বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জুলাই সংকট ১৯১৪: অস্ট্রিয়া-সার্বিয়া সংঘাত থেকে কয়েক সপ্তাহে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল?

Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
জুলাই সংকট ১৯১৪: অস্ট্রিয়া-সার্বিয়া সংঘাত থেকে কয়েক সপ্তাহে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল?
জুলাই সংকট ১৯১৪

১৯১৪ সালের ২৮ জুন সারায়েভোতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ নিহত হওয়ার পরও ইউরোপে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি। লন্ডন, প্যারিস কিংবা বার্লিনের সাধারণ মানুষের কাছে তখনও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরো মহাদেশ যুদ্ধে ডুবে যাবে—এমন ভবিষ্যৎ প্রায় অকল্পনীয় ছিল। অথচ হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী প্রায় পাঁচ সপ্তাহে কূটনৈতিক হিসাব, গোপন প্রতিশ্রুতি, আল্টিমেটাম, সামরিক সমাবেশ এবং একের পর এক যুদ্ধ ঘোষণার এমন একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়, যা একটি অস্ট্রিয়া-সার্বিয়া সংকটকে ইউরোপীয় মহাযুদ্ধে পরিণত করে। ইতিহাসে এই বিস্ফোরক সময়টিই জুলাই সংকট নামে পরিচিত।

সারায়েভো হত্যাকাণ্ডের পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির নেতৃত্বের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল শুধু হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়া নয়। ভিয়েনার বহু নীতিনির্ধারক দীর্ঘদিন ধরে সার্বিয়াকে সাম্রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক মনে করতেন। বলকান যুদ্ধগুলোর পর সার্বিয়ার ভূখণ্ড, জনসংখ্যা ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছিল। দক্ষিণ স্লাভ জাতীয়তাবাদের বিস্তার অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। ফলে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডকে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা শুরু হয়।

কিন্তু সমস্যাটি ছিল রাশিয়া। সার্বিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং বলকানে নিজের প্রভাব রক্ষার স্বার্থও ছিল। ১৯০৮-০৯ সালের বসনিয়া সংকটে রাশিয়া অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সামনে কার্যত পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আবারও সার্বিয়াকে অপমানিত হতে দিলে বলকানে রাশিয়ার মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ঝুঁকি ছিল প্রবল। আর রাশিয়া যুদ্ধে নামলে তার মিত্র ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মিত্র জার্মানির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।

এই কারণেই ভিয়েনা প্রথমে বার্লিনের সমর্থন নিশ্চিত করতে চায়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিনিধিরা জার্মান নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে। ৫-৬ জুলাইয়ের মধ্যে জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম ও তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে দৃঢ় সমর্থনের বার্তা দেওয়া হয়। ইতিহাসে এটি বিখ্যাত ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ নামে। এর অর্থ এই নয় যে জার্মানি একটি লিখিত ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করেছিল; বরং ধারণাটি বোঝায় যে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়া কঠোর ব্যবস্থা নিলে এবং তাতে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হলেও জার্মানি তার মিত্রকে সমর্থন করবে।

জার্মান নেতৃত্বের একটি অংশ ধারণা করেছিল, দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিলে সংঘাতকে হয়তো অস্ট্রিয়া-সার্বিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বার্লিনে এমন আশঙ্কাও ছিল যে রাশিয়া দ্রুত শিল্পায়ন ও সামরিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ভবিষ্যতে রাশিয়া আরও শক্তিশালী হলে জার্মানির কৌশলগত অবস্থান খারাপ হতে পারে। এই ‘এখন না হলে পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে’ ধরনের চিন্তা জুলাই সংকটকে শান্ত করার বদলে ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা বাড়িয়েছিল।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি অবশ্য সারায়েভো হত্যাকাণ্ডের পর সঙ্গে সঙ্গে সার্বিয়াকে আল্টিমেটাম দেয়নি। তদন্ত, অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনার কারণে কয়েক সপ্তাহ কেটে যায়। পাশাপাশি ফরাসি প্রেসিডেন্ট রেমোঁ পুয়াঁকারে ও প্রধানমন্ত্রী রেনে ভিভিয়ানি রাশিয়া সফরে ছিলেন। ভিয়েনা এমন সময় আল্টিমেটাম দেওয়ার পরিকল্পনা করে, যখন ফরাসি নেতারা সেন্ট পিটার্সবার্গ ত্যাগ করে ফিরতি যাত্রায় থাকবেন এবং ফ্রান্স-রাশিয়ার তাৎক্ষণিক সমন্বয় কিছুটা কঠিন হতে পারে।

২৩ জুলাই সন্ধ্যায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বেলগ্রেডে সার্ব সরকারের কাছে কঠোর আল্টিমেটাম হস্তান্তর করে। সার্বিয়াকে উত্তর দেওয়ার জন্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে অস্ট্রিয়াবিরোধী প্রচারণা দমন, নির্দিষ্ট সংগঠন নিষিদ্ধ করা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক তদন্তের দাবি ছিল। বিশেষভাবে বিতর্কিত ছিল এমন কিছু শর্ত, যেগুলো বাস্তবায়নে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় কর্মকর্তাদের সার্বিয়ার ভেতরে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারত। বেলগ্রেড এটিকে নিজের সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখে।

২৫ জুলাই সার্বিয়া তার উত্তর দেয়। সার্ব সরকার অস্ট্রিয়ার অধিকাংশ দাবি পুরোপুরি বা নীতিগতভাবে মেনে নেয় এবং কয়েকটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে। বিতর্কিত দাবিগুলোর ক্ষেত্রে তারা আপস ও আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাও তুলে ধরে। উত্তরটি এতটাই সমঝোতামূলক ছিল যে ইউরোপের অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগ তখনও ছিল বলে মনে হয়। জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্মও পরে সার্বিয়ার উত্তর দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে এর ফলে যুদ্ধের একটি বড় কারণ কার্যত দুর্বল হয়ে গেছে।

কিন্তু অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির উদ্দেশ্য শুধু সার্বিয়ার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করা ছিল না। ভিয়েনার নেতৃত্ব ইতিমধ্যে সামরিকভাবে সার্বিয়াকে শাস্তি দেওয়ার দিকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। সার্বিয়ার উত্তর পাওয়ার পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় রাষ্ট্রদূত বেলগ্রেড ত্যাগ করেন। সার্বিয়াও সামরিক প্রস্তুতি শুরু করে। ২৮ জুলাই ১৯১৪ অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

পরদিন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় বাহিনী বেলগ্রেডের দিকে গোলাবর্ষণ শুরু করলে সংকট আর কেবল কূটনৈতিক থাকল না। রাশিয়ার সামনে তখন কঠিন সিদ্ধান্ত আসে। সার্বিয়াকে সামরিকভাবে পরাজিত হতে দিলে বলকানে রাশিয়ার প্রভাব ও বৃহৎ শক্তি হিসেবে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। রুশ নেতৃত্ব প্রথমে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক প্রস্তুতির ধারণা বিবেচনা করলেও তাদের সামরিক পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো ছিল যে আংশিক ও পূর্ণ সমাবেশের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য বজায় রাখা কঠিন ছিল।

৩০ জুলাই রাশিয়া সাধারণ সামরিক সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। এখানেই সংকট নাটকীয়ভাবে জার্মানির নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়। জার্মান সামরিক পরিকল্পনার ভিত্তি ছিল দুই ফ্রন্টের সম্ভাব্য যুদ্ধ—পশ্চিমে ফ্রান্স এবং পূর্বে রাশিয়া। রাশিয়া তার বিশাল সেনাবাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত করার আগে জার্মান পরিকল্পনাকারীরা পশ্চিমে দ্রুত ফ্রান্সকে পরাজিত করতে চেয়েছিলেন। ফলে রুশ সমাবেশকে বার্লিন শুধু রাজনৈতিক চাপ হিসেবে নয়, আসন্ন যুদ্ধের সামরিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিল।

৩১ জুলাই জার্মানি রাশিয়াকে সামরিক সমাবেশ বন্ধ করার জন্য আল্টিমেটাম দেয়। একই সময়ে ফ্রান্সের কাছেও তার অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। রাশিয়া সমাবেশ বন্ধ না করায় ১ আগস্ট জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেদিনই ফ্রান্সও পূর্ণ সামরিক সমাবেশ শুরু করে। ইউরোপের দুটি প্রধান জোটের বৃহৎ শক্তিগুলো তখন কার্যত মুখোমুখি।

ফ্রান্সের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক জোট থাকায় জার্মানি ধরে নিয়েছিল, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ মানেই শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের সঙ্গেও যুদ্ধ। জার্মান সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চিমে দ্রুত আঘাত করা প্রয়োজন ছিল। ফ্রান্সের পূর্ব সীমান্তের শক্তিশালী দুর্গব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে উত্তরের পথ দিয়ে আক্রমণের জন্য নিরপেক্ষ বেলজিয়ামের ভূখণ্ড ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়। ২ আগস্ট জার্মানি বেলজিয়ামের কাছে সৈন্য চলাচলের অনুমতি দাবি করে। বেলজিয়াম তা প্রত্যাখ্যান করে।

৩ আগস্ট জার্মানি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরদিন, ৪ আগস্ট জার্মান বাহিনী বেলজিয়ামে প্রবেশ করে। বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বীকৃত ছিল এবং ব্রিটেন ইউরোপের উপকূলীয় অঞ্চলে জার্মান আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও নিজের কৌশলগত স্বার্থের জন্য বিপজ্জনক মনে করত। ব্রিটিশ সরকার জার্মানির কাছে বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা সম্মান করার দাবি জানায়। সন্তোষজনক নিশ্চয়তা না পাওয়ায় ৪ আগস্ট রাতেই ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করে।

এভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটনাপ্রবাহের চরিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। ২৮ জুলাই ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বনাম সার্বিয়ার যুদ্ধ। ১ আগস্ট জার্মানি ও রাশিয়া যুদ্ধে জড়ায়। ৩ আগস্ট জার্মানি ও ফ্রান্স যুদ্ধরত হয়। ৪ আগস্ট বেলজিয়াম আক্রমণ এবং ব্রিটেনের প্রবেশের মাধ্যমে সংঘাত পশ্চিম ইউরোপেও পূর্ণমাত্রায় বিস্তৃত হয়। পরবর্তী সময়ে আরও রাষ্ট্র যোগ দেওয়ায় এটি প্রকৃত অর্থেই বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেয়।

তবে জুলাই সংকটকে এমনভাবে দেখা ভুল হবে যেন জোটব্যবস্থা একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো প্রতিটি দেশকে বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে টেনে নিয়েছিল। বাস্তবে প্রতিটি পর্যায়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে সামরিকভাবে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; জার্মানি তাকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিল; রাশিয়া সার্বিয়াকে পরিত্যাগ না করে সামরিক সমাবেশ বেছে নিয়েছিল; জার্মানি রুশ সমাবেশের জবাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল; আর বেলজিয়ামের মধ্য দিয়ে জার্মান আক্রমণ ব্রিটিশ হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করেছিল। জোটগুলো সংকটকে বিস্তৃত করার কাঠামো তৈরি করেছিল, কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই সেই কাঠামোকে যুদ্ধে রূপ দিয়েছিল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সামরিক সমাবেশের প্রকৃতি। লাখ লাখ সৈন্য, ঘোড়া, কামান ও সরঞ্জামকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সীমান্তে পৌঁছে দিতে বিশাল রেলওয়ে সময়সূচি তৈরি ছিল। একবার সমাবেশ শুরু হলে পরিকল্পনা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। সামরিক নেতারা আশঙ্কা করতেন, কয়েক দিনের বিলম্বও শত্রুকে মারাত্মক কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। ফলে কূটনীতির ঘড়ি যখন ধীরে চলতে চাইছিল, সামরিক সময়সূচির ঘড়ি তখন দ্রুত যুদ্ধের দিকে ছুটছিল।

জুলাই সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক বৈশিষ্ট্য এখানেই। ইউরোপের নেতাদের সবাই যে শুরু থেকেই একটি মহাযুদ্ধ চেয়েছিলেন, তা নয়। বিভিন্ন সরকার ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে ঝুঁকি নিয়েছিল। ভিয়েনা সার্বিয়াকে দুর্বল করতে চেয়েছিল, বার্লিন অস্ট্রিয়াকে রক্ষা ও নিজের কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখতে চেয়েছিল, সেন্ট পিটার্সবার্গ বলকানে মর্যাদা হারাতে চায়নি, প্যারিস রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন হতে দিতে চায়নি এবং লন্ডন ইউরোপের শক্তির ভারসাম্য ও বেলজিয়ামের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। কিন্তু প্রত্যেকে নিজের সীমিত লক্ষ্য অনুসরণ করতে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এমন একটি ফল তৈরি করেছিল, যার ব্যাপ্তি তাদের অনেকের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়।

১৯১৪ সালের জুলাই সংকট তাই শুধু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপঞ্জি নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি সতর্কবার্তা। সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড যুদ্ধের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু ২৩ জুলাইয়ের আল্টিমেটাম, ২৮ জুলাইয়ের যুদ্ধ ঘোষণা, ৩০ জুলাইয়ের রুশ সমাবেশ, ১ আগস্ট জার্মানি-রাশিয়া যুদ্ধ, ৩ আগস্ট জার্মানি-ফ্রান্স যুদ্ধ এবং ৪ আগস্ট বেলজিয়াম আক্রমণ ও ব্রিটিশ প্রবেশ—এই ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলোই একটি বলকান সংকটকে ইউরোপীয় মহাযুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল। কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত এমন এক সংঘাতের দরজা খুলে দেয়, যা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র, সমাজ এবং মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দেবে।