টেনোচটিটলানের বিদ্রোহ ও বিষাদের রাত্রি: ১৫২০ সালে স্প্যানিশ পরাজয়
সিরিজ: অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন
অন্ধকার জলপথ ও বিচ্ছিন্ন সেতুতে মেশিকা আক্রমণে বিপর্যস্ত কোর্তেসের বাহিনী।
আসায়াকাতলের প্রাসাদে অবস্থান নেওয়া স্প্যানিশদের শিবির যখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছিল, তখন মোকতেজুমার কর্তৃত্ব দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর পুরোনো কৌশলও ব্যর্থ হচ্ছিল। আগের কয়েক মাসের দরকষাকষি, সম্পদ সংগ্রহ এবং সম্রাটের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল, তোক্সকাতল উৎসবের হত্যাকাণ্ড তাকে প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ দেয়। ১৫২০ সালের মে থেকে জুনে টেনোচটিটলানের মানুষ রাজধানীর ভেতরে অবস্থানকারী বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কোর্তেসের সামনে এবার সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; নিজের বাহিনীকে জীবিত বের করে আনার প্রশ্ন।
বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক পটভূমি ছিল তোক্সকাতল উৎসব। কোর্তেস উপকূলে পানফিলো দে নারভায়েসের মোকাবিলা করতে গেলে রাজধানীতে স্প্যানিশদের নেতৃত্বে থাকেন পেদ্রো দে আলভারাদো। মে মাসে ধর্মীয় প্রাঙ্গণে উৎসব চলার সময় তাঁর লোকেরা সমবেত মেশিকাদের আক্রমণ করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নৃত্যশিল্পী, সংগীতজ্ঞ ও অভিজাত অংশগ্রহণকারীরা। ঘটনার তারিখ ও বিস্তারিত নিয়ে বিবরণে পার্থক্য থাকলেও হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতা স্পষ্ট। উৎসবে স্প্যানিশদের হত্যার পরিকল্পনা ছিল—এই অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। স্থানীয় বিবরণে এটি নিরস্ত্র মানুষের ওপর আকস্মিক আক্রমণ।
এই হত্যাকাণ্ড কেবল বহু মানুষের মৃত্যু ঘটায়নি; রাজধানীর ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছিল। উৎসবের প্রাঙ্গণ রাজনীতি, উপাসনা এবং অভিজাত সমাজের মিলনস্থলও ছিল। সেখানে আক্রমণের পর স্প্যানিশরা নিজেদের আবাসে ফিরে গেলেও পরিস্থিতি আর আগের মতো থাকেনি। মেশিকা যোদ্ধারা তাদের ঘাঁটি আক্রমণ করে এবং সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সম্রাটের আতিথ্য পাওয়া বিদেশিরা এবার শহরের কাছে শত্রুবাহিনী। রাজধানীর ভেতরে অবস্থান করার সুবিধা দ্রুত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার অসুবিধায় পরিণত হয়।
এদিকে কোর্তেস মে মাসের শেষদিকে সেম্পোয়ালার কাছে নারভায়েসকে পরাজিত করেন। প্রতিদ্বন্দ্বীর অনেক সৈন্যকে নিজের দলে যোগ দেওয়াতে তাঁর স্প্যানিশ জনবল বেড়ে যায়। সংখ্যাবৃদ্ধি তাঁকে শক্তিশালী করলেও রাজধানীর সংকট দূর করেনি। জুনের শেষভাগে টেনোচটিটলানে ফিরে তিনি দেখেন, শহরে তাঁর আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। মোকতেজুমা তখনও স্প্যানিশদের নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু তাঁর নির্দেশ মানিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সুযোগ সংকুচিত। নতুন সৈন্যদের নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করেও কোর্তেস শান্তি বা নিরাপদ রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেননি।
মেশিকাদের প্রধান সুবিধা ছিল নিজ শহরের ভূগোল সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান। খাল, ছাদ, সরু পথ এবং হ্রদের ক্যানো চলাচল তাদের বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণের সুযোগ দিত। স্প্যানিশদের ঘোড়া ও কামান খোলা জমিতে কার্যকর হলেও নগরীর প্রতিটি স্থানে একই সুবিধা এনে দিত না। ছোট দলে বেরিয়ে আক্রমণ ঠেকানো বা পথ পরিষ্কার করাও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সামরিক প্রযুক্তির সুবিধা স্থানীয় ভূগোল ও সংগঠিত প্রতিরোধকে অকার্যকর করে দেয়নি। মেশিকারা আগন্তুকদের দুর্বল অবস্থান বুঝে সেটিই কাজে লাগাচ্ছিল।
খাদ্য ও পানির সংকট, আহত সৈন্য এবং অবিরাম আক্রমণ শিবিরের সহ্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ঘাঁটি রক্ষা করলেও চারপাশের শহর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। কোনো পথ সাময়িকভাবে পরিষ্কার করা মানেই সেটি দীর্ঘদিন নিরাপদ রাখা নয়। রাজধানী মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল কয়েকটি বাঁধানো সড়কে; সেগুলোর জলপথ পারাপারের সেতু বিচ্ছিন্ন হলে চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। এখানে অবরোধের কার্যকারিতা ছিল রসদ ও বের হওয়ার পথকে একসঙ্গে অনিশ্চিত করে দেওয়ায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে কোর্তেসের বাহিনী আরও দুর্বল হতো।
এই পরিস্থিতিতে মোকতেজুমাকে জনতার সঙ্গে কথা বলিয়ে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে স্প্যানিশ বিবরণে পাওয়া যায়। কিন্তু বন্দিত্ব, অপমান এবং হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অনেক কমে গিয়েছিল। শাসকের ব্যক্তিগত মর্যাদা থাকলেও তাঁর পক্ষে স্প্যানিশদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর সহজ ছিল না। সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করে জনগণকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে—কোর্তেসের এই হিসাব ব্যর্থ হয়। মেশিকা প্রতিরোধ তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে রাজকীয় নির্দেশের চেয়ে রাজধানী থেকে শত্রুকে সরানোর লক্ষ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
জুনের শেষদিকে মোকতেজুমার মৃত্যু ঘটে। পরিচিত স্প্যানিশ বিবরণ অনুযায়ী, জনতার উদ্দেশে কথা বলার সময় পাথরের আঘাতে আহত হয়ে তিনি মারা যান। অন্যদিকে কিছু নাহুয়া বিবরণ তাঁর মৃত্যুর জন্য স্প্যানিশদের দায়ী করে। সুনির্দিষ্ট দিন, আঘাতের ধরন এবং হত্যাকারী নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মোকতেজুমা নিজের প্রজাদের পাথরে নিশ্চিতভাবে নিহত হয়েছিলেন—এ কথা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বলা যায় না। নিশ্চিত বিষয় হলো, তিনি স্প্যানিশদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় সহিংস পরিস্থিতিতে মারা যান এবং তাঁর মৃত্যু রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে।
এই সংকটে মোকতেজুমার ভাই কুইতলাহুয়াক প্রতিরোধের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন এবং তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করেন। নতুন নেতৃত্বের সামনে রাজধানী থেকে বিদেশি বাহিনী সরানো ছিল জরুরি লক্ষ্য। কোর্তেসও বুঝতে পারেন, অবস্থান ধরে রাখা ক্রমে অসম্ভব হচ্ছে। দিনের আলোয় বের হলে মেশিকাদের সংগঠিত আক্রমণের মুখে পড়তে হবে। তাই রাতের অন্ধকারে পশ্চিমের ত্লাকোপান বা তাকুবামুখী সড়ক ধরে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পথ তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হলেও বিচ্ছিন্ন সেতু ও জলপথের বাধা ছিল।
৩০ জুন রাত থেকে ১ জুলাই ভোরের সেই পশ্চাদপসরণই লা নোচে ত্রিস্তে—বাংলায় ‘বিষাদের রাত্রি’ নামে পরিচিত। হালকা বৃষ্টি ও অন্ধকারের মধ্যে বাহিনীকে গোপনে বের করার পরিকল্পনা ছিল। বিচ্ছিন্ন জলপথ পার হতে বহনযোগ্য কাঠের সেতু প্রস্তুত করা হয়। সামনের দল, মাঝের অংশ ও পেছনের প্রতিরক্ষাদলে সৈন্যদের ভাগ করা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল আহত মানুষ, স্থানীয় মিত্র, বাহক, বন্দি, ঘোড়া এবং মূল্যবান সামগ্রী। এত বড় ও বিচিত্র দলকে নিঃশব্দে সংকীর্ণ পথে সরিয়ে নেওয়া নিজেই কঠিন কাজ ছিল।
প্রথম বাধা পার হওয়ার পর মেশিকা প্রহরীরা চলাচল টের পায় এবং সতর্কসংকেত ছড়িয়ে পড়ে। কে প্রথম খবর দিয়েছিল, সে বিষয়ে পরবর্তী কাহিনিতে বিভিন্ন বর্ণনা আছে; মূল বিষয় হলো, গোপন বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। স্থলভাগ থেকে যোদ্ধারা এগিয়ে আসে, আর হ্রদের ক্যানো থেকে দুই পাশ দিয়ে আক্রমণ শুরু হয়। স্প্যানিশদের সামনে শুধু পেছন থেকে ধাওয়া নয়, জল ও স্থল থেকে একযোগে চাপ তৈরি হয়েছিল। বাঁধানো সড়কে বাহিনী ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরক্ষা গড়ার জায়গাও সীমিত ছিল।
জলপথের ফাঁক ও অস্থায়ী সেতুর কাছে ভিড় বাড়লে পশ্চাদপসরণের শৃঙ্খলা ভেঙে যায়। সামনের অংশ এগিয়ে গেলেও পেছনের সবাই একইভাবে পার হতে পারেনি। সৈন্য, ঘোড়া ও সরঞ্জাম পানিতে পড়ে; কেউ সাঁতরে উঠতে চেষ্টা করে, কেউ আক্রমণে নিহত বা বন্দি হয়। অন্ধকারে নির্দেশ পৌঁছানো এবং বিভিন্ন দলকে একত্র রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। সেতু নিয়ন্ত্রণ হারানোই চলমান বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত করেছিল। এই অবস্থায় স্প্যানিশদের অস্ত্রের সুবিধা পুরো বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
পশ্চাদপসরণের সময় বহন করা স্বর্ণ ও অন্যান্য সম্পদ বিপর্যয়ের পরিচিত প্রতীক। ভারী বোঝা কারও চলাচল ও সাঁতারকে কঠিন করেছিল, আর বহু মূল্যবান সামগ্রী হারিয়ে যায়। কিন্তু সব মৃত্যুকে স্বর্ণের লোভ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে মেশিকাদের যুদ্ধকৌশল ও ভাঙা পারাপারের গুরুত্ব আড়াল হয়। হতাহতের সংখ্যাও অনিশ্চিত: স্প্যানিশ বিবরণে বড় পার্থক্য আছে, আর স্থানীয় সহযোগীদের ক্ষতি আরও কম স্পষ্ট। স্প্যানিশদের পাশাপাশি ত্লাসকালান ও অন্য সহযাত্রীরাও বিপুল প্রাণহানি ভোগ করেছিল। এই রাতের ইতিহাস শুধু ইউরোপীয় সৈন্যদের দুর্ভোগ নয়।
জীবিতরা ত্লাকোপানের দিকে পৌঁছালেও নিরাপদ হয়ে যায়নি। আহত ও ক্লান্ত বাহিনীকে আরও পথ অতিক্রম করতে হয়; পথে সংঘর্ষ চলতে থাকে। জুলাইয়ের শুরুতে ওতুম্বার কাছে যুদ্ধের পর তারা ত্লাসকালার দিকে এগোতে সক্ষম হয়। এই রক্ষাপ্রাপ্তিকে শুধু কোর্তেসের ব্যক্তিগত বীরত্ব হিসেবে দেখানো অসম্পূর্ণ। স্থানীয় মিত্রদের যুদ্ধ, পথনির্দেশ এবং পরে খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়া অপরিহার্য ছিল। কোর্তেস গাছের নিচে বসে কেঁদেছিলেন—পরিচিত এই দৃশ্যের ঐতিহাসিক নিশ্চিততাও সীমিত। সামরিক পরাজয়টি নিশ্চিত; তার সব নাটকীয় বিবরণ সমানভাবে নিশ্চিত নয়।
‘বিষাদের রাত্রি’ নামটি পরাজিত স্প্যানিশদের দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে। মেশিকাদের জন্য এটি ছিল রাজধানী থেকে অনুপ্রবেশকারী বাহিনীকে বিতাড়নের বিজয়। তারা দেখিয়েছিল, স্প্যানিশরা অজেয় নয় এবং সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করলেই নগরী দখল করা যায় না। কিন্তু কোর্তেস বেঁচে ছিলেন, ত্লাসকালান জোটও টিকে ছিল। রাজধানী উদ্ধার করা যুদ্ধের একটি বড় সাফল্য, পুরো যুদ্ধের সমাপ্তি নয়। টেনোচটিটলানে বিজয়ের পর শাসন পুনর্গঠনের কাজ চলছিল; অন্যদিকে ত্লাসকালায় পরাজিত বাহিনী বিশ্রাম, নতুন জনবল ও আরও বিস্তৃত জোটের সাহায্যে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিতে শুরু করছিল।
কোর্তেসের মেক্সিকো অভিযান: ১৫১৯ সালের আগমন ও স্থানীয় জোট
অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের উত্থান: টেনোচটিটলান ও দ্বিতীয় মোকতেজুমার মেক্সিকো
নানকিং চুক্তি ও হংকং: চীনে ব্রিটিশ প্রভাব ও অসম চুক্তির সূচনা
প্রথম আফিম যুদ্ধ: ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছে চিং সাম্রাজ্য কেন পরাজিত হয়েছিল?
লিন জেশু ও হুমেনে আফিম ধ্বংস: প্রথম আফিম যুদ্ধের সূচনা