বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফরাসি-সুইডিশ পর্ব: রক্রোয়া থেকে প্রাগ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কীভাবে হ্যাবসবার্গ শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল?

Series: ত্রিশ বছরের যুদ্ধ: ধর্মীয় সংঘাত থেকে ইউরোপের ক্ষমতার মহাযুদ্ধ

  • Author: Admin
  • September 06, 2026
ফরাসি-সুইডিশ পর্ব: রক্রোয়া থেকে প্রাগ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কীভাবে হ্যাবসবার্গ শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল?
রক্রোয়া থেকে প্রাগ—হ্যাবসবার্গ শক্তির ক্ষয়ের শেষ অধ্যায়

১৬৩৫ সালে ক্যাথলিক ফ্রান্স সরাসরি হ্যাবসবার্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করার পর ত্রিশ বছরের যুদ্ধ তার সবচেয়ে দীর্ঘ, আন্তর্জাতিক এবং ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে প্রবেশ করে। বোহেমিয়ার ধর্মীয় ও সাংবিধানিক সংকট থেকে শুরু হওয়া সংঘাত তখন আর মূলত ক্যাথলিক বনাম প্রোটেস্ট্যান্ট যুদ্ধ ছিল না। একদিকে অস্ট্রিয়ান ও স্প্যানিশ হ্যাবসবার্গ, অন্যদিকে ফ্রান্স, সুইডেন এবং তাদের বিভিন্ন মিত্র—মধ্য ইউরোপের যুদ্ধ ক্রমে ইউরোপীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের মহাসংঘাতে পরিণত হয়। এই শেষ পর্যায়ে কোনো একক যুদ্ধ হ্যাবসবার্গ শক্তিকে ধ্বংস করেনি; বরং বহু বছর ধরে একাধিক ফ্রন্টে সামরিক চাপ, বিপুল অর্থব্যয়, সৈন্যক্ষয়, বিদ্রোহ এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের শক্তিকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়।

১৬৩৪ সালের নর্ডলিঙ্গেনের যুদ্ধে সুইডিশ-প্রোটেস্ট্যান্ট বাহিনীর বিপর্যয়কর পরাজয়ের পর হ্যাবসবার্গদের অবস্থান আবার শক্তিশালী মনে হয়েছিল। ১৬৩৫ সালের প্রাগের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে স্যাক্সনিসহ বহু জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট শাসক সম্রাটের সঙ্গে সমঝোতায় আসে। সুইডেনের জার্মান অবস্থানও বিপদের মুখে পড়ে। কিন্তু ঠিক এই সম্ভাব্য হ্যাবসবার্গ পুনরুত্থানই ফ্রান্সকে সরাসরি যুদ্ধে নামার দিকে ঠেলে দেয়।

প্রথমদিকে ফরাসিদের জন্য যুদ্ধ মোটেও সহজ ছিল না। ১৬৩৬ সালে স্প্যানিশ ও সাম্রাজ্যিক বাহিনী উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সে গভীরভাবে প্রবেশ করে, এমনকি প্যারিসেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে বোঝা যায়, ফ্রান্সের যুদ্ধে প্রবেশ মানেই হ্যাবসবার্গদের তাৎক্ষণিক পতন ছিল না। স্প্যানিশ সেনাবাহিনী তখনও ইউরোপের সবচেয়ে সম্মানিত সামরিক শক্তিগুলোর একটি এবং অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গরাও জার্মানিতে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছিল।

অন্যদিকে নর্ডলিঙ্গেনের ধাক্কার পর সুইডেনও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ইয়োহান বানার সুইডিশ সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৬৩৬ সালের ভিটস্টকের যুদ্ধে তাঁর বাহিনী স্যাক্সন ও সাম্রাজ্যিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় যে গুস্তাভাস অ্যাডলফাসের মৃত্যু এবং নর্ডলিঙ্গেনের বিপর্যয়ের পরও সুইডেনকে জার্মানি থেকে সহজে বিতাড়িত করা সম্ভব নয়।

সুইডিশ বাহিনী পরবর্তী বছরগুলোতে উত্তর ও মধ্য জার্মানিতে সক্রিয় থাকে। তাদের উদ্দেশ্য শুধু প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় স্বার্থ রক্ষা নয়; জার্মানিতে এমন কৌশলগত অবস্থান অর্জন করা, যা ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তিতে সুইডেনকে শক্তিশালী দরকষাকষির অবস্থান দেবে। বাল্টিক উপকূল, পোমেরানিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ সুইডিশ কৌশলের কেন্দ্রে ছিল।

একই সময়ে ফ্রান্স বিভিন্ন ফ্রন্টে স্প্যানিশ হ্যাবসবার্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। ফরাসি কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্পেন ও স্প্যানিশ নেদারল্যান্ডসের যোগাযোগ দুর্বল করা এবং হ্যাবসবার্গদের একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া। এই দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে স্পেনকে শুধু ফ্রান্স ও ডাচদের বিরুদ্ধেই নয়, নিজের রাজতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংকটও সামলাতে হচ্ছিল।

১৬৪০ সাল স্প্যানিশ হ্যাবসবার্গদের জন্য বিশেষভাবে সংকটময় হয়ে ওঠে। পর্তুগালে বিদ্রোহের মাধ্যমে ব্রাগানজা রাজবংশ স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে যায় এবং কাতালোনিয়াতেও বড় বিদ্রোহ শুরু হয়। ফলে স্পেনের সামরিক ও আর্থিক সম্পদ আরও ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্স এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হ্যাবসবার্গ শক্তির ওপর চাপ বাড়াতে থাকে।

এদিকে অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গদেরও একের পর এক সুইডিশ অভিযান মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। বানারের পর লেনার্ট টরস্টেনসন সুইডিশ সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার হয়ে ওঠেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত দ্রুতগতির অভিযান পরিচালনার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সুইডিশ বাহিনী আবারও সাম্রাজ্যের গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করে।

এই পর্যায়ে যুদ্ধের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে জার্মানির বাইরে ফরাসি-স্প্যানিশ ফ্রন্টে। ১৬৪৩ সালের ১৯ মে রক্রোয়ার যুদ্ধে তরুণ ফরাসি সেনাপতি লুই দ্য বুরবোঁ, ডিউক দ’অঁগিয়েন—যিনি পরে গ্র্যান্ড কঁদে নামে বিখ্যাত হন—স্প্যানিশ বাহিনীর মুখোমুখি হন।

রক্রোয়ার যুদ্ধকে প্রায়ই স্প্যানিশ সামরিক আধিপত্যের সমাপ্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবতা কিছুটা বেশি জটিল। স্পেন যুদ্ধের পরও বহু বছর শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে ছিল। তবু রক্রোয়ার পরাজয়ের প্রতীকী ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। ইউরোপজুড়ে দীর্ঘদিন ভীতিকর খ্যাতি অর্জন করা স্প্যানিশ পদাতিক বাহিনীকে একটি বড় খোলা যুদ্ধে ফরাসিরা পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

যুদ্ধের শুরুতে পরিস্থিতি ফরাসিদের জন্য সহজ ছিল না। স্প্যানিশ বাহিনীর শক্তিশালী পদাতিক কেন্দ্র দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ করে। কিন্তু ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনী এক পাশে সাফল্য অর্জন করার পর দ’অঁগিয়েন দ্রুত সেই সুবিধা কাজে লাগান। শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ অবস্থান ঘিরে ফেলা হয় এবং তাদের প্রধান পদাতিক বাহিনী গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে।

রক্রোয়া এক দিনে স্পেনের শক্তি শেষ করেনি, কিন্তু ইউরোপীয় সামরিক মর্যাদার পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। ফ্রান্স এখন শুধু কূটনৈতিক অর্থদাতা নয়; নিজস্ব সেনাবাহিনী নিয়েও হ্যাবসবার্গ শক্তিকে বড় যুদ্ধে পরাজিত করতে সক্ষম।

এই সময় সুইডিশ বাহিনীও হ্যাবসবার্গদের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করছিল। টরস্টেনসনের নেতৃত্বে তারা মধ্য ইউরোপে দ্রুত অভিযান চালায়। কিন্তু সুইডেনকে একই সঙ্গে ডেনমার্কের সঙ্গেও সংঘাতে জড়াতে হয়। ১৬৪৩–১৬৪৫ সালের টরস্টেনসন যুদ্ধ ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সুইডিশ সাফল্যের মাধ্যমে শেষ হয় এবং বাল্টিক অঞ্চলে সুইডেনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

ডেনিশ সমস্যার সমাধান হওয়ার পর সুইডেন আবার অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গদের বিরুদ্ধে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। এর ফল দেখা যায় ১৬৪৫ সালের ৬ মার্চ জানকাউয়ের যুদ্ধে। বোহেমিয়ায় সংঘটিত এই যুদ্ধে টরস্টেনসনের সুইডিশ বাহিনী সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনীকে বড় ধরনের পরাজয় দেয়।

জানকাউয়ের গুরুত্ব ছিল তার অবস্থানে। এটি আর উত্তর জার্মানির দূরবর্তী কোনো যুদ্ধ নয়। সুইডিশ বাহিনী এখন হ্যাবসবার্গ রাজবংশের নিজস্ব অস্ট্রিয়ান কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বিজয়ের পর টরস্টেনসন মোরাভিয়ার দিকে অগ্রসর হন এবং ভিয়েনার ওপর হুমকি সৃষ্টি করেন।

ভিয়েনা সরাসরি দখল করা সম্ভব হয়নি। সরবরাহ সমস্যা, প্রতিরোধ এবং প্রত্যাশিত মিত্র সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা সুইডিশ অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি পরিষ্কার ছিল—সম্রাট তৃতীয় ফার্দিনান্দের নিজস্ব রাজবংশীয় ভূখণ্ডও আর যুদ্ধের বাইরে নিরাপদ নয়।

এই সময় যুদ্ধের মানবিক মূল্য ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছিল। কয়েক দশক ধরে সেনাবাহিনী একই অঞ্চল দিয়ে বারবার চলাচল করেছে। সৈন্যদের খাদ্য ও অর্থ জোগাতে গ্রাম ও শহরের ওপর বাধ্যতামূলক কর আরোপ করা হয়েছে। কৃষকের শস্য, পশু ও খাদ্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোথাও লুটপাট, কোথাও অগ্নিসংযোগ, আবার কোথাও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিই স্থানীয় অর্থনীতি ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্ভিক্ষ, রোগ এবং জনসংখ্যার স্থানচ্যুতি। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সৈন্যের সংখ্যাই ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ধ্বংস বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। বহু অঞ্চলে রোগ ও খাদ্যসংকটে সামরিক মৃত্যুর তুলনায় অনেক বেশি মানুষ মারা যায়। বিশেষ করে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের কিছু অঞ্চলে জনসংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়, যদিও ক্ষতির মাত্রা অঞ্চলভেদে অত্যন্ত অসম ছিল।

যুদ্ধ তখন নিজেই নিজের খাদ্য হয়ে উঠেছিল। সেনাবাহিনী টিকিয়ে রাখতে অঞ্চল থেকে সম্পদ আদায় করা হতো; সেই আদায় উৎপাদন ধ্বংস করত; উৎপাদন কমে গেলে পরবর্তী সেনাবাহিনী আরও নির্মমভাবে অবশিষ্ট সম্পদ দখল করত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বহন করছিল সাধারণ মানুষ।

১৬৪০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে কোনো পক্ষের জন্যই সহজ সামরিক সমাধান দেখা যাচ্ছিল না। ফ্রান্স ও সুইডেন হ্যাবসবার্গদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম, কিন্তু তারাও বিপুল অর্থ ও সৈন্য হারাচ্ছে। অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গরা বারবার পরাজিত হলেও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে না। স্পেন দুর্বল হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা এখনও রয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ১৬৪৪ সাল থেকে মুনস্টার ও ওসনাব্রুকে বৃহৎ শান্তি আলোচনা কার্যকরভাবে শুরু হয়। একটি মাত্র সম্মেলনে সবাইকে বসানো সহজ ছিল না। ধর্মীয় মর্যাদা, কূটনৈতিক প্রোটোকল এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে আলাদা শহরে আলোচনা চালানো হয়। ক্যাথলিক শক্তিগুলোর অনেক আলোচনা মুনস্টারে এবং সুইডেন ও সাম্রাজ্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ওসনাব্রুকে অনুষ্ঠিত হয়।

কিন্তু শান্তি আলোচনা শুরু মানেই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিটি পক্ষ বুঝতে পেরেছিল যে যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সুবিধাই আলোচনার টেবিলে তাদের দাবি শক্তিশালী করবে। ফলে শান্তি নিয়ে আলোচনা চলার পাশাপাশি সেনাবাহিনী নতুন অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে।

১৬৪৮ সালেও যুদ্ধ থামেনি। সুইডিশ সেনাপতি কার্ল গুস্তাভ ভ্রাঙ্গেল এবং ফরাসি সেনাপতি তুরেন যৌথভাবে সাম্রাজ্যিক-বাভারিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালান। জুসমার্শাউজেনের যুদ্ধে তাদের বিজয় বাভারিয়ার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে। দক্ষিণ জার্মানির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আবারও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

একই বছরের গ্রীষ্মে যুদ্ধ পৌঁছে যায় এমন একটি শহরে, যেখান থেকে তিন দশক আগে সংঘাতের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটেছিল—প্রাগ। ১৬১৮ সালের ডিফেনেস্ট্রেশন অব প্রাগ ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সূচনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল; ১৬৪৮ সালে সেই প্রাগই যুদ্ধের শেষ বড় সামরিক অভিযানের একটি মঞ্চে পরিণত হয়।

১৬৪৮ সালের জুলাইয়ে সুইডিশ বাহিনী আকস্মিক আক্রমণে প্রাগের ভলতাভা নদীর পশ্চিম তীরের অংশ, বিশেষ করে মালা স্ত্রানা ও হ্রাদচানি এলাকা দখল করে। প্রাগ দুর্গ এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তাদের হাতে আসে। শহর থেকে মূল্যবান শিল্পকর্ম, বই ও সংগ্রহ সুইডিশদের হাতে চলে যায়।

কিন্তু পুরো প্রাগ দখল করা সম্ভব হয়নি। ওল্ড টাউন ও নদীর পূর্ব তীরের প্রতিরক্ষা স্থানীয় সৈন্য, নাগরিক এবং ছাত্রদের অংশগ্রহণে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুইডিশরা বারবার চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। অবরোধ চলতে থাকে এমন সময় যখন পশ্চিমে কূটনীতিকরা ইতিমধ্যে যুদ্ধের অবসানের শর্ত প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছেন।

এখানে ইতিহাস যেন একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছিল। যে প্রাগে ১৬১৮ সালে বিদ্রোহের মাধ্যমে যুদ্ধের আগুন জ্বলেছিল, ১৬৪৮ সালে সেই শহরের দেয়ালের কাছেই যুদ্ধের শেষ বড় সংঘর্ষগুলোর একটি চলছিল। কিন্তু তিন দশকের মধ্যে সংঘাতের চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ১৬১৮ সালে বোহেমিয়ান প্রোটেস্ট্যান্ট অভিজাতদের সঙ্গে ক্যাথলিক হ্যাবসবার্গ সম্রাটের বিরোধ ছিল কেন্দ্রে; ১৬৪৮ সালে সুইডিশ সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যিক রাজধানী নয়, বরং বৃহত্তর ইউরোপীয় ক্ষমতার দরকষাকষির অংশ হিসেবে প্রাগে যুদ্ধ করছে।

এই দীর্ঘ ফরাসি-সুইডিশ চাপ হ্যাবসবার্গদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করেনি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গ রাজবংশ ১৬৪৮ সালের পরও মধ্য ইউরোপের প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকে এবং পরে আবারও শক্তিশালী হয়। স্পেনও সঙ্গে সঙ্গে পতিত হয়নি। কিন্তু ১৬১৮ বা ১৬২৯ সালের মতো পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের ওপর সম্রাটের শর্ত একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল।

হ্যাবসবার্গ দুর্বলতার প্রকৃত অর্থ ছিল রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা। সম্রাটকে স্বীকার করতে হচ্ছিল যে জার্মান রাজপুত্রদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষা করে সাম্রাজ্যকে কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ফ্রান্স ও সুইডেনকে ইউরোপীয় ক্ষমতার ভারসাম্যের স্থায়ী অংশ হিসেবে মেনে নিতে হচ্ছিল।

ফ্রান্সের জন্য দীর্ঘ যুদ্ধ হ্যাবসবার্গ ঘেরাও দুর্বল করার পথ খুলে দেয়। সুইডেনের জন্য এটি বাল্টিক ও উত্তর জার্মানিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। জার্মান রাজপুত্রদের জন্য যুদ্ধের শেষ পর্যায় দেখিয়ে দেয় যে সম্রাট, ফ্রান্স কিংবা সুইডেন—কোনো একক শক্তির সম্পূর্ণ আধিপত্যই তাদের স্বার্থের জন্য নিরাপদ নয়।

১৬৪৮ সালের ২৪ অক্টোবর ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হওয়ার সময়ও প্রাগে যুদ্ধের প্রতিধ্বনি পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। শান্তির সংবাদ পৌঁছানোর পর সুইডিশ অভিযান থামে। তিন দশক ধরে চলা সংঘাতের সামরিক অধ্যায় অবশেষে শেষ হতে শুরু করে।

তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তি ত্রিশ বছরের যুদ্ধের প্রধান সাম্রাজ্যিক সংঘাতের অবসান ঘটালেও ফ্রান্স ও স্পেনের যুদ্ধ ১৬৪৮ সালে শেষ হয়নি। দুই দেশ আরও এগারো বছর যুদ্ধ চালিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৬৫৯ সালের পিরেনিসের শান্তিচুক্তিতে সমঝোতায় পৌঁছায়। ফলে হ্যাবসবার্গ-বুরবোঁ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সীমা অতিক্রম করেও চলতে থাকে।

রক্রোয়া থেকে প্রাগ পর্যন্ত ঘটনাগুলো তাই কোনো সরল হ্যাবসবার্গ পতনের গল্প নয়। বরং এটি ক্রমাগত সামরিক ক্ষয়, একাধিক ফ্রন্টে চাপ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে সাম্রাজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ইতিহাস। রক্রোয়া স্প্যানিশ সামরিক মর্যাদায় বড় আঘাত দেয়, জানকাউ অস্ট্রিয়ান হ্যাবসবার্গদের নিজস্ব ভূখণ্ডকে হুমকির মুখে ফেলে, আর ১৬৪৮ সালের অভিযানে দেখা যায় যে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সব পক্ষের জন্যই ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

শেষ পর্যন্ত ফরাসি ও সুইডিশ বাহিনী ভিয়েনা দখল করে হ্যাবসবার্গ রাজবংশকে উৎখাত করেনি। তাদের বড় সাফল্য ছিল হ্যাবসবার্গদের এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে পুরো জার্মানির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ আর সম্ভব ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রের ধারাবাহিক চাপ কূটনৈতিক আপসকে অনিবার্য করে তোলে।

১৬১৮ সালে প্রাগে শুরু হওয়া সংঘাত ১৬৪৮ সালে আবার প্রাগের দেয়ালে ফিরে এসেছিল, কিন্তু ইউরোপ আর আগের ইউরোপ ছিল না। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট বিভাজনের ওপর শুরু হওয়া যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ফ্রান্স ও সুইডেন হ্যাবসবার্গ শক্তিকে দুই দিক থেকে চাপে রেখেছিল, জার্মান রাজ্যগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার চেষ্টা করছিল এবং শান্তির আলোচনায় ধর্মের পাশাপাশি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্য কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছিল। রক্রোয়া থেকে প্রাগ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী পথই শেষ পর্যন্ত ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে দিয়েছিল।


You may also like