মরুভূমিতে বরফ পড়তে পারে? সাহারায় তুষারপাতের কারণ ও বিস্ময়কর ঘটনা
সাহারার উত্তর প্রান্তে কমলা বালির ওপর শীতের সাদা বিস্ময়।
মরুভূমি মানেই সারা বছর প্রচণ্ড গরম নয়
কমলা বালিয়াড়ির ওপর সাদা তুষার—দৃশ্যটি প্রথম দেখলে ছবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। সাহারা বলতে আমরা সাধারণত উত্তপ্ত বালি, পানির অভাব ও রৌদ্রদগ্ধ আকাশ বুঝি। অথচ এর উত্তর প্রান্তে নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় সত্যিই তুষারপাত হয়। ঘটনাটি বিরল, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের বাইরে নয়।
মূল বিষয় হলো, মরুভূমির পরিচয় প্রধানত শুষ্কতা দিয়ে নির্ধারিত হয়, শুধু তাপমাত্রা দিয়ে নয়। সাধারণভাবে বছরে খুব কম বৃষ্টিপাত বা তুষারপাত পাওয়া অঞ্চল মরুভূমির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। পৃথিবীতে উষ্ণ মরুভূমির পাশাপাশি শীতল মরুভূমিও রয়েছে।
সাহারার সব জায়গার আবহাওয়া এক নয়
বিশাল সাহারায় বালিয়াড়ি ছাড়াও পাথুরে সমভূমি, মালভূমি ও পর্বত রয়েছে। কেন্দ্রের অতিশুষ্ক নিচু অঞ্চল এবং উত্তর প্রান্তের উঁচু ভূখণ্ডের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সুযোগ আলাদা।
গ্রীষ্মের উত্তাপ দিয়ে শীতের সম্ভাব্য আবহাওয়া বোঝা যায় না। কোনো স্থানে গরমকালে প্রচণ্ড তাপমাত্রা উঠলেও শীতকালে ঠান্ডা বায়ুর প্রবাহে তুষারপাতের উপযোগী অবস্থা তৈরি হতে পারে।
সাহারার কোন অঞ্চলে তুষারপাতের ছবি দেখা যায়?
সাহারায় তুষারপাতের আলোচিত ছবিগুলোর অনেকটাই আলজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আইন সেফরা ও আশপাশের এলাকা থেকে এসেছে। শহরটি সাহারার উত্তর প্রান্ত এবং অ্যাটলাস পর্বতমালার মধ্যবর্তী অবস্থানের জন্য মরুভূমির প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
উচ্চতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আইন সেফরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার মিটার উঁচুতে অবস্থিত। আশপাশে আরও উঁচু ভূখণ্ড রয়েছে। সাধারণভাবে উচ্চতার সঙ্গে বায়ুর তাপমাত্রা কমার প্রবণতা থাকায় এসব স্থানে শীতের ঠান্ডা তুলনামূলক তীব্র হতে পারে।
ফলে নিচু এলাকায় বৃষ্টি হলেও কাছের উঁচু ঢাল বা বালিয়াড়িতে তুষার পড়তে পারে। একই এলাকার ছবিতে কোথাও সাদা আস্তরণ, কোথাও খোলা বালি দেখা যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
পাহাড়ের তুষার আর মরুর বালিতে তুষার এক অভিজ্ঞতা নয়
উত্তর আফ্রিকার উচ্চ অ্যাটলাসে তুষারপাত পরিচিত ঘটনা। কিন্তু নিচের সাহারীয় অ্যাটলাস ও তার পাশের শুষ্ক বালিয়াড়িতে তুষারের উপস্থিতি তুলনামূলক বিরল।
তাই “সাহারা বরফে ঢেকে গেছে” বললে ঘটনাটির বিস্তার সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিক অঞ্চলের অংশবিশেষ সাদা হয়েছিল; পুরো মরুভূমি নয়।
শুষ্ক মরুভূমিতে তুষার তৈরির উপাদান আসে কোথা থেকে?
তুষারপাতের জন্য শুধু ঠান্ডা যথেষ্ট নয়। বায়ুতে জলীয়বাষ্প, মেঘ তৈরির উপযোগী অবস্থা এবং যথেষ্ট নিম্ন তাপমাত্রা একসঙ্গে দরকার। সাহারায় এই সমন্বয় সাধারণত অনুপস্থিত থাকে।
ঠান্ডার সঙ্গে আর্দ্রতার মিলন
শীতকালে বায়ুমণ্ডলের প্রবাহ বদলে গেলে আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আর্দ্র বায়ু উত্তর সাহারার দিকে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ওপরের বায়ুমণ্ডলে শীতল বায়ু দক্ষিণে নেমে এলে তুষারপাতের সুযোগ তৈরি হয়।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বায়ু ওপরে উঠলে তা ঠান্ডা হয়। পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে মেঘ তৈরি হয় এবং উপযুক্ত তাপমাত্রায় বরফকণা গড়ে ওঠে। এসব কণা নিচে নামার পথে পুরোপুরি গলে না গেলে তুষার হিসেবে মাটিতে পৌঁছায়।
রাতে ঠান্ডা হলেই কেন প্রতিদিন তুষার পড়ে না?
মেঘহীন মরুভূমিতে ভূমি রাতে দ্রুত তাপ হারাতে পারে। কিন্তু পরিষ্কার আকাশ ও শুষ্ক বাতাসে তুষার তৈরির মেঘই নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ ঠান্ডা রাত এবং তুষারপাত একই বিষয় নয়।
মাটির কাছের তাপমাত্রা সামান্য শূন্যের ওপরে থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তুষার মাটিতে পৌঁছাতে পারে। তবে জমে থাকা ও কতক্ষণ টিকে থাকার জন্য ভূমির তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৬ ও ২০১৮ সালের ঘটনায় কী দেখা গিয়েছিল?
২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর আইন সেফরা অঞ্চলে তুষারপাত বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কমলা বালির ওপর পাতলা সাদা আস্তরণের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ভূমি পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহও উত্তর আফ্রিকার ওই অঞ্চলে তুষারের উপস্থিতি ধারণ করে।
২০১৬ সালের পাতলা সাদা আবরণ
স্থানীয় আলোকচিত্রীদের ছবিতে বালিয়াড়ি ও উদ্ভিদের ওপর হালকা তুষার দেখা যায়। বেশির ভাগ তুষার পরদিনের মধ্যে চলে যায়। এই ঘটনাকে ঘিরে বহু সংবাদে কয়েক দশক পর তুষারপাতের কথা বলা হয়েছিল।
তবে একটি শহরের নথিভুক্ত ঘটনার বিরতি থেকে পুরো সাহারার তুষারপাতের ইতিহাস নির্ধারণ করা যায় না। অঞ্চল, পর্যবেক্ষণের সুযোগ ও “উল্লেখযোগ্য তুষারপাত” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৮ সালের উপগ্রহচিত্র
২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি উত্তর-পশ্চিম আলজেরিয়ার সাহারা প্রান্তে আবার তুষার পড়ে। ৮ জানুয়ারি ল্যান্ডস্যাট ও সেন্টিনেল উপগ্রহ সাদা হয়ে যাওয়া ভূদৃশ্য ধারণ করে।
কিছু উঁচু স্থানে কয়েক দশ সেন্টিমিটার তুষার জমার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু পুরো এলাকায় একই পুরুত্ব ছিল না। প্রতিবেদনভেদে পরিমাণও আলাদা ছিল, তাই একটি সর্বোচ্চ সংখ্যাকে সব বালিয়াড়ির অবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে অধিকাংশ তুষার দ্রুত গলে যায়।
সাদা আস্তরণ দেখলেই কি সেটি তুষারপাত?
বালির ওপর সাদা রেখা দেখা গেলেই আকাশ থেকে তুষার পড়েছে—এ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত নয়। তুষার, তুষারসদৃশ হিমকণা এবং শিলাবৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য আছে।
তুষার ও তুষারাবরণ
তুষার মেঘে তৈরি বরফকণা হিসেবে নিচে পড়ে। অন্যদিকে খুব ঠান্ডা পৃষ্ঠে বায়ুর জলীয়বাষ্প সরাসরি বরফকণা হিসেবে জমে সাদা আবরণ তৈরি করতে পারে। এতে আকাশ থেকে তুষারপাত হওয়া জরুরি নয়।
শিলাবৃষ্টিতে বজ্রমেঘের মধ্যে তৈরি তুলনামূলক শক্ত বরফখণ্ড মাটিতে পড়ে। সেটিও ভূমিকে সাদা করতে পারে, কিন্তু তার গঠনপ্রক্রিয়া আলাদা।
ঘটনার প্রমাণ কীভাবে বোঝা যায়?
ছবির মূল প্রকাশকাল, সুনির্দিষ্ট স্থান, স্থানীয় আবহাওয়ার তথ্য এবং উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখতে হয়। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে প্রকাশিত হলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
উপগ্রহের বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তথ্যও কাজে লাগে। কিছু প্রক্রিয়াজাত ছবিতে তুষার সাদা না দেখিয়ে নীলচে বা সবুজাভ রঙে দেখানো হয়, যাতে অন্য ভূবৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা করা সহজ হয়। সেটি ছবির ভুল রং নয়, তথ্য দেখানোর পদ্ধতি।
সাহারায় তুষারপাত কি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ?
একটি তুষারপাত দিয়ে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে বলা যায় না। আবার প্রতিটি বিরল তুষারপাতকে সরাসরি মানুষের কারণে হওয়া উষ্ণায়নের ফল বলাও যথাযথ নয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কারণ নির্ধারণে আলাদা বিশ্লেষণ দরকার।
আবহাওয়া ও জলবায়ুর সময়সীমা আলাদা
আবহাওয়া হলো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো স্থানের অবস্থা। জলবায়ু বুঝতে দীর্ঘ সময়ের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ধারা দেখা হয়। বৈশ্বিক গড় উষ্ণতা বাড়লেও কোনো অঞ্চলে সাময়িক ঠান্ডা প্রবাহ আসতে পারে।
সাহারায় তুষারপাত বাড়ছে কি না জানতে একই মানের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য প্রয়োজন। সামাজিক মাধ্যমে বেশি ছবি দেখা যাওয়া মানেই ঘটনা বেড়েছে নয়; ছবি তোলা ও প্রচারের সুযোগও বেড়েছে।
সাহারার তুষারপাতের বিস্ময় তাই অসম্ভব কিছু ঘটায় নয়। বিস্ময়টি হলো, শুষ্ক মরুর কিনারায় ঠান্ডা, আর্দ্রতা ও উচ্চতা অল্প সময়ের জন্য এমনভাবে মিলে যায়, যা পরিচিত ভূদৃশ্যকে সম্পূর্ণ নতুন চেহারা দেয়। তারপর সূর্যের তাপে সাদা আবরণ সরে গেলে আবার দেখা যায় সেই কমলা বালিয়াড়ি।
ডোজেস প্যালেস: ভেনিসের শাসক, গোপন আদালত ও ব্রিজ অব সাইজের অন্ধকার ইতিহাস
স্ফোর্ৎসা ক্যাসেল: মিলানের ডিউক, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও ইতালীয় রেনেসাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র
কাস্তেল সান্ত’আঞ্জেলো: রোমান সম্রাটের সমাধি কীভাবে পোপদের দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হলো?
কাস্তেল দেল মন্তে: ইতালির রহস্যময় অষ্টভুজ দুর্গ কেন আজও ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করে?
রয়্যাল আলকাসার অব সেভিল: ইসলামি স্থাপত্য থেকে স্প্যানিশ রাজপ্রাসাদে রূপান্তরের ইতিহাস
আলকাসার অব সেগোভিয়া: স্পেনের রাজাদের রূপকথার দুর্গ ও রাজকীয় ক্ষমতার ইতিহাস