তে ছিল না; ছিল অসংখ্য নিয়ন্ত্রণের বাইরের ঘটনায়। ভূপাতিত বিমান, পথ হারানো ইউ-২, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন সাবমেরিন, প্রস্তুত পারমাণবিক টর্পেডো এবং স্থানীয় সামরিক কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত—যেকোনো একটি ঘটনা সংঘাতকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারত। শেষ পর্যন্ত দুই নেতা পিছু হটার সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সেই তেরো দিন দেখিয়ে দিয়েছিল যে পারমাণবিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা যতই হিসাবনির্ভর মনে হোক, মানুষের ভুল, ভয় ও অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে সভ্যতার ভবিষ্যৎ কয়েক মিনিটের মধ্যেই বদলে যেতে পারে।