বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সালেমের ডাইনি বিচারের অবসান: ২০ জনের মৃত্যু, অনুশোচনা ও নির্দোষদের সম্মান ফেরানোর ইতিহাস

সিরিজ: সালেমের ডাইনি বিচার

সালেমের ডাইনি বিচারের অবসান: ২০ জনের মৃত্যু, অনুশোচনা ও নির্দোষদের সম্মান ফেরানোর ইতিহাস
বিচারের অবসান ঘটলেও ক্ষত রয়ে যায় বহু প্রজন্ম

সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সালেমের মানুষ দেখেছে, অভিযোগ কীভাবে প্রতিবেশীকে কারাগারে পাঠায় এবং আদালতের রায় কীভাবে তাঁকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। রেবেকা নার্স, জন প্রক্টর ও মার্থা কোরিকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে; জাইলস কোরি মারা গেছেন বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকার করায় তাঁর ওপর পাথর চাপানোর সময়। ২২ সেপ্টেম্বর আরও আটজনকে ফাঁসি দেওয়ার পর মৃত্যুদণ্ডের ধারাটি থামে। কিন্তু সেদিন কেউ নিশ্চয়তা পায়নি যে অভিযোগও থামবে। কারাগারে তখনো মানুষ বন্দি, আর অদৃশ্য রূপ দেখার দাবিকে ঘিরে বিচার চলার আশঙ্কা রয়ে গেছে।

১৬৯২ সালের বিচারে নিহত ২০ জনের হিসাবটি নির্দিষ্ট: উনিশজনকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং জাইলস কোরি পাথরচাপায় মারা যান। তাঁদের আগুনে পোড়ানো হয়নি। এই সংখ্যার বাইরেও অন্তত পাঁচজন বন্দি কারাগারে প্রাণ হারান। অর্থাৎ বিচারের সঙ্গে যুক্ত মোট মৃত্যুর হিসাব করতে গেলে ২০ জনের পাশাপাশি কারাগারের মৃত্যুগুলোও মনে রাখতে হয়। শুধু সংখ্যায় অবশ্য ক্ষতি ধরা যায় না। বন্দিদের পরিবারকে খাবার ও থাকার খরচ জোগাতে হয়েছে, সন্তানদের জীবন বদলে গেছে, আর মুক্তি পেলেও অনেককে সন্দেহের ভার বহন করতে হয়েছে।

এত মৃত্যু ও গ্রেপ্তারের পর প্রশ্ন উঠতে থাকে, আদালত যে সাক্ষ্য গ্রহণ করছে তা আদৌ কতটা নির্ভরযোগ্য। অসুস্থতার দাবি করা কেউ অভিযুক্তের ‘প্রেতরূপ’ দেখেছেন বললেই বাস্তব মানুষটিকে দোষী করা যায় কি? শয়তান যদি কারও অনুমতি ছাড়াই তাঁর রূপ ধারণ করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও ধর্মীয় আলোচনায় উঠে আসে—তবে রূপ দেখার দাবি অভিযুক্তের সম্মতি বা কাজের প্রমাণ হবে কীভাবে? জুনেই কয়েকজন ধর্মযাজক শুধু এ ধরনের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরের মাসগুলোতে মৃত্যুদণ্ড চলতে থাকায় এই সতর্কতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়।

গভর্নর উইলিয়াম ফিপসের সামনে প্রশাসনিক সংকটও ছিল। বিশেষ আদালত একের পর এক মামলা শুনছিল; কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা বাড়ছিল। অভিযোগ সালেম ভিলেজ ছাড়িয়ে অন্য বসতিতেও পৌঁছেছিল। সামাজিকভাবে পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবারের মানুষও সন্দেহের বাইরে থাকছিলেন না। ফিপস শেষ পর্যন্ত আর গ্রেপ্তার ও বিচার আগের মতো চলতে দেননি। অক্টোবর ১৬৯২-এ তিনি কোর্ট অব ওয়ার অ্যান্ড টার্মিনার বিলুপ্ত করেন। এটি ছিল মৃত্যুদণ্ডের পথ বন্ধ করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যদিও আদালত বিলুপ্ত হলেই বন্দিরা সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফিরতে পারেননি।

বাকি মামলাগুলোর জন্য নতুন বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ১৬৯৩ সালের জানুয়ারিতে সুপিরিয়র কোর্ট অব জুডিকেচার সালেমে শুনানি শুরু করে। আগের বিশেষ আদালতে যে প্রেতরূপ দেখার দাবিকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, নতুন আদালত সেটিকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেনি। ফলাফলে বড় পরিবর্তন দেখা যায়: প্রথম দফায় শুনানি হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২৩ জন নির্দোষ সাব্যস্ত হন; বাকি তিনজন পরে গভর্নরের ক্ষমায় মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পান। প্রমাণের মানদণ্ড বদলালে রায়ও কতখানি বদলে যেতে পারে, সালেমের দুই আদালতের ফল তার কঠিন উদাহরণ।

বিচার বন্ধ হওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া এক ঘটনা ছিল না। যারা মারা গেছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল না। যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁদের অনেকের ওপর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আইনি ফল রয়ে গিয়েছিল। পরিবারগুলো সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও স্বজন হারানোর কষ্ট নিয়ে জীবন চালিয়েছে। কারাগার থেকে মুক্ত মানুষও বন্দিত্বের খরচ ও অভিযোগের কলঙ্ক থেকে সহজে মুক্ত হননি। সালেমে তাই আতঙ্ক থামার পর আরেকটি দীর্ঘ কাজ শুরু হয়: যাঁদের বিরুদ্ধে অন্যায় করা হয়েছে, তাঁদের নাম ও অধিকার কীভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হবে?

অনুশোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ১৬৯৭ সালে। ম্যাসাচুসেটসে উপবাস ও আত্মসমালোচনার একটি দিন পালন করা হয়। সেদিন বিচারক স্যামুয়েল সিউয়াল তাঁর ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করে ক্ষমা চান। সবাই তাঁর মতো প্রকাশ্যে কথা বলেননি; ব্যক্তিগত বিশ্বাস, দায় স্বীকারের ভাষা এবং বিচারের ব্যাখ্যা একেকজনের কাছে একেক রকম ছিল। তবু আদালতের একজন বিচারকের প্রকাশ্য অনুশোচনা তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে আগের রায়গুলোকে আর প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা হলো না। যে কর্তৃত্ব এক সময় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, তার ভেতর থেকেও ভুলের স্বীকৃতি এল।

অভিযোগকারীদের একজন অ্যান পুটনাম জুনিয়র ১৭০৬ সালে গির্জায় যোগ দেওয়ার সময় নিজের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চান। তিনি জানান, নির্দোষ মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় তাঁর অংশগ্রহণ ছিল, বিশেষ করে রেবেকা নার্সের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে সে সময়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের ছাপ ছিল; তিনি নিজের আচরণকে সেই ভাষাতেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তবু নির্দোষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তাঁর স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। সালেমের ইতিহাসে অভিযোগকারীদের সবাই একইভাবে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন—এমন দাবি করা যায় না। যার বক্তব্য আদালতে প্রভাব ফেলেছিল, তাঁর স্বীকারোক্তিও হারানো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো শুধু ক্ষমার কথায় থামেনি। তারা রায় প্রত্যাহার ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছে। ১৭১১ সালে ম্যাসাচুসেটসের আইনসভা কয়েকজন দণ্ডিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের আইনি ফল বাতিল করে এবং তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে। এটি সব অভিযুক্তের জন্য একযোগে পূর্ণ ন্যায়বিচার ছিল না; তালিকায় নাম থাকা, আবেদন করা এবং পরিবারের দাবি উপস্থাপন করার ওপর ফল নির্ভর করেছে। তবে সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছিল যে পুরোনো রায় বহাল রেখে ক্ষতি মেরামত করা যায় না।

পরবর্তী শতকগুলোতেও সালেমের নির্দোষদের সম্মান ফেরানোর কাজ শেষ হয়নি। ১৯৫৭ ও ২০০১ সালে ম্যাসাচুসেটসে আরও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবু একটি নাম বাদ পড়ে যায়—এলিজাবেথ জনসন জুনিয়র। তাঁকে ১৬৯৩ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। অবশেষে ২০২২ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে তাঁর নামও নির্দোষ ঘোষণা-সংক্রান্ত তালিকায় যুক্ত হয়। বিচার থামার তিন শতকেরও বেশি সময় পর একটি নাম সংশোধন করতে হওয়া দেখায়, ঐতিহাসিক অন্যায়ের হিসাব কত দীর্ঘ হতে পারে।

আজ সালেমে নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ আছে। ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত জীবনও আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু ১৬৯২ সালের ভয়াবহ ঘটনাকে মনে রাখা নয়; ‘ডাইনি’ পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর নাম, পরিবার ও স্বাভাবিক জীবনের অধিকারকে সামনে আনা। তাঁদের কেউ দরিদ্র ছিলেন, কেউ সমাজে সম্মানিত; কেউ প্রতিবাদ করেছিলেন, কেউ চাপের মুখে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। তাঁদের আলাদা অভিজ্ঞতাকে একটি রহস্যগল্পে মিশিয়ে দিলে বিচারের প্রকৃত মানবিক ক্ষতি আড়াল হয়ে যায়।

সালেমের ঘটনায় একটিমাত্র কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ধর্মীয় বিশ্বাস, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রতিবেশীদের পুরোনো বিরোধ, সামাজিক অসমতা এবং দুর্বল সাক্ষ্য যাচাই—সবকিছু মিলে অভিযোগকে শক্তি দিয়েছিল। কিন্তু পটভূমি যত জটিলই হোক, আদালতের দায় এড়ানো যায় না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দাবি পরীক্ষা করা, সাক্ষ্যের সীমা বোঝা এবং সন্দেহকে অপরাধের প্রমাণ না বানানো বিচারপ্রক্রিয়ার কাজ। সালেমে এই সীমা ভেঙে পড়েছিল; নতুন আদালত ভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করার পর তার পরিণাম আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বেটি প্যারিস ও অ্যাবিগেইল উইলিয়ামসের অসুস্থতা দিয়ে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক শেষ হয় আদালত বিলুপ্তি, অনুশোচনা এবং বহু প্রজন্ম ধরে নাম পুনর্বাসনের প্রচেষ্টায়। ১৬৯২ সালের সেপ্টেম্বরে ফাঁসি থেমেছিল; অন্যায়ের প্রভাব তখন থামেনি। সালেমের স্থায়ী শিক্ষা হলো, মানুষের ভয় যত গভীরই হোক, কারও বিরুদ্ধে অসাধারণ অভিযোগকে প্রমাণের কঠোর পরীক্ষা থেকে ছাড় দেওয়া যায় না। যাঁরা সেই পরীক্ষার অভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতি রক্ষার সবচেয়ে সৎ উপায় হলো তাঁদের মানুষ হিসেবে দেখা এবং তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছিল তা নির্ভুলভাবে বলা।