বাস্তিল দুর্গের পতন: ১৪ জুলাই ১৭৮৯ কীভাবে ফরাসি বিপ্লব বদলে দিল
সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব
বারুদের সন্ধানে শুরু হওয়া অভিযান বদলে দিল রাজক্ষমতার ভবিষ্যৎ।
জাতীয় পরিষদ সংবিধান রচনার অধিকার দাবি করেছিল, কিন্তু রাজদরবার সৈন্য ব্যবহার করলে সেই অধিকার রক্ষা করবে কে—এই আশঙ্কা জুলাইয়ের শুরুতে ক্রমেই বাস্তব হয়ে উঠছিল। প্যারিস ও ভার্সাইয়ের আশপাশে সেনাসমাবেশ চলছিল; বিদেশি রেজিমেন্টের উপস্থিতি সন্দেহ আরও বাড়ায়। পরিষদের প্রতিনিধিরা রাজক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করতে চাইছিলেন, আর রাজধানীর মানুষ ভাবছিলেন তাঁদের ওপর দমন অভিযান আসন্ন কি না। ১৪ জুলাইয়ের বাস্তিল আক্রমণ এই সাংবিধানিক সংকটকে সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
প্যারিসের অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক ভয়ের সঙ্গে খাদ্যসংকটও কাজ করছিল। রুটির উচ্চমূল্য শ্রমজীবী পরিবারগুলোর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। কাজের অনিশ্চয়তা, বাজারে উত্তেজনা এবং শস্য সরবরাহ নিয়ে সন্দেহ মানুষের ক্ষোভ বাড়াচ্ছিল। রাজদরবারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে গুজব দ্রুত ছড়াত। সেনারা পরিষদ ভেঙে দেবে, শহর অবরোধ করবে কিংবা খাদ্য চলাচল বন্ধ করবে—এমন আশঙ্কা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল।
এই পরিস্থিতিতে ১১ জুলাই ষোড়শ লুই অর্থমন্ত্রী জাক নেকারকে বরখাস্ত করেন। নেকারকে বহু মানুষ সংস্কারের সম্ভাব্য সমর্থক মনে করতেন। তাই তাঁর অপসারণ কেবল মন্ত্রিসভার পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়নি; এটি রাজদরবারে কঠোরপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধির সংকেত বলে মনে হয়েছিল। পরদিন খবর প্যারিসে পৌঁছালে পালেস-রোয়ালের মতো জনসমাবেশের স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বক্তৃতা, প্রতিবাদ ও মিছিলের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধের আহ্বান জোরালো হয়।
১২ জুলাই কামিয় দেমুলাঁ জনতাকে অস্ত্র ধরার আহ্বান জানান। একই দিনে মিছিলকারীদের সঙ্গে রাজকীয় অশ্বারোহী সেনার সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি ঘিরে নানা বীরত্বগাথা তৈরি হলেও মূল পরিবর্তনটি ছিল স্পষ্ট: মানুষ আর শুধু রাজনৈতিক খবর নিয়ে আলোচনা করছিল না, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। সম্ভাব্য দমন অভিযানের ভয় আত্মরক্ষার নামে অস্ত্র সংগ্রহকে জরুরি রাজনৈতিক কাজে পরিণত করে।
১৩ জুলাই শহরের বিভিন্ন অংশে অস্ত্র খোঁজা, পাহারা গঠন এবং ব্যারিকেড তৈরির উদ্যোগ চলে। প্যারিসের নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতিনিধিরা ওতেল দ্য ভিল বা নগরভবনে একটি স্থায়ী কমিটি গড়েন। নাগরিক মিলিশিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হয়। সম্পত্তিশালী নাগরিকদের অনেকে রাজসেনার পাশাপাশি জনতার অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন। ফলে নতুন সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী: শহরকে রাজকীয় দমন থেকে রক্ষা করা এবং রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
১৪ জুলাই সকালে জনতা লে জাঁভালিদ সামরিক স্থাপনা থেকে বিপুলসংখ্যক মাস্কেট সংগ্রহ করে। কিন্তু বন্দুক পেলেই প্রতিরোধ সম্ভব নয়; সেগুলো চালাতে বারুদ দরকার। বাস্তিলে উল্লেখযোগ্য বারুদের মজুত থাকার খবর তাই দুর্গটির দিকে মানুষের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়। বাস্তিল আক্রমণের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত অস্ত্র ও বারুদ সংগ্রহ এবং শহরের ওপর দুর্গের সামরিক হুমকি দূর করা। বিপুল রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্ত করাই অভিযানের প্রধান কারণ ছিল না।
বাস্তিল ছিল প্যারিসের পূর্বাংশে দাঁড়িয়ে থাকা আট টাওয়ারবিশিষ্ট মধ্যযুগীয় দুর্গ। পরে এটি রাজকীয় কারাগারে পরিণত হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাজকীয় আদেশে বন্দিত্বের স্মৃতির কারণে দুর্গটি স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তবে ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই সেখানে বন্দি ছিলেন মাত্র সাতজন। তাঁদের মধ্যে চারজন জালিয়াতির অভিযোগে আটক ছিলেন; বাকিদের বন্দিত্বের পরিস্থিতি আলাদা ছিল। সেদিন কোনো বিশাল রাজনৈতিক বন্দিসমাজ বাস্তিলের ভেতরে অপেক্ষা করছিল না।
দুর্গের গভর্নর বের্নার-রেনে দ্য লোনের অধীনে মূলত প্রবীণ সৈনিক এবং অল্পসংখ্যক সুইস সেনা ছিল। তাঁর অবস্থানও সংকটপূর্ণ: দুর্গ রক্ষা করতে হবে, অথচ বাইরে ক্রমবর্ধমান জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানো জরুরি। সকাল থেকে প্রতিনিধিদল দুর্গে গিয়ে আলোচনা করে। জনতার দাবি ছিল বারুদ হস্তান্তর এবং কামান থেকে শহরবাসীর ওপর আক্রমণ না করার নিশ্চয়তা। আলোচনা চললেও বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষ জানতেন না ভেতরে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জনতার একটি অংশ বাইরের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে এবং ড্রব্রিজ নামানোর ঘটনায় উত্তেজনা বাড়ে। এরপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ঠিক কোন মুহূর্তে কে প্রথম গুলি চালিয়েছিল, তা নিয়ে বিবরণে মতভেদ আছে। পরবর্তী বিপ্লবী বর্ণনায় ঘটনাটিকে সরল বীরত্বগাথায় রূপ দেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে ভুল বোঝাবুঝি, আতঙ্ক এবং ব্যর্থ যোগাযোগের বড় ভূমিকা ছিল। জনতা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আলোচনার আড়ালে তাঁদের ফাঁদে ফেলা হয়েছে।
দুর্গের উঁচু অবস্থান থেকে রক্ষীদের গুলি আক্রমণকারীদের জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে। বাইরে হতাহত বাড়তে থাকে, কিন্তু জনতা সরে যায়নি। সংঘর্ষের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ফরাসি গার্ডের বিদ্রোহী সৈন্যরা আক্রমণকারীদের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা সামরিক অভিজ্ঞতা এবং কামান পরিচালনার দক্ষতা নিয়ে আসেন। ফলে ঘটনাটি কেবল অসংগঠিত মানুষের আবেগের বিস্ফোরণ ছিল না; প্রশিক্ষিত সৈন্যদের অংশগ্রহণ দুর্গের প্রবেশপথের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করে এবং শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়।
বিকেল নাগাদ দ্য লোনে বুঝতে পারেন, বাইরে থেকে দ্রুত সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দীর্ঘ অবরোধ সামলানোর মতো প্রস্তুতিও দুর্গে ছিল না। আত্মসমর্পণের শর্ত নিয়ে বার্তা আদান-প্রদান হয় এবং শেষ পর্যন্ত দুর্গের প্রতিরোধ শেষ হয়। সংঘর্ষে প্রায় একশ আক্রমণকারী নিহত হন; রক্ষীদের প্রাথমিক যুদ্ধক্ষয় তুলনামূলক কম ছিল। তাই বাস্তিলের পতনকে সহজ বা প্রায় রক্তপাতহীন বিজয় মনে করা ভুল। জনতার সামরিক সাফল্যের মূল্য দিতে হয়েছিল বহু জীবন দিয়ে।
আত্মসমর্পণের পরও সহিংসতা থামেনি। দ্য লোনেকে নগরভবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা হত্যা করে; তাঁর ছিন্নমস্তক প্রদর্শন করা হয়। কয়েকজন রক্ষীও নিহত হন। একই দিনে প্যারিসের রাজকীয় প্রশাসনের প্রধান জাক দ্য ফ্লেসেল জনতার হাতে প্রাণ হারান। বাস্তিলের পতন স্বাধীনতার প্রতীক হওয়ার পাশাপাশি দেখিয়ে দেয়, বিপ্লবী উত্তেজনার মধ্যে আত্মসমর্পণ, নিরাপত্তার আশ্বাস ও বিচারপ্রক্রিয়া কত সহজে ভেঙে পড়তে পারে। এই দ্বৈততা বিপ্লবের পরবর্তী ইতিহাসেও ফিরে আসবে।
সামরিক বিচারে বাস্তিল দখল ফ্রান্সের সব রাজকীয় শক্তিকে পরাজিত করেনি। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব ছিল বিরাট। রাজধানীর জনতা অস্ত্র হাতে রাজকীয় স্থাপনা দখল করেছে, আর সেনাবাহিনীর একাংশ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ১৫ জুলাই রাজা জাতীয় পরিষদে এসে সৈন্য সরানোর কথা জানান। পরে নেকারকে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিষদকে দমন করার সম্ভাব্য সামরিক পথ সংকুচিত হয় এবং প্রতিনিধিদের সাংবিধানিক আন্দোলন জনতার সশস্ত্র সমর্থন পায়।
প্যারিসে নতুন পৌর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়; বাইয়ি মেয়র এবং লাফায়েত জাতীয় রক্ষীবাহিনীর অধিনায়ক হন। ১৭ জুলাই রাজা প্যারিসে এসে নতুন পরিস্থিতি স্বীকার করার প্রকাশ্য পদক্ষেপ নেন। বাস্তিল দ্রুত ভাঙা শুরু হয়; তার পাথর ও প্রতিরূপ বিপ্লবের স্মারকে পরিণত হয়। কিন্তু পরিবর্তন রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রদেশে পৌর বিপ্লব ছড়ায়, আর গ্রামে অভিজাত ষড়যন্ত্র ও আক্রমণের গুজব কৃষকদের আতঙ্কিত করে। প্যারিসে রাজকীয় দুর্গ ভেঙেছিল; এবার গ্রামের মানুষ জমিদারি ক্ষমতার দলিল ও দাবির দিকে ফিরছিল। সেই আন্দোলনই সামন্তীয় বিশেষাধিকার বিলোপের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসবে।
রুয়ান্ডার গণহত্যায় জাতিসংঘ ও বিশ্বশক্তির ব্যর্থতা: কেন থামেনি হত্যাযজ্ঞ?
রুয়ান্ডার ১০০ দিনের গণহত্যা: তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ
রুয়ান্ডায় গণহত্যার সূচনা: বিমান হামলা ও ৭ এপ্রিলের হত্যাযজ্ঞ
রুয়ান্ডার গণহত্যার পটভূমি: ঔপনিবেশিক বিভাজন থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধ