সালেমের ডাইনি বিচারের সূচনা: বেটি ও অ্যাবিগেইলের অসুস্থতা থেকে ১৬৯২ সালের আতঙ্ক
সিরিজ: সালেমের ডাইনি বিচার
দুই শিশুর অসুস্থতা থেকে সালেমজুড়ে ডাইনি আতঙ্ক
১৬৯২ সালের শীতকালে ম্যাসাচুসেটস উপনিবেশের সালেম ভিলেজে ধর্মযাজক স্যামুয়েল প্যারিসের বাড়ি ছিল গ্রামের অন্যতম পরিচিত স্থান। সেই বাড়িতেই প্যারিসের নয় বছর বয়সী মেয়ে এলিজাবেথ, যাকে সবাই বেটি বলত, এবং তাঁর প্রায় এগারো বছর বয়সী ভাগনি অ্যাবিগেইল উইলিয়ামস অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের অস্বাভাবিক আচরণের খবর প্রথমে পরিবার, তারপর প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়ায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রশ্নটি বদলে যায়। শিশুদের কী হয়েছে, তা জানার চেষ্টার বদলে গ্রামবাসীর একাংশ জানতে চাইতে থাকে, কে তাদের এমন করেছে।
ঘটনাটি বোঝার জন্য সালেম ভিলেজকে আজকের সালেম শহর থেকে আলাদা করে দেখতে হয়। ভিলেজ ছিল কৃষিনির্ভর বসতি; কাছের সালেম টাউন ছিল বাণিজ্যের কেন্দ্র। জমি, গির্জার নেতৃত্ব, কর ও গ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিলেজের পরিবারগুলোর মধ্যে আগেই মতবিরোধ ছিল। প্যারিসের বেতন ও সুযোগসুবিধা নিয়েও বিরোধ চলছিল। তাই তাঁর বাড়িতে দেখা দেওয়া সংকট এমন একটি সমাজে ঘটেছিল, যেখানে প্রতিবেশীরা একে অন্যকে চিনলেও সবাই একে অন্যকে বিশ্বাস করত না। পরবর্তী অভিযোগগুলো এই পুরোনো টানাপোড়েনের মাঝেই জায়গা পায়।
সালেমের পিউরিটান অধিবাসীদের কাছে শয়তানের অস্তিত্ব ছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তব অংশ। তাঁরা মনে করতেন, শয়তান মানুষের ক্ষতি করতে পারে এবং কেউ তার সহায়তা নিয়ে প্রতিবেশীর ওপর বিপদ ডেকে আনতে পারে। উপনিবেশের বাইরের সংঘাতও সেই ভয় বাড়িয়েছিল। উত্তর-পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধের খবর, বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করেছিল। তবে এসব পটভূমি বেটি ও অ্যাবিগেইলের আচরণের কারণ প্রমাণ করে না। এগুলো ব্যাখ্যা করে, কেন সেই আচরণের একটি অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা এত দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।
জানুয়ারির দিকে বেটির অসুস্থতা শুরু হয়; শিগগির অ্যাবিগেইলের মধ্যেও উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখা যায়। পরবর্তী বিবরণে চিৎকার, শরীর মোচড়ানো, অস্বাভাবিক ভঙ্গি এবং ব্যথায় কাতর হওয়ার কথা পাওয়া যায়। সতেরো শতকের পর্যবেক্ষকেরা যেভাবে এসব লক্ষণ লিখেছেন, তা দিয়ে আজ নিশ্চিত রোগনির্ণয় করা সম্ভব নয়। তারা কোনো নির্দিষ্ট বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ছিল, অভিনয় করছিল, নাকি অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যায় ভুগছিল—এসব দাবির কোনোটি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত বিষয় হলো লক্ষণগুলো পরিবারকে আতঙ্কিত করেছিল; লক্ষণের প্রকৃত চিকিৎসাগত কারণ নিশ্চিত নয়।
প্যারিস চিকিৎসকের সাহায্য নেন। সাধারণভাবে স্থানীয় চিকিৎসক উইলিয়াম গ্রিগসের নাম এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। স্বাভাবিক রোগ দিয়ে লক্ষণ ব্যাখ্যা করা না গেলে ডাইনিবিদ্যার আশঙ্কা সামনে আসে। তবে কোনো চিকিৎসক ঠিক কোন কথায়, কোন দিনে সিদ্ধান্তটি জানিয়েছিলেন, সে বিষয়ে পরবর্তী বর্ণনাগুলো পুরোপুরি একরকম নয়। গ্রামে যা ঘটেছিল, তার জন্য এই পার্থক্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। শিশুদের অসুস্থতাকে যখন সম্ভাব্য জাদুটোনার ফল বলা হলো, তখন প্রার্থনা ও চিকিৎসার পাশাপাশি সন্দেহভাজন মানুষ খোঁজার চাপও তৈরি হলো।
প্যারিসের পরিবারে টিটুবা এবং জন ইন্ডিয়ান নামে দুজন দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ কাজ করতেন। পরবর্তী গল্পে টিটুবাকে প্রায়ই শিশুদের গোপনে জাদুবিদ্যা শেখানো একজন রহস্যময় নারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। শুরুর ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সেই জনপ্রিয় কাহিনিকে সমর্থন করে না। তাঁর পরিচয় ও অতীত নিয়েও প্রচলিত বিবরণে বহু অনুমান জড়িয়ে গেছে। সালেমে তাঁর অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ছিল এই যে, তিনি প্যারিস পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা একজন দাসত্বে আবদ্ধ নারী। অভিযোগ উঠলে নিজের সুরক্ষায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর খুব কম ছিল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রতিবেশী মেরি সিবলি অসুস্থতার উৎস খুঁজতে একটি লোকজ পদ্ধতির পরামর্শ দেন। তাঁর নির্দেশে টিটুবা ও জন ইন্ডিয়ান শিশুর প্রস্রাব মেশানো রাইয়ের আটার একটি পিঠা বানিয়ে কুকুরকে খাওয়ান। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এভাবে ক্ষতির পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যেতে পারে। কাজটি রোগের কারণ সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারত না। উল্টো প্যারিসের কাছে এটি নিজেই আপত্তিকর ছিল: ডাইনিবিদ্যার আশঙ্কা দূর করতে এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁর ধর্মীয় দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ চর্চার কাছাকাছি।
এ সময় বেটি ও অ্যাবিগেইল আর একা ছিল না। অ্যান পুটনাম জুনিয়র ও এলিজাবেথ হাবার্ডসহ অন্য কিশোরীদের মধ্যেও একই ধরনের কষ্টের খবর আসে। অসুস্থতা একটি পরিবারের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীর কাছে বিপদ আরও বড় মনে হতে থাকে। কিন্তু একাধিক মানুষের লক্ষণ দেখা দেওয়া নিজে থেকে কোনো ডাইনির অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। সালেমে তখন সেই সতর্কতার চেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে অন্য প্রশ্ন: শিশুরা যদি আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে আক্রমণকারী কারা? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে শিশুদের ওপর বড়দের প্রত্যাশা ও চাপ কতটা কাজ করেছিল, তা আজ নির্দিষ্ট করে মাপা যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রথম যে তিন নারীর নাম উঠে আসে, তাঁরা ছিলেন টিটুবা, সারা গুড এবং সারা অসবর্ন। তিনজনের জীবন ও সামাজিক অবস্থান এক ছিল না। টিটুবা ছিলেন দাসত্বে আবদ্ধ; সারা গুড দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতেন এবং প্রতিবেশীদের কাছে তাঁর আচরণ নিয়ে বিরূপ ধারণা ছিল। সারা অসবর্ন দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন; তাঁর পারিবারিক বিষয় ও গির্জায় অনুপস্থিতি নিয়েও আলোচনা ছিল। সন্দেহ এমন মানুষদের দিকে গিয়েছিল, যাঁদের পক্ষে গ্রামের প্রচলিত সামাজিক মর্যাদার আশ্রয় পাওয়া কঠিন ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার সময় এই দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২৯ ফেব্রুয়ারি টিটুবা, সারা গুড ও সারা অসবর্নের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। বেটি ও অ্যাবিগেইলের পাশাপাশি অ্যান পুটনাম জুনিয়র এবং এলিজাবেথ হাবার্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়। এই মুহূর্তে ভয় আর ঘরের ভেতরের আলোচনা রইল না। কর্তৃপক্ষের নথিতে সন্দেহভাজনদের নাম ঢুকে গেল; তাঁদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পথ তৈরি হলো। লক্ষণগুলোর কারণ তখনো জানা যায়নি, কিন্তু অভিযোগটি ইতিমধ্যে এমন একটি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা ও জীবন বিপন্ন হতে পারে।
সালেমের আতঙ্কের প্রথম ধাপ তাই কেবল দুজন শিশুর রহস্যময় আচরণের গল্প নয়। এটি দেখায়, অজানা অসুস্থতা কীভাবে একটি সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসের ভাষা পায়, তারপর সেই ভাষা কীভাবে নির্দিষ্ট মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগে পরিণত হয়। বেটি ও অ্যাবিগেইলের কষ্ট বাস্তবেই পরিবারকে উদ্বিগ্ন করেছিল; কিন্তু কষ্টের ব্যাখ্যা হিসেবে ডাইনিবিদ্যাকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত মানুষই নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিবেশীদের সন্দেহ, সামাজিক অবস্থানের অসমতা এবং অপরাধী খুঁজে পাওয়ার তাড়না।
ফেব্রুয়ারি শেষ হতে না হতেই সালেম ভিলেজে তিন নারীর নাম উচ্চারিত হচ্ছিল অভিযুক্ত হিসেবে। পরদিন তাঁদের সামনে অপেক্ষা করছিল বিচারকদের প্রশ্ন, অসুস্থ কিশোরীদের বক্তব্য এবং জনসমক্ষে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের কঠিন চেষ্টা। বেটি ও অ্যাবিগেইলের আচরণ যে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল, ১ মার্চের জিজ্ঞাসাবাদে সেই আতঙ্ক আরও বড় ও বিপজ্জনক রূপ নিতে শুরু করবে।
এফিয়াল্টিসের বিশ্বাসঘাতকতা: থার্মোপাইলিতে লিওনিডাসের শেষ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির যুদ্ধ: ৩০০ স্পার্টান ও গ্রিক মিত্রদের অসাধারণ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির গিরিপথ: লিওনিডাস কেন এখানেই পারস্যকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন?
ম্যারাথনের প্রতিশোধ: ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জার্ক্সিসের গ্রিস আক্রমণ
আরব বসন্তের ফলাফল ও উত্তরাধিকার: গণতন্ত্র, পাল্টা বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ
আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ফেসবুক ও টুইটার যেভাবে আন্দোলন ছড়িয়েছিল