বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বার্লিন সংকট ও বার্লিন প্রাচীর: স্নায়ুযুদ্ধের বিভক্ত শহরের ইতিহাস

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

বার্লিন সংকট ও বার্লিন প্রাচীর: স্নায়ুযুদ্ধের বিভক্ত শহরের ইতিহাস
প্রাচীরে বিভক্ত বার্লিন ও স্নায়ুযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে পরাজিত জার্মানিকে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি দখল অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। সোভিয়েত অঞ্চলের গভীরে অবস্থিত রাজধানী বার্লিনও একইভাবে চার ভাগে বিভক্ত হয়। ১৯৪৯ সালে পশ্চিমাঞ্চলীয় দখলভূমি নিয়ে জার্মান ফেডারেল প্রজাতন্ত্র এবং সোভিয়েত অঞ্চল নিয়ে জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে জার্মানির বিভাজন স্থায়ী রূপ পায়। কিন্তু বার্লিনের পশ্চিমাংশ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে থেকে পূর্ব জার্মানির মাঝখানে একটি পুঁজিবাদী দ্বীপে পরিণত হয়। একই শহরে পরস্পরবিরোধী দুটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা পাশাপাশি অবস্থান করায় বার্লিন স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্ত হয়ে ওঠে।

১৯৪৮–৪৯ সালের সোভিয়েত অবরোধ ও পশ্চিমা এয়ারলিফটের পর পশ্চিম বার্লিন শুধু একটি শহর ছিল না; এটি সোভিয়েত চাপের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। মার্শাল পরিকল্পনার সহায়তা ও পশ্চিম জার্মানির দ্রুত অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে পশ্চিম বার্লিনে দোকান, কর্মসংস্থান, ভোগ্যপণ্য ও তুলনামূলক স্বাধীন রাজনৈতিক জীবন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পূর্ব জার্মানিতে সমাজতান্ত্রিক একদলীয় শাসন, গোপন পুলিশ, সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ, কৃষির সমবায়ীকরণ এবং কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা চালু ছিল। দুই অংশের জীবনযাত্রার পার্থক্য একই নগরীর রাস্তাতেই দেখা যেত, যা পূর্ব জার্মান সরকারের জন্য প্রতিদিনের রাজনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করত।

পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার সীমান্ত ১৯৫২ সাল থেকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করলেও বার্লিনে চলাচল তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। ভূগর্ভস্থ ও শহরতলির রেল, ট্রাম এবং সড়ক ব্যবহার করে পূর্ব বার্লিন থেকে পশ্চিমাংশে যাওয়া সম্ভব হতো। সেখান থেকে বিমানে বা স্থলপথে পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাওয়া যেত। ফলে বার্লিন পূর্ব জার্মানি ত্যাগ করার প্রধান পথ হয়ে ওঠে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে আনুমানিক ২৭ থেকে ৩০ লাখ মানুষ পূর্ব জার্মানি ছেড়ে পশ্চিমে চলে যায়; তাদের বড় অংশই বার্লিনের পথ ব্যবহার করেছিল।

এই জনস্রোত শুধু সংখ্যার সমস্যা ছিল না। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, দক্ষ শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ও তরুণ পেশাজীবীর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। পূর্ব জার্মানি তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করলেও সেই দক্ষ জনশক্তি পশ্চিমের অর্থনীতিতে যোগ দিচ্ছিল। বহু কৃষক ও শ্রমিকও সমবায়ীকরণ, পণ্যের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এড়াতে দেশ ত্যাগ করছিলেন। এতে পূর্ব জার্মানির উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বার্লিনের খোলা সীমান্ত পূর্ব জার্মান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক বৈধতা—দুটিকেই ভেতর থেকে ক্ষয় করছিল।

সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ মনে করতেন, পশ্চিম বার্লিনের অবস্থান পূর্ব জার্মানির স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরটিতে পশ্চিমা গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রচারমাধ্যম এবং পুঁজিবাদী জীবনযাত্রার দৃশ্যমান উপস্থিতি সোভিয়েত শিবিরের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। ১৯৫৮ সালের নভেম্বরে তিনি পশ্চিমা শক্তিগুলোকে ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিম বার্লিন থেকে সেনা সরিয়ে শহরটিকে নিরস্ত্রীকৃত ‘মুক্ত নগরী’তে পরিণত করার দাবি জানান। তা না হলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পূর্ব জার্মান সরকারের হাতে দেওয়ার হুমকি দেন। এটি কার্যকর হলে পশ্চিমাদের বার্লিনে প্রবেশের অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, যুদ্ধোত্তর চুক্তির ভিত্তিতে পশ্চিম বার্লিনে অবস্থান ও প্রবেশের আইনগত অধিকার ছিল। পশ্চিমারা শহর ছেড়ে গেলে ইউরোপজুড়ে তাদের মিত্ররা মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা হারাতে পারত। কিন্তু কোনো পক্ষই পারমাণবিক যুদ্ধ চায়নি। ফলে জেনেভা ও প্যারিসে আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। ১৯৬০ সালে একটি মার্কিন ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান সোভিয়েত ভূখণ্ডে ভূপাতিত হওয়ায় প্যারিস শীর্ষ সম্মেলন ভেঙে পড়ে এবং বার্লিন প্রশ্নে উত্তেজনা আরও বাড়ে।

১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে জন এফ. কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন। জুনে ভিয়েনায় ক্রুশ্চেভের সঙ্গে তাঁর প্রথম মুখোমুখি বৈঠক হয়। ক্রুশ্চেভ আবারও পশ্চিম বার্লিনের মর্যাদা পরিবর্তনের দাবি করেন এবং পৃথক শান্তিচুক্তির হুমকি দেন। তরুণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন কি না, সেটিও ছিল এই বৈঠকের একটি অঘোষিত পরীক্ষা। কেনেডি পশ্চিম বার্লিনে পশ্চিমা বাহিনীর উপস্থিতি, শহরটিতে প্রবেশাধিকার এবং পশ্চিম বার্লিনবাসীর স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার করেন। তবে তিনি পুরো বার্লিনকে একীভূত করা বা পূর্ব জার্মান ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেননি।

ভিয়েনা বৈঠকের পর কেনেডি সামরিক প্রস্তুতি বাড়ান, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় চান এবং রিজার্ভ সেনা ডাকার ঘোষণা দেন। একই সময়ে পূর্ব জার্মানি থেকে মানুষের পালিয়ে যাওয়ার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৬১ সালের শুধু জুলাই মাসেই কয়েক দশ হাজার মানুষ পশ্চিমে চলে যায়। অনেক পরিবার আশঙ্কা করেছিল সীমান্ত শিগগিরই বন্ধ হবে। পূর্ব জার্মান নেতা ওয়াল্টার উলব্রিখট দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর কাছে সীমান্ত বন্ধের অনুমতি চাইছিলেন। অথচ ১৯৬১ সালের ১৫ জুন তিনি সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন, “কেউ একটি প্রাচীর নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করে না।” দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে কথাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

১২ আগস্ট রাতে পূর্ব জার্মান নেতৃত্বের নির্দেশে ‘অপারেশন রোজ’ শুরু হয়। মধ্যরাতের পর সৈন্য, পুলিশ, শ্রমিক ও দলীয় মিলিশিয়া বার্লিনের পূর্ব-পশ্চিম সীমান্তে রাস্তাঘাট কেটে কাঁটাতার বিছাতে থাকে। রেল ও পাতালরেলের বহু সংযোগ বন্ধ করা হয়, রাস্তা খুঁড়ে ফেলা হয় এবং সীমান্তবর্তী ভবন পাহারায় নেওয়া হয়। ১৩ আগস্ট সকালে ঘুম থেকে উঠে বার্লিনবাসী দেখতে পান, তাদের শহরটি রাতারাতি বিভক্ত হয়ে গেছে। যে মানুষ আগের দিন কর্মস্থল, আত্মীয়ের বাড়ি বা বাজারে সহজে যেতে পেরেছিলেন, তাঁরা এখন সশস্ত্র প্রহরী ও কাঁটাতারের দুই পাশে আটকা পড়েছেন।

প্রাথমিক কাঁটাতারের বাধা দ্রুত কংক্রিটের প্রাচীরে রূপান্তরিত হয়। সীমান্তসংলগ্ন বাড়িগুলোর নিচতলার দরজা ও জানালা ইট দিয়ে বন্ধ করা হয়। প্রথম দিকে কিছু মানুষ ওপরের জানালা থেকে পশ্চিম বার্লিনের দিকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন; পশ্চিমা অগ্নিনির্বাপকেরা নিচে জাল ধরে তাঁদের উদ্ধার করতেন। পরে ভবনগুলো খালি করে অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে ফেলা হয়। শহরের রাস্তা, পার্ক, কবরস্থান, খাল ও আবাসিক এলাকার মাঝখান দিয়ে বিভাজনরেখা চলে যায়। পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কেউ পশ্চিমে কাজ করতেন কিন্তু পূর্বে বাস করতেন; কেউ হাসপাতালে থাকা স্বজনকে আর দেখতে পারেননি।

পূর্ব জার্মান সরকার প্রাচীরটিকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সুরক্ষা প্রাচীর’ বলে দাবি করে। তাদের বক্তব্য ছিল, পশ্চিমা গুপ্তচর, নাশকতাকারী ও ফ্যাসিবাদী শক্তির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এটি প্রয়োজন। কিন্তু প্রাচীরের প্রহরা, বাধা ও অস্ত্রের মুখ প্রধানত পূর্ব দিকে ছিল—যাতে নিজ দেশের নাগরিকেরা বেরিয়ে যেতে না পারেন। তাই পশ্চিমা বিশ্বের চোখে এটি ছিল স্বাধীন প্রবেশ ঠেকানোর দেয়াল নয়, মানুষকে নিজের রাষ্ট্রের ভেতরে বন্দী রাখার প্রাচীর। নির্মাণের পর পূর্ব জার্মানি থেকে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক বহির্গমন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায়।

প্রাচীর নির্মাণের সময় পশ্চিমা সামরিক বাহিনী সরাসরি বাধা দেয়নি। পশ্চিম বার্লিনবাসীদের একাংশ এতে হতাশ হলেও কেনেডি প্রশাসন বুঝেছিল, প্রাচীর নির্মাণ অমানবিক হলেও পশ্চিমা বাহিনীর প্রবেশাধিকার বা পশ্চিম বার্লিনের অস্তিত্ব তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত করছে না। কাঁটাতার অপসারণে সামরিক পদক্ষেপ নিলে সোভিয়েত ও মার্কিন সেনাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হতে পারত। কেনেডি ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, প্রাচীর যুদ্ধের চেয়ে ভালো—কারণ এটি পূর্ব জার্মান শরণার্থী সংকট বন্ধ করে ক্রুশ্চেভকে পশ্চিম বার্লিন দখলের আরও বিপজ্জনক চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের নির্মম যুক্তিতে মানবিক বিপর্যয় কখনো কখনো পারমাণবিক সংঘাত এড়ানোর রাজনৈতিক মূল্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।

তবে পশ্চিমারা শহরের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি প্রদর্শনের জন্য অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পশ্চিম বার্লিনে পাঠায়। ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন শহর পরিদর্শন করেন এবং জেনারেল লুসিয়াস ক্লে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ফিরে আসেন। সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাত ঘটে ১৯৬১ সালের অক্টোবরে চেকপয়েন্ট চার্লিতে। পূর্ব জার্মান সীমান্তরক্ষীরা একজন মার্কিন কূটনীতিকের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবাদ জানায়, কারণ পশ্চিমারা পূর্ব জার্মান রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করতে চাইছিল না। মার্কিন ট্যাংক সীমান্তে এগিয়ে আসে; তাদের বিপরীতে সোভিয়েত ট্যাংকও অবস্থান নেয়।

২৭ অক্টোবর প্রায় ষোলো ঘণ্টা মার্কিন ও সোভিয়েত ট্যাংক অল্প দূরত্বে পরস্পরের দিকে কামান তাক করে দাঁড়িয়েছিল। কোনো নার্ভাস সৈন্য ভুল করে গুলি চালালে সংঘর্ষ দ্রুত পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারত। গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে কেনেডি ও ক্রুশ্চেভ উত্তেজনা কমানোর ব্যবস্থা করেন। প্রথমে একটি সোভিয়েত ট্যাংক পিছু হটে, তারপর একটি মার্কিন ট্যাংক সরানো হয়; এভাবে পর্যায়ক্রমে উভয় পক্ষ সরে যায়। চেকপয়েন্ট চার্লির মুখোমুখি অবস্থান দেখিয়ে দেয়, একটি সীমান্তপরীক্ষার বিরোধও স্নায়ুযুদ্ধের দুই পরাশক্তিকে যুদ্ধের কয়েক মুহূর্ত দূরত্বে নিয়ে যেতে পারত।

পরবর্তী বছরগুলোতে প্রাচীর আরও জটিল ও কঠোর করা হয়। কংক্রিটের উঁচু দেয়াল, সমান্তরাল বেড়া, প্রহরীদুর্গ, অনুসন্ধানী আলো, যানবাহনরোধক, কুকুরের টহল এবং খোলা ‘মৃত্যু অঞ্চল’ তৈরি হয়। তবু মানুষ সুড়ঙ্গ, নকল নথি, পরিবর্তিত গাড়ি, বেলুন ও গোপন পথ ব্যবহার করে পালানোর চেষ্টা করেছিল। হাজার হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে পশ্চিমে পৌঁছালেও অনেকে গ্রেপ্তার, আহত বা নিহত হন। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব থাকলেও প্রাচীরসংলগ্ন পালানোর প্রচেষ্টায় এক শতাধিক মানুষের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। ১৯৬২ সালে তরুণ পিটার ফেখটার গুলিবিদ্ধ হয়ে সীমান্তের কাছে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার পর মারা গেলে ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

১৯৬৩ সালের জুনে কেনেডি পশ্চিম বার্লিনে এসে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতায় শহরটির মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। স্বাধীন বিশ্ব ও কমিউনিস্ট ব্যবস্থার পার্থক্যের প্রমাণ হিসেবে তিনি প্রাচীরের দিকে তাকানোর আহ্বান জানান। পশ্চিমের কাছে বার্লিন প্রাচীর কমিউনিস্ট শাসনের ব্যর্থতা ও দমননীতির প্রতীক হয়ে ওঠে; পূর্ব জার্মান সরকারের কাছে এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার উপায় ছিল। কিন্তু প্রাচীর যে সমস্যার সমাধান করেছিল তা রাজনৈতিক সম্মতি সৃষ্টি করে নয়, নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে।

প্রাচীর নির্মাণের পর বার্লিন সংকটের তাৎক্ষণিক সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমে যায়। পূর্ব জার্মান রাষ্ট্র স্থিতিশীল হয়, পশ্চিম বার্লিনও পশ্চিমা সুরক্ষায় টিকে থাকে এবং দুই পক্ষ কার্যত বিভক্ত নগরীর বাস্তবতা মেনে নেয়। কিন্তু শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীর প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত যে ইউরোপের বিভাজন মানচিত্রের রেখা নয়—এটি মানুষের বাড়ি, পরিবার ও জীবনের ওপর নির্মিত বাস্তব বাধা। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর পূর্ব জার্মান সরকারের বিভ্রান্তিকর ঘোষণার পর জনতার চাপে সীমান্ত খুলে গেলে মানুষ প্রাচীরের ওপর উঠে সেটি ভাঙতে শুরু করে। সেই দৃশ্য সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউরোপের পতনের প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়।

বার্লিন প্রাচীরের শক্তি তার কংক্রিটে ছিল না; ছিল তার রাজনৈতিক ও মানবিক অর্থে। এটি একদিকে পশ্চিম বার্লিনকে ঘিরে রাখা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-আতঙ্ক প্রকাশ করেছিল, অন্যদিকে সেই রাষ্ট্র থেকে নাগরিকদের পালিয়ে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষাও দৃশ্যমান করেছিল। ১৯৬১ সালের বার্লিন সংকট প্রমাণ করে, স্নায়ুযুদ্ধে পরাশক্তিগুলো অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে বিভাজনকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেছিল। একটি শহরের মাঝখানে নির্মিত সেই প্রাচীর তাই প্রায় তিন দশক ধরে স্বাধীনতা ও বন্দিত্ব, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র এবং পারমাণবিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ছিল।