বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বাড়ির ভেতর দিয়ে বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডস সীমান্ত গেল কীভাবে?

বাড়ির ভেতর দিয়ে বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডস সীমান্ত গেল কীভাবে?
একই বাড়ির দুই পাশে দুই দেশ—বার্লের সীমান্তের বিস্ময়।

একটি বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ফুটপাতের সাদা সীমান্তচিহ্ন এসে দরজার মাঝখানে পৌঁছেছে। দরজার এক পাশে বেলজিয়ামের বাড়ির নম্বর, অন্য পাশে নেদারল্যান্ডসের। কয়েক কদম হাঁটলেই দেশ বদলে যাচ্ছে, অথচ কোথাও কাঁটাতার নেই, কোনো নদীও পার হতে হচ্ছে না। বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের বার্লে জনপদে এমন দৃশ্য বাস্তব। এখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত শুধু রাস্তার ওপর দিয়ে যায়নি; কিছু বাড়ির বসার ঘর, রান্নাঘর, শোবার ঘর কিংবা বাগানের মধ্য দিয়েও চলে গেছে। এর কারণ আধুনিক কোনো স্থাপত্যের খেয়াল নয়, বহু শতাব্দীর জমির ইতিহাস।

বার্লে নামে আমরা যে একটানা বসতি দেখি, প্রশাসনিকভাবে সেটি দুটি পৌরসভায় বিভক্ত। নেদারল্যান্ডসের অংশের নাম বার্লে-নাসাউ, বেলজিয়ামের অংশ বার্লে-হার্টোগ। তবে একটি রাস্তার এক পাশ এক দেশ, অন্য পাশ আরেক দেশ—এমন সহজ বিভাজন এখানে নেই। নেদারল্যান্ডসের ভূখণ্ডের মধ্যে বেলজিয়ামের বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট অংশ ছড়িয়ে রয়েছে। আবার কিছু বেলজীয় অংশের ভেতরে নেদারল্যান্ডসের ছোট ভূখণ্ডও রয়েছে। ফলে পুরো বিন্যাসটি মানচিত্রে দেখলে এক ধরনের জোড়াতালি দেওয়া ধাঁধার মতো মনে হয়।

অন্য দেশের ভূখণ্ড দিয়ে সম্পূর্ণ ঘেরা কোনো দেশের বিচ্ছিন্ন অংশকে ছিটমহল বলা হয়। বার্লে-হার্টোগের বাইশটি বেলজীয় ছিটমহল নেদারল্যান্ডসের ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা। নেদারল্যান্ডসের আটটি ছিটমহলের সাতটি রয়েছে দুটি বড় বেলজীয় ছিটমহলের ভেতরে; আরেকটি বেলজিয়ামের মূল ভূখণ্ডে। সব মিলিয়ে ত্রিশটি ছিটমহলের এই বিন্যাস বার্লের বিশেষ পরিচয়। তবে বার্লে-হার্টোগের সব ভূমিই ছিটমহল নয়। বেলজিয়ামের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত জোন্ডেরেইখেন এলাকাও এই পৌরসভার অংশ।

এই জটিলতার শিকড় মধ্যযুগে। বারো শতকের শেষ দিকে ব্রাবান্টের ডিউক ও ব্রেডার অধিপতির মধ্যে ভূমি ও কর্তৃত্বের ব্যবস্থাপনা থেকে বার্লের বিভক্তির ভিত্তি তৈরি হয়। বারোশ শতক আসার আগেই, বিশেষ করে এগারোশ আটানব্বই সালের ঘটনাপ্রবাহে, কিছু জমি এক কর্তৃপক্ষের অধীনে যায় এবং অন্য কিছু জমি ডিউকের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। জমিগুলো পাশাপাশি একটি পরিষ্কার সীমায় সাজানো ছিল না। বিচ্ছিন্ন খণ্ডে আলাদা কর্তৃত্ব বজায় থাকায় পরবর্তী ছিটমহলগুলোর ভিত্তি তৈরি হয়।

পরবর্তী শতাব্দীতে শাসক ও রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও জমির সেই খণ্ডিত বিন্যাস টিকে থাকে। ব্রেডার অধীন অংশ নাসাউ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়, আর ডিউকের অধীন অংশের পরিচয়ে ‘হার্টোগ’ নাম থেকে যায়। ষোলোশ আটচল্লিশ সালের মুনস্টারের চুক্তির পর উত্তর ও দক্ষিণ নেদারল্যান্ডসের রাজনৈতিক বিভাজনে এই পুরোনো ভূমিবিন্যাস নতুন গুরুত্ব পায়। উনিশ শতকে বেলজিয়াম স্বাধীন হওয়ার পর সেটিই দুই আধুনিক দেশের সীমান্ত সমস্যার অংশ হয়ে ওঠে।

আঠারোশ তেতাল্লিশ সালে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের সীমান্ত নির্ধারণের সময় বার্লের জমিগুলোকে একটি অবিচ্ছিন্ন রেখায় ভাগ করা সম্ভব হয়নি। তাই কোন জমিখণ্ড কোন পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত, তার বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সীমান্তের সূক্ষ্ম অবস্থান নির্ধারণের কাজ আরও অনেক পরে পর্যন্ত চলেছে। উনিশশ পঁচানব্বই সালে শেষ ছিটমহলসীমাগুলোর আনুষ্ঠানিক নির্ধারণ ও স্বীকৃতি সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ কয়েক শতাব্দী পুরোনো জমির বিভাজন আধুনিক জরিপের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে।

বাড়ির ভেতর দিয়ে সীমান্ত যাওয়ার ব্যাখ্যাও এখানেই। সীমান্ত মূলত জমির নির্ধারিত বিভাজন অনুসরণ করে; ভবনের দেয়াল বা ঘরের বিন্যাস অনুসরণ করা তার বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক জমিখণ্ডের ওপর বাড়ি বা অন্য ভবন তৈরি হলে একই ছাদের নিচে দুই দেশের ভূমি পড়তে পারে। সীমা স্পষ্টভাবে মাপার পর এমন অবস্থান আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তাই একটি বাড়ি দেখতে একটিই হলেও তার নিচের মাটির প্রশাসনিক পরিচয় একাধিক হতে পারে।

ঘরের ভেতরে দেশ বদলানোর অর্থ অবশ্য বাসিন্দার নাগরিকত্ব বদলে যাওয়া নয়। একজন মানুষ বসার ঘর থেকে রান্নাঘরে গেলেই নতুন দেশের নাগরিক হয়ে যান না। নাগরিকত্ব, বসবাসের নিবন্ধন এবং জমির ওপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আলাদা বিষয়। সীমান্তচিহ্ন পার হওয়া ভূমির অবস্থান বোঝায়। ব্যক্তির পাসপোর্ট বা পরিচয় তার সঙ্গে মুহূর্তে বদলে যায় না। বার্লে নিয়ে মজার গল্পে এই পার্থক্য বাদ পড়লে বাস্তব ঘটনাটি অতিরঞ্জিত হয়ে যায়।

এখানে বাড়ির ঠিকানা ও বাসিন্দার আবাসিক নিবন্ধন নির্ধারণে সদর দরজার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান প্রবেশপথ কোন দেশের ভূখণ্ডে, তা দেখে বাড়ির সংশ্লিষ্ট পরিচয় নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়ির নম্বরের ফলকে জাতীয় পতাকার রং দেখেও সেই পরিচয় বোঝা যায়। কিন্তু এই নিয়ম মানে বাড়ির সব জমি এক দেশের হয়ে গেছে, এমন নয়। দরজা একটি ব্যবহারিক প্রশাসনিক ভিত্তি; সীমান্তের অন্য পাশে থাকা জমির অবস্থান এতে মুছে যায় না।

সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ লোভেরেন এলাকার একটি বাড়ি। সেখানে সীমান্ত সদর দরজার ঠিক মাঝখান দিয়ে গেছে। বাড়িটির বেলজীয় নম্বর দুই এবং নেদারল্যান্ডসের নম্বর উনিশ। ফলে একই প্রবেশপথের পাশে দুটি ঠিকানার চিহ্ন দেখা যায়। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের আবাসিক ঠিকানা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটিকে দেখে বার্লের প্রত্যেক বাসিন্দা ইচ্ছেমতো দেশের পরিচয় বেছে নিতে পারেন, এমন ধারণা করা ঠিক নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট বাড়ির বিশেষ ব্যবস্থা।

সদর দরজা নিয়ে আরেকটি বাস্তব গল্প রয়েছে। উনিশশ পঁচানব্বই সালের জরিপে দেখা যায়, বহুদিন বেলজীয় হিসেবে পরিচিত একটি বাড়ির প্রবেশপথ আসলে নেদারল্যান্ডসের দিকে পড়েছে। সেখানে বসবাসকারী চুরাশি বছর বয়সী নারী তাঁর বেলজীয় আবাসিক পরিচয় বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। সমাধান হিসেবে সদর দরজা ও পাশের জানালার অবস্থান অদলবদল করা হয়। বাড়ি সরানো হয়নি; প্রবেশপথের পরিবর্তনে প্রশাসনিক সমস্যার ব্যবহারিক সমাধান খোঁজা হয়েছিল।

রাস্তায় হাঁটলে বার্লের সীমান্ত অনেক জায়গায় চোখে পড়ে। বিশেষ পাথর, ধাতব ফলক বা সাদা চিহ্ন দিয়ে বসতিপূর্ণ অংশে সীমা দেখানো হয়েছে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দেশ বদলে যেতে পারে, আবার একই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বারবার সীমা পার হতে পারেন। এই দৃশ্যের আকর্ষণ হলো, রেখাটি দৃশ্যমান অথচ দৈনন্দিন চলাচলের মধ্যে মিশে আছে। স্থানীয় মানুষের জন্য যা পরিচিত রাস্তা, দর্শনার্থীর জন্য সেটিই আন্তর্জাতিক ভূগোলের সরাসরি অভিজ্ঞতা।

তবে রাস্তার প্রতিটি সীমান্তচিহ্নকে একই ধরনের প্রশাসনিক পরিস্থিতি ধরে নেওয়া যাবে না। কোথাও বেলজীয় ছিটমহলের বাইরের সীমা, কোথাও তার ভেতরের নেদারল্যান্ডসের অংশের সীমা রয়েছে। ছোট মানচিত্রে এগুলো গুলিয়ে যেতে পারে। একটি বেলজীয় ছিটমহলে ঢুকে তার ভেতরের নেদারল্যান্ডসের অংশে পৌঁছালে আপনি একই দেশের মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসছেন না; বরং আরেকটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে দাঁড়াচ্ছেন। বার্লের ধাঁধা বুঝতে এই স্তরগুলো আলাদা করা দরকার।

বাড়ি ও রাস্তার এই বিন্যাস পৌরসভার কাজেও প্রভাব ফেলে। একটি রাস্তা মেরামত, নর্দমার ব্যবস্থা তৈরি বা জনসেবার অবকাঠামো পরিচালনার সময় দুই কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ সীমান্তের দুই পাশের মানুষ একই বসতির দৈনন্দিন সুবিধা ব্যবহার করেন। রাস্তার পানি বা আগুনের ঝুঁকি মানচিত্রের চিহ্ন দেখে থেমে থাকে না। তাই প্রশাসনিক বিভাজন বজায় রেখেও বাস্তব সমস্যার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়।

বার্লে-হার্টোগ ও বার্লে-নাসাউ অবকাঠামো, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে। যৌথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও এই সহযোগিতার উদাহরণ। দুই হাজার একুশ সালে আন্তসীমান্ত সহযোগিতার কাঠামো আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। এতে বোঝা যায়, আলাদা পৌরসভা থাকার অর্থ সব কাজ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে করা নয়। বার্লের জীবন সম্ভব হয়েছে শুধু সীমান্ত মেনে নয়, প্রয়োজনমতো সীমান্তের দুই পাশের কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে শেখার মাধ্যমে।

দোকান, ব্যবসা বা ভবনের ক্ষেত্রে কোন দেশের নিয়ম প্রযোজ্য, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু ‘মেঝের এক পাশ থেকে অন্য পাশে গেলেই সব আইন বদলে যায়’—এমন সরল বর্ণনা বিভ্রান্তিকর। ব্যবসার নিবন্ধন, স্থাপনার অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয় আলাদাভাবে বিবেচিত হয়। একইভাবে দরজা সরালেই যেকোনো কর বা নিয়ম এড়ানো যাবে, এমন সাধারণ উপসংহারও ভুল। বার্লের বিশেষ ঘটনাগুলো স্থানীয় ইতিহাস ও নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে বুঝতে হয়।

দুই দেশের মানুষের যোগাযোগে ইউরোপীয় সহযোগিতা দৈনন্দিন চলাফেরা সহজ করেছে। কিন্তু সহজ চলাচল মানে রাষ্ট্রসীমা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এমন নয়। প্রশাসন, ঠিকানা এবং সরকারি দায়িত্বে দেশের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ থাকে। বার্লের বিশেষত্ব তাই সীমান্ত না থাকা নয়; সীমান্তের জটিল উপস্থিতির মধ্যেও একটি স্বাভাবিক জনপদ গড়ে ওঠা। একই বাজার, পরিচিত প্রতিবেশী ও দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্যে মানুষ দুই দেশের ব্যবস্থার সঙ্গে বসবাস করেন।

বাংলাদেশের পাঠকের কাছে ছিটমহলের ধারণা অপরিচিত নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সাবেক ছিটমহলেও দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থানের বাস্তবতা ছিল। তবে বার্লের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা হুবহু মেলানো উচিত নয়। যোগাযোগ, জনসেবা, ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পার্থক্য রয়েছে। কোনো এলাকার ছিটমহল পর্যটনের আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বলেই সব ছিটমহলের মানুষের জীবন একই রকম ছিল না। ভূখণ্ডের আকৃতি বোঝার পাশাপাশি মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করা জরুরি।

বার্লে দেখার সবচেয়ে ভালো মানসিক প্রস্তুতি হলো এটিকে কেবল একটি অদ্ভুত বাড়ির গল্প হিসেবে না দেখা। সদর দরজার দুটি নম্বর আকর্ষণীয়, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে মধ্যযুগীয় জমির কর্তৃত্ব, আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম এবং দীর্ঘ জরিপের ইতিহাস। রাস্তার সাদা রেখা সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান শেষ অংশ। ব্যক্তিগত বাড়ির সামনে সীমান্তচিহ্ন থাকলেও সেটি মানুষের বাসস্থান; বাইরে থেকে দেখার কৌতূহল যেন বাসিন্দার গোপনীয়তা ও স্বাভাবিক জীবনকে অস্বস্তিতে না ফেলে।

বার্লেতে একটি দরজা, একটি ফুটপাত বা রান্নাঘরের মেঝে আন্তর্জাতিক ভূগোলের অংশ হয়ে উঠেছে। কারণ মানুষ বসতি গড়ার আগে থেকেই জমির খণ্ডিত পরিচয়ের ইতিহাস ছিল, আর পরবর্তী রাষ্ট্রগুলো সেই পরিচয় বহন করেছে। আজকের শহুরে দৃশ্যের মধ্যে পুরোনো সীমা টিকে থাকার ফলেই এমন বিস্ময় দেখা যায়। একই বাড়ির দুই অংশে দুই দেশের ভূমি থাকলেও বাসিন্দাদের জীবনকে সচল রাখতে দরকার ব্যবহারিক সমাধান ও সহযোগিতা। বার্লের গল্প তাই অদ্ভুত সীমান্তের পাশাপাশি পাশাপাশি থাকার দীর্ঘ অভ্যাসেরও গল্প।


আপনার পছন্দ হতে পারে