বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রুয়ান্ডার ১০০ দিনের গণহত্যা: তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ

সিরিজ: রুয়ান্ডার গণহত্যা: ১৯৯৪

রুয়ান্ডার ১০০ দিনের গণহত্যা: তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ
একশ দিনে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অসংখ্য পরিবার ও জনপদ

যেসব গির্জা, বিদ্যালয় ও সরকারি ভবনে মানুষ নিরাপত্তার আশায় জড়ো হয়েছিল, এপ্রিলের পরবর্তী দিনগুলোতে সেগুলোর অনেকই হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাড়িঘরে হামলা এবং রাস্তায় পরিচয় যাচাইয়ের মুখে পরিবারগুলো ভেবেছিল, একসঙ্গে থাকলে হয়তো রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু হত্যাকারীরা সেই সমাবেশকেই কাজে লাগায়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত রুয়ান্ডার গণহত্যা ছিল নিরস্ত্র তুতসি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার সংগঠিত অভিযান, যার পাশাপাশি হত্যা করা হয় উগ্রপন্থীদের বিরোধী বহু হুতুকেও।

এই সময়কে সাধারণভাবে ‘১০০ দিনের গণহত্যা’ বলা হয়। নিহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন; বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে তা পাঁচ লাখ থেকে দশ লাখ বা তারও বেশি। বহুল ব্যবহৃত অনুমান প্রায় আট লাখ। অধিকাংশ নিহত ছিলেন তুতসি; তাঁদের সঙ্গে মধ্যপন্থী হুতু, তুতসিদের রক্ষাকারী ব্যক্তি এবং অন্যরাও প্রাণ হারান। সংখ্যার পার্থক্য সত্ত্বেও মূল ঐতিহাসিক সত্য স্পষ্ট: অল্প সময়ের মধ্যে একটি জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

৭ এপ্রিলের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর উগ্রপন্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা আরও জোরদার করে। পরবর্তী কয়েক দিনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন জ্যাঁ কামবান্দা এবং প্রেসিডেন্ট হন থেওদোর সিনদিকুবো। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, সামরিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের একটি অংশ হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব বা সহযোগিতা দেয়। কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সমর্থন স্থানীয় অপরাধীদের উৎসাহিত করে। ফলে হত্যার অভিযান শুধু বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র দলের তৎপরতা থাকেনি; রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও সম্পদও এতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

রুয়ান্ডার প্রশাসন ছিল সুসংগঠিত ও স্তরবিন্যস্ত। প্রিফেক্ট, কমিউনের প্রধান এবং নিচের স্তরের কর্মকর্তারা স্থানীয় জনগণের জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন। এই কাঠামো দিয়ে নির্দেশ পৌঁছানো, সভা ডাকা, মানুষ জড়ো করা এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। বহু এলাকায় কর্মকর্তারা তুতসিদের সমবেত হতে নির্দেশ দেন বা নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। পরে সেই মানুষদের ওপর হামলা হয়। যে প্রশাসনের কাজ নাগরিককে রক্ষা করা, তার একটি বড় অংশ নাগরিক শনাক্ত ও নিধনের ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

সেনাবাহিনী, জাতীয় পুলিশ এবং ইন্টারাহামওয়ে ও ইমপুজামুগাম্বির মতো মিলিশিয়ার ভূমিকা এক ছিল না, কিন্তু বহু হামলায় তারা পরস্পরকে সহায়তা করে। বড় আশ্রয়স্থলে প্রতিরোধ ভাঙতে সৈন্য ও পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র এবং গ্রেনেড ব্যবহার করত। এরপর মিলিশিয়া ও অন্য অংশগ্রহণকারীরা বেঁচে থাকা মানুষদের ওপর আক্রমণ চালাত। শুধু কৃষিযন্ত্র হাতে উন্মত্ত জনতার ছবি দিয়ে এই ইতিহাস বোঝা যায় না। সামরিক দক্ষতা, অস্ত্র, পরিবহন এবং রাজনৈতিক নির্দেশনা হত্যাযজ্ঞের ব্যাপকতা বাড়িয়েছিল।

সড়ক অবরোধ ছিল এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহরের মোড়, গ্রামীণ রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ পথ আটকে পরিচয়পত্র পরীক্ষা করা হতো। তুতসি পরিচয় পাওয়া গেলে মানুষ হামলার শিকার হতেন। পরিচয়পত্র না থাকলেও স্থানীয় পরিচিতি, অভিযোগ কিংবা চেহারা সম্পর্কে বর্ণবাদী ধারণার ভিত্তিতে কাউকে তুতসি বলে চিহ্নিত করা হতো। ফলে ভুল পরিচয়েও মানুষ নিহত হন। পালিয়ে যাওয়া, খাবার সংগ্রহ কিংবা আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়ার মতো সাধারণ কাজও জীবনঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

কিগালির একোল টেকনিক অফিসিয়েল বা ইটিও বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের পরিণতি এই বিপদের একটি উদাহরণ। সেখানে বেলজীয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতিতে বহু মানুষ নিরাপত্তা খুঁজেছিলেন। ১১ এপ্রিল শান্তিরক্ষীরা চলে যাওয়ার পর আশ্রয়প্রার্থীরা সুরক্ষাহীন হয়ে পড়েন। তাঁদের অনেককে নিকটবর্তী ন্যাঞ্জা এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা দেখায়, হত্যাকারীরা কোথায় মানুষ জড়ো হয়েছে তা জানত এবং সুরক্ষা সরে যাওয়ার সুযোগ ব্যবহার করত। আশ্রয়স্থলের ভবন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো না।

পূর্ব রুয়ান্ডার ন্যারুবুয়ে গির্জায় এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আশ্রয় নেওয়া তুতসিদের ওপর কয়েক দিন ধরে হামলা চলে। পশ্চিমের কিবুয়ে অঞ্চলেও গির্জা ও অন্য সমাবেশস্থলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে। এসব হামলায় স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আশ্রয় নেওয়া মানুষদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিরাও ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি হত্যাকারীদের থামায়নি, কারণ লক্ষ্য ছিল কেবল সম্ভাব্য যোদ্ধাদের হত্যা করা নয়; পরিবারসহ তুতসি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ধ্বংস করা।

তবে ভুক্তভোগীরা সর্বত্র নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। পশ্চিম রুয়ান্ডার বিসেসেরোর পাহাড়ে তুতসিরা দলবদ্ধ হয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। সীমিত অস্ত্র, পাথর এবং ভূখণ্ডের সুবিধা ব্যবহার করে তাঁরা কিছু হামলা প্রতিহত করেন। কিন্তু সংগঠিত সশস্ত্র অভিযানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন ছিল। বিসেসেরোর ইতিহাসে তাই প্রতিরোধ ও বিপুল প্রাণহানি পাশাপাশি আছে। বেঁচে থাকার সংগ্রামও এই ইতিহাসের অংশ; নিহত মানুষদের কেবল অসহায় সংখ্যায় নামিয়ে আনা তাঁদের অভিজ্ঞতাকে অসম্পূর্ণ করে।

নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ছিল গণহত্যার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির একটি ক্ষেত্র। ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব এবং নির্যাতনের মাধ্যমে ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবার ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়। অনেক বেঁচে যাওয়া নারী পরে শারীরিক অসুস্থতা, এইচআইভি সংক্রমণ, মানসিক আঘাত ও সামাজিক বর্জনের মুখে পড়েন। এসব অপরাধকে যুদ্ধের অনিয়ন্ত্রিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলা যায় না। রুয়ান্ডার বিচারপ্রক্রিয়া পরবর্তী সময়ে দেখাবে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতাও গণহত্যা সংঘটনের উপায় হতে পারে।

শিশুদের হত্যাও এই অভিযানের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে। হত্যাকারীরা শুধু বর্তমানের রাজনৈতিক বিরোধীকে সরাচ্ছিল না; একটি জনগোষ্ঠীর পরবর্তী প্রজন্মকেও আক্রমণ করছিল। অসংখ্য শিশু মা-বাবা ও ভাইবোন হারায়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় অথবা লুকিয়ে বেঁচে থাকে। যারা জীবিত ছিল, তাদের অনেকের কাছে নিরাপত্তার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় কথা না বলা, পরিচয় গোপন রাখা এবং অপরিচিত কারও সাহায্যের ওপর নির্ভর করা। হত্যাযজ্ঞ শেষ হলেও তাদের শৈশবের ক্ষতি শেষ হয়নি।

মধ্যপন্থী হুতুদের ওপর আক্রমণ বুঝতেও একই রাজনৈতিক কাঠামো দেখতে হয়। কেউ বিরোধী দলের কর্মী হওয়ায়, কেউ তুতসি আত্মীয় বা প্রতিবেশীকে রক্ষা করায়, আবার কেউ হত্যায় অংশ নিতে অস্বীকার করায় নিশানা হন। ‘মধ্যপন্থী’ পরিচয়টি এখানে বিস্তৃত; নিহত সবাই একই মতাদর্শের ছিলেন না। তুতসিদের জাতিগত পরিচয়ের কারণে ধ্বংস করার অভিযান এবং বিরোধী হুতুদের রাজনৈতিক দমন সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন ছিল না। এই পার্থক্য গণহত্যার লক্ষ্য ও পদ্ধতি বুঝতে জরুরি।

সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নানা পথে সংগঠিত হয়। বিদ্বেষের পাশাপাশি লুটপাটের সুযোগ, জমি বা গবাদিপশু দখলের আকাঙ্ক্ষা, দলীয় আনুগত্য এবং শাস্তির ভয় কাজ করেছিল। কোথাও অংশ না নিলে বিশ্বাসঘাতক বলা হতো; কোথাও সরাসরি হুমকি দেওয়া হতো। কিন্তু সবাই একই আচরণ করেননি। কিছু হুতু পরিবার তুতসি প্রতিবেশীদের লুকিয়ে রাখে, খাবার দেয় বা পালাতে সাহায্য করে। ধরা পড়লে নিজেদের প্রাণ যেতে পারে জেনেও তাঁরা সাহায্য করেছিলেন।

হত্যাযজ্ঞের গতি অঞ্চলভেদে আলাদা ছিল। কোথাও স্থানীয় নেতৃত্বের বাধায় তা বিলম্বিত হয়; পরে কর্মকর্তা বদল, রাজনৈতিক চাপ ও বাইরের হামলাকারীদের উপস্থিতিতে সহিংসতা বাড়ে। এপ্রিলের বড় সমাবেশস্থলে হত্যার পর মে ও জুনে অনেক এলাকায় লুকিয়ে থাকা মানুষদের খোঁজা চলতে থাকে। বন, জলাভূমি, পাহাড় ও পরিত্যক্ত বাড়িও নিরাপদ ছিল না। এই দীর্ঘ অনুসন্ধান প্রমাণ করে, ঘটনাটি কয়েক দিনের আবেগের বিস্ফোরণ ছিল না; বেঁচে থাকা মানুষদেরও নির্মূল করার চেষ্টা অব্যাহত ছিল।

আরপিএফের সামরিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে জুলাইয়ে গণহত্যাকারী সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। ৪ জুলাই কিগালি দখল এবং পরবর্তী অগ্রগতিতে সংগঠিত হত্যাযজ্ঞের অবসান ঘটে। কিন্তু তখন অসংখ্য পরিবার নিশ্চিহ্ন, জনপদ বিপর্যস্ত এবং বেঁচে যাওয়া মানুষ গভীর আঘাতে বিধ্বস্ত। এই একশ দিনের ইতিহাস রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রচারণা ও স্থানীয় সহযোগিতার সম্মিলিত বিপদ দেখায়। একই সঙ্গে সামনে আসে আরেকটি প্রশ্ন: এত প্রকাশ্য হত্যাযজ্ঞ চলার পরও আন্তর্জাতিক শক্তি ও জাতিসংঘ কেন কার্যকরভাবে মানুষকে রক্ষা করতে পারল না?