বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের উত্থান: টেনোচটিটলান ও দ্বিতীয় মোকতেজুমার মেক্সিকো

সিরিজ: অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন

অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের উত্থান: টেনোচটিটলান ও দ্বিতীয় মোকতেজুমার মেক্সিকো
হ্রদের বুকে গড়ে ওঠা অ্যাজটেক শক্তির রাজধানী টেনোচটিটলান।

তেসকোকো হ্রদের জল পেরিয়ে টেনোচটিটলানের দিকে এগোলে প্রথমেই চোখে পড়ত দীর্ঘ বাঁধানো সড়ক, ক্যানোভরা খাল এবং আকাশের দিকে উঠে যাওয়া মন্দিরের সিঁড়ি। দূর থেকে নগরীকে মনে হতো পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বিরাট স্থাপত্য। অথচ এখানে চলত খাদ্য সরবরাহ, বিচার, বাণিজ্য ও রাজনীতির সুসংগঠিত ব্যবস্থা। ষোড়শ শতকের শুরুতে এই রাজধানী থেকেই মধ্য মেক্সিকোর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কর্তৃত্ব করত অ্যাজটেক সাম্রাজ্য। তার শাসক দ্বিতীয় মোকতেজুমার হাতে ছিল বিপুল সম্পদ ও সামরিক শক্তি; কিন্তু সেই শক্তির নিচেই জমছিল অসন্তোষ।

আজ যাদের অ্যাজটেক বলা হয়, রাজধানীর সেই জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় দিত মূলত মেশিকা নামে। তাদের ভাষা ছিল নাহুয়াতল। ‘অ্যাজটেক’ নামটি এসেছে কিংবদন্তির আদি বাসভূমি আজতলান থেকে; আধুনিক আলোচনায় শব্দটি কখনো মেশিকাদের, কখনো তাদের সাম্রাজ্য ও সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিকে বোঝায়। তারা মেক্সিকোর প্রথম সভ্যতার নির্মাতা ছিল না। ওলমেক, তেওতিহুয়াকান ও তোলতেকসহ পূর্ববর্তী সমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মধ্যে থেকেই তাদের উত্থান ঘটে। মন্দির, বাজার, কৃষি ও দেবদেবীর বহু ধারণা তারা গ্রহণ করে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যবহার করেছিল।

মেশিকাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাদের দীর্ঘ অভিবাসনের শেষ হয় এমন এক স্থানে, যেখানে ক্যাকটাসের ওপর ঈগল বসেছিল। যুদ্ধদেবতা হুইৎসিলোপোচতলির নির্দেশ হিসেবে এই চিহ্ন ব্যাখ্যা করা হয়। প্রচলিত কালপঞ্জিতে ১৩২৫ সালকে টেনোচটিটলান প্রতিষ্ঠার বছর ধরা হয়। তবে দেবতার নির্দেশ ও ঈগলের কাহিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাকথা, সরাসরি যাচাই করা ঘটনার বিবরণ নয়। বাস্তবে হ্রদের দ্বীপে বসতি গড়ে মেশিকারা আশ্রয় পেয়েছিল, যদিও প্রথমদিকে সেখানে আবাদযোগ্য জমি ও নির্মাণসামগ্রী সীমিত ছিল। পরে এই অসুবিধাজনক অবস্থানই প্রতিরক্ষা ও জলপথের বাণিজ্যে সুবিধা এনে দেয়।

শুরুর টেনোচটিটলান স্বাধীন মহাশক্তি ছিল না। মেশিকারা শক্তিশালী তেপানেক কেন্দ্র আসকাপোৎসালকোর অধীন থেকে কর দিত এবং সামরিক অভিযানে অংশ নিত। সেই অভিজ্ঞতায় তাদের যুদ্ধদক্ষতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ে। তেপানেক শাসকদের মধ্যে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সংঘাত দেখা দিলে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৪২৮ সালে টেনোচটিটলান, তেসকোকো ও ত্লাকোপান মিলে আসকাপোৎসালকোর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। এই তিন নগররাষ্ট্রের জোটই পরবর্তী সাম্রাজ্যের ভিত্তি। টেনোচটিটলানের ইতস্কোয়াতল এবং তেসকোকোর নেসাহুয়ালকোয়োতল এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।

তিন নগরের জোট থাকলেও সময়ের সঙ্গে টেনোচটিটলানের প্রাধান্য বেড়ে যায়। প্রথম মোকতেজুমা, আসায়াকাতল ও আহুইৎসোতলের মতো শাসকদের অভিযানে করদ অঞ্চলের পরিধি বিস্তৃত হয়। উপত্যকার বাইরে উষ্ণ নিম্নভূমি ও দূরবর্তী উৎপাদনকেন্দ্র থেকে রাজধানীতে আসতে থাকে বিভিন্ন পণ্য। তবে সাম্রাজ্য মানেই সর্বত্র এক ধরনের প্রত্যক্ষ প্রশাসন ছিল না। বহু পরাজিত নগরে স্থানীয় শাসক বহাল থাকতেন; নির্ধারিত কর প্রদান ও রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান শর্ত। কোথাও প্রতিরোধ বা কৌশলগত গুরুত্ব বেশি হলে নিয়ন্ত্রণও কঠোর হতো।

এই ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যের শক্তি মাপা যেত রাজধানীতে পৌঁছানো পণ্যের প্রবাহ দিয়ে। কর হিসেবে আসত ভুট্টা, শিম, সুতির কাপড়, কাকাও, পালক, অলংকার ও যোদ্ধাদের পোশাক। অঞ্চলভেদে নির্ধারিত পণ্য ও পরিমাণ আলাদা ছিল। কর সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বলা হতো কালপিশকে। চিত্রলিপির নথিতে করের হিসাব রাখা হতো। এসব সামগ্রী রাজদরবার, মন্দির, সামরিক কার্যক্রম ও অভিজাতদের মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করত। কিন্তু রাজধানীর প্রাচুর্য অর্জিত হতো করদ জনগোষ্ঠীর শ্রমে; খারাপ ফসলের বছরেও দাবি থাকলে সেই সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠতে পারত।

টেনোচটিটলানের গুরুত্ব বুঝতে তার জনসংখ্যা ও পরিকল্পনা বিবেচনা করা জরুরি। স্প্যানিশ আগমনের কাছাকাছি সময়ে বৃহত্তর নগরাঞ্চলে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস ছিল বলে বহুল ব্যবহৃত অনুমান রয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কের কিছু অংশে সরানো যায় এমন সেতু ছিল। নগরীর ভেতরে খাল দিয়ে মানুষ ও মালামাল চলত; পাশাপাশি ছিল হাঁটার পথ। বাসস্থান, বাজার ও ধর্মীয় কেন্দ্রের এই সংযোগ নগরীকে সচল রাখত। জলাভূমির মধ্যে এত মানুষের বসতি টিকিয়ে রাখা ছিল দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার বড় সাফল্য।

হ্রদের পানি থাকলেই পানীয় জলের সমস্যা মিটত না। তেসকোকোর লবণাক্ত পানি থেকে মিঠা পানির অঞ্চল আলাদা করতে বাঁধ এবং পানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চাপুলতেপেকের ঝরনা থেকে জলনালার মাধ্যমে রাজধানীতে পানি আনা হতো। খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত চিনাম্পা ছিল অগভীর জলাভূমিতে নির্মিত স্থায়ী উঁচু কৃষিজমি, ভেসে বেড়ানো বাগান নয়। মাটি ও জৈব উপাদান জমিয়ে তৈরি জমির মাঝখানে থাকত খাল। আর্দ্র মাটি, সেচের সুবিধা এবং নিবিড় পরিচর্যায় সেখানে ভালো উৎপাদন হতো। তবে রাজধানী শুধু চিনাম্পার ওপর নির্ভরশীল ছিল না; আঞ্চলিক বাণিজ্য ও করের খাদ্যও অপরিহার্য ছিল।

টেনোচটিটলানের উত্তরাংশের ত্লাতেলোলকো বাজারে এই অর্থনীতির অন্য রূপ দেখা যেত। নির্দিষ্ট জায়গায় বিক্রি হতো খাদ্য, কাপড়, মৃৎপাত্র, অবসিডিয়ানের সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী। বাজারে লেনদেন তদারক এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ছিল। বিনিময়ের পাশাপাশি কাকাও বীজ ও নির্দিষ্ট ধরনের সুতির কাপড় মূল্য আদানপ্রদানে ব্যবহৃত হতো। দূরপাল্লার বণিক পোচতেকারা মূল্যবান পণ্য আনতেন এবং বিদেশি অঞ্চলের খবরও সংগ্রহ করতেন। ফলে বাজার ছিল কেবল কেনাকাটার স্থান নয়; রাজধানীর সঙ্গে দূরের সমাজগুলোর সংযোগের কেন্দ্রও ছিল।

নগরসমাজে জন্ম, পেশা ও সামরিক অর্জন মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করত। অভিজাত পিপিলতিন এবং সাধারণ মাসেহুয়ালতিনদের অধিকার ও সুযোগ এক ছিল না। স্থানীয় কালপুল্লি সংগঠন জমি, কর, শ্রম ও সামাজিক দায়িত্ব পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। শিক্ষাব্যবস্থায় তেলপোচকাল্লিতে সামরিক প্রস্তুতি ও সামষ্টিক কাজ শেখানো হতো; কালমেকাক ধর্মীয় জ্ঞান, নেতৃত্ব ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাধারণ পরিবার থেকেও যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে মর্যাদা বাড়ানোর সুযোগ ছিল। নারীরা কৃষি, বয়ন, বাজার ও গৃহস্থালির উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

নগরীর কেন্দ্রে দাঁড়ানো টেম্পলো মায়োর এই সমাজের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তিকে একত্র করেছিল। পিরামিডের ওপর পাশাপাশি ছিল বৃষ্টি ও উর্বরতার দেবতা ত্লালোক এবং যুদ্ধদেবতা হুইৎসিলোপোচতলির মন্দির। দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গের মধ্যে মানববলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল; প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এর বাস্তবতা নিশ্চিত করে। তবে প্রাচীন বিবরণে উল্লিখিত বিপুল সংখ্যাকে যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা ঠিক নয়। মানববলি ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস, যুদ্ধবন্দিত্ব ও রাজশক্তির প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু সেটিই সমগ্র সভ্যতার পরিচয় নয়। কৃষক, কারিগর, শিক্ষক ও বণিকদের কাজও রাষ্ট্রকে প্রতিদিন টিকিয়ে রাখত।

সাম্রাজ্যের সৈন্যরা তুলার বর্ম, ঢাল, বর্শা, ধনুক এবং অবসিডিয়ান ফলাযুক্ত কাঠের অস্ত্র মাকুয়াহুইতল ব্যবহার করত। যুদ্ধবন্দি ধরার মাধ্যমে মর্যাদা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু যুদ্ধের উদ্দেশ্য শুধু বন্দি সংগ্রহ নয়; কর, ভূমি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও ছিল। ঈগল ও জাগুয়ার যোদ্ধারা বিশেষ সামরিক মর্যাদার পরিচয় বহন করতেন। তবু জয়ের সীমা ছিল। পশ্চিমের পুরেপেচা রাষ্ট্রকে বশে আনা যায়নি, আর ত্লাসকালার নগররাষ্ট্রগুলোও স্বাধীন ছিল। ১৫১৯ সালের আগে আজকের মেক্সিকো কোনো একক অ্যাজটেক রাষ্ট্র ছিল না; তার মধ্যে বহু ভাষা, জাতিগোষ্ঠী ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি সহাবস্থান করত।

এই শক্তিশালী কিন্তু অসম রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষে ১৫০২ সালে উঠে আসেন দ্বিতীয় মোকতেজুমা। তাঁর উপাধি ছিল হুয়েই ত্লাতোয়ানি—প্রধান শাসক, যাকে সাধারণভাবে সম্রাট বলা হয়। রাজপরিবারের যোগ্য সদস্যদের মধ্য থেকে অভিজাতদের অংশগ্রহণে শাসক নির্বাচিত হতেন। মোকতেজুমা সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা ছিলেন; তাঁর দরবারে অভিজাত মর্যাদা, আনুষ্ঠানিকতা ও শাসকের সঙ্গে দূরত্ব বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিন্তু রাজধানীর সমৃদ্ধি সব করদ অঞ্চলের আনুগত্য নিশ্চিত করেনি। স্প্যানিশদের আগমনের আগে সাম্রাজ্য শক্তিশালী ছিল, অথচ তার শত্রু ও অসন্তুষ্ট প্রজাও ছিল অনেক। ১৫১৭ ও ১৫১৮ সালে উপকূলে অপরিচিত জাহাজের উপস্থিতির পর ১৫১৯ সালে হার্নান কোর্তেস মেক্সিকোর উপকূলে পৌঁছালেন। মোকতেজুমার সামনে তখন প্রশ্ন—এই নতুন আগন্তুকদের কীভাবে সামলানো হবে, এবং তারা উপত্যকার পুরোনো শত্রুতাকে কতটা বদলে দিতে পারে?