বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লেক হিলিয়ার গোলাপি কেন? অস্ট্রেলিয়ার অদ্ভুত হ্রদের রঙের রহস্য

লেক হিলিয়ার গোলাপি কেন? অস্ট্রেলিয়ার অদ্ভুত হ্রদের রঙের রহস্য
লেক হিলিয়ারের পরিচিত গোলাপি রং প্রকৃতির পরিবর্তনশীল জীবজগতের প্রকাশ।

নীল সমুদ্রের পাশে গোলাপি হ্রদ—কিন্তু রং কি স্থায়ী?

ওপর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ দ্বীপের মধ্যে কেউ গোলাপি রঙের পানি ঢেলে দিয়েছে। পাশে নীল সমুদ্র, মাঝখানে গাছপালা ও উপকূলের সরু রেখা, আর তার ভেতরে অস্বাভাবিক রঙের একটি হ্রদ। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার লেক হিলিয়ার এমন দৃশ্যের জন্যই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দরকার। হিলিয়ার সব সময় একই উজ্জ্বল গোলাপি থাকে—এ দাবি ঠিক নয়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের বড় বৃষ্টিপাতের পর লবণাক্ততা কমে হ্রদটি পরিচিত উজ্জ্বল রং হারায়। আবার সেই রং ফিরতে পারে, কিন্তু সময় নিশ্চিত নয়।

হ্রদটির অবস্থান কোথায়?

হিলিয়ার রয়েছে রেশের্শ দ্বীপপুঞ্জের মিডল দ্বীপে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলের কাছে। এটি সমুদ্রের গোলাপি অংশ নয়; আলাদা একটি লবণাক্ত জলাশয়।

পুরোনো ছবির উজ্জ্বল রং তাই বাস্তব হলেও সেটিকে বর্তমান অবস্থার নিশ্চয়তা ভাবা যাবে না। হ্রদটির রহস্য বোঝার জন্য সুন্দর ছবির পাশাপাশি এর পরিবর্তনশীল পরিবেশও দেখতে হবে।

গোলাপি রঙের পেছনে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র জীবজগৎ

হিলিয়ারের পরিচিত রঙের প্রধান ব্যাখ্যা হলো পানিতে থাকা রঞ্জক উৎপাদনকারী অণুজীব। শুধু লবণ নিজে গোলাপি বলে পানি এমন দেখায় না। বরং অত্যন্ত লবণাক্ত পরিবেশ নির্দিষ্ট ধরনের অণুজীবের বসবাসের সুযোগ তৈরি করে।

একটি শৈবালই পুরো ব্যাখ্যা নয়

অনেক জনপ্রিয় লেখায় শুধু ডুনালিয়েলা স্যালিনা নামের শৈবালকে দায়ী করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার গোলাপি হ্রদগুলোতে এই শৈবালের গুরুত্ব আছে। তবে হিলিয়ারের ক্ষেত্রে গবেষণা আরও বৈচিত্র্যময় জীবজগতের কথা বলছে।

২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় হ্রদের পানি ও তলানির নমুনার বংশগত উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়াসহ বিভিন্ন অণুজীব এবং রঞ্জক তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। স্যালিনিব্যাক্টারসহ একাধিক রঞ্জকসমৃদ্ধ অণুজীব রঙে অবদান রাখতে পারে বলে গবেষকেরা প্রস্তাব করেন।

রঙের কতটা কার অবদান?

গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও প্রত্যেক অণুজীবের সুনির্দিষ্ট অবদান মেপে সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। জীবের উপস্থিতি শনাক্ত করা এবং কোন রঞ্জক কতটা দৃশ্যমান রং তৈরি করছে—দুটি আলাদা অনুসন্ধান।

তাই “একটি জীবাণুই রহস্যের সম্পূর্ণ সমাধান”—এমন দাবি গবেষণার তুলনায় বেশি নিশ্চিত শোনায়।

অণুজীব কেন রঞ্জক তৈরি করে, আর লবণের ভূমিকা কী?

আমাদের চোখে গোলাপি পানি সুন্দর লাগলেও অণুজীব মানুষের দেখার জন্য রং তৈরি করে না। তাদের রঞ্জক কোষের স্বাভাবিক কাজ ও কঠিন পরিবেশে অভিযোজনের সঙ্গে যুক্ত।

সূর্যালোকের মধ্যে টিকে থাকার ব্যবস্থা

ডুনালিয়েলার মতো কিছু শৈবাল উপযুক্ত অবস্থায় ক্যারোটিনয়েডজাত রঞ্জক জমায়। বিটা-ক্যারোটিন এই গোষ্ঠীর পরিচিত উদাহরণ। তীব্র আলো ও পরিবেশগত চাপের মধ্যে এমন রঞ্জক কোষকে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

শৈবালটি শ্রেণিবিন্যাসে সবুজ শৈবাল হলেও বিশেষ অবস্থায় তার রঞ্জকের কারণে কমলা বা লালচে চেহারা দেখা যেতে পারে। তাই “সবুজ শৈবাল কীভাবে গোলাপি পানি তৈরি করবে”—এই আপাত বিরোধ আসলে রঞ্জকের পরিবর্তন দিয়ে বোঝা যায়।

লবণাক্ততা জীবের প্রতিযোগিতা বদলে দেয়

যে পানিতে সাধারণ অনেক জীব ভালোভাবে বাঁচতে পারে না, সেখানে লবণপ্রিয় জীব সুবিধা পায়। পানির লবণাক্ততা বদলালে কোন জীব বেশি বাড়বে এবং তাদের কার্যকলাপ কেমন হবে, সেটিও বদলাতে পারে।

তবে বেশি লবণ মানেই সব জলাশয় গোলাপি হবে না। উপযুক্ত জীব, পুষ্টি, আলো ও পানির অবস্থার সমন্বয় দরকার। গোলাপি রং একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থার ফল, শুধু রাসায়নিক ঘনত্বের সরল হিসাব নয়।

বৃষ্টি হলে হ্রদের রং বদলে যেতে পারে কেন?

একটি লবণাক্ত হ্রদকে স্থির পানিভর্তি পাত্র হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। বৃষ্টি, বাষ্পীভবন, ভূগর্ভস্থ পানির যোগাযোগ ও অণুজীবের পরিবর্তনের মধ্যে তার পরিবেশ গড়ে ওঠে।

পানি বাড়লে লবণ পাতলা হতে পারে

বৃষ্টির মিঠাপানি যোগ হলে দ্রবীভূত লবণের ঘনত্ব কমতে পারে। এতে আগে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা লবণপ্রিয় অণুজীবের জন্য পরিবেশ বদলে যায়। অন্য জীবের বৃদ্ধি এবং দৃশ্যমান রঙের ভারসাম্যও পাল্টাতে পারে।

হিলিয়ারের উজ্জ্বল রং হারানোর ক্ষেত্রে পর্যটন কর্তৃপক্ষ এই লবণাক্ততা কমে যাওয়ার ব্যাখ্যাই দিয়েছে। এটি দেখায়, দীর্ঘদিন পরিচিত থাকা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যও অপরিবর্তনীয় নয়।

বাষ্পীভবন হলেই কি সঙ্গে সঙ্গে রং ফিরবে?

পানি কমে লবণাক্ততা বাড়লেও জীবজগতের আগের অবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরবে—এ নিশ্চয়তা নেই। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অণুজীবের সংখ্যা বাড়তে সময় লাগতে পারে।

আলো, পানির গভীরতা ও দেখার কোণও দৃশ্যমান রঙের তীব্রতায় প্রভাব ফেলে। ফলে একটি ছবির সঙ্গে অন্য ছবির পার্থক্য শুধু অণুজীবের পরিবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

হিলিয়ার ও ‘পিঙ্ক লেক’ এক নয়: প্রচলিত বিভ্রান্তি

এস্পেরেন্স অঞ্চলে লেক হিলিয়ারের পাশাপাশি পিঙ্ক লেক বা লেক স্পেনসার নামে আরেকটি হ্রদ রয়েছে। নাম ও পুরোনো ছবির মিলের কারণে দুটিকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়।

দুটি আলাদা জলাশয়ের ইতিহাস

হিলিয়ার মিডল দ্বীপে। অন্যদিকে পিঙ্ক লেক মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত। পিঙ্ক লেকও তার পুরোনো গোলাপি রং হারিয়েছে এবং সেটির পানিপ্রবাহ ও লবণাক্ততা নিয়ে পৃথক পুনরুদ্ধার গবেষণা হয়েছে।

একটির গবেষণার ফল সরাসরি অন্যটির ওপর প্রয়োগ করা যায় না। একইভাবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার হাট লেগুনের রঙের ব্যাখ্যা হিলিয়ারের সব প্রশ্নের স্বয়ংক্রিয় উত্তর নয়।

গোলাপি দেখালেই পানির নিরাপত্তা বোঝা যায় না

প্রাকৃতিক রং মানেই পানি পানযোগ্য বা সাঁতারের অনুমতি আছে—এমন নয়। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ত্বক ও চোখে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। সংরক্ষিত স্থানের প্রবেশাধিকারও আলাদা বিষয়।

হ্রদ দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে বর্তমান রং ও অনুমোদিত প্রবেশব্যবস্থা যাচাই করা দরকার। পুরোনো উজ্জ্বল ছবিকে নিশ্চিত অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

লেক হিলিয়ারের আসল বিস্ময় রঙের চেয়েও বড়

একটি হ্রদের রং তার ভেতরের অদৃশ্য জীবজগত সম্পর্কে সূত্র দিতে পারে। কিন্তু শুধু রং দেখে সেখানে কোন প্রজাতি আছে, কতটা সক্রিয় কিংবা পরিবেশ কতটা সুস্থ—সব জানা যায় না। তার জন্য নমুনা, অণুবীক্ষণ ও পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণ দরকার।

জীবন কঠিন পরিবেশেও পথ খুঁজে নেয়

অত্যন্ত লবণাক্ত জলাশয় সাধারণ পুকুরের মতো না হলেও তা প্রাণহীন নয়। বিশেষ অভিযোজনসম্পন্ন অণুজীব সেখানে টিকে থাকে এবং পুরো জলাশয়ের দৃশ্যমান চেহারায় প্রভাব ফেলতে পারে।

হিলিয়ারের গোলাপি অবস্থার ছবি তাই নিছক অদ্ভুত প্রাকৃতিক সাজসজ্জা নয়। সেটি সূর্যালোক, পানি, লবণ এবং জীবের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রকাশ।

এর রং ফিকে হয়ে যাওয়াও একই গল্পের অংশ। প্রকৃতির বিস্ময় সব সময় স্থির থাকে না; পরিবেশ বদলালে পরিচিত দৃশ্যও বদলে যায়। লেক হিলিয়ারকে বোঝার জন্য উজ্জ্বল গোলাপি ছবিটির পাশাপাশি সেই পরিবর্তনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।


আপনার পছন্দ হতে পারে