আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ফেসবুক ও টুইটার যেভাবে আন্দোলন ছড়িয়েছিল
সিরিজ: আরব বসন্ত
ডিজিটাল যোগাযোগে সংগঠিত আরব বসন্তের আন্দোলন
আরব বসন্তের ঢেউ কোথাও শাসককে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, কোথাও সীমিত সংস্কারের দরজা খুলেছিল, আবার কোথাও পুরোনো ক্ষমতাকে আরও সতর্ক, অভিযোজিত ও দমনমূলক করে তুলেছিল। প্রতিটি দেশের ফল ভিন্ন হলেও এসব আন্দোলনের মধ্যে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল—রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদব্যবস্থার বাইরে সাধারণ মানুষের নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ এবং দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের নতুন ক্ষমতা। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ব্লগ ও মুঠোফোনের মাধ্যমে একটি শহরের প্রতিবাদ মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র দেশ এবং বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারত। আরব বসন্ত প্রথম বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর একটি, যেখানে ডিজিটাল যোগাযোগ রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
তবে আরব বসন্তকে শুধু “ফেসবুক বিপ্লব” বা “টুইটার বিপ্লব” বলা বিভ্রান্তিকর। তিউনিসিয়া, মিসর, বাহরাইন কিংবা ইয়েমেনের মানুষ কেবল অনলাইনে বার্তা দেখে রাজপথে নামেনি। তাদের ক্ষোভের পেছনে ছিল বেকারত্ব, দুর্নীতি, পুলিশি নির্যাতন, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব। শ্রমিক সংগঠন, ছাত্রগোষ্ঠী, বিরোধী দল, মসজিদ, পেশাজীবী সমিতি, মানবাধিকারকর্মী এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের নেটওয়ার্ক বহু বছর ধরে প্রতিরোধের ভিত্তি তৈরি করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অসন্তোষ সৃষ্টি করেনি; এটি ছড়িয়ে থাকা অসন্তোষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, দৃশ্যমান এবং দ্রুত সংগঠিত করেছিল।
আরব বিশ্বের স্বৈরশাসনগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করত। টেলিভিশন ও রেডিও রাষ্ট্রের সাফল্য প্রচার করত, সংবাদপত্র সেন্সরশিপ ও মালিকানাগত চাপের মধ্যে পরিচালিত হতো এবং বিরোধীদের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ ছিল সীমিত। কোনো প্রত্যন্ত শহরে পুলিশি সহিংসতা ঘটলে রাজধানীর মানুষ তা জানতেই পারত না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিচ্ছিন্নতাকে দুর্বল করে দেয়। একটি ছোট মুঠোফোনে ধারণ করা অস্পষ্ট ভিডিওও রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে উঠতে পারত।
তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর সিদি বুজিদের বিক্ষোভ প্রথমদিকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। স্থানীয় মানুষ মুঠোফোনে প্রতিবাদ, পুলিশের দমন এবং আহতদের দৃশ্য ধারণ করে ফেসবুক ও ভিডিও ভাগাভাগির মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকে। তিউনিসিয়ার ভেতরে ফেসবুক তুলনামূলকভাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় ভিডিওগুলো দ্রুত অন্য শহরে পৌঁছে যায়। প্রবাসী তিউনিসীয় ও মানবাধিকারকর্মীরা সেগুলো পুনরায় প্রচার করেন। নাওয়াতের মতো নাগরিক সংবাদমাধ্যম বিচ্ছিন্ন ছবি, ভিডিও ও বক্তব্য সংগ্রহ করে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
কাতারভিত্তিক আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট সংবাদমাধ্যম অনলাইনে প্রকাশিত কিছু ভিডিও যাচাই করে টেলিভিশনে প্রচার করে। এর ফলে ডিজিটাল জগত ও প্রচলিত সম্প্রচারের মধ্যে একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি হয়। মুঠোফোনের ভিডিও ফেসবুকে উঠত, বিদেশি কর্মীরা তা ছড়িয়ে দিতেন, স্যাটেলাইট টেলিভিশন সেটি লাখো দর্শকের ঘরে পৌঁছে দিত এবং দর্শকেরা আবার অনলাইনে আলোচনা করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না; টেলিভিশন সেটিকে বহুগুণ বিস্তৃত করেছিল।
তিউনিসিয়ার সরকার অনলাইন কর্মীদের পরিচয় ও পাসওয়ার্ড সংগ্রহ, ওয়েবসাইট বন্ধ এবং ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারির চেষ্টা করে। তবু বিক্ষোভের ভিডিও সম্পূর্ণভাবে দমন করা সম্ভব হয়নি। বেন আলীর সরকারের পতনের পর আরব বিশ্বের কর্মীরা প্রথমবার প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পান, অনলাইন তথ্যপ্রবাহ রাষ্ট্রীয় নীরবতার প্রাচীর ভেঙে দিতে পারে। তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা তখন মিসরীয় কর্মীদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে ওঠে।
মিসরে ডিজিটাল আন্দোলনের ভিত্তি ২০১১ সালের অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। ব্লগাররা পুলিশি নির্যাতন, যৌন হয়রানি, শ্রমিক আন্দোলন এবং নির্বাচনী জালিয়াতি নিয়ে লিখতেন। ২০০৮ সালে মাহাল্লা আল-কুবরার বস্ত্রশ্রমিকদের ধর্মঘটের সমর্থনে গড়ে ওঠা ৬ এপ্রিল যুব আন্দোলন ফেসবুক ব্যবহার করে তরুণদের সংগঠিত করেছিল। যদিও সেই ধর্মঘটকে ঘিরে অনলাইন আহ্বানের ফল মিশ্র ছিল, কর্মীরা ডিজিটাল নিরাপত্তা, দ্রুত বার্তা প্রচার এবং বিকেন্দ্রীভূত সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
২০১০ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার তরুণ খালেদ সাঈদের পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর পর তাঁর ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। “আমরা সবাই খালেদ সাঈদ” নামের ফেসবুক পাতা তাঁর মৃত্যুকে একটি জাতীয় প্রতীকে পরিণত করে। পাতাটির অন্যতম গোপন প্রশাসক ছিলেন ওয়ায়েল ঘোনিম। সেখানে আবেগপূর্ণ ভাষায় পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরা, নীরব প্রতিবাদের নির্দেশনা দেওয়া এবং ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা হয়। এটি এমন একটি ডিজিটাল পরিসর ছিল, যেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না হয়েও সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারত।
২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারির প্রতিবাদের আহ্বান ফেসবুক, টুইটার, অনলাইন ভিডিও ও মুঠোফোনের বার্তার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কর্মীরা সমাবেশের স্থান, জরুরি নম্বর, গ্রেপ্তার এড়ানোর কৌশল এবং কাঁদানে গ্যাস থেকে রক্ষার প্রাথমিক নির্দেশনা ভাগ করে নেন। তবে পুলিশের নজর এড়াতে সব তথ্য প্রকাশ্যে দেওয়া হতো না। কায়রোর বিভিন্ন দরিদ্র পাড়া থেকে ছোট ছোট মিছিল বের করে ধীরে ধীরে বড় মিছিলে যুক্ত করার পরিকল্পনা অনেকাংশে সরাসরি বৈঠক এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে করা হয়েছিল।
২৮ জানুয়ারির “ক্রোধের শুক্রবার”-এর আগে মিসর সরকার প্রায় পুরো দেশের ইন্টারনেট সংযোগ এবং মুঠোফোন সেবা বন্ধ করে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং বিক্ষোভের দৃশ্য বিদেশে পৌঁছানো ঠেকানো। কিন্তু বন্ধের ফলে উল্টো প্রমাণিত হয় যে সংকট কতটা গভীর। অনলাইনে থাকা মানুষ ঘর ছেড়ে মসজিদ, গির্জা, মহল্লা ও পরিচিত সমাবেশস্থলে যায়। কাগজের প্রচারপত্র, মুখে মুখে সংবাদ, স্থির টেলিফোন এবং পাড়াভিত্তিক যোগাযোগ আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইন্টারনেট বন্ধ আন্দোলনকে থামাতে পারেনি, কারণ ডিজিটাল যোগাযোগের নিচে শক্তিশালী বাস্তব সামাজিক নেটওয়ার্ক ছিল।
বিদেশে থাকা প্রযুক্তিকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা মিসরীয়দের বার্তা বাইরে পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেন। মানুষ আন্তর্জাতিক নম্বরে ফোন করে কণ্ঠবার্তা রেকর্ড করত, যা পরে অনলাইনে প্রকাশ করা হতো। ডায়াল-আপ সংযোগ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগও সীমিতভাবে ব্যবহৃত হয়। এই উদ্যোগগুলোর প্রত্যক্ষ ব্যবহারকারী খুব বেশি না হলেও সরকার সম্পূর্ণ তথ্য অবরোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাহরির স্কয়ারের ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক জনমতকে আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট রাখে।
টুইটার তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি জানানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোট বার্তায় কোথায় পুলিশ মোতায়েন হয়েছে, কোন সড়ক খোলা, কোথায় চিকিৎসা বা খাবার দরকার এবং কে গ্রেপ্তার হয়েছে—এসব তথ্য দ্রুত ছড়ানো যেত। হ্যাশট্যাগ বিভিন্ন দেশের কর্মী, সাংবাদিক ও প্রবাসীদের একই আলোচনায় যুক্ত করত। তবে সে সময় আরব বিশ্বের অধিকাংশ নাগরিক টুইটার ব্যবহার করত না। এর বিশেষ গুরুত্ব ছিল সংবাদকর্মী, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, প্রযুক্তিসচেতন কর্মী ও প্রবাসীদের সংযোগস্থল হিসেবে।
ইউটিউব ও অন্যান্য ভিডিওসেবা নাগরিক সাংবাদিকতার দৃশ্যমান ভিত্তি তৈরি করে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশি গুলি, আহত মানুষ, বিশাল মিছিল এবং শাসকবিরোধী স্লোগান ধারণ করে প্রকাশ করত। বিদেশি সাংবাদিক প্রবেশ করতে না পারলে এসব অপেশাদার ভিডিওই ঘটনাস্থলের একমাত্র দৃশ্য হয়ে উঠত। লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বেনগাজির বিক্ষোভ এবং সরকারি দমনের ভিডিও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বাহরাইনে পার্ল রাউন্ডঅ্যাবাউটের রাতের অভিযানও মুঠোফোনে ধারণ করা দৃশ্যের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে আসে।
সিরিয়ায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। স্থানীয় সমন্বয় কমিটিগুলো শুক্রবারের বিক্ষোভের নাম, সময় ও স্থান নির্ধারণ করে অনলাইনে প্রচার করত। কর্মীরা মুঠোফোনে বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ধারণ করে সীমান্তের বাইরে থাকা সহযোগীদের কাছে পাঠাতেন। যাচাই কঠিন হলেও এসব ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দারা, হোমস, হামা ও অন্যান্য শহরের ঘটনাবলি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিত। পরে যুদ্ধ বিস্তৃত হলে ডিজিটাল নথি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নারী কর্মী ও প্রবাসীরাও অনলাইনে বিশেষ সুযোগ পান। সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে যারা সহজে সভা বা রাজনৈতিক দপ্তরে যেতে পারতেন না, তারা ডিজিটাল পরিসরে বক্তব্য, ছবি ও সাংগঠনিক নির্দেশনা ছড়াতে সক্ষম হন। প্রবাসীরা অনুবাদ, অর্থ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারে ভূমিকা রাখেন। একটি দেশের স্থানীয় স্লোগান কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরবি থেকে ইংরেজি, ফরাসি বা অন্য ভাষায় অনূদিত হয়ে বৈশ্বিক সংহতির বার্তায় পরিণত হতো।
ডিজিটাল যোগাযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বকেও বিকেন্দ্রীভূত করে। একটি প্রধান কার্যালয় বা পরিচিত নেতা গ্রেপ্তার হলেও অন্য ব্যবহারকারী নতুন পাতা, হিসাব বা যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করতে পারত। অনলাইনে নাম প্রকাশ না করে অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রথমদিকে অনেক মানুষের ভয় কমায়। যখন একজন ব্যবহারকারী দেখতেন হাজারো মানুষ একই ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তখন নিজের অসন্তোষকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা না ভেবে সম্মিলিত রাজনৈতিক সমস্যার অংশ হিসেবে উপলব্ধি করতেন। এই পারস্পরিক দৃশ্যমানতা স্বৈরশাসনের তৈরি একাকিত্ব ও অসহায়তার অনুভূতিকে দুর্বল করেছিল।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণ নিরাপদ বা মুক্ত ক্ষেত্র ছিল না। সরকারগুলো ভুয়া পরিচয়ে আন্দোলনের পাতায় প্রবেশ, ব্যক্তিগত বার্তা পর্যবেক্ষণ, অবস্থান শনাক্ত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তির হিসাব থেকে তাঁর পরিচিতদের খুঁজে বের করত। কর্মীদের পাসওয়ার্ড দিতে বাধ্য করা হতো। সন্দেহজনক সংযোগ ও নকল নথির মাধ্যমে যন্ত্রে নজরদারি সফটওয়্যার প্রবেশ করানো হতো। ডিজিটাল কার্যক্রম অনেক সময় কর্মীদের জন্য এমন প্রমাণ তৈরি করত, যা নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারত।
ভুল তথ্য, পুরোনো ছবি, গুজব এবং অতিরঞ্জিত হতাহতের সংখ্যাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। সংঘাত সশস্ত্র রূপ নেওয়ার পর বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের বিজয় প্রচার, পরাজয় গোপন এবং প্রতিপক্ষকে দানব হিসেবে তুলে ধরতে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে। সিরিয়া ও লিবিয়ায় একই ঘটনার পরস্পরবিরোধী ভিডিও ও বিবরণ যাচাই করা কঠিন হয়ে ওঠে। যে প্রযুক্তি রাষ্ট্রীয় প্রচারণার একচেটিয়া ক্ষমতা ভেঙেছিল, সেটিই বহু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রচারণা ও বিভ্রান্তির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
আরেকটি সীমাবদ্ধতা ছিল ডিজিটাল বৈষম্য। শহুরে, শিক্ষিত ও তুলনামূলক সচ্ছল তরুণেরা অনলাইনে বেশি সক্রিয় ছিল; গ্রাম, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও বয়স্ক মানুষের বড় অংশের ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। তাই অনলাইন আলোচনাকে পুরো সমাজের মতামত ধরে নেওয়া ভুল। প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়েছিল তখনই, যখন ডিজিটাল আহ্বান শ্রমিক ধর্মঘট, মহল্লার মিছিল, মসজিদ-পরবর্তী সমাবেশ, পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের অবস্থানে রূপ নিয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো স্বৈরশাসককে নিজে থেকে ক্ষমতাচ্যুত করেনি। তিউনিসিয়ায় শ্রমিক সংগঠন ও সেনাবাহিনীর অবস্থান, মিসরে লাখো মানুষের রাজপথ দখল ও শ্রমিক ধর্মঘট, লিবিয়ায় সশস্ত্র বিদ্রোহ ও ন্যাটো অভিযান এবং বাহরাইনে সৌদি হস্তক্ষেপ শেষ ফল নির্ধারণ করেছিল। তবু ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া ঘটনাগুলো এত দ্রুত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ত না। ফেসবুক মানুষকে অসন্তোষে ভোগায়নি, টুইটার বিপ্লব পরিচালনা করেনি এবং ইউটিউব শাসককে সরায়নি—কিন্তু এগুলো মানুষকে পরস্পরকে দেখতে, খুঁজে পেতে, সংগঠিত হতে এবং রাষ্ট্রের গোপন সহিংসতাকে প্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল।
আরব বসন্তের পর সরকারগুলো এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনলাইন নজরদারি, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, ভুয়া প্রচারণা, সাইবার আইন ও ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা আরও বাড়ায়। একই সঙ্গে নাগরিক আন্দোলনও সাংকেতিক যোগাযোগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং বিকেন্দ্রীভূত প্রচারের নতুন কৌশল শেখে। আরব বসন্তের ডিজিটাল উত্তরাধিকার তাই দ্বিমুখী—এটি সাধারণ মানুষকে অভূতপূর্ব প্রকাশক্ষমতা দিয়েছে, আবার রাষ্ট্রকে তাদের অনুসরণ ও নিয়ন্ত্রণের আরও সূক্ষ্ম অস্ত্রও তুলে দিয়েছে; পরবর্তী আন্দোলনগুলোর লড়াই চলবে এই দুই শক্তির মধ্যবর্তী পরিবর্তনশীল ডিজিটাল ময়দানে।
এফিয়াল্টিসের বিশ্বাসঘাতকতা: থার্মোপাইলিতে লিওনিডাসের শেষ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির যুদ্ধ: ৩০০ স্পার্টান ও গ্রিক মিত্রদের অসাধারণ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির গিরিপথ: লিওনিডাস কেন এখানেই পারস্যকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন?
ম্যারাথনের প্রতিশোধ: ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জার্ক্সিসের গ্রিস আক্রমণ
সালেমের ডাইনি বিচারের অবসান: ২০ জনের মৃত্যু, অনুশোচনা ও নির্দোষদের সম্মান ফেরানোর ইতিহাস