বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

টিটুবা, সারাহ গুড ও সারাহ অসবোর্ন: সালেমে প্রথম গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তির ইতিহাস

সিরিজ: সালেমের ডাইনি বিচার

টিটুবা, সারাহ গুড ও সারাহ অসবোর্ন: সালেমে প্রথম গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তির ইতিহাস
প্রথম জিজ্ঞাসাবাদেই বদলে যায় সালেমের আতঙ্কের রূপ

ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে টিটুবা, সারাহ গুড ও সারাহ অসবোর্নের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর সালেম ভিলেজের ভয় নতুন রূপ পেল। এত দিন ধর্মযাজক স্যামুয়েল প্যারিসের মেয়ে বেটি ও ভাগনি অ্যাবিগেইলের অসুস্থতা নিয়ে প্রতিবেশীরা আলোচনা করছিলেন। এখন সেই অসুস্থতার জন্য তিনজন জীবিত মানুষকে দায়ী করা হচ্ছে। অজানা কষ্টের ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা পরিণত হলো অভিযুক্ত খোঁজার বিচারিক প্রক্রিয়ায়। ১ মার্চের জিজ্ঞাসাবাদে তিন নারী যা বলবেন, এবং তাঁদের কথাকে কর্তৃপক্ষ যেভাবে গ্রহণ করবে, তার ওপর শুধু তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, গ্রামের অন্যদের নিরাপত্তাও নির্ভর করতে শুরু করল।

তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাঁরা অদৃশ্যভাবে বেটি, অ্যাবিগেইল এবং অসুস্থতার দাবি করা অন্য কিশোরীদের যন্ত্রণা দিচ্ছেন। আজকের পাঠকের কাছে অভিযোগটি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু সে সময় অনেকের বিশ্বাস ছিল, একজন ডাইনি নিজের দৃশ্যমান শরীর থেকে দূরে থেকেও অন্য রূপে উপস্থিত হয়ে কারও ক্ষতি করতে পারে। ফলে অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে দেখা না গেলেও কিশোরীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। এই বিশ্বাসই জিজ্ঞাসাবাদকে বিপজ্জনক করে তোলে: সরাসরি দেখা কাজের প্রমাণ ছাড়াই একজনের বিরুদ্ধে অদৃশ্য আক্রমণের অভিযোগ দাঁড় করানো সম্ভব হচ্ছিল।

প্রথম অভিযুক্তদের সামাজিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। টিটুবা ছিলেন প্যারিসের বাড়িতে দাসত্বে আবদ্ধ একজন নারী। সারাহ গুড চরম আর্থিক সংকটে ছিলেন; প্রতিবেশীদের বাড়িতে সাহায্য চাইতে যাওয়ার কারণে কেউ কেউ তাঁকে বিরক্তিকর মনে করতেন। সারাহ অসবোর্ন দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন এবং গ্রামের ধর্মীয় সমাবেশে নিয়মিত যোগ দিতেন না। তাঁর পারিবারিক বিষয় নিয়েও প্রতিবেশীদের মধ্যে আলোচনা ছিল। তিনজনের মধ্যে পার্থক্য অনেক, তবে একটি মিল স্পষ্ট: সালেমের ক্ষমতাবান পরিবারগুলোর সমান সামাজিক সুরক্ষা তাঁদের কারও ছিল না। সন্দেহ তাঁদের দিকে ঘুরে যাওয়া তাই কেবল দৈব নির্বাচন ছিল না।

টিটুবাকে ঘিরে পরবর্তী শতকে অসংখ্য নাটকীয় গল্প তৈরি হয়েছে। জনপ্রিয় একটি কাহিনিতে বলা হয়, তিনি শিশুদের গোপনে জাদুবিদ্যা শেখাতেন এবং সেখান থেকেই পুরো ঘটনা শুরু হয়। সেই দৃশ্যকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ধরে নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। ১৬৯২ সালে তাঁর অবস্থান বুঝতে বেশি জরুরি হলো, তিনি নিজের নিয়োগকর্তা ও গ্রামের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অধীন ছিলেন। প্যারিসের বাড়িতেই বেটি ও অ্যাবিগেইল অসুস্থ হওয়ায় তাঁর দিকে সন্দেহ ঘুরে যাওয়া সহজ হয়েছিল। কিন্তু কারও কাছে থাকার সুযোগ পাওয়া এবং সেই ব্যক্তির অসুস্থতার কারণ হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

সারাহ গুডের বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরির পথ ছিল ভিন্ন। তিনি সাহায্য চাইলে কেউ তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, আর পরে সেই পরিবারের কোনো দুর্ভাগ্য ঘটেছে—এমন ঘটনার মধ্যে প্রতিবেশীরা অশুভ যোগসূত্র খুঁজতেন। দরিদ্র মানুষের ক্ষোভ, বিড়বিড় করে কথা বলা বা অস্বস্তিকর আচরণও ডাইনিবিদ্যার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল। অথচ সাহায্য না পেয়ে বিরক্ত হওয়া অপরাধের প্রমাণ নয়। সালেমে একবার তাঁর নাম অভিযুক্ত হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার পর আগের নানা অপ্রিয় স্মৃতিকে নতুন অর্থ দেওয়া হলো। সাধারণ সামাজিক বিরোধকে তখন অতিপ্রাকৃত ক্ষতির সম্ভাব্য ইতিহাস বলে মনে হতে লাগল।

সারাহ অসবোর্নের ক্ষেত্রেও পুরোনো ধারণা নতুন অভিযোগকে শক্তি দিল। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে তিনি গির্জায় উপস্থিত হতে পারতেন না। পিউরিটান সমাজে নিয়মিত ধর্মীয় জীবনের বাইরে থাকা সহজেই সন্দেহের কারণ হয়ে উঠতে পারত, যদিও অসুস্থতাই তাঁর অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা। পরিবারের সম্পত্তি ও সম্পর্ক নিয়ে স্থানীয় মতবিরোধও তাঁকে ঘিরে বিরূপ ধারণা তৈরি করেছিল। এই পটভূমি তাঁকে দোষী করে না; বরং বোঝায়, অভিযোগ শোনার আগেই একজন অভিযুক্ত সম্পর্কে গ্রামবাসীর মনে কী ধরনের বিচার তৈরি থাকতে পারে।

১ মার্চ প্রথমে তিন নারীকে স্থানীয় একটি সরাইখানায় জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা ছিল। এত মানুষ দেখতে জড়ো হয় যে কার্যক্রম সালেম ভিলেজের সভাঘরে সরিয়ে নিতে হয়। বিচারক জন হ্যাথর্ন ও জোনাথন করউইন তাঁদের প্রশ্ন করেন। এটি তখনো পরবর্তী আনুষ্ঠানিক বিচারে দোষী সাব্যস্ত করার পর্যায় ছিল না; অভিযোগের ভিত্তি আছে কি না, তা পরীক্ষা করে অভিযুক্তদের আটক রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু দর্শকে ভরা ঘর, কিশোরীদের উপস্থিতি এবং প্রকাশ্যে করা প্রশ্ন তিন নারীর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।

সারাহ গুড তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। নথিতে দেখা যায়, তাঁকে এমনভাবে প্রশ্ন করা হচ্ছিল যেন শিশুদের কষ্টের পেছনে কেউ যে আছে, তা আগেই নিশ্চিত: তিনি নিজে না করলে তাঁর হয়ে কে করছে? গুড পাল্টা সারাহ অসবোর্নের নাম বলেন। অসবোর্নও নিজের নির্দোষিতা জানান এবং বলেন, তাঁর রূপ ধরে শয়তান কিছু করলে সে বিষয়ে তিনি জানেন না। উভয়ের জবাবেই নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু একজনের অস্বীকারের মধ্য থেকে অন্যজনের নাম উঠে আসায় সন্দেহ কমল না; বরং অভিযুক্তদের পারস্পরিক সম্পর্ক খোঁজার সুযোগ তৈরি হলো।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় অসুস্থ কিশোরীরা যন্ত্রণা পাওয়ার কথা জানায়। তাদের প্রতিক্রিয়াকে অভিযুক্ত নারীদের উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। একজন নারী কথা বলছেন বা নড়ছেন, আর সেই মুহূর্তে কেউ কষ্ট পাচ্ছেন—এমন মিলকে দর্শকেরা শক্ত প্রমাণ মনে করতে পারতেন। বাস্তবে ঘটনাদুটির পাশাপাশি ঘটা কোনো অদৃশ্য আক্রমণের কারণ প্রতিষ্ঠা করে না। কিন্তু সভাঘরের পরিবেশে সন্দেহ পরীক্ষা করার বদলে অনেকেই সন্দেহকে সত্য ধরে নিয়ে পরের ঘটনার অর্থ খুঁজছিলেন। অভিযোগের কাঠামো এমন ছিল যে নির্দোষ বলে প্রতিবাদ করাও সব সময় অভিযুক্তকে রক্ষা করছিল না।

টিটুবা প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন, পরে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, এক ভয়ংকর পুরুষ তাঁকে শিশুদের ক্ষতি করতে বলেছে; সারাহ গুড ও সারাহ অসবোর্নের নামও তাঁর কথায় আসে। আরও কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তির উপস্থিতির কথা তিনি জানান। তাঁর বিবরণে অস্বাভাবিক প্রাণী, একটি বইয়ে নাম লেখানোর চাপ এবং অশুভ শক্তির নির্দেশের মতো বিষয় উঠে আসে। এগুলো টিটুবার মুখে বলা অভিযোগের বিবরণ, বাস্তবে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটেছিল তার প্রমাণ নয়। তাঁর ওপর ক্ষমতার চাপ ছিল; প্যারিস তাঁকে মারধর করেছিলেন বলেও পরবর্তী সাক্ষ্যে উল্লেখ আছে। এমন পরিস্থিতিতে বক্তব্যটি কতটা স্বেচ্ছায় দেওয়া, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকে।

টিটুবার স্বীকারোক্তির প্রভাব ছিল অসাধারণ। গুড ও অসবোর্ন নিজেদের নির্দোষ বললেও টিটুবার বক্তব্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যেন তাদের আগের আশঙ্কার সমর্থন হয়ে দাঁড়াল। আরও ভয়াবহ ছিল অজ্ঞাত অন্যদের কথা। যদি তিন অভিযুক্তের বাইরে আরও মানুষ জড়িত থাকে, তবে গ্রামের যে কাউকে নতুন করে সন্দেহ করা যেতে পারে। একজনের কথিত স্বীকারোক্তি একটি সীমিত অভিযোগকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের খোঁজে পরিণত করল। সালেমের ডাইনি শিকার ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ছিল निर्णায়ক।

জিজ্ঞাসাবাদের শেষে তিন নারীই আটক থাকলেন। এটি মনে রাখা জরুরি যে টিটুবা স্বীকার করেছিলেন আর অন্য দুজন অস্বীকার করেছিলেন—তবু তিনজনের কেউ সেদিন মুক্তি পাননি। স্বীকারোক্তি টিটুবাকে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা দেয়নি; অস্বীকারও গুড বা অসবোর্নকে রক্ষা করেনি। বরং টিটুবার কথাকে ভিত্তি করে কর্তৃপক্ষ আরও নাম ও আরও ঘটনার সন্ধান পেতে উৎসাহিত হলো। অসুস্থ কিশোরীদের প্রতিটি নতুন অভিযোগ এখন একটি সম্ভাব্য বড় দলের চিহ্ন হিসেবে দেখা যেতে লাগল।

১ মার্চের সভাঘরে তাই কেবল তিন নারীর ভাগ্য নির্ধারণ হয়নি। সেখানে সালেম এমন একটি পথ ধরল, যেখানে প্রতিবেশীর বিরূপ ধারণা, অদৃশ্য রূপে আক্রমণের দাবি এবং চাপের মুখে দেওয়া বক্তব্য একে অন্যকে শক্তি জোগাচ্ছিল। টিটুবা, সারাহ গুড ও সারাহ অসবোর্ন আটক অবস্থায় রইলেন; বাইরে গ্রামবাসীর সামনে রইল আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন—টিটুবা যে অজ্ঞাত অন্যদের কথা বলেছেন, তারা কারা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সালেমের অভিযোগের পরিধি প্রথম তিন নারীর বাইরে ছড়াতে শুরু করবে।