রেবেকা নার্স, জন প্রক্টর ও জাইলস কোরি: সালেমে গণঅভিযোগ ও মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাস
সিরিজ: সালেমের ডাইনি বিচার
অভিযোগের ভয়ে বিপর্যস্ত ১৬৯২ সালের সালেম
ব্রিজেট বিশপের ফাঁসির পর সালেমের বন্দিদের কাছে মৃত্যুদণ্ড আর দূরের আশঙ্কা ছিল না। ১০ জুন ১৬৯২ সালে আদালতের প্রথম দণ্ড কার্যকর হয়েছে; কারাগারে অপেক্ষমাণ অন্যদেরও একই আদালতের সামনে দাঁড়াতে হতে পারে। অভিযোগ তখন সালেম ভিলেজের প্রথম কয়েকজন সন্দেহভাজনের সীমানা পেরিয়ে আশপাশের জনপদে ছড়াচ্ছিল। প্রতিবেশীর অসুস্থতা, বহু বছরের বিরোধ অথবা কারও ‘অদৃশ্য রূপ’ দেখার দাবি গ্রেপ্তারের সূত্র হয়ে উঠতে পারত। প্রথম ফাঁসি সবাইকে দেখিয়ে দিল, এসব অভিযোগের শেষ পরিণতি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রেবেকা নার্সের নাম ওঠা সালেমে বিশেষ আলোড়ন তোলে। তিনি ছিলেন বয়স্ক, গির্জার সদস্য এবং বহু প্রতিবেশীর কাছে শ্রদ্ধেয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার আগে অনেকে ধরে নিতে পারতেন, সন্দেহ কেবল সমাজে দুর্বল বা অপ্রিয় মানুষের দিকে যাবে। রেবেকার মামলা সেই ধারণা ভেঙে দিল। তিনি অভিযুক্ত হলে তাঁর পরিচিতরা সমর্থনে এগিয়ে আসেন; প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে তাঁর ভালো চরিত্রের কথা জানানো হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের সুনামও এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে নিশ্চিত সুরক্ষা দিল না, যেখানে সাক্ষী দাবি করতে পারেন যে অভিযুক্তের অদৃশ্য রূপ তাঁকে আঘাত করেছে।
রেবেকার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অসুস্থতার দাবি করা কিশোরীদের আচরণ ও বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। তাঁকে সামনে আনা হলে তাদের যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। সেই দৃশ্য আদালতের দর্শকদের প্রভাবিত করতে পারত, কিন্তু প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে রেবেকার অপরাধের কারণগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করত না। তাঁর পরিবার ও সমর্থকেরা সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সন্দেহ দূর হয়নি। বিচার চলার সঙ্গে সঙ্গে রেবেকা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে নিজের ঘরে বহু বছরের জীবনযাপন ও পরিচিত মানুষের আস্থা রক্ষাকবচ হিসেবে যথেষ্ট ছিল না।
জুনের শেষে রেবেকার মামলায় জুরি প্রথমে তাঁকে নির্দোষ বলে রায় দেয়। আদালতকক্ষে উপস্থিত অভিযোগকারীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং প্রধান বিচারক উইলিয়াম স্টটনের আপত্তির পর জুরিকে বিষয়টি আবার বিবেচনা করতে বলা হয়। বিশেষভাবে আলোচনায় আসে অন্য এক বন্দি নারীর প্রসঙ্গে রেবেকার বলা একটি কথা—তিনি তাঁকে ‘আমাদের একজন’ বলেছিলেন। বিচারকেরা ভাবেন, রেবেকা কি তাঁকে ডাইনিদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করছেন? রেবেকার ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন: নারীটি তাঁর মতোই বন্দি ছিলেন। অসুস্থ, বয়স্ক ও কম শুনতে পাওয়া রেবেকা আদালতে প্রশ্নটির জবাব দিতে পারেননি; তাঁর নীরবতাকে সন্দেহের পক্ষে ব্যাখ্যা করা হয়।
জুরি দ্বিতীয়বার আলোচনার পর রেবেকাকে দোষী সাব্যস্ত করে। এই বদলে যাওয়া রায় সালেমের বিচারপ্রক্রিয়ার একটি ভয়াবহ মুহূর্ত। প্রথম রায়ে যে যুক্তিসংগত সন্দেহের জায়গা দেখা গিয়েছিল, তা একটি অস্পষ্ট বাক্য, আদালতকক্ষের উত্তেজনা এবং বিচারকের হস্তক্ষেপে হারিয়ে গেল। রেবেকার সমর্থকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা চালান; গভর্নর উইলিয়াম ফিপস সাময়িকভাবে দণ্ড স্থগিত করলেও তা স্থায়ী হয়নি। ১৯ জুলাই রেবেকা নার্সকে সারাহ গুড, সুসানা মার্টিন, এলিজাবেথ হাও ও সারাহ ওয়াইল্ডসের সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়। সেদিন সালেমে একসঙ্গে পাঁচ নারীর মৃত্যু আতঙ্ককে আরও গভীর করে।
রেবেকার পরিণতি প্রমাণ করল, সম্মানিত গির্জার সদস্যও রেহাই পাচ্ছেন না। এপ্রিলেই আরেকটি পরিবারে একই ভয় প্রবেশ করেছিল—জন প্রক্টর ও তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথের পরিবারে। জন প্রকাশ্যে অভিযোগকারীদের আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। এলিজাবেথের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়; জনও তাঁর সঙ্গে যান। অল্প সময়ের মধ্যে জন নিজেই অভিযুক্ত হন। তাঁর প্রতিবাদ যে সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছিল, তা বোঝা যায়, তবে তাঁকে অভিযুক্ত করার পেছনে শুধু একটি মন্তব্য কাজ করেছে বলে নিশ্চিত করা যায় না।
জন ও এলিজাবেথ প্রক্টরের বিরুদ্ধে মামলা চলার সময় তাঁদের পরিবারও চাপের মুখে পড়ে। কারাগারে থাকা মানে শুধু স্বাধীনতা হারানো নয়; পরিবারের কাজ, আয় এবং সন্তানদের দেখাশোনাও বিপর্যস্ত হওয়া। প্রতিবেশীরা তাঁদের চরিত্রের পক্ষে আবেদন জানান। জন ২৩ জুলাই বোস্টনের কয়েকজন ধর্মযাজকের কাছে চিঠি লিখে বন্দিদের দুর্দশা ও বিচারের পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। অভিযুক্ত মানুষটির নিজের কাছেও আদালতের বাইরের কারও সাহায্য চাওয়া জরুরি মনে হচ্ছিল। তাঁর প্রতিবাদ বিচার থামাতে পারেনি; আগস্টে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
১৯ আগস্ট জন প্রক্টরকে জর্জ বারোজ, মার্থা ক্যারিয়ার, জর্জ জ্যাকবস ও জন উইলার্ডের সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়। এলিজাবেথও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন, কিন্তু গর্ভবতী থাকায় তাঁর দণ্ড কার্যকর স্থগিত হয়। পরে বিচার-আতঙ্ক থেমে যাওয়ায় তিনি বেঁচে যান। একই অভিযোগে দণ্ডিত স্বামী-স্ত্রীর একজনকে ফাঁসি দেওয়া হলো, অন্যজনের দণ্ড স্থগিত থাকল—এ ঘটনা বিচারের মানবিক বিপর্যয় স্পষ্ট করে। সন্তানদের জন্য জনের মৃত্যু এবং এলিজাবেথের দীর্ঘ বন্দিত্ব একই সঙ্গে পরিবারকে আঘাত করেছিল।
এদিকে জাইলস কোরি ও তাঁর স্ত্রী মার্থাও অভিযুক্ত হয়ে বন্দি ছিলেন। মার্থাকে মার্চে এবং জাইলসকে এপ্রিলে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃদ্ধ জাইলসের বিরুদ্ধে পুরোনো অপ্রিয় ঘটনা নিয়ে গ্রামে আলোচনা ছিল, কিন্তু পুরোনো বদনাম ডাইনিবিদ্যার প্রমাণ হতে পারে না। তাঁর মামলা বিশেষ আদালতের সামনে এলে তিনি অভিযোগ স্বীকার বা অস্বীকার করে বিচারে অংশ নিতে রাজি হননি। সে সময় অভিযুক্ত আনুষ্ঠানিক জবাব না দিলে বিচার এগোনোর পথে আইনি বাধা তৈরি হতো। জাইলস কেন এই সিদ্ধান্ত নেন, তার মনস্তত্ত্ব নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। সম্পত্তি বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই তিনি তা করেছিলেন—এমন প্রচলিত ব্যাখ্যাকেও প্রতিষ্ঠিত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
জাইলসকে আনুষ্ঠানিক জবাব দিতে বাধ্য করতে তাঁর শরীরের ওপর ভারী পাথর চাপানো হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি এই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় মারা যান। তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি এবং ডাইনিবিদ্যার মামলায় জুরির দোষী রায়ের পর তাঁর মৃত্যু ঘটেনি। বিচারে অংশ নিতে অস্বীকার করার কারণে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন পর, ২২ সেপ্টেম্বর, তাঁর স্ত্রী মার্থা কোরিকে আরও সাতজনের সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়। একই পরিবারের দুজনের মৃত্যু সালেমের বিচার-আতঙ্ক কতদূর পৌঁছেছিল, তার মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত।
রেবেকা, জন ও জাইলসের ঘটনাগুলো একেকটি ভিন্ন দুর্বলতা প্রকাশ করে। রেবেকার প্রথম নির্দোষ রায় টিকল না; জনের প্রতিবাদ ও সমর্থকদের আবেদন তাঁকে বাঁচাল না; জাইলস বিচারপ্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করেও প্রাণ রক্ষা করতে পারলেন না। ইতিমধ্যে অভিযোগ এমনভাবে ছড়িয়েছিল যে কেউ অভিযুক্ত হলে তাঁর আত্মীয়স্বজনও নজরের বাইরে থাকতেন না। এক প্রতিবেশী অন্যের পক্ষ নিতে চাইলে নিজের কথার ফল নিয়েও ভাবতে হতো। সালেম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছিল কারণ অভিযোগের পরিধি বাড়ছিল, অথচ তা যাচাইয়ের সীমা শক্ত হচ্ছিল না।
সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সালেমে ফাঁসিতে নিহতের সংখ্যা উনিশে পৌঁছায়; জাইলস কোরির মৃত্যু ছিল এর বাইরে আরেকটি হত্যাতুল্য পরিণতি। কারাগারেও বন্দিদের মৃত্যু ঘটে। এত প্রাণহানির পর আদালতের পদ্ধতি, বিশেষ করে অদৃশ্য রূপ দেখার সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠার আগেই রেবেকা নার্স ও জন প্রক্টরের মতো মানুষ মারা গেছেন, আর জাইলস ও মার্থা কোরির পরিবার বিধ্বস্ত হয়েছে। এখন সালেমের সামনে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: এতগুলো মৃত্যুর পর কর্তৃপক্ষ কি অভিযোগ ও বিচার থামাতে পারবে?
এফিয়াল্টিসের বিশ্বাসঘাতকতা: থার্মোপাইলিতে লিওনিডাসের শেষ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির যুদ্ধ: ৩০০ স্পার্টান ও গ্রিক মিত্রদের অসাধারণ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির গিরিপথ: লিওনিডাস কেন এখানেই পারস্যকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন?
ম্যারাথনের প্রতিশোধ: ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জার্ক্সিসের গ্রিস আক্রমণ
আরব বসন্তের ফলাফল ও উত্তরাধিকার: গণতন্ত্র, পাল্টা বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ
আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ফেসবুক ও টুইটার যেভাবে আন্দোলন ছড়িয়েছিল