বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

যেখানে কয়েক মাস সূর্য ওঠে না: মেরুরাত্রির বিস্ময়কর জগৎ

যেখানে কয়েক মাস সূর্য ওঠে না: মেরুরাত্রির বিস্ময়কর জগৎ
সূর্যহীন আকাশের নিচেও থেমে থাকে না মেরু অঞ্চলের জীবন।

সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠে জানালার বাইরে তাকালেন, অথচ আকাশে রাতের অন্ধকার। দুপুরে কাজের বিরতি নিয়ে বাইরে এলেন, তখনো সূর্য নেই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, কিন্তু দিনের আলো বলতে যা বোঝেন, তার দেখা মিলল না। পরদিনও একই অবস্থা। এভাবে সপ্তাহ পেরিয়ে মাস চলে গেল। পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং প্রতিবছর ফিরে আসা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। এই দীর্ঘ সূর্যহীন সময়ের নাম মেরুরাত্রি। তবে নামের মধ্যে রাত থাকলেও পুরো সময়টিকে একটানা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভাবলে ভুল হবে। মেরুরাত্রির জগতে অন্ধকারেরও বিভিন্ন স্তর আছে, আছে নীলচে গোধূলি, চাঁদের আলো, তুষারের প্রতিফলন এবং কখনো আকাশজুড়ে মেরুজ্যোতির নীরব নাচ।

মেরুরাত্রি বলতে এমন সময়কে বোঝায়, যখন কোনো স্থানে টানা চব্বিশ ঘণ্টার বেশি সময় সূর্য দিগন্তের ওপরে ওঠে না। ঘটনাটি মূলত উত্তর ও দক্ষিণ মেরুবৃত্তের মেরুমুখী অঞ্চলে দেখা যায়। উত্তর গোলার্ধে শীতকালে উত্তর মেরু অঞ্চল সূর্য থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, আর দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকালে একই অবস্থা হয় দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের। ফলে পৃথিবীর এক প্রান্ত যখন দীর্ঘ সূর্যহীন সময় কাটায়, বিপরীত প্রান্ত তখন দীর্ঘ আলোকিত দিনের অভিজ্ঞতা পায়। আমাদের পরিচিত সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যার সূর্যনির্ভর ছন্দ সেখানে বছরের একটি অংশে বদলে যায়। ঘড়ি ঠিকই সময় দেখায়, কিন্তু আকাশ সেই সময়ের পরিচিত সংকেত দেয় না।

এই ঘটনার মূল কারণ পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান। পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ সূর্যকে প্রদক্ষিণের কক্ষপথের ওপর লম্ব অবস্থান থেকে প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি হেলে আছে। পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘুরতে ঘুরতে সূর্যের চারদিকে চললেও বছরের বিভিন্ন সময়ে দুই গোলার্ধ সমানভাবে সূর্যালোক পায় না। উত্তর গোলার্ধের শীতকালে উত্তর মেরুর আশপাশের অঞ্চল এমন অবস্থানে থাকে যে দৈনিক ঘূর্ণনের পুরো চক্রেও সেখানে সূর্য দিগন্ত পেরোতে পারে না। পৃথিবী ঘোরা বন্ধ করে না, সূর্যও নিভে যায় না। শুধু পর্যবেক্ষকের অবস্থান ও পৃথিবীর জ্যামিতিক বিন্যাসের কারণে সূর্য তার দৃশ্যমান আকাশের নিচে থেকে যায়।

অনেকে মনে করেন, শীতে পৃথিবী সূর্য থেকে দূরে চলে যাওয়ায় মেরুরাত্রি ঘটে। ধারণাটি সঠিক নয়। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব ঋতুচক্রের প্রধান কারণ নয়; অক্ষের হেলানো অবস্থানই এখানে নির্ধারক। একইভাবে উত্তরাঞ্চলের সব শীতপ্রধান শহরে মেরুরাত্রি হয় না। কোনো জায়গায় প্রচণ্ড তুষারপাত হতে পারে, তাপমাত্রা অনেক নিচে নামতে পারে, অথচ প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য সূর্য উঠতে পারে। মেরুরাত্রি বোঝার জন্য ঠান্ডার মাত্রার চেয়ে অক্ষাংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানটি মেরুর কত কাছে, সেই প্রশ্নের উত্তর থেকেই সূর্যহীন সময়ের সম্ভাব্য দৈর্ঘ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

মেরুবৃত্তের কাছাকাছি অঞ্চলে সূর্য না ওঠার সময় তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। মেরুর দিকে যত এগোনো যায়, এই সময় সাধারণত তত দীর্ঘ হয়। তবে মানচিত্রে আঁকা মেরুবৃত্তকে একেবারে নির্ভুল দৃশ্যমান সীমা ভাবা উচিত নয়। সূর্য আকাশে একটি বিস্তৃত চাকতির মতো দেখা যায়, আর বায়ুমণ্ডল আলো বাঁকিয়ে দিগন্তের নিচে থাকা সূর্যকেও সামান্য ওপরে দেখাতে পারে। এই বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ, পর্যবেক্ষকের উচ্চতা এবং স্থানীয় পাহাড়ের অবস্থান সূর্য দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। তাই সূর্যের কেন্দ্রের জ্যামিতিক অবস্থান এবং কোনো মানুষের চোখে সূর্যোদয় দেখা যাওয়া সব সময় একই বিষয় নয়।

নরওয়ের ট্রমসো শহর মেরুরাত্রির একটি পরিচিত উদাহরণ। এখানে সাধারণত নভেম্বরের শেষ ভাগ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সূর্য দিগন্তের ওপরে ওঠে না। কিন্তু এই সময় শহরটি সারাক্ষণ কালো অন্ধকারে ডুবে থাকে না। দিনের মাঝামাঝি কয়েক ঘণ্টা আকাশে মৃদু আলো দেখা যায়। কখনো দিগন্ত গোলাপি হয়, কখনো পাহাড় ও সমুদ্রের ওপর নীলচে আভা ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যকে দেখা না গেলেও তার আলো বায়ুমণ্ডলের মাধ্যমে আকাশের একটি অংশ আলোকিত করে। আশপাশের পাহাড় আবার সূর্য ফিরে আসার পরও কিছু স্থান থেকে তাকে আড়াল করতে পারে। ফলে একই শহরের ভিন্ন অবস্থান থেকে প্রথম সূর্য দেখার দিন আলাদা হতে পারে।

আরও উত্তরে নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লংইয়ারবিয়েনের অভিজ্ঞতা অনেক দীর্ঘ। এখানে প্রায় অক্টোবরের শেষ ভাগ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সূর্য দিগন্তের নিচে থাকে। বছরের এই অংশে জনপদটির জীবন চলে রাস্তার বাতি, ঘরের আলো এবং মানুষের নির্ধারিত সময়সূচির ওপর ভর করে। স্কুলে যাওয়া, কাজ করা, বাজার করা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করলে জীবন অচল হয়ে পড়ত। তবু পুরো চার মাসের আলো একই রকম নয়। শুরু ও শেষের দিকে গোধূলির আভা তুলনামূলক বেশি থাকে, আর শীতের গভীর অংশে অন্ধকার দীর্ঘ ও ঘন হয়।

আলাস্কার উত্তরের উপকূলীয় জনপদ উতকিয়াগভিকেও কয়েক সপ্তাহ ধরে সূর্য দেখা যায় না। কানাডার উত্তরাঞ্চল, গ্রিনল্যান্ডের উত্তরের বসতি এবং রাশিয়ার উচ্চ অক্ষাংশের জনপদেও মেরুরাত্রি ঘটে। তবে আলাস্কা, কানাডা বা নরওয়ের নাম শুনেই পুরো দেশকে কয়েক মাসের অন্ধকারের দেশ বলা ভুল। একই দেশের দক্ষিণের শহরে প্রতিদিন সূর্য উঠতে পারে, অথচ উত্তরের জনপদে দীর্ঘ সময় সূর্য অনুপস্থিত থাকতে পারে। এমনকি গ্রিনল্যান্ডের মতো বিশাল ভূখণ্ডের সব অংশেও অভিজ্ঞতা এক নয়। মেরুরাত্রির বিস্তার রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে না; এটি পৃথিবীর অবস্থান ও সূর্যালোকের সম্পর্ক মেনে চলে।

ঠিক উত্তর মেরুতে সূর্য বছরে মোটামুটি একবার উদিত হয় এবং একবার অস্ত যায়। সেখানে সূর্য প্রতিদিন পূর্ব দিক থেকে উঠে পশ্চিমে ডোবার পরিচিত পথ অনুসরণ করে না। বরং দিগন্তের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ঋতুর সঙ্গে ধীরে ধীরে উঁচুতে ওঠে বা নিচে নামে। আনুমানিক বসন্তের বিষুবের কাছাকাছি সূর্য ফিরে আসে এবং শরতের বিষুবের কাছাকাছি দিগন্তের নিচে চলে যায়। এই হিসেবে প্রায় অর্ধেক বছর সূর্যহীন সময় থাকে। তবে সূর্যের চাকতির আকার ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণের কারণে দৃশ্যমান ওঠা ও ডোবার সময়ে পার্থক্য হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সূর্য অনুপস্থিত থাকার পুরো অর্ধবছর সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকে না।

দক্ষিণ মেরুতে একই ঘটনা ঘটে উল্টো ঋতুতে। উত্তর মেরু যখন দীর্ঘ দিনের আলো পায়, দক্ষিণ মেরু তখন শীতের সূর্যহীন সময় কাটায়। দক্ষিণ মেরুর গবেষণাকেন্দ্রে কর্মরত মানুষকে তাই বহু মাস এমন পরিবেশে থাকতে হয়, যেখানে বাইরের আকাশ থেকে সকাল বা বিকেলের পরিচিত সংকেত পাওয়া যায় না। তবে অ্যান্টার্কটিকার সব গবেষণাকেন্দ্রে সমান দৈর্ঘ্যের মেরুরাত্রি হয় না। মেরুবৃত্তের বাইরের কোনো কেন্দ্রে দিন খুব ছোট হতে পারে, কিন্তু সূর্য প্রতিদিনই উঠতে পারে। অন্যদিকে মহাদেশের গভীরে উচ্চ অক্ষাংশের কেন্দ্রে দীর্ঘ সূর্যহীন সময়ের সঙ্গে তীব্র ঠান্ডা, বিচ্ছিন্নতা ও কঠিন আবহাওয়া একসঙ্গে উপস্থিত থাকে।

সূর্য না ওঠা এবং আলো না থাকা কেন আলাদা, তা বুঝতে গোধূলির দিকে নজর দিতে হয়। আমাদের অঞ্চলে সূর্য ডোবার পরও কিছু সময় চারপাশে আলো থাকে। কারণ সূর্যের আলো ওপরের বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে ছড়িয়ে পড়ে। মেরুরাত্রির সময়ও সূর্য দিগন্তের সামান্য নিচে থাকলে একই প্রক্রিয়া ঘটে। পার্থক্য হলো, এখানে সূর্য ওপরে উঠতে না পেরে নিচ থেকেই দিনের মাঝামাঝি আকাশে আলো পাঠায়। ফলে সূর্যহীন দুপুর কখনো দীর্ঘ সন্ধ্যার মতো দেখায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সেই আলোতে পাহাড়ের রেখা, বরফের ঢাল এবং দূরের বাড়িগুলোও চেনা যেতে পারে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে সূর্য দিগন্তের কত নিচে আছে, তার ভিত্তিতে গোধূলিকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়। দিগন্তের নিচে প্রায় ছয় ডিগ্রি পর্যন্ত অবস্থানে থাকলে তুলনামূলক উজ্জ্বল গোধূলি থাকতে পারে। ছয় থেকে বারো ডিগ্রির মধ্যে আলো আরও দুর্বল হয়, আর বারো থেকে আঠারো ডিগ্রির মধ্যে আকাশ ক্রমে গভীর রাতের অবস্থার দিকে যায়। সূর্য আঠারো ডিগ্রিরও নিচে নেমে গেলে সাধারণভাবে সৌর গোধূলির অবদান শেষ হয়েছে বলে ধরা হয়। তাই দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়েও সূর্য কত নিচে থাকে, তা মেরুরাত্রির অন্ধকারের ধরন নির্ধারণ করে। ট্রমসোর সূর্যহীন দুপুর এবং মেরুর কাছাকাছি কোনো স্থানের গভীর শীতের দুপুর একই রকম নয়।

অন্ধকারের মধ্যেও তুষার দৃশ্যকে বদলে দেয়। চাঁদ উঠলে সাদা বরফ তার আলো প্রতিফলিত করে চারপাশকে অপ্রত্যাশিতভাবে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে। পরিষ্কার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র, জনপদের আলো এবং মেরুজ্যোতিও পরিবেশে আলোর অনুভূতি যোগ করে। আবার মেঘে ঢাকা আকাশ, চাঁদের অনুপস্থিতি ও জনবসতি থেকে দূরের অবস্থান অন্ধকারকে অনেক ঘন করে তোলে। তুষারঝড় হলে শুধু আলো কমে না, দূরত্ব ও ভূমির ঢাল বোঝাও কঠিন হয়ে যায়। সাদা মাটি ও অস্পষ্ট আকাশের মধ্যে দৃশ্যমান সীমারেখা হারিয়ে গেলে সামান্য পথও বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

মেরুরাত্রির ছবিতে প্রায়ই সবুজ বা বেগুনি মেরুজ্যোতি দেখা যায়। কিন্তু মেরুরাত্রি নিজে মেরুজ্যোতি তৈরি করে না। সূর্য থেকে আসা আধানযুক্ত কণা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে ওপরের বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলে এই আলো সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ অন্ধকার তাকে দেখার সুযোগ বাড়ায় মাত্র। আকাশ মেঘলা হলে, উপযুক্ত সৌর কার্যকলাপ না থাকলে কিংবা পর্যবেক্ষক অনুকূল অবস্থানে না থাকলে মেরুজ্যোতি দেখা নাও যেতে পারে। আবার সূর্য প্রতিদিন ওঠে এমন মৌসুমেও রাতের আকাশ যথেষ্ট অন্ধকার হলে এটি দেখা সম্ভব। তাই কয়েক মাস সূর্য নেই মানেই প্রতিরাতে আকাশে রঙিন আলোর উৎসব চলবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়।

মানুষের জন্য মেরুরাত্রির বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়ের স্বাভাবিক সংকেত ধরে রাখা। দিনের আলো আমাদের দৈনিক জৈব ছন্দকে বাইরের সময়ের সঙ্গে মিলতে সাহায্য করে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অনুপস্থিত থাকলে ঘুম, কাজ ও বিশ্রামের সময় বজায় রাখতে সচেতন অভ্যাসের গুরুত্ব বাড়ে। স্থানীয় মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে ওঠা, খাবার খাওয়া, কাজ করা এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দিনের কাঠামো ধরে রাখেন। বাইরে রাতের মতো দেখালেও ঘরের ভেতর সকালের কাজ শুরু হয় ঘড়ির নিয়মে। তবে অন্ধকারের প্রভাব সবার ওপর এক নয়। কেউ এই মৌসুমে ক্লান্তি বা মনমরা ভাব অনুভব করেন, আবার কেউ শান্ত পরিবেশ ও শীতকালীন কর্মকাণ্ড উপভোগ করেন।

মেরুরাত্রির জনপদকে নিঃসঙ্গ, স্তব্ধ ও ভীতিকর দেখানো জনপ্রিয় হলেও বাস্তব জীবন অনেক বেশি বহুমাত্রিক। সেখানে শিশুরা পড়াশোনা করে, দোকান খোলে, যানবাহন চলে এবং পরিবারগুলো নিজেদের দৈনন্দিন কাজ সামলায়। বাড়ির উষ্ণতা, জানালার আলো, একসঙ্গে খাবার খাওয়া ও সামাজিক আয়োজন দীর্ঘ অন্ধকারের মধ্যে পরিচিত পরিবেশ তৈরি করে। বাইরের মানুষ যে অন্ধকারকে শুধু অনুপস্থিতি হিসেবে দেখেন, স্থানীয়দের কাছে সেটি বছরের একটি স্বতন্ত্র সময়। তার নিজস্ব রং, শব্দ, উৎসব এবং অভ্যাস আছে। সূর্যহীনতা জীবন থামিয়ে দেয় না; বরং জীবনকে অন্যভাবে সাজানোর প্রয়োজন তৈরি করে।

প্রাণিজগতেও মেরুরাত্রি মানেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ে না। অনেক পাখি শীত আসার আগে তুলনামূলক উষ্ণ ও খাদ্যসমৃদ্ধ অঞ্চলে চলে যায়। আবার মেরু অঞ্চলের কিছু স্থায়ী প্রাণী সেখানেই থেকে খাদ্য খোঁজা ও চলাচল চালিয়ে যায়। বল্গাহরিণের মতো প্রাণী তুষারের নিচে খাবার খুঁজতে পারে, আর মেরুশিয়াল সুযোগ অনুযায়ী শিকার ও অন্য খাদ্য সংগ্রহ করে। তাদের টিকে থাকা শুধু অন্ধকার সহ্য করার বিষয় নয়; বরফের অবস্থা, খাদ্যের প্রাপ্যতা, তাপমাত্রা এবং শক্তি ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো বছরে তুষারের ওপর শক্ত বরফের স্তর তৈরি হলে খাদ্য সংগ্রহ বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে।

মেরুসমুদ্রের জীবনও দীর্ঘ শীতের অন্ধকারে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। সূর্যালোকের অভাবে আলোকসংশ্লেষণনির্ভর উৎপাদন কমে আসে, কিন্তু খাদ্যজালের অন্য প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ক্ষুদ্র প্রাণী, মাছ এবং সমুদ্রতলের জীবেরা সঞ্চিত খাদ্য, ভাসমান জৈব পদার্থ কিংবা অন্য প্রাণীর ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। কিছু জীবের চলাচল অত্যন্ত দুর্বল আলো ও চাঁদের আলোর সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে ওপর থেকে নিশ্চুপ মনে হওয়া বরফঢাকা সমুদ্রের নিচে চলতে থাকে জটিল জীবন্ত ব্যবস্থা। অন্ধকার এখানে জীবনের অনুপস্থিতি নয়, বরং জীবনের কাজ করার শর্ত বদলে যাওয়ার একটি মৌসুম।

মেরুরাত্রির অবসানও একদিনে সাধারণ দিনের মতো হয়ে যায় না। প্রথমে দিনের মাঝামাঝি আকাশে আলো বাড়ে, দিগন্তে উজ্জ্বল রেখা দীর্ঘ হয়, তারপর সূর্যের একটি অংশ দেখা দেয়। পাহাড়ঘেরা জনপদে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে সূর্য ফিরে এলেও বসতির নির্দিষ্ট স্থান থেকে তাকে দেখতে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রথম সূর্য দেখা অনেক মানুষের কাছে আবেগের মুহূর্ত। পরিচিত ছাদ, পাহাড় বা বরফের ওপর সরাসরি আলো পড়া তখন সাধারণ ঘটনা থাকে না। কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনের দৈর্ঘ্য দ্রুত বাড়তে থাকে এবং বছরের পরবর্তী অংশে সেই একই অঞ্চল পৌঁছে যায় বিপরীত বিস্ময়ে—মধ্যরাতেও সূর্য দৃশ্যমান থাকার সময়ে।

মেরুরাত্রি পৃথিবীর ঘূর্ণন, অক্ষের হেলানো অবস্থান, বায়ুমণ্ডল এবং জীবনের অভিযোজনকে একসঙ্গে দেখার একটি অসাধারণ সুযোগ। এটি মনে করিয়ে দেয়, সকাল মানেই সব জায়গায় সূর্যোদয় নয়, আবার সূর্যহীনতা মানেই সম্পূর্ণ অন্ধকারও নয়। বাংলাদেশের পরিচিত দিনের ছন্দ থেকে বহু দূরে এমন জনপদ আছে, যেখানে কয়েক মাস সূর্যকে না দেখেও মানুষ স্বাভাবিক জীবন গড়ে তুলেছে। সেখানে ঘড়ির সকাল, আকাশের গোধূলি এবং ঘরের উষ্ণ আলো পাশাপাশি থাকে। মেরুরাত্রির বিস্ময় তাই শুধু সূর্য না ওঠায় সীমাবদ্ধ নয়; তার গভীরে আছে বদলে যাওয়া আলোর মধ্যে পৃথিবীর জীবন কীভাবে নিজের ছন্দ খুঁজে নেয়, সেই গল্প।


আপনার পছন্দ হতে পারে