বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রুয়ান্ডার গণহত্যার পটভূমি: ঔপনিবেশিক বিভাজন থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধ

সিরিজ: রুয়ান্ডার গণহত্যা: ১৯৯৪

রুয়ান্ডার গণহত্যার পটভূমি: ঔপনিবেশিক বিভাজন থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধ
পরিচয়ের বিভাজন থেকে গণহত্যার পথে রুয়ান্ডা

১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যা বুঝতে হলে হত্যাকাণ্ড শুরুর মুহূর্ত থেকে অনেক পেছনে তাকাতে হয়। আফ্রিকার এই পাহাড়ঘেরা দেশে প্রতিবেশী কেন প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার উত্তর কোনো জন্মগত বিদ্বেষে নেই। ঔপনিবেশিক বৈষম্য, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপরিচালনায় বঞ্চনা, বারবার সংঘটিত সহিংসতা এবং ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতি মিলিয়ে বিপর্যয়ের পটভূমি তৈরি হয়েছিল। হুতু ও তুতসি পরিচয় আগে থেকেই ছিল; কিন্তু সেই পরিচয়কে অধিকার, আনুগত্য এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রশ্নে পরিণত করা হয়েছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়।

রুয়ান্ডার প্রধান জনগোষ্ঠী হুতু, তুতসি এবং সংখ্যায় ছোট ত্বা সম্প্রদায় একই ভূখণ্ডে বসবাস করত। হুতু ও তুতসিরা সাধারণভাবে কিনিয়ারুয়ান্ডা ভাষায় কথা বলত; তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও দৈনন্দিন সংস্কৃতিতে ব্যাপক মিল ছিল। আন্তবিবাহও ঘটত। ঐতিহাসিকভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে হুতু এবং গবাদিপশু পালনের সঙ্গে তুতসি পরিচয়ের সম্পর্ক থাকলেও বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। সব তুতসি ধনী কিংবা সব হুতু দরিদ্র ছিল না। সম্পদ ও পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক পরিচয়ের অবস্থানও বদলাতে পারত।

তবে ঔপনিবেশিক আগমনের আগের রুয়ান্ডাকে সম্পূর্ণ সমতাভিত্তিক সমাজ ভাবাও ভুল। উনিশ শতকে রাজতন্ত্রের সম্প্রসারণের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও শ্রম আদায়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। রাজদরবার এবং উচ্চপদে তুতসি অভিজাতদের প্রভাব ছিল প্রবল, যদিও সাধারণ তুতসিদের সবাই সেই ক্ষমতার সুবিধাভোগী ছিল না। ভূমি, গবাদিপশু ও শ্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বহু কৃষকের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। ইউরোপীয় শাসন এই বৈষম্য নতুন করে আবিষ্কার করেনি; বরং বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্ককে বর্ণবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে আরও কঠোর করেছিল।

উনিশ শতকের শেষভাগে রুয়ান্ডা জার্মান পূর্ব আফ্রিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। জার্মানরা সীমিত জনবল দিয়ে শাসনের জন্য রাজতন্ত্র ও স্থানীয় প্রধানদের ওপর নির্ভর করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৬ সালে বেলজীয় বাহিনী অঞ্চলটি দখল করে। পরবর্তী সময়ে রুয়ান্ডা–উরুন্ডি বেলজিয়ামের অধীনে আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেটভুক্ত ভূখণ্ড হয়। বেলজীয় প্রশাসন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে কর, বাধ্যতামূলক শ্রম ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব আরও সুসংহত করে। ফলে স্থানীয় শাসকের নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শক্তি পরস্পরকে জোরদার করতে থাকে।

এই শাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর একটি ছিল তথাকথিত হামিটিক তত্ত্ব। ইউরোপীয় কিছু প্রশাসক, মিশনারি ও লেখক তুতসিদের বাইরের অঞ্চল থেকে আসা অপেক্ষাকৃত ‘উন্নত’ জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তাদের শারীরিক গঠন নিয়ে মনগড়া শ্রেণিবিন্যাস করা হতো। এর কোনো গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। কিন্তু এই ধারণার সাহায্যে তুতসি অভিজাতদের প্রশাসনিক প্রাধান্যকে স্বাভাবিক বলে দেখানো হয়। অন্যদিকে হুতুদের শাসিত জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সামাজিক পার্থক্য তখন ক্রমে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব ও হীনতার ভাষা পেতে থাকে।

বিদ্যালয়ে প্রবেশ, প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ এবং সরকারি পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে তুতসিদের একটি অংশ অগ্রাধিকার পায়। বেলজীয় সংস্কারে বহু হুতু প্রধান ক্ষমতা হারান; কেন্দ্রীভূত প্রশাসনে তুতসি প্রধানদের প্রভাব বাড়ে। এতে সুবিধাভোগী অভিজাত এবং সাধারণ মানুষের পার্থক্য আড়াল হয়ে যায়। একজন দরিদ্র তুতসিকেও প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। একইভাবে বঞ্চিত হুতু কৃষকের ক্ষোভকে নির্দিষ্ট শাসকের বদলে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ জন্ম নেয়।

১৯৩০-এর দশকে পরিচয়পত্রে হুতু, তুতসি ও ত্বা পরিচয় নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা এই বিভাজনকে স্থায়ী প্রশাসনিক রূপ দেয়। আগে যেখানে পরিচয়ের সঙ্গে সামাজিক অবস্থানের কিছু পরিবর্তনশীলতা ছিল, সেখানে রাষ্ট্র মানুষকে নির্দিষ্ট ঘরে আটকে দেয়। পরিবার থেকে সন্তানদের পরিচয়ও সেই শ্রেণিবিভাগ অনুসরণ করতে থাকে। মানুষের পরিচয় তখন ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি সরকারি নথিতে নির্ধারিত অধিকার ও বঞ্চনার ভিত্তি হয়ে ওঠে। কয়েক দশক পরে এই নথিভুক্ত পরিচয়ই হত্যাকারীদের হাতে মানুষ বাছাইয়ের ভয়াবহ উপকরণে পরিণত হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতার দাবি বাড়তে থাকলে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলায়। শিক্ষিত হুতু নেতারা প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষার সুযোগ এবং তুতসি অভিজাতদের প্রাধান্যের অবসান দাবি করেন। ১৯৫৭ সালের ‘বাহুতু ম্যানিফেস্টো’ এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বেলজীয় প্রশাসন ও ক্যাথলিক চার্চের প্রভাবশালী অংশও ক্রমে হুতু নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবি সামনে এলেও, সেই দাবির একটি ধারা তুতসিদের সামগ্রিকভাবে বহিরাগত ও অবৈধ সুবিধাভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।

১৯৫৯ সালে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেয়। তুতসিদের বাড়িঘরে হামলা, হত্যাকাণ্ড এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। পরবর্তী কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক তুতসি প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়। এই পরিবর্তন ‘সামাজিক বিপ্লব’ নামে পরিচিত হলেও তার অভিজ্ঞতা সবার কাছে এক ছিল না। বহু হুতুর কাছে এটি পুরোনো আধিপত্য থেকে মুক্তির সূচনা; বহু তুতসির কাছে ঘরবাড়ি, নিরাপত্তা ও স্বদেশ হারানোর ইতিহাস। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয় এবং ১৯৬২ সালের ১ জুলাই রুয়ান্ডা স্বাধীনতা লাভ করে।

স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট গ্রেগোয়ার কায়িবান্দার শাসনে হুতু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও সমান নাগরিকত্বের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তুতসিরা শিক্ষা, চাকরি ও রাজনীতিতে বৈষম্যের মুখে পড়ে। নির্বাসিত কিছু গোষ্ঠীর সশস্ত্র অনুপ্রবেশের পর দেশের ভেতরের সাধারণ তুতসিদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা হয়। বিশেষত ১৯৬৩ সালের শেষভাগের সহিংসতা দেখিয়ে দেয়, সীমান্তের সামরিক হুমকিকে কীভাবে নিরস্ত্র নাগরিকদের শাস্তি দেওয়ার অজুহাত করা সম্ভব। এতে নতুন মানুষ দেশ ছাড়ে, আর নির্বাসিত পরিবারগুলোর প্রত্যাবর্তনের আশা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

১৯৭৩ সালে জুভেনাল হাবিয়ারিমানা সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিলেও একদলীয় শাসন এবং জাতিগত কোটাভিত্তিক বঞ্চনা বজায় থাকে। ক্ষমতার কেন্দ্র ক্রমে উত্তরাঞ্চলীয় অনুগত গোষ্ঠী ও প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মহলে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে রাজনৈতিক অসন্তোষ কেবল হুতু–তুতসি সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; হুতু সমাজের মধ্যেও আঞ্চলিক ও ক্ষমতাগত বিরোধ ছিল। আশির দশকের শেষদিকে কফির আন্তর্জাতিক মূল্যপতন, অর্থনৈতিক চাপ ও জমির সংকট সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তোলে।

অন্যদিকে উগান্ডায় বেড়ে ওঠা রুয়ান্ডার শরণার্থী সন্তানদের একাংশ সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। নির্বাসনে জন্মালেও তারা নিজেদের রুয়ান্ডার নাগরিক বলে মনে করত। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে কার্যকর সমাধান মিলছিল না; রুয়ান্ডার সরকার জনসংখ্যার চাপ ও জমির অভাবের যুক্তি তুলত। এই পটভূমিতে ১৯৮৭ সালে রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট বা আরপিএফ গঠিত হয়। সংগঠনটিতে তুতসি শরণার্থীদের প্রাধান্য থাকলেও তার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন; কিছু হুতুও এতে যুক্ত ছিলেন।

১৯৯০ সালের ১ অক্টোবর আরপিএফ উগান্ডা থেকে উত্তর রুয়ান্ডায় আক্রমণ শুরু করে। প্রাথমিক অভিযানে ফ্রেড রুইগেমা নিহত হওয়ার পর পল কাগামে বিদ্রোহী বাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন। ফ্রান্সসহ বাইরের মিত্রদের সহায়তা হাবিয়ারিমানার সরকারকে সামরিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, কৃষিকাজ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। আরপিএফের অভিযান ও নির্যাতনও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। কিন্তু বিদ্রোহী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দায় দেশের সব তুতসি নাগরিকের ওপর চাপানো ছিল সম্পূর্ণ অন্যায়।

সরকারি দমননীতিতে হাজার হাজার মানুষ সন্দেহভাজন সহযোগী হিসেবে আটক হন, যাদের অনেকেই তুতসি। উগ্রপন্থী প্রচার দেশীয় তুতসিদের ‘ভেতরের শত্রু’ হিসেবে দেখাতে থাকে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ‘কাঙ্গুরা’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথাকথিত ‘হুতু দশ নির্দেশনা’ সামাজিক সম্পর্ক ও পেশাগত জীবনেও বিচ্ছিন্নতার আহ্বান জানায়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়কে প্রতিবেশীর প্রতি অবিশ্বাসে বদলে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিরোধী, সশস্ত্র বিদ্রোহী এবং নিরস্ত্র তুতসি নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য মুছে ফেলাই ছিল এই প্রচারের বিপজ্জনক কৌশল।

তবু গণহত্যা অনিবার্য ছিল না। বহুদলীয় রাজনীতি, সংলাপ এবং শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ ছিল। কিন্তু যুদ্ধের চাপের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির সম্ভাবনাকে উগ্রপন্থীরা নিজেদের অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। ঔপনিবেশিক শ্রেণিবিভাগ, স্বাধীনতার পর নিপীড়ন এবং গৃহযুদ্ধের আতঙ্ক তখন একই রাজনৈতিক ভাষায় মিলছিল। পরবর্তী পর্যায়ে এই ভাষা সংবাদপত্র, রেডিও ও দলীয় মিলিশিয়ার মাধ্যমে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে—আর শান্তির আলোচনা চলার পাশেই প্রস্তুত হতে থাকবে সাধারণ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার সংগঠিত রাজনীতি।