বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আলহামরা ফরমান ১৪৯২: ইহুদি বিতাড়ন, ধর্মান্তর ও নির্বাসন

সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার

আলহামরা ফরমান ১৪৯২: ইহুদি বিতাড়ন, ধর্মান্তর ও নির্বাসন
১৪৯২ সালের আলহামরা ফরমান: বিশ্বাস রক্ষা করতে জন্মভূমি ছাড়ার ইতিহাস।

সন্দেহ যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা পেল, তখন নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের সংকট শুধু ইনকুইজিশনের অভিযুক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। তোরকেমাদার নেতৃত্বে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদের বিশ্বাস যাচাই করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে ইহুদি ধর্ম পালনকারীদের উপস্থিতিকেই সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করল। যুক্তি দাঁড়াল, ইহুদি প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে কনভার্সোরা পুরোনো ধর্মে ফিরে যেতে পারেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে বসবাসের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো। ১৪৯২ সালের আলহামরা ফরমান ধর্মীয় তদন্তের ইতিহাসকে এভাবেই গণবিতাড়নের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে।

১৪৯২ সালের জানুয়ারিতে গ্রানাডার মুসলিম রাজ্যের পতন ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার সামরিক সাফল্যের শীর্ষবিন্দু ছিল। কিন্তু গ্রানাডা বিজয় এবং ইহুদি বিতাড়ন একই সিদ্ধান্তের দুটি স্বয়ংক্রিয় ধাপ ছিল না। মুসলিম অধিবাসীদের জন্য আত্মসমর্পণ চুক্তিতে তখন ধর্মীয় অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। অন্যদিকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের নীতি গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের বিদ্বেষ, ধর্মান্তর ও ইনকুইজিশনের কার্যক্রমের পটভূমিতে। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সব প্রশ্নে রাজদম্পতি তখন অভিন্ন ব্যবস্থা নেননি। ইহুদিদের সম্পর্কে তাঁদের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বুঝতে ফরমানের ঘোষিত যুক্তি এবং বাস্তব শর্ত আলাদা করে দেখতে হয়।

১৪৯২ সালের ৩১ মার্চ গ্রানাডায় বহিষ্কারের আদেশ জারি হয়। আলহামরা প্রাসাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি আলহামরা ফরমান নামে পরিচিত। কাস্তিল ও আরাগনের জন্য সংশ্লিষ্ট আদেশের পৃথক পাঠ ছিল। নির্দেশের লক্ষ্য ছিলেন ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষ; আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারীরা কেবল ইহুদি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে এই বহিষ্কারের আওতায় পড়েননি। তবে তাঁদের ওপর ইনকুইজিশনের নজরদারি বহাল ছিল। ফলে বিতাড়ন ও ইনকুইজিশনকে এক প্রতিষ্ঠান ভাবা ভুল, যদিও তাদের যুক্তি এবং প্রভাব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল।

ফরমানের বক্তব্য ছিল, ইহুদিদের সংস্পর্শে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরা ইহুদি আচার, খাদ্যবিধি ও বিশ্বাসের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ দাবি করে, পৃথক বসতি এবং কিছু অঞ্চল থেকে আগের বহিষ্কার সমস্যার সমাধান করেনি। তাই এবার ব্যাপক অপসারণ প্রয়োজন। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের প্রশ্ন ছিল না। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, দরিদ্র ও ধনী—সবার ওপর সামষ্টিক সিদ্ধান্ত চাপানো হয়। কনভার্সোদের কথিত ধর্মীয় বিচ্যুতির জন্য অবাপ্তাইজিত ইহুদিদের সমষ্টিগতভাবে দায়ী করাই ছিল ফরমানের মৌলিক অন্যায়।

দেশত্যাগের মূল সময়সীমা নির্ধারিত হয় জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত। কিন্তু বিভিন্ন শহরে আদেশ পৌঁছানো ও ঘোষণার সময় আলাদা হওয়ায় বাস্তবে প্রস্তুতির সুযোগ আরও কমে যায়। নির্ধারিত সময়ের পর ইহুদি হিসেবে থেকে যাওয়া বা ফিরে আসার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের হুমকি ছিল। আশ্রয় দিয়ে আদেশ অমান্যে সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধেও শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়। ফলে রাজকীয় ফরমানটি শুধু নির্বাসিতদের ওপর নয়, তাঁদের প্রতিবেশী ও সম্ভাব্য আশ্রয়দাতাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিতে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে থাকা সম্ভব ছিল। তাই সিদ্ধান্তটি কার্যত দাঁড়ায় ধর্মান্তর অথবা জন্মভূমি ত্যাগ। কিন্তু এটিকে স্বাধীন ধর্মীয় পছন্দ বলা যায় না। পরিবার, ভাষা, পেশা ও বাড়ি রক্ষা করার জন্য মানুষকে বিশ্বাস পরিবর্তনের চাপ দেওয়া হয়েছিল। কেউ আন্তরিকভাবে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেন, কেউ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাপ্তিস্ম নেন, আবার কেউ দেশত্যাগ করেন। একই পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্তও এক ছিল না। ফলে ধর্মান্তর শুধু পরিচয় বদলায়নি; কখনো পরিবারকে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন সামাজিক অবস্থানে ভাগ করে দিয়েছিল।

ধর্মান্তরকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভাবারও সুযোগ ছিল না। বাপ্তিস্ম নেওয়ার পর ব্যক্তি খ্রিস্টীয় ধর্মদ্রোহের তদন্তের আওতায় আসতেন। পুরোনো ধর্মীয় অভ্যাস বজায় রাখার অভিযোগ উঠলে ইনকুইজিশন তাঁকে বিচার করতে পারত। অর্থাৎ বহিষ্কার এড়াতে যে পথ খোলা ছিল, সেই পথ নতুন বিচারিক ঝুঁকি তৈরি করত। পূর্বপুরুষের প্রথা, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা খাবারের অভ্যাস সন্দেহের কারণ হয়ে উঠতে পারত। দেশত্যাগ ও ধর্মান্তরের মধ্যে বেছে নেওয়ার কঠিন বাস্তবতা তাই ফরমানের পরও শেষ হয়নি।

সম্পত্তির প্রশ্নে ফরমানের ভাষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল। আদেশে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত রাজকীয় সুরক্ষার আশ্বাস এবং সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাই সব ইহুদির সম্পত্তি শুরুতেই বিনা ক্ষতিপূরণে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল—এমন দাবি সঠিক নয়। কিন্তু সময়সীমার মধ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য মানুষ বাজারে সমান দরকষাকষির অবস্থানে ছিলেন না। ক্রেতারা জানতেন, বাড়ি, দোকান বা জমির মালিককে দ্রুত বিক্রি করতেই হবে। এর ফলে বহু পরিবার সম্পদের প্রকৃত মূল্য উদ্ধার করতে পারেনি।

স্থাবর সম্পত্তির পাশাপাশি পাওনা ঋণ, বাণিজ্যিক অংশীদারি ও বন্ধক নিষ্পত্তিও জটিল হয়ে ওঠে। কারও অন্যের কাছে পাওনা ছিল, কারও নিজের দেনা ছিল। দেশত্যাগের আগে এসব হিসাব মেটানো কঠিন; সুযোগসন্ধানীরা বিলম্ব বা বিরোধের সুবিধা নিতে পারত। সিনাগগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাম্প্রদায়িক সম্পত্তির ব্যবস্থাপনাও সংকটে পড়ে। ক্ষতিটি তাই শুধু কয়েকটি বাড়ির মালিকানা বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বহু প্রজন্মে গড়ে ওঠা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পারস্পরিক সহায়তার ব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক একসঙ্গে ভেঙে যায়।

দেশের বাইরে সম্পদ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা ছিল। সোনা, রুপা ও মুদ্রা বহনে প্রচলিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়; অনুমোদিত পণ্য বা অন্য ব্যবস্থায় সম্পদ স্থানান্তরের চেষ্টা করতে হতো। ফলে সম্পত্তি বিক্রি করলেই তার মূল্য সহজে বহন করা সম্ভব ছিল না। বিনিময়, পরিবহন, দালালি ও যাত্রার ব্যয় হাতে থাকা সম্পদ আরও কমিয়ে দিত। দরিদ্রদের সংকট ছিল আরও তীব্র: তাঁদের বিক্রি করার মতো সম্পদ কম, অথচ সীমান্ত পার হওয়া বা জাহাজে ওঠার খরচ এড়ানোর উপায় ছিল না।

নির্বাসিতদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ছিল প্রতিবেশী পর্তুগাল; কেউ নাভারায় যান, কেউ সমুদ্রপথে উত্তর আফ্রিকা বা ইতালীয় অঞ্চলে পৌঁছান। পরে অনেকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসতি স্থাপন করেন। সব নির্বাসিত সরাসরি একই গন্তব্যে যাননি, এবং আশ্রয় পাওয়াও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। যাত্রাপথে অতিরিক্ত ভাড়া, প্রতারণা, রোগ ও খাদ্যাভাবের ঝুঁকি ছিল। নতুন অঞ্চলের ভাষা, কাজ ও প্রশাসনিক নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দায়ও তাঁদেরই বহন করতে হয়।

পর্তুগালে আশ্রয় নেওয়া অনেকের দুর্ভোগ কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন রূপ নেয়। ১৪৯৬ সালে রাজা প্রথম মানুয়েল বহিষ্কারের আদেশ দেন; ১৪৯৭ সালে ব্যাপক জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মাধ্যমে বহু ইহুদিকে খ্রিস্টান পরিচয়ে আবদ্ধ করা হয়। স্পেন থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলোর একাংশ আবার বিশ্বাস ও নিরাপত্তার সংকটে পড়ে। অন্যদিকে কিছু নির্বাসিত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে স্পেনে ফিরে আসেন। সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার সুযোগসংক্রান্ত ব্যবস্থা থাকলেও ফিরে আসা মানে আগের জীবন নির্বিঘ্নে ফিরে পাওয়া ছিল না; বিক্রি হয়ে যাওয়া সম্পদ ও নতুন মালিকানার বাস্তবতা রয়ে গিয়েছিল।

ঠিক কতজন দেশত্যাগ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। আগের শতকের গণধর্মান্তর, অসম্পূর্ণ হিসাব এবং নির্বাসনের পর প্রত্যাবর্তন সংখ্যা নির্ধারণকে কঠিন করেছে। তাই একটি নির্দিষ্ট বড় সংখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বহু হাজার মানুষ দেশছাড়া হন এবং স্পেনের প্রকাশ্য ইহুদি সাম্প্রদায়িক জীবন ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়। দীর্ঘমেয়াদে নির্বাসিতরা উত্তর আফ্রিকা, ইতালি ও উসমানীয় নগরগুলোতে নতুন সমাজ গড়েন। তাঁদের বংশধরদের মধ্যে স্পেনীয় ভাষাভিত্তিক ইহুদি-স্প্যানিশ বা লাদিনো ঐতিহ্য বিকশিত ও সংরক্ষিত হয়।

সেফার্দি পরিচয় নির্বাসনের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম সৃষ্টি হয়নি; হিব্রু ঐতিহ্যে আইবেরিয়ার সঙ্গে যুক্ত সেফারাদ নাম আগে থেকেই ব্যবহৃত হতো। তবে ১৪৯২ সালের বিচ্ছেদ সেই পরিচয়ের স্মৃতিকে গভীরভাবে বদলে দেয়। মানুষ নতুন দেশে ধর্মীয় শিক্ষা, বাণিজ্য ও সাহিত্যচর্চা গড়ে তুললেও হারানো জন্মভূমির অভিজ্ঞতা বহন করেন। আলহামরা ফরমান বিশ্বাসের অভিযোগকে বসবাসের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অস্ত্রে পরিণত করেছিল। আর যাঁরা থেকে গেলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি দাঁড়াল আরও ব্যক্তিগতভাবে: বাপ্তিস্ম নেওয়ার পরও রাষ্ট্র যদি আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ করে, তবে দৈনন্দিন জীবনের কোন আচরণ তাঁদের নিরাপদ রাখবে?