বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা: গর্বাচেভের সংস্কার কীভাবে সোভিয়েত ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছিল?

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা: গর্বাচেভের সংস্কার কীভাবে সোভিয়েত ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছিল?
সোভিয়েত ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া গর্বাচেভের সংস্কার

১৯৮৫ সালের ১১ মার্চ মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, যা বাইরে থেকে পরাশক্তি হলেও ভেতরে ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছিল। পারমাণবিক অস্ত্র, বিশাল সেনাবাহিনী এবং পূর্ব ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক প্রভাব সোভিয়েত শক্তির দৃশ্যমান পরিচয় ছিল। কিন্তু এর আড়ালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গিয়েছিল, উৎপাদনব্যবস্থা অদক্ষ হয়ে পড়েছিল, কৃষি খাত নিয়মিত ঘাটতির মুখে ছিল এবং সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াত। গর্বাচেভের উদ্দেশ্য সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ধ্বংস করা ছিল না; তিনি সংস্কারের মাধ্যমে একে আধুনিক, কার্যকর ও টেকসই করতে চেয়েছিলেন।

গর্বাচেভের আগে লিওনিদ ব্রেজনেভের দীর্ঘ শাসনকালকে অনেকে স্থবিরতার যুগ হিসেবে দেখেন। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন নির্ধারণ করত কোন কারখানা কী উৎপাদন করবে, কত পরিমাণে করবে এবং কোথায় সরবরাহ করবে। উৎপাদনের মান বা ক্রেতার চাহিদার পরিবর্তে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে কারখানাগুলো অনেক সময় নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করত। প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত থাকায় প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা বাড়তে থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি, তথ্য গোপন এবং দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে।

সোভিয়েত সমাজের রাজনৈতিক অবস্থাও ছিল সংকুচিত। কমিউনিস্ট পার্টিই রাষ্ট্র, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করত। নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, সরকারের সমালোচনা বিপজ্জনক হতে পারত এবং ইতিহাসের বহু অধ্যায় সরকারি ব্যাখ্যার বাইরে আলোচনা করা যেত না। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন রাষ্ট্রের সাফল্য তুলে ধরলেও ব্যর্থতা, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা ও সামাজিক সমস্যার খবর প্রায়ই গোপন রাখত। ফলে নেতৃত্ব বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেত না এবং সাধারণ মানুষের অসন্তোষ প্রকাশের বৈধ পথও সংকুচিত ছিল।

গর্বাচেভ শুরুতে উসকোরেনিয়ে বা অর্থনৈতিক গতিবৃদ্ধির কথা বলেন। তাঁর ধারণা ছিল, কঠোর শৃঙ্খলা, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবস্থাকে সচল করা সম্ভব। তিনি মদ্যপান নিয়ন্ত্রণে অভিযানও চালান, কারণ কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সঙ্গে অতিরিক্ত মদ্যপানের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মদ বিক্রি কমে যাওয়ায় রাষ্ট্র বিপুল কর ও রাজস্ব হারায়, আর অবৈধ মদ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। শিগগিরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা যাবে না।

এই উপলব্ধি থেকেই সামনে আসে পেরেস্ত্রোইকা, যার অর্থ পুনর্গঠন। এর লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত অর্থনীতি ও প্রশাসনের কার্যপদ্ধতি পরিবর্তন করা। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমিত স্বাধীনতা দেওয়া হয়, যাতে তারা উৎপাদন, ব্যয় ও আয়ের কিছু সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে। ১৯৮৭ সালের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আইনের মাধ্যমে কারখানাগুলোকে কেন্দ্রীয় নির্দেশের বাইরে কিছু পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের সমবায় আইন ব্যক্তিমালিকানাধীন রেস্তোরাঁ, দোকান, সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ছোট উৎপাদনমূলক উদ্যোগ পরিচালনার পথ খুলে দেয়।

এসব পরিবর্তন সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পিত অর্থনীতির মধ্যে বাজারের কিছু উপাদান প্রবেশ করালেও পূর্ণাঙ্গ বাজারব্যবস্থা সৃষ্টি করেনি। রাষ্ট্র মূল্য নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখে, সরবরাহব্যবস্থাও কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের হাতে থেকে যায়। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুনাফা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে আংশিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এই অসম্পূর্ণ রূপান্তরে পুরোনো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, কিন্তু নতুন ব্যবস্থার কার্যকর নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয় না। পেরেস্ত্রোইকা পরিকল্পিত অর্থনীতির শৃঙ্খল শিথিল করেছিল, কিন্তু তার জায়গায় দ্রুত একটি স্থিতিশীল বিকল্প দাঁড় করাতে পারেনি।

ফলে অনেক পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। নিয়ন্ত্রিত সরকারি দামে পণ্য বিক্রি করার চেয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বেশি লাভজনক বাজার বা সমবায় প্রতিষ্ঠানের দিকে পণ্য সরিয়ে দেয়। দোকানে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি আরও দৃশ্যমান হয়। মানুষের হাতে অর্থ থাকলেও কেনার মতো পণ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন সমবায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত অর্থ উপার্জন করায় সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভও বাড়ে। অনেকের চোখে তারা উদ্যোক্তা নয়, বরং পুরোনো ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগানো সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত হয়।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি গর্বাচেভ চালু করেন গ্লাসনস্ত, যার অর্থ উন্মুক্ততা বা প্রকাশ্যতা। শুরুতে এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ভুল, দুর্নীতি ও অদক্ষতা প্রকাশ করে পেরেস্ত্রোইকাকে সফল করা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সংবাদমাধ্যম, সাহিত্য, ইতিহাসচর্চা ও জনপরিসরে অভাবনীয় স্বাধীনতা তৈরি করে। পত্রিকা ও টেলিভিশনে সামাজিক সমস্যা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিবেশদূষণ এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আগে নিষিদ্ধ বা সীমিত বহু বই প্রকাশিত হয় এবং নির্বাসিত ও নিপীড়িত লেখকদের রচনা পাঠকের কাছে ফিরে আসে।

১৯৮৬ সালের এপ্রিলের চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা গ্লাসনস্তের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত নির্মমভাবে সামনে আনে। দুর্ঘটনার পর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ প্রথমে তথ্য গোপন ও বিপদের মাত্রা ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। বিকিরণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শনাক্ত হওয়ার পর সত্য আড়াল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের গোপনীয়তার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গর্বাচেভ পরে তথ্য প্রকাশের পরিসর বাড়ান। চেরনোবিল শুধু প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ছিল না; এটি সোভিয়েত প্রশাসনের গোপনীয়তা, অবহেলা ও জবাবদিহির অভাবের প্রতীক হয়ে ওঠে।

গ্লাসনস্তের ফলে স্তালিনের শাসনামলের গণগ্রেপ্তার, বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির, নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু হয়। যেসব পরিবার কয়েক দশক ধরে নিপীড়িত স্বজনদের কথা নীরবে বহন করেছিল, তারা রাষ্ট্রের সামনে সত্য ও পুনর্বাসনের দাবি জানাতে পারে। নিকিতা ক্রুশ্চেভ স্তালিনের কিছু অপরাধ প্রকাশ করলেও সেই প্রক্রিয়া সীমিত ছিল; গর্বাচেভের সময় আলোচনা অনেক বিস্তৃত হয়। এতে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সরকারি ইতিহাস এবং কমিউনিস্ট পার্টির নৈতিক কর্তৃত্ব গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে।

গর্বাচেভ বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু অর্থনৈতিক নির্দেশ বদলে পেরেস্ত্রোইকা সফল হবে না; আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে রাজনৈতিক সংস্কারও দরকার। ১৯৮৮ সালে নতুন কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটিজ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে বহু আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সব নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ না হলেও সোভিয়েত ইতিহাসে এটি ছিল বড় পরিবর্তন। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অধিবেশনে প্রতিনিধিরা মন্ত্রী, কর্মকর্তা এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। কোটি কোটি মানুষ প্রথমবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রকৃত বিতর্ক প্রত্যক্ষ করে।

সংস্কারপন্থী নেতা বরিস ইয়েলৎসিন এই নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। একসময় গর্বাচেভের সহযোগী ইয়েলৎসিন দ্রুত ও গভীর সংস্কারের দাবি তুলে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন। অন্যদিকে রক্ষণশীল কমিউনিস্ট নেতারা মনে করতেন, গর্বাচেভ অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তন এনে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল করছেন। ফলে তিনি দুই দিক থেকে চাপের মুখে পড়েন—সংস্কারপন্থীদের কাছে পরিবর্তন ছিল খুব ধীর, আর রক্ষণশীলদের কাছে তা ছিল বিপজ্জনকভাবে দ্রুত।

১৯৯০ সালে সোভিয়েত সংবিধানের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়, যা কমিউনিস্ট পার্টিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানকারী একমাত্র শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতির আইনি পথ খুলে যায়। একই বছর গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রপতি পদ তাঁর কর্তৃত্ব স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করতে পারেনি, কারণ পার্টির পুরোনো নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ছিল এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল।

গ্লাসনস্তের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ফল দেখা যায় সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোতে। বাল্টিক অঞ্চলের এস্তোনিয়া, লাতভিয়া ও লিথুয়ানিয়ায় মানুষ স্বাধীন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তোলে। তারা স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৪০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ভূখণ্ড দখল করেছিল। ১৯৮৯ সালের আগস্টে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ তিনটি বাল্টিক প্রজাতন্ত্রজুড়ে হাত ধরে দীর্ঘ মানবশৃঙ্খল তৈরি করে। বাল্টিক ওয়ে নামে পরিচিত এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি জাতীয় স্বাধীনতার শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

ককেশাসেও জাতীয়তাবাদ ও ভূখণ্ডগত বিরোধ মাথাচাড়া দেয়। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে নাগোরনো-কারাবাখ নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে তিবিলিসিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর সোভিয়েত বাহিনীর হামলা এবং ১৯৯১ সালে ভিলনিয়ুসে স্বাধীনতাপন্থীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইউক্রেন, জর্জিয়া, মলদোভা এবং মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলোতেও ভাষা, ইতিহাস, পরিবেশ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মস্কো যে উন্মুক্ততা সীমিত সংস্কারের সহায়ক হিসেবে শুরু করেছিল, সেটিই প্রজাতন্ত্রগুলোকে বহুদিনের ক্ষোভ সংগঠিত করার সুযোগ দেয়।

গর্বাচেভের পররাষ্ট্রনীতিও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা এগিয়ে নেন, আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার করেন এবং পূর্ব ইউরোপের মিত্র সরকারগুলোকে সামরিক শক্তি দিয়ে রক্ষা করার পুরোনো নীতি থেকে সরে আসেন। এর ফলে ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ায় কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটে। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়লেও সোভিয়েত সেনাবাহিনী তা ঠেকাতে এগিয়ে যায়নি। এই অবস্থান ইউরোপে স্নায়ুযুদ্ধের বিভাজন শেষ করতে সহায়তা করলেও সোভিয়েত রক্ষণশীলদের কাছে তা সাম্রাজ্যিক প্রভাব বিসর্জনের সমান ছিল।

১৯৯১ সালের আগস্টে রক্ষণশীল কমিউনিস্ট কর্মকর্তা, কেজিবি নেতা ও সামরিক ব্যক্তিদের একটি অংশ গর্বাচেভকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে। ক্রিমিয়ায় অবকাশযাপনরত গর্বাচেভকে গৃহবন্দী করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু মস্কোতে বরিস ইয়েলৎসিনের নেতৃত্বে জনসাধারণের প্রতিরোধ এবং সেনাবাহিনীর একাংশের অনাগ্রহের কারণে অভ্যুত্থান তিন দিনের মধ্যে ব্যর্থ হয়। গর্বাচেভ ক্ষমতায় ফিরে এলেও প্রকৃত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দ্রুত ইয়েলৎসিন ও সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর হাতে চলে যায়। একই বছরের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে।

গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা সোভিয়েত পতন ঘটানোর জন্য পরিকল্পিত ছিল না। গর্বাচেভ বিশ্বাস করতেন, সমাজতন্ত্রকে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করা সম্ভব। কিন্তু তাঁর সংস্কার পুরোনো ব্যবস্থার স্তম্ভগুলো—ভয়, সেন্সরশিপ, একদলীয় কর্তৃত্ব ও কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—একসঙ্গে দুর্বল করে দেয়। অথচ কার্যকর বাজার, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বা নতুন ফেডারেল সম্পর্ক সময়মতো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি সোভিয়েত ব্যবস্থাকে বাঁচাতে দরজা খুলেছিলেন, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে দমিয়ে রাখা ইতিহাস, অর্থনৈতিক ক্ষোভ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্বাধীনতার দাবি।

গর্বাচেভের উত্তরাধিকার তাই গভীরভাবে দ্বিমুখী। অনেক রুশ নাগরিক তাঁকে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রের দুর্বলতা এবং একটি পরাশক্তির পতনের জন্য দায়ী মনে করেন। অন্যদিকে বিশ্বের বহু মানুষের কাছে তিনি সেন্সরশিপ শিথিল করা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, পূর্ব ইউরোপে রক্তক্ষয়ী সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানো এবং স্নায়ুযুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য স্মরণীয়। শেষ পর্যন্ত গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা প্রমাণ করেছিল, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা যখন সত্য প্রকাশ ও স্বাধীন বিতর্কের সুযোগ দেয়, তখন পরিবর্তনকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা কঠিন। গর্বাচেভ সংস্কার শুরু করেছিলেন সোভিয়েত রাষ্ট্রকে নবজীবন দিতে; কিন্তু সেই সংস্কারই এমন এক আমূল রূপান্তরের পথ খুলে দেয়, যার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসান।