ব্যাবিলন: প্রাচীন বিশ্বের কিংবদন্তি নগরী কীভাবে হারিয়ে গেল?
Series: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য
- Author: Admin
- August 17, 2026
ব্যাবিলন: প্রাচীন বিশ্বের কিংবদন্তি নগরী কীভাবে হারিয়ে গেল?
প্রাচীন পৃথিবীর খুব কম নগরের নামই ব্যাবিলনের মতো এত দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের কল্পনাকে প্রভাবিত করেছে। কখনো এটি ছিল শক্তিশালী রাজাদের রাজধানী, কখনো জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মের কেন্দ্র, আবার পরবর্তী ধর্মীয় ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যে এটি হয়ে ওঠে অহংকার, সম্পদ ও পতনের প্রতীক। হাম্মুরাবির আইন, নেবুচাদনেজারের বিশাল নির্মাণকর্ম, ইশতার গেট, বাবেলের টাওয়ার এবং কিংবদন্তির ঝুলন্ত উদ্যান—সবকিছু মিলিয়ে ব্যাবিলন বাস্তব ইতিহাস ও কিংবদন্তির এক অসাধারণ সংযোগস্থল। অথচ একসময়ের এই মহানগর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়।
ব্যাবিলন বর্তমান ইরাকের বাগদাদ থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। মেসোপটেমিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থান করায় নগরটি নদীপথ, কৃষি এবং স্থলবাণিজ্যের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান পেয়েছিল। তবে ব্যাবিলন শুরু থেকেই বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল না। তৃতীয় সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষভাগের লিখিত উৎসে নগরটির প্রাথমিক উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে মূলত দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে।
খ্রিস্টপূর্ব ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকে আমোরীয় বংশোদ্ভূত একটি রাজবংশ ব্যাবিলনে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। এই রাজবংশের ষষ্ঠ শাসক হাম্মুরাবি, যিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন, ব্যাবিলনকে একটি আঞ্চলিক নগর থেকে বৃহৎ সাম্রাজ্যের রাজধানীতে রূপান্তর করেন। সামরিক অভিযান, কূটনীতি এবং জোটের মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ ও মধ্য মেসোপটেমিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো নিজের অধীনে আনেন।
হাম্মুরাবির নাম আজ সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর আইনসংহিতার জন্য। একটি বিশাল পাথরের স্তম্ভে খোদাই করা এই আইনসমষ্টিতে সম্পত্তি, ঋণ, ব্যবসা, পরিবার, শ্রম, আঘাত, চিকিৎসা এবং সামাজিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিধান রয়েছে। এটি পৃথিবীর প্রথম আইন নয়—এর আগেও মেসোপটেমিয়ায় লিখিত আইন ছিল। তবে হাম্মুরাবির আইনসংহিতা প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত ও বিখ্যাত আইনসংকলনগুলোর একটি।
হাম্মুরাবির মৃত্যুর পর তাঁর তৈরি সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উত্তরসূরিদের সময় বিভিন্ন অঞ্চল বিচ্ছিন্ন হতে থাকে এবং ব্যাবিলনের রাজনৈতিক শক্তি কমে যায়। খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে হিট্টাইট রাজা প্রথম মুরসিলি ব্যাবিলনে অভিযান চালিয়ে নগরটি দখল করেন। এরপর দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় ক্যাসাইট রাজবংশ ক্ষমতায় আসে এবং ব্যাবিলন নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করে।
ক্যাসাইটরা কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যাবিলনিয়া শাসন করে। এই দীর্ঘ সময়ে ব্যাবিলন শুধু একটি রাজনৈতিক রাজধানী নয়, বরং গভীর ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন নগরে পরিণত হয়। বিশেষ করে নগরের প্রধান দেবতা মারদুক ধীরে ধীরে ব্যাবিলনীয় ধর্মীয় জগতে সর্বোচ্চ মর্যাদার দেবতাদের একজন হয়ে ওঠেন। ব্যাবিলনের রাজনৈতিক ভাগ্য ওঠানামা করলেও তার সাংস্কৃতিক মর্যাদা ক্রমে এত শক্তিশালী হয় যে বিদেশি শাসকেরাও নগরটির ধর্মীয় গুরুত্ব উপেক্ষা করতে পারতেন না।
ব্যাবিলনের ইতিহাসে পরবর্তী বড় শক্তি ছিল আসিরীয় সাম্রাজ্য। প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলন বহুবার আসিরীয় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে আসে। কিন্তু ব্যাবিলনীয়রা বারবার বিদ্রোহ করে। এই সম্পর্ক এতটাই সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে যে খ্রিস্টপূর্ব ৬৮৯ সালে আসিরীয় রাজা সেন্নাকেরিব বিদ্রোহ দমনের পর ব্যাবিলনের ওপর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালান।
কিন্তু এত বড় ধ্বংসের পরও ব্যাবিলন শেষ হয়ে যায়নি। সেন্নাকেরিবের উত্তরসূরি এসারহাডন নগরটি পুনর্নির্মাণ করেন। ঘটনাটি ব্যাবিলনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে—এই শহর একাধিকবার পরাজিত, দখল ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু বারবার পুনর্গঠিত হয়েছে।
ব্যাবিলনের সবচেয়ে বিখ্যাত যুগ শুরু হয় আসিরীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শেষদিকে নব-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। নাবোপোলাসার এবং তাঁর পুত্র দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার ব্যাবিলনকে আবার একটি বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। নেবুচাদনেজার দ্বিতীয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০৫ থেকে ৫৬২ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন এবং তাঁর সময়েই ব্যাবিলন তার স্থাপত্যিক জাঁকজমকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
নেবুচাদনেজারের বিশাল নির্মাণকর্মের ফলে নগরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর, প্রাসাদ, মন্দির, রাস্তা এবং প্রবেশদ্বার নতুনভাবে নির্মিত বা সংস্কার করা হয়। এই যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন ইশতার গেট। নীল রঙের চকচকে ইট দিয়ে নির্মিত এই বিশাল প্রবেশদ্বারে ষাঁড় ও পৌরাণিক মুশহুশশু প্রাণীর অলংকরণ ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বিখ্যাত শোভাযাত্রার পথ, যার দেয়ালে সিংহের চিত্র ছিল।
ধর্মীয় উৎসবের সময় এই পথ দিয়ে দেবতার প্রতিমা এবং আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা অতিক্রম করত। ফলে ইশতার গেট শুধু প্রতিরক্ষামূলক প্রবেশদ্বার ছিল না; এটি ছিল ব্যাবিলনের রাজকীয় ক্ষমতা, ধর্মীয় মর্যাদা ও স্থাপত্যিক মহিমার দৃশ্যমান ঘোষণা।
নগরের কেন্দ্রে মারদুকের প্রধান মন্দির এসাগিলা এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশাল জিগুরাত এতেমেনাঙ্কি ব্যাবিলনের ধর্মীয় ভূদৃশ্যের কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন বর্ণনা ও পরবর্তী ঐতিহ্যের কারণে এতেমেনাঙ্কিকে অনেক সময় বাইবেলের ‘বাবেলের টাওয়ার’ কাহিনির সম্ভাব্য ঐতিহাসিক অনুপ্রেরণাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। তবে ধর্মীয় কাহিনি ও প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসকে সরাসরি একই ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
ব্যাবিলনের আরেক কিংবদন্তি হলো ঝুলন্ত উদ্যান। গ্রিক ও রোমান লেখকদের বিবরণে এটি প্রাচীন বিশ্বের সাত আশ্চর্যের একটি হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী ঐতিহ্যে বলা হয়, নেবুচাদনেজার তাঁর স্ত্রীর জন্য স্তরে স্তরে সাজানো সবুজ উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এখানে একটি বড় রহস্য রয়েছে—ব্যাবিলনে এমন উদ্যানের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো প্রত্যক্ষ সমসাময়িক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এ কারণে কিছু গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন, বিখ্যাত উদ্যানটি আদৌ ব্যাবিলনে ছিল কি না। একটি উল্লেখযোগ্য বিকল্প তত্ত্ব হলো, পরবর্তী লেখকেরা সম্ভবত আসিরীয় রাজধানী নিনেভেহর বিশাল রাজকীয় উদ্যান ও পানি সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যাবিলনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে ঝুলন্ত উদ্যান ব্যাবিলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতীকগুলোর একটি হলেও এর বাস্তব অবস্থান আজও অমীমাংসিত।
নেবুচাদনেজারের ব্যাবিলন শুধু রাজপ্রাসাদ ও মন্দিরের শহর ছিল না। এর ভেতরে ছিল আবাসিক এলাকা, কর্মশালা, বাজার, গুদাম এবং প্রশাসনিক ভবন। হাজার হাজার কিউনিফর্ম ফলক থেকে ব্যবসায়িক চুক্তি, ঋণ, জমি, বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং পণ্য পরিবহনের তথ্য পাওয়া যায়। ব্যাবিলনের প্রকৃত শক্তি তার বিশাল স্থাপত্যের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত সংগঠিত নগর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
ব্যাবিলনীয় জ্ঞানচর্চাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মেসোপটেমিয়ার লেখক ও পণ্ডিতেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, ভবিষ্যৎ গণনা এবং সাহিত্যসংক্রান্ত তথ্য মাটির ফলকে সংরক্ষণ করেছিলেন। বিশেষ করে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ব্যাবিলনীয় পণ্ডিতদের ধারাবাহিকতা অসাধারণ ছিল। গ্রহ ও চন্দ্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তারা দীর্ঘমেয়াদি নথি তৈরি করেছিল।
কিন্তু নেবুচাদনেজারের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্রুত কয়েকজন শাসক পরিবর্তনের পরে নাবোনিডাস সিংহাসনে বসেন। তাঁর ধর্মীয় নীতি এবং দীর্ঘ সময় রাজধানীর বাইরে অবস্থান ব্যাবিলনের ক্ষমতাবান পুরোহিতগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল করে তুলেছিল বলে প্রাচীন উৎস থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
এই পরিস্থিতিতে পূর্বদিকে পারস্যের রাজা দ্বিতীয় সাইরাস দ্রুত একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সালে পারস্য বাহিনী ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ওপিসের যুদ্ধে ব্যাবিলনীয় বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর পারস্য বাহিনী ব্যাবিলনের দিকে অগ্রসর হয়। প্রাচীন নথি থেকে বোঝা যায়, ব্যাবিলন তুলনামূলক কম প্রতিরোধের মধ্যেই পারস্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এই ঘটনাটি ব্যাবিলনের স্বাধীন সাম্রাজ্যিক রাজধানী হিসেবে যুগের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু নগরটির মৃত্যু ঘটায়নি। সাইরাস নিজেকে ব্যাবিলনের বৈধ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করার রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন। পারস্যের আকেমেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনেও ব্যাবিলন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র ছিল।
পরবর্তী সময়ে ব্যাবিলনে পারস্যবিরোধী বিদ্রোহ ঘটে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট গগামেলার যুদ্ধে পারস্যের তৃতীয় দারিয়ুসকে পরাজিত করে ব্যাবিলনে প্রবেশ করেন। আলেকজান্ডার শহরটির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং ব্যাবিলনকে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
ইতিহাসের এক নাটকীয় ঘটনায় খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেকজান্ডার ব্যাবিলনেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য সেনাপতিদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। মেসোপটেমিয়া শেষ পর্যন্ত সেলিউকাসের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সেলিউসিড সাম্রাজ্যের অংশ হয়।
ব্যাবিলনের দীর্ঘমেয়াদি পতনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন সেলিউসিয়া নামের নতুন নগর টাইগ্রিস নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র সেখানে স্থানান্তরিত হতে থাকায় ব্যাবিলনের জনসংখ্যা ও গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এটি কোনো একদিনের ধ্বংস ছিল না; বরং বহু শতাব্দী ধরে চলা নগর অবক্ষয়।
নদী ও খালব্যবস্থার পরিবর্তন, রাজনৈতিক রাজধানীর স্থানান্তর, বাণিজ্যপথের পুনর্বিন্যাস এবং নতুন নগরের উত্থান ব্যাবিলনকে ক্রমশ প্রান্তিক করে দেয়। কিছু ধর্মীয় ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় টিকে থাকলেও বিশাল নগরের বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কাঁচা মাটির ইট দিয়ে নির্মিত ভবন রক্ষণাবেক্ষণ না করলে দ্রুত ক্ষয় হয়। যে শহরকে একসময় প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় বলে মনে করা হতো, সেটিই শেষ পর্যন্ত ধুলো ও মাটির ঢিবির নিচে হারিয়ে যেতে থাকে।
ব্যাবিলনের পতনকে তাই পারস্যের ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বিজয়ের সঙ্গে এক করে দেখা ভুল। পারস্য ব্যাবিলনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা শেষ করেছিল, কিন্তু শহরটি এরপরও শতাব্দীর পর শতাব্দী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রকৃত নগর অবক্ষয় ছিল অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ব্যাবিলন জয় করা হয়েছিল একাধিকবার, কিন্তু তার হারিয়ে যাওয়া ঘটেছিল ধীরে ধীরে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পরে ইউরোপীয় ভ্রমণকারী ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রাচীন লেখায় বর্ণিত ব্যাবিলনের অবস্থান অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। উনিশ শতকে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক রবার্ট কোল্ডেভে ১৮৯৯ সালে বড় আকারের খনন শুরু করেন। দীর্ঘ খননে ইশতার গেট, শোভাযাত্রার পথ, প্রাসাদের অংশ এবং বিশাল নগর পরিকল্পনার বহু নিদর্শন উন্মোচিত হয়।
এই আবিষ্কার ব্যাবিলনকে কিংবদন্তির জগৎ থেকে আবার বাস্তব ইতিহাসের মাটিতে ফিরিয়ে আনে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বুঝতে পারেন, প্রাচীন লেখকদের বর্ণনায় অতিরঞ্জন থাকলেও ব্যাবিলন সত্যিই ছিল অসাধারণ মাত্রার একটি মহানগর। একই সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব কিংবদন্তির সীমাও প্রকাশ করে—বিশেষ করে ঝুলন্ত উদ্যানের মতো বিষয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
আধুনিক যুগেও ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষ নতুন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিভিন্ন পুনর্নির্মাণ প্রকল্প, রাজনৈতিক ব্যবহার, যুদ্ধ এবং সামরিক কার্যক্রম প্রত্নস্থলটির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে ব্যাবিলনের গল্প শুধু প্রাচীন নগর কীভাবে হারিয়ে গেল তার ইতিহাস নয়; হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে আধুনিক মানুষ কীভাবে সংরক্ষণ করবে, সেটিও এখন এই নগরীর গল্পের অংশ।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ব্যাবিলন প্রকৃতপক্ষে কখনো মানুষের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ হারায়নি। বাইবেল, গ্রিক-রোমান সাহিত্য, মেসোপটেমীয় দলিল এবং পরবর্তী সংস্কৃতিতে এর নাম বেঁচে ছিল। হারিয়ে গিয়েছিল মূলত নগরটির বাস্তব চেহারা—তার রাস্তা, প্রাসাদ, মন্দির এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জগৎ।
আজ ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষ আমাদের সামনে দুটি ভিন্ন জগতকে একসঙ্গে তুলে ধরে। একটি হলো হাম্মুরাবি, নেবুচাদনেজার, ইশতার গেট, মারদুকের মন্দির এবং কিউনিফর্ম পণ্ডিতদের বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যাবিলন। অন্যটি হলো বাবেলের টাওয়ার, ঝুলন্ত উদ্যান এবং পরবর্তী যুগের কল্পনায় তৈরি কিংবদন্তির ব্যাবিলন।
এই দুই জগতের মাঝখানেই ব্যাবিলনের প্রকৃত রহস্য। শহরটি কোনো এক মহাবিপর্যয়ে হঠাৎ নিশ্চিহ্ন হয়নি; সাম্রাজ্য বদলেছে, রাজনৈতিক কেন্দ্র সরে গেছে, অর্থনৈতিক পথ পরিবর্তিত হয়েছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনজীবন সংকুচিত হতে হতে একসময়ের মহানগর ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। অথচ তার নাম হারায়নি। প্রায় চার হাজার বছর পরও ব্যাবিলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি শহরের প্রাচীর মাটিতে মিশে যেতে পারে, কিন্তু তার ইতিহাস ও কিংবদন্তি কখনো কখনো সেই প্রাচীরের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়।
উগারিত: এক রাতের ধ্বংসে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন বন্দরনগরীর রহস্য
এলিনর অব অ্যাকুইটেন: মধ্যযুগীয় ইউরোপের রাজনীতি বদলে দেওয়া দুর্ধর্ষ রানির ইতিহাস
রাজিয়া সুলতানা: দিল্লির সিংহাসনে বসা প্রথম ও একমাত্র নারী সুলতানের ইতিহাস
উ জেতিয়ান: চীনের ইতিহাসের একমাত্র নারী সম্রাট কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন?