আকাশ থেকে মাছ বা ব্যাঙ পড়ে কি সত্যিই? প্রাণীবৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
ঝড়ের সঙ্গে প্রাণী পড়ার কিছু বিবরণ বাস্তব হলেও প্রতিটি ঘটনার কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
হঠাৎ ঝড় নামল। বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে বাড়ির উঠান বা রাস্তায় ছোট মাছ পড়তে দেখা গেল। আবার কোনো অঞ্চলে বৃষ্টি থামার পরে মাটিজুড়ে অসংখ্য ব্যাঙ পাওয়া গেল। এমন ঘটনার বিবরণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহল বাড়িয়েছে। কেউ একে অলৌকিক ঘটনা বলেছেন, কেউ সম্পূর্ণ গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। বৈজ্ঞানিক অবস্থানটি একটু আলাদা: প্রবল বাতাসে ছোট প্রাণী স্থানান্তরিত হয়ে নিচে পড়া সম্ভব, কিন্তু প্রাণীবৃষ্টির নামে প্রচলিত প্রতিটি বিবরণ সমানভাবে প্রমাণিত নয়।
প্রাণীবৃষ্টি বলতে সাধারণত এমন ঘটনাকে বোঝানো হয়, যেখানে মাছ, ব্যাঙ বা অন্য ছোট প্রাণী ওপর থেকে পড়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এটি সাধারণ বৃষ্টির মতো কোনো প্রক্রিয়া নয়। প্রাণী বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে না, মেঘের মধ্যে জন্মায়ও না। সত্যিই ওপর থেকে পড়ে থাকলে আগে কোনোভাবে তাদের ওপরে উঠতে হয়েছে। সুতরাং ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে হবে প্রাণীর উৎস, পরিবহনের শক্তি এবং নিচে পড়ার পরিস্থিতি অনুসন্ধান করে।
সবচেয়ে পরিচিত সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো প্রবল ঘূর্ণিবায়ু ও জলঘূর্ণি। জলাশয়ের ওপর তৈরি বা জলাশয় অতিক্রম করা ঘূর্ণায়মান বায়ুস্তম্ভের সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ থাকতে পারে। যথেষ্ট শক্তিশালী প্রবাহ ছোট মাছ বা অন্য হালকা প্রাণীকে পানি থেকে তুলে নিতে পারে। পরে বাতাসের সঙ্গে কিছু দূর গিয়ে সেগুলো পড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া সংস্থাও ঝড়ের মধ্যে ছোট মাছ বা ব্যাঙ স্থানান্তরের এই সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করেছে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে ঘূর্ণি ছিল কি না, সেটি যাচাই করা দরকার।
এখানে একটি ভুল ছবি এড়ানো জরুরি। জলঘূর্ণি মানেই সমুদ্র থেকে মেঘ পর্যন্ত উঠে যাওয়া বিশাল পানিভর্তি নল নয়। দৃশ্যমান সরু মেঘস্তম্ভের বড় অংশ তৈরি হয় ঘূর্ণির মধ্যে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে; পানির পৃষ্ঠে ছিটা ও ফেনার বলয়ও থাকতে পারে। বায়ুপ্রবাহই মূল চালিকাশক্তি। প্রাণী ওপরে উঠতে পারে বলে ধরে নিলেও পুরো জলাশয় বা তার সব জীব একসঙ্গে আকাশে চলে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সব জলঘূর্ণির শক্তিও একরকম নয়। কিছু জলঘূর্ণি প্রবল বজ্রঝড়ের সঙ্গে যুক্ত এবং স্থলভাগের টর্নেডোর মতো বৈশিষ্ট্য বহন করে। অন্য কিছু তুলনামূলক শান্ত আবহাওয়ায় জলপৃষ্ঠের কাছ থেকে গড়ে ওঠে, সাধারণত ধীরে চলে এবং স্থলে পৌঁছে দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। তাই জলঘূর্ণির একটি ছবি দেখেই দূরের মাছ পড়ার ঘটনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তার সময়, অবস্থান, শক্তি ও গতিপথের সঙ্গে ঘটনাটির মিল থাকতে হবে।
একটি প্রাণী বাতাসে উঠবে কি না, তা শুধু তার ওজনের ওপর নির্ভর করে না। শরীরের আকার, বাতাসের সামনে উন্মুক্ত ক্ষেত্রফল, অবস্থান এবং বায়ুপ্রবাহের গতি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট প্রাণী সরানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু কত উঁচুতে উঠবে বা কত দূরে যাবে, তার সর্বজনীন হিসাব নেই। একই কারণে বহুল প্রচারিত কয়েকশ কিলোমিটার ভেসে যাওয়ার গল্পও প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। সম্ভাব্য প্রক্রিয়া জানা এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব প্রমাণ করা আলাদা বিষয়।
প্রাণীবৃষ্টির ইতিহাসে একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৪৭ সালের ২৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার মার্কসভিলে। জীববিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বাজকভ সেখানে মাছ পড়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নথিবদ্ধ করেন। তিনি বিস্তৃত এলাকায় স্থানীয় স্বাদুপানির বিভিন্ন মাছ পাওয়ার কথা জানান। আশপাশে ঘূর্ণিবায়ুর বিবরণ থাকায় প্রবল ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু মাছ জলাশয় থেকে ওঠা, আকাশে পরিবাহিত হওয়া এবং পড়া—পুরো ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ রেকর্ড সেখানে ছিল না।
এই সীমাবদ্ধতাই বিষয়টির কেন্দ্রীয় সমস্যা। ঝড়ের পরে রাস্তায় মাছ পাওয়ার ছবি মাছের উপস্থিতি প্রমাণ করে, আকাশ থেকে পড়ার প্রক্রিয়া নয়। আবার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী মাছ পড়তে দেখলে তা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলেও প্রাণীগুলো কোথা থেকে এসেছে, সে প্রশ্ন থেকে যায়। বৃষ্টির সঙ্গে একই সময়ে ঘটেছে বলেই বৃষ্টি তার একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তও নিশ্চিত নয়। ভালো তদন্তে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী অনুমান আলাদা রাখতে হয়।
ব্যাঙের ক্ষেত্রে মাটিতে হঠাৎ উপস্থিতির বিকল্প ব্যাখ্যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টিতে আর্দ্রতা বাড়লে ব্যাঙ আশ্রয় থেকে বেরিয়ে চলাফেরা ও প্রজননে সক্রিয় হতে পারে। একই জলাশয় থেকে অনেক ছোট ব্যাঙ কাছাকাছি সময়ে স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়লেও অস্বাভাবিক ভিড় দেখা যায়। মানুষ আগে তাদের না দেখে থাকলে মনে করতে পারেন, প্রাণীগুলো বৃষ্টির সঙ্গে এসেছে। কিন্তু ওপর থেকে পড়তে দেখা না গেলে শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে ব্যাঙবৃষ্টি বলা যাবে না।
মাছের ক্ষেত্রেও বন্যার পানি, ডুবে যাওয়া নালা কিংবা কাছের জলাশয়ের উপচে পড়া প্রবাহ বিবেচনা করতে হয়। অল্প গভীর পানিতে মাছ ছড়িয়ে পড়ার পরে পানি সরে গেলে শুকনো মনে হওয়া জায়গায় তাদের পাওয়া যেতে পারে। এই ব্যাখ্যা অবশ্য প্রতিটি ঘটনায় প্রযোজ্য নয়—বিশেষত উঁচু ছাদ বা পানির নাগালের বাইরের স্থানে মাছ পড়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকলে। মূল কথা হলো, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি না দেখে সব ঘটনায় একই উত্তর বসানো যায় না।
পাখিও কোনো কোনো ঘটনার বিকল্প ব্যাখ্যা হতে পারে। মাছখেকো পাখি উড়ন্ত অবস্থায় শিকার ফেলে দিতে বা বিরক্ত হলে গিলে রাখা খাবার উগরে দিতে পারে। ২০২১ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সারকানায় মাছ পড়ার আলোচিত ঘটনায় পরবর্তী অনুসন্ধানকারীরা পানকৌড়িজাতীয় পাখির এমন আচরণকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে প্রস্তাব করেন। মাছের অবস্থা ও আশপাশে পাখির উপস্থিতি তাঁদের যুক্তির অংশ ছিল। এটি সব মাছবৃষ্টির ব্যাখ্যা নয়; বরং একই রকম দৃশ্যের পেছনে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে, তার উদাহরণ।
কখনো অনেক প্রাণী জীবিত পাওয়া যায় বলে ঘটনাটি আরও অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু বেঁচে থাকা সম্ভব কি না, তা প্রাণীর ধরন, বাতাসে থাকার সময়, আঘাত, আর্দ্রতা এবং কোথায় পড়েছে—এসবের ওপর নির্ভর করে। জীবিত মাছ পাওয়া মানেই সেটি অনেকক্ষণ মেঘের মধ্যে ছিল না। আবার মৃত প্রাণী পাওয়া মানেই তা ওপর থেকে পড়েনি, এমনও নয়। প্রাণীর অবস্থার তথ্য ব্যাখ্যাকে সাহায্য করে, কিন্তু একা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না।
বিশ্বাসযোগ্য তদন্তে তাই ঘটনার সময়, স্থান, প্রাণীর প্রজাতি, আকার, বিস্তারের ধরন এবং আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। কাছাকাছি জলাশয়, বন্যার চিহ্ন, পাখির উপস্থিতি ও নিরবচ্ছিন্ন দৃশ্যরেকর্ডও গুরুত্বপূর্ণ। একই প্রজাতির ছোট মাছ পাওয়া কোনো নির্দিষ্ট ঝাঁক থেকে আসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বিজ্ঞান ঘটনার অদ্ভুত চেহারার চেয়ে পরস্পর মিলে যাওয়া প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
তাহলে আকাশ থেকে মাছ বা ব্যাঙ পড়া কি সত্যি? এমন ঘটনার ঐতিহাসিক বিবরণ ও কিছু প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ রয়েছে, আর শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহে ছোট প্রাণী বহন হওয়া শারীরিকভাবে সম্ভব। তবে সব প্রতিবেদনকে নিশ্চিত প্রাণীবৃষ্টি বলা বা প্রতিটির কারণ জলঘূর্ণি বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়। এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক আকর্ষণ সেখানেই—একটি অস্বাভাবিক দৃশ্যকে বোঝার জন্য আবহাওয়া, প্রাণীর আচরণ ও স্থানীয় পরিবেশের তথ্য একসঙ্গে পরীক্ষা করতে হয়।
ডোজেস প্যালেস: ভেনিসের শাসক, গোপন আদালত ও ব্রিজ অব সাইজের অন্ধকার ইতিহাস
স্ফোর্ৎসা ক্যাসেল: মিলানের ডিউক, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও ইতালীয় রেনেসাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র
কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো: রোমান সম্রাটের সমাধি কীভাবে পোপদের দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হলো?
কাস্তেল দেল মন্তে: ইতালির রহস্যময় অষ্টভুজ দুর্গ কেন আজও ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করে?
রয়্যাল আলকাসার অব সেভিল: ইসলামি স্থাপত্য থেকে স্প্যানিশ রাজপ্রাসাদে রূপান্তরের ইতিহাস
আলকাসার অব সেগোভিয়া: স্পেনের রাজাদের রূপকথার দুর্গ ও রাজকীয় ক্ষমতার ইতিহাস