বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

উর নগরী: মেসোপটেমিয়ার হারিয়ে যাওয়া মহান শহরের রহস্য

Series: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

  • Author: Admin
  • August 17, 2026
উর নগরী: মেসোপটেমিয়ার হারিয়ে যাওয়া মহান শহরের রহস্য
উর নগরী: মেসোপটেমিয়ার হারিয়ে যাওয়া মহান শহরের রহস্য

বর্তমান দক্ষিণ ইরাকের শুষ্ক ও ধুলোময় সমভূমিতে আজ যে বিশাল মাটির ঢিবি ও প্রাচীন ইটের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, প্রায় চার হাজার বছর আগে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ নগর উর। একসময় এই শহরের মন্দিরে পুরোহিতেরা দেবতার উদ্দেশে আচার পালন করতেন, ব্যস্ত বাজারে দূরদেশের পণ্য কেনাবেচা হতো, লেখকেরা কাদামাটির ফলকে হিসাব লিখতেন এবং বিশাল জিগুরাত নগরের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকত। উর শুধু একটি সুমেরীয় শহর ছিল না; বিভিন্ন সময়ে এটি দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার অর্থনীতি, ধর্ম, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

উরের অবস্থান ছিল দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায়, বর্তমান ইরাকের নাসিরিয়ার কাছে। প্রাচীনকালে এর ভৌগোলিক পরিবেশ আজকের মতো ছিল না। ইউফ্রেটিসের শাখা, খাল এবং পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি জলপথ উরকে বৃহত্তর বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। নদীপথে শস্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা যেত, আবার দক্ষিণের সামুদ্রিক পথ ধরে আরও দূরের অঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ সম্ভব ছিল। জলপথের এই সুবিধাই উরের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

উরের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দেও এখানে বসতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তৃতীয় সহস্রাব্দে নগরটি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে। উর একটি স্বাধীন নগররাষ্ট্র হিসেবে বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব রাজবংশের অধীনে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুমেরীয় রাজনৈতিক জগতে উরুক, লাগাশ, কিশ ও অন্যান্য নগরের মতো উরও ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করত।

উরের সমৃদ্ধির সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রমাণগুলোর একটি এসেছে এর রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র থেকে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রত্নতাত্ত্বিক লিওনার্ড উলির নেতৃত্বে পরিচালিত খননে হাজারের বেশি সমাধি আবিষ্কৃত হয়, যার মধ্যে কয়েকটি অসাধারণ সম্পদ ও আনুষ্ঠানিকতার কারণে রাজকীয় সমাধি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এগুলো প্রধানত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ের।

এই সমাধিগুলো থেকে স্বর্ণের অলংকার, রূপা, লাপিস লাজুলি, বাদ্যযন্ত্র, অস্ত্র, পাত্র এবং অসাধারণ কারুশিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায়। বিখ্যাত রানি পুয়াবির সমাধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পরিচয় বহনকারী সিলমোহর এবং সমাধির বিপুল সম্পদ থেকে বোঝা যায় তিনি উরের উচ্চতম অভিজাত শ্রেণির একজন ছিলেন। তাঁর অলংকারে ব্যবহৃত সোনা ও লাপিস লাজুলি শুধু শিল্পের উৎকর্ষ নয়, উরের দূরপাল্লার বাণিজ্যেরও প্রমাণ।

দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় মূল্যবান পাথর, ভালো নির্মাণকাঠ এবং ধাতুর বড় উৎস ছিল না। অথচ উরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এসব উপকরণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শহরটির বাণিজ্যিক যোগাযোগ অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যপথ ধরে দিলমুন, সম্ভবত বর্তমান বাহরাইন ও আশপাশের অঞ্চল, এবং মাগান, সাধারণভাবে বর্তমান ওমানের সঙ্গে সম্পর্কিত অঞ্চল, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। মেসোপটেমীয় নথিতে মেলুহহা নামের আরেক দূরবর্তী দেশের উল্লেখ রয়েছে, যাকে অধিকাংশ গবেষক সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেন।

ফলে উরের বাজারে এমন সব পণ্য পৌঁছাতে পারত, যেগুলোর উৎস শত শত বা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। তামা, মূল্যবান পাথর, কাঠ এবং বিলাসপণ্যের বিনিময়ে মেসোপটেমিয়া থেকে বস্ত্র, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী রপ্তানি করা হতো। উর ছিল প্রাচীন বিশ্বের একটি আন্তঃআঞ্চলিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

শহরটির সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য নিঃসন্দেহে উরের মহান জিগুরাত। বর্তমানেও এর বিশাল ভিত্তি ও পুনর্গঠিত অংশ দর্শনার্থীদের প্রাচীন নগরের আকার সম্পর্কে ধারণা দেয়। এর সবচেয়ে পরিচিত রূপটি নির্মিত হয় উরের তৃতীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা উর-নাম্মুর সময়ে, খ্রিস্টপূর্ব একবিংশ শতাব্দীর দিকে। এটি চন্দ্রদেবতা নান্নার ধর্মীয় কমপ্লেক্সের অংশ ছিল।

জিগুরাতকে মিশরীয় পিরামিডের সঙ্গে এক করে দেখা ভুল। পিরামিড প্রধানত রাজকীয় সমাধি হিসেবে নির্মিত হলেও মেসোপটেমীয় জিগুরাত ছিল ধর্মীয় স্থাপত্যের উঁচু স্তরবিন্যস্ত ভিত্তি। কাঁচা মাটির ইট দিয়ে এর অভ্যন্তর এবং পোড়ানো ইট দিয়ে বাইরের অংশ নির্মাণ করা হতো। উরের সমতল ভূমির ওপর বিশাল এই কাঠামো দূর থেকে দৃশ্যমান ছিল এবং নগরের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

উরের সমাজে ধর্ম ও অর্থনীতির মধ্যে কঠোর বিভাজন ছিল না। মন্দির প্রতিষ্ঠান জমি, কৃষিপণ্য, শ্রম ও বিভিন্ন সম্পদের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। একই সঙ্গে রাজপ্রাসাদ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানও অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করত। হাজার হাজার কিউনিফর্ম ফলক থেকে শস্য, পশু, জমি, শ্রমিক, বেতন, কর এবং বাণিজ্যের অসংখ্য তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে উরের তৃতীয় রাজবংশ, যাকে সাধারণভাবে উর তৃতীয় যুগ বলা হয়, নগরটির রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়গুলোর একটি। আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের পতন ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার পরে উর-নাম্মু দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি এবং তাঁর উত্তরসূরিরা একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র গড়ে তোলেন, যার প্রভাব সুমেরের বাইরেও বিস্তৃত হয়।

উর-নাম্মুর নামের সঙ্গে যুক্ত আইনসংহিতা বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এটি বর্তমানে পরিচিত প্রাচীনতম আইনসংকলনগুলোর অন্যতম এবং হাম্মুরাবির আইনসংহিতার কয়েক শতাব্দী আগের। এতে বিভিন্ন অপরাধ, ক্ষতিপূরণ এবং সামাজিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের বিধান পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, উরের রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাও অত্যন্ত বিকশিত ছিল।

উর তৃতীয় যুগের প্রশাসনের বিস্তার বোঝা যায় বিপুলসংখ্যক মাটির ফলক থেকে। সরকারি কর্মী কত শস্য পেল, কত পশু কোথায় পাঠানো হলো, কোন শ্রমিক কত দিন কাজ করল—এমন ক্ষুদ্র তথ্যও লিখে রাখা হতো। প্রাচীন উর ছিল নথি, হিসাব এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়ানো এক জটিল নগররাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যিক কেন্দ্র।

তবে এত শক্তিশালী ব্যবস্থার ভেতরেও দুর্বলতা ছিল। বিশাল রাষ্ট্র পরিচালনা করতে বিপুল সম্পদ প্রয়োজন হতো। দূরবর্তী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ, সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ, সেচব্যবস্থা সচল রাখা এবং প্রশাসনিক কর্মীদের সমর্থন করা ছিল ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে মেসোপটেমিয়ার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আমোরীয় জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।

উর তৃতীয় রাজবংশের শেষ শাসক ইব্বি-সিনের সময় পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ইশবি-এররা শেষ পর্যন্ত ইসিনে নিজের স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। খাদ্য সরবরাহ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সংকট উরের অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে।

অবশেষে খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ২০০৪ সালের দিকে এলামীয় বাহিনী উর দখল করে। নগরটি লুণ্ঠিত হয় এবং ইব্বি-সিন বন্দী হন। এই ঘটনা উরের তৃতীয় রাজবংশের সমাপ্তি ঘটায়। সুমেরীয় সাহিত্যে এই বিপর্যয়ের গভীর স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে। বিখ্যাত উরের বিলাপ ধরনের রচনায় শহরের ধ্বংসকে দেবতাদের সিদ্ধান্ত ও মহাবিপর্যয়ের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

কিন্তু এখানেই উরের ইতিহাস শেষ হয়নি। উর ধ্বংস হওয়ার পর আবারও পুনর্গঠিত ও বসতিপূর্ণ হয়েছিল। পরবর্তী ব্যাবিলনীয় যুগসহ দীর্ঘ সময় ধরে শহরটি ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ধরে রাখে। অর্থাৎ ২০০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পতনকে উর নগরীর চূড়ান্ত মৃত্যু বলা যাবে না; সেটি ছিল মূলত একটি শক্তিশালী রাজবংশ ও সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থার পতন।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক কেন্দ্র পরিবর্তিত হতে থাকে। ব্যাবিলনের মতো নতুন শক্তি উত্থিত হয়। তারপরও উরের চন্দ্রদেবতা নান্নার ধর্মীয় কেন্দ্রের গুরুত্ব বজায় ছিল। বিভিন্ন পরবর্তী শাসক উরের মন্দির সংস্কার করেছেন। এমনকি নব্য-ব্যাবিলনীয় যুগেও নগরটির ধর্মীয় স্থাপনায় বড় ধরনের নির্মাণকাজ হয়।

উরের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মধ্যে নদীর গতিপথ পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেসোপটেমিয়ার নগরগুলোর জীবন নদী ও খালের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। ইউফ্রেটিসের প্রধান প্রবাহ কোনো শহর থেকে দূরে সরে গেলে পরিবহন, কৃষি ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। উরের ক্ষেত্রেও পরিবর্তিত জলপথ ধীরে ধীরে নগরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমাতে ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।

আরেকটি সমস্যা ছিল সেচনির্ভর কৃষির দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত চাপ। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার উষ্ণ ও শুষ্ক পরিবেশে সেচের পানি বাষ্পীভূত হয়ে গেলে মাটিতে লবণ জমে থাকতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে মাটির লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। তবে উরের পতনের প্রতিটি পর্যায়কে শুধু লবণাক্ততা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রথম সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষভাগে এসে উরের জনসংখ্যা ও গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নগরটি পরিত্যক্ত হয়। নদীপথের পরিবর্তন, আঞ্চলিক অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক কেন্দ্রের স্থানান্তর মিলিয়ে একসময়ের সমৃদ্ধ শহর ধীরে ধীরে মাটির ঢিবিতে পরিণত হয়। উর কোনো এক রাতে অদৃশ্য হয়নি; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার নগরজীবনের অবসান ঘটেছিল।

তারপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। বাতাস ও ধুলো কাঁচা ইটের ভবনগুলো ক্ষয় করে, বালু ও মাটি প্রাচীন রাস্তা ঢেকে দেয়। স্থানীয়ভাবে ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব পরিচিত থাকলেও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আগে উরের জটিল ইতিহাসের বিশাল অংশ অজানা ছিল। উনিশ ও বিশ শতকে অনুসন্ধান শুরু হয় এবং বিশেষ করে স্যার লিওনার্ড উলির ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকের খনন উরকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।

রাজকীয় সমাধিক্ষেত্রের আবিষ্কার ছিল নাটকীয়। সোনা, লাপিস লাজুলি, অলংকার, বাদ্যযন্ত্র এবং অসাধারণ কারুশিল্পের নিদর্শন দেখিয়ে দেয় যে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের উর কতটা সমৃদ্ধ ছিল। একই সঙ্গে হাজার হাজার সাধারণ প্রশাসনিক দলিল প্রাচীন নগরের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে এমন তথ্য দেয়, যা শুধু রাজপ্রাসাদ বা সমাধি দেখে জানা সম্ভব নয়।

উরকে ঘিরে আরেকটি বহুল পরিচিত বিষয় হলো বাইবেলের “উর অব দ্য ক্যালডিস” এবং আব্রাহামের কাহিনির সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক। আধুনিক দক্ষিণ ইরাকের এই উরকে ঐতিহ্যগতভাবে সেই স্থানের সঙ্গে শনাক্ত করা হয়েছে, তবে বিষয়টি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক আলোচনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত নয়। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক উরের ইতিহাসকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়।

উরের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত কোনো গুপ্তধন বা হারিয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ নয়। বরং বিস্ময়কর হলো একটি শহর কীভাবে প্রায় তিন সহস্রাব্দ ধরে বারবার রাজনৈতিক বিপর্যয়, রাজবংশের পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্যেও টিকে ছিল, তারপর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে পরিত্যক্ত হয়ে গেল। এর ইতিহাস প্রমাণ করে যে নগরের মৃত্যু সবসময় আকস্মিক নয়।

আজ উরের মহান জিগুরাতের সামনে দাঁড়ালে চারপাশের শুষ্ক ভূদৃশ্য দেখে কল্পনা করা কঠিন যে একসময় এখান দিয়ে নৌকা চলত, বাজারে দূরদেশের পণ্য আসত, মন্দিরের গুদামে শস্য জমা হতো এবং লেখকেরা কাদামাটির ফলকে হাজার হাজার মানুষের অর্থনৈতিক জীবন লিপিবদ্ধ করতেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের উদ্ধার করা প্রতিটি ফলক, অলংকার ও ইট সেই হারিয়ে যাওয়া নগরের আরেকটি অংশকে আমাদের সামনে ফিরিয়ে আনে।

উর তাই শুধু একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সুমেরীয় নগর নয়; এটি নগরসভ্যতার স্থায়িত্ব ও ভঙ্গুরতার এক অসাধারণ দলিল। রাজা ও সাম্রাজ্য হারিয়ে গেছে, ইউফ্রেটিস তার পুরোনো পথ বদলেছে, বাজার ও ঘরবাড়ি ধুলোর নিচে চাপা পড়েছে—কিন্তু উরের জিগুরাত এবং মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য নিদর্শন এখনো সাক্ষ্য দেয় যে দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার এই শহর একসময় প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম জীবন্ত, ধনী এবং জটিল মহানগর ছিল।