পৃথিবীর অন্যতম লবণাক্ত হ্রদে মানুষ সহজেই ভেসে থাকে কেন?
- Author: Admin
- September 04, 2026
ডেড সির ঘন লবণাক্ত পানিতে অনায়াসে ভেসে থাকা মানুষ
জর্ডান ও ইসরায়েলের মধ্যবর্তী শুষ্ক মরুভূমির গভীরে এমন একটি জলাশয় রয়েছে, যেখানে পানিতে নামার পর স্বাভাবিকভাবে সাঁতার না কাটলেও শরীরকে ডুবিয়ে রাখা বেশ কঠিন। পিঠের ওপর শুয়ে হাত-পা ছেড়ে দিলেও শরীর পানির ওপর ভেসে থাকে। কেউ কেউ এমনভাবে ভেসে থাকতে পারেন যে পানিতে শুয়েই বই বা পত্রিকা পড়ার পরিচিত দৃশ্য তৈরি হয়। এই অস্বাভাবিক জলাশয়ই ডেড সি বা মৃত সাগর। নামের মধ্যে ‘সাগর’ থাকলেও এটি প্রকৃতপক্ষে সমুদ্র নয়, বরং স্থলবেষ্টিত একটি অত্যন্ত লবণাক্ত হ্রদ।
ডেড সির সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্য এর অস্বাভাবিক লবণাক্ততা। সাধারণ সমুদ্রের পানিতে যে পরিমাণ দ্রবীভূত লবণ থাকে, ডেড সির পানিতে তার প্রায় দশ গুণ পর্যন্ত বেশি লবণ ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থাকতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ দ্রবীভূত পদার্থ পানির ভৌত বৈশিষ্ট্যই বদলে দিয়েছে। ফলে সাধারণ মিঠাপানি কিংবা সমুদ্রের পানির তুলনায় ডেড সির পানি অনেক বেশি ঘন। আর এই ঘনত্বই মানুষের শরীরকে অস্বাভাবিক সহজে ভাসিয়ে রাখার মূল রহস্য।
কোনো বস্তু পানিতে ভাসবে নাকি ডুবে যাবে, তা বোঝার জন্য পানির ঘনত্ব এবং বস্তুটির গড় ঘনত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের শরীরের বড় অংশই পানি দিয়ে তৈরি হলেও শরীরে চর্বি, হাড়, পেশি এবং বাতাসভর্তি ফুসফুস রয়েছে। এ কারণে মানুষের শরীরের সামগ্রিক ঘনত্ব পানির কাছাকাছি। সাধারণ পানিতেও তাই মানুষ নির্দিষ্ট কৌশলে ভাসতে পারে। কিন্তু ডেড সির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সুবিধাজনক। সেখানে পানির ঘনত্ব মানুষের শরীরের গড় ঘনত্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ায় শরীরকে ওপরের দিকে ঠেলে দেওয়া বলও অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই ঘটনাকে বোঝার জন্য প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের ব্যাখ্যা অত্যন্ত কার্যকর। কোনো বস্তু তরলে ডোবানো হলে বস্তুটি যতটুকু তরল স্থানচ্যুত করে, সেই স্থানচ্যুত তরলের ওজনের সমান একটি ঊর্ধ্বমুখী বল বস্তুটির ওপর কাজ করে। তরল যত ঘন হবে, একই আয়তনের স্থানচ্যুত তরলের ওজন তত বেশি হবে। অর্থাৎ একই মানুষের শরীর সাধারণ পানিতে যে পরিমাণ ঊর্ধ্বমুখী বল পায়, অধিক ঘন ডেড সির পানিতে তার চেয়ে বেশি বল পেতে পারে। ফলে শরীরের তুলনামূলক বড় অংশ পানির ওপর উঠে আসে এবং ভেসে থাকা অনেক সহজ হয়।
সাধারণ সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা মোটামুটি সাড়ে তিন শতাংশের কাছাকাছি হলেও ডেড সির পানিতে দ্রবীভূত লবণ ও খনিজ পদার্থের অনুপাত প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তবে স্থান, গভীরতা, ঋতু ও পরিমাপের সময় অনুসারে এই মাত্রায় কিছু পরিবর্তন ঘটে। এত বিপুল পরিমাণ দ্রবীভূত পদার্থের কারণে এর পানি সাধারণ পানির তুলনায় ভারী এবং স্পর্শেও কিছুটা ভিন্ন অনুভূত হয়। পানিতে হাত নাড়ালে অনেকের কাছে সেটি যেন স্বাভাবিক পানির চেয়ে সামান্য ঘন ও তৈলাক্ত ধরনের বলে মনে হতে পারে।
ডেড সির এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের পেছনে রয়েছে এর অবস্থান ও ভূপ্রকৃতি। এটি এমন একটি অববাহিকায় অবস্থিত, যেখান থেকে পানি কোনো নদী হয়ে সমুদ্রে বেরিয়ে যেতে পারে না। জর্ডান নদী ঐতিহাসিকভাবে এর প্রধান পানির উৎসগুলোর একটি। আশপাশের ছোট জলধারা এবং বৃষ্টির পানিও এতে পৌঁছায়। কিন্তু হ্রদে আসা পানি বাইরে যাওয়ার স্বাভাবিক নদীপথ নেই। পানি হারানোর প্রধান প্রাকৃতিক পথ হলো বাষ্পীভবন।
অঞ্চলটির আবহাওয়া অত্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক। প্রচণ্ড রোদ এবং কম বৃষ্টিপাতের কারণে হ্রদের পানি দ্রুত বাষ্প হয়ে বাতাসে চলে যায়। কিন্তু পানিতে দ্রবীভূত লবণ ও অধিকাংশ খনিজ বাষ্প হয়ে উড়ে যায় না। পানি চলে যায়, খনিজ থেকে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকায় হ্রদের পানিতে দ্রবীভূত পদার্থের ঘনত্ব ক্রমাগত বেড়েছে। অনেকটা একটি পাত্রে লবণপানি রেখে পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়ার মতো—পানি যত কমবে, অবশিষ্ট দ্রবণে লবণের অনুপাত তত বাড়বে।
ডেড সির পানি কেবল সাধারণ খাবার লবণেই পরিপূর্ণ নয়। এতে ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের দ্রবীভূত খনিজ রয়েছে। এই বিশেষ রাসায়নিক গঠনই এর পানিকে সাধারণ সমুদ্রের পানি থেকে আলাদা করেছে। তীরবর্তী এলাকায় পানি সরে গেলে অনেক স্থানে সাদা লবণের স্তর ও স্ফটিক দেখা যায়। কখনো পাথরের গায়েও লবণের স্ফটিক জমে অদ্ভুত প্রাকৃতিক আকৃতি তৈরি করে।
‘ডেড সি’ নামটি শুনলে মনে হতে পারে এর পানিতে কোনো জীবই বেঁচে থাকতে পারে না। বাস্তবতা কিছুটা সূক্ষ্ম। মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং সাধারণ হ্রদ বা সমুদ্রে দেখা অধিকাংশ প্রাণীর পক্ষে এই মাত্রার লবণাক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাদের শরীরের কোষের ভেতরের এবং বাইরের পানির ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পরিবেশ কোষ থেকে পানি টেনে বের করে নিতে পারে, ফলে স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
তবে ডেড সি সম্পূর্ণ জীবশূন্য নয়। বিশেষ ধরনের অতি লবণসহিষ্ণু অণুজীব এমন কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। অনুকূল পরিস্থিতিতে কিছু অণুজীবের সংখ্যা বেড়েও যেতে পারে। তাই ‘মৃত সাগর’ নামটি মূলত চোখে দেখা বড় জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের অনুপস্থিতির ধারণা থেকে এসেছে; বৈজ্ঞানিক অর্থে এটি পুরোপুরি প্রাণহীন কোনো জলাশয় নয়।
ডেড সির আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চতা—বরং বলা ভালো, নিম্নতা। এর জলপৃষ্ঠ পৃথিবীর স্থলভাগে উন্মুক্ত স্থানগুলোর মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সবচেয়ে নিচু অঞ্চলের একটি। জলপৃষ্ঠ সমুদ্রপৃষ্ঠের চার শত মিটারেরও বেশি নিচে অবস্থান করে এবং পানির স্তর কমার সঙ্গে এই সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে। এত নিচু ভূভাগের সৃষ্টি এই অঞ্চলের দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
ডেড সি একটি বিশাল ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি অঞ্চলের অংশ। বহু লক্ষ ও কোটি বছরের ভূত্বকীয় গতিবিধির ফলে অঞ্চলটি নিচু হয়ে একটি গভীর অববাহিকা তৈরি করেছে। আশপাশের পাহাড়ি ও মরুভূমির ভূমির মাঝখানে এই নিচু অঞ্চল পানি জমার জন্য প্রাকৃতিক পাত্রের মতো কাজ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে পানি, খনিজ, বাষ্পীভবন এবং ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে আজকের ডেড সি তৈরি হয়েছে।
তবে মানুষ সহজে ভেসে থাকতে পারে বলে ডেড সির পানিতে নামা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। অত্যন্ত লবণাক্ত পানি চোখে গেলে তীব্র জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। মুখের ভেতরে পানি ঢুকলেও খুব অস্বস্তিকর অনুভূতি হয় এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গিলে ফেলা বিপজ্জনক হতে পারে। শরীরে কাটা বা ক্ষত থাকলে সেই স্থানে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া হতে পারে। এমনকি সদ্য কামানো ত্বকেও অস্বস্তি অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ডেড সিতে সাধারণ সাঁতারের মতো জোরে হাত-পা চালানোরও বিশেষ প্রয়োজন নেই। বরং পিঠের ওপর ধীরে শুয়ে শরীরকে পানির ওপর স্থির হতে দেওয়াই বেশি স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। অতিরিক্ত ভাসমানতার কারণে শরীরের ভারসাম্য সাধারণ পানির তুলনায় অন্যরকম অনুভূত হতে পারে। অসাবধানতায় শরীর উল্টে মুখ পানির দিকে চলে গেলে আবার সঠিক অবস্থায় ফিরতে সমস্যা হতে পারে। তাই সহজে ভেসে থাকা এবং নিরাপদে পানিতে থাকা—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।
মানুষের শরীরের গঠনও ভাসার মাত্রায় কিছু পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে। শরীরের চর্বির ঘনত্ব পেশি ও হাড়ের তুলনায় কম হওয়ায় বেশি চর্বিযুক্ত শরীর সাধারণত তুলনামূলক সহজে ভাসে। আবার ফুসফুসে বাতাস থাকলে শরীরের সামগ্রিক গড় ঘনত্ব কমে যায়। গভীর শ্বাস নেওয়ার পর তাই অনেক মানুষ আরও সহজে ভাসতে পারেন। তবে ডেড সির পানি এত ঘন যে শরীরের গঠনভেদে পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য সেখানে ভাসমানতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
একটি সহজ তুলনা বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে। একটি ডিম সাধারণ পানিতে রাখলে সাধারণত তলিয়ে যায়। কিন্তু পানিতে পর্যাপ্ত লবণ মিশিয়ে ঘনত্ব বাড়ালে একসময় ডিমটি ভেসে উঠতে শুরু করে। ডিমের ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না; পরিবর্তন ঘটে চারপাশের তরলের ঘনত্বে। ডেড সিতে মানুষের ক্ষেত্রে মূল নীতিটিও একই। মানুষের শরীর হঠাৎ হালকা হয়ে যায় না; বরং চারপাশের পানি এত বেশি ঘন যে শরীরকে ভাসিয়ে রাখার ঊর্ধ্বমুখী বল অনেক বেড়ে যায়।
এই কারণেই ‘ডেড সিতে মানুষ ডোবে না’ কথাটি জনপ্রিয় হলেও আক্ষরিক অর্থে সঠিক নয়। কোনো জলাশয়েই মানুষকে সম্পূর্ণ অডুবনীয় বলা নিরাপদ নয়। অসুস্থতা, ভারসাম্য হারানো, মুখ পানিতে চলে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনার কারণে বিপদ ঘটতে পারে। ডেড সির বিশেষত্ব হলো সেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের শরীরের ভাসমানতা সাধারণ মিঠাপানি বা সমুদ্রের তুলনায় অনেক বেশি।
ডেড সির পানিতে খনিজের ঘনত্ব এত বেশি যে পর্যটন ও প্রসাধনশিল্পেও এর পরিচিতি তৈরি হয়েছে। তীরবর্তী খনিজসমৃদ্ধ কাদা শরীরে মাখার দৃশ্য সেখানে খুবই পরিচিত। বিভিন্ন প্রসাধনী পণ্যে ডেড সির লবণ, কাদা বা খনিজ ব্যবহারের দাবিও দেখা যায়। তবে খনিজসমৃদ্ধ হওয়া আর সব ধরনের চিকিৎসাগত দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হওয়া একই বিষয় নয়। কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা হিসেবে এসব উপাদানের কার্যকারিতা বিচার করতে আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।
ডেড সির বর্তমান ইতিহাসের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর দ্রুত সংকুচিত হওয়া। গত কয়েক দশকে এর জলস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমেছে। যে পানি আগে জর্ডান নদী ও অন্যান্য উৎস থেকে হ্রদে পৌঁছাত, তার বড় অংশ কৃষি, নগর ও অন্যান্য মানবিক ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শুষ্ক অঞ্চলের প্রবল বাষ্পীভবন অব্যাহত রয়েছে। কিছু শিল্পকার্যক্রমের জন্য পানির ব্যবহারও সামগ্রিক জলসমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
পানির স্তর নেমে যাওয়ার ফল শুধু হ্রদের আকার ছোট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তীররেখা অনেক জায়গায় দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে পানির ধারে পর্যটনকেন্দ্র বা স্থাপনা ছিল, কোনো কোনো স্থানে সেখান থেকে বর্তমান তীর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শুকিয়ে যাওয়া ভূমিতে আবার আরেকটি বিপজ্জনক ঘটনা দেখা দিচ্ছে—হঠাৎ বিশাল গর্ত বা ধস তৈরি হওয়া।
এই গর্ত সৃষ্টির পেছনেও লবণের ভূমিকা রয়েছে। ডেড সির পুরোনো তলদেশের নিচে বিভিন্ন স্থানে লবণের স্তর রয়েছে। হ্রদের পানি পিছিয়ে গেলে ভূগর্ভে তুলনামূলক মিঠাপানি প্রবেশ করে সেই লবণ দ্রবীভূত করতে পারে। ফলে মাটির নিচে ফাঁপা স্থান তৈরি হয়। উপরের স্তর সেই ফাঁকা জায়গার ভার বহন করতে না পারলে হঠাৎ ধসে পড়ে বড় গর্ত তৈরি হয়। এসব গর্ত রাস্তা, কৃষিজমি ও পর্যটন অবকাঠামোর জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ডেড সির সংকট তাই শুধু একটি বিখ্যাত পর্যটনস্থল হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি পানি ব্যবস্থাপনা, সীমিত জলসম্পদের ওপর মানুষের চাপ এবং শুষ্ক অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একটি বদ্ধ হ্রদের পানির প্রবাহে বড় পরিবর্তন ঘটলে কয়েক দশকের মধ্যেই পুরো ভূদৃশ্য কতটা বদলে যেতে পারে, ডেড সি তার বাস্তব প্রমাণ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেড সি সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে সেখানে শুধু একটি শুকনো লবণের মাঠ থেকে যাবে—এমন সরল ভবিষ্যদ্বাণী করাও ঠিক নয়। পানির পরিমাণ কমতে থাকলে লবণের ঘনত্ব, স্ফটিক জমা, বাষ্পীভবনের হার এবং হ্রদের ভৌত ও রাসায়নিক আচরণের মধ্যেও পরিবর্তন ঘটে। ফলে হ্রদটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পানির আগমন, জলবায়ু, শিল্পকার্যক্রম এবং আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।
ডেড সির দিকে তাকালে তাই একই সঙ্গে কয়েকটি অসাধারণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দেখা যায়। ভূত্বকের গতিবিধি একটি গভীর অববাহিকা তৈরি করেছে। নদী সেই অববাহিকায় পানি ও দ্রবীভূত খনিজ নিয়ে এসেছে। মরুভূমির প্রচণ্ড তাপ পানি বাষ্পীভূত করেছে। খনিজ থেকে গিয়ে পানিকে ক্রমশ ঘন ও লবণাক্ত করেছে। আর সেই ঘন পানি মানুষের শরীরকে এমন শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বল দেয় যে সেখানে অনায়াসে পিঠের ওপর ভেসে থাকা সম্ভব হয়।
এক অর্থে ডেড সিতে ভেসে থাকা কোনো রহস্যময় ঘটনা নয়; এটি পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত সুন্দর একটি বাস্তব প্রদর্শনী। এখানে মানুষকে কোনো অদৃশ্য শক্তি ওপরে ধরে রাখে না। কাজ করে ঘনত্ব, স্থানচ্যুতি, মাধ্যাকর্ষণ এবং ঊর্ধ্বমুখী বলের পরিচিত নিয়ম। কিন্তু সেই সাধারণ নিয়মই যখন পৃথিবীর অন্যতম লবণাক্ত বৃহৎ জলাশয়ে চরম মাত্রায় প্রকাশ পায়, তখন দৃশ্যটি হয়ে ওঠে অসাধারণ।
ডেড সি তাই শুধু এমন একটি জায়গা নয় যেখানে মানুষ সহজে ভেসে থাকতে পারে। এটি একই সঙ্গে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, পানির রসায়ন, অতি লবণাক্ত পরিবেশে জীবনের সীমা, মরুভূমির বাষ্পীভবন, মানুষের জলসম্পদ ব্যবহার এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের এক বিশাল প্রাকৃতিক গবেষণাগার। এর পানিতে ভেসে থাকা একজন মানুষের শরীরের নিচে যে ঘন লবণাক্ত পানি তাকে ওপরে ঠেলে রাখে, সেই পানির মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের খনিজ সঞ্চয় এবং তারও অনেক পুরোনো ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস। আর আজ দ্রুত পিছিয়ে যেতে থাকা তীররেখা মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোও চিরস্থায়ী নয়।
পৃথিবীর গভীরতম স্থানে পরিবেশ কেমন এবং সেখানে কী রয়েছে?
সাহারা মরুভূমি: পৃথিবীর বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমির বালুর নিচে কী লুকিয়ে আছে?
প্রশান্ত মহাসাগর: পৃথিবীর বৃহত্তম ও গভীরতম মহাসাগর আসলে কতটা বিশাল?
ইরানি বিপ্লব ১৯৭৯: শাহের পতন, খোমেনির উত্থান ও ইরানের আমূল পরিবর্তনের ইতিহাস
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের যুগ, ১৯৪৮–১৯৯৪: জাতিগত বিভাজন, নিপীড়ন, প্রতিরোধ ও মুক্তির ইতিহাস
পুতিনের ক্রিমিয়া দখল ২০১৪: কীভাবে রাশিয়া ইউক্রেনের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল?