১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি: ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তির পথে রাবিনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ
ঐতিহাসিক করমর্দন আলোচনার দরজা খুলেছিল, কিন্তু সংঘাতের চূড়ান্ত সমাধান দেয়নি।
একটি করমর্দন কেন ইতিহাস হয়ে উঠেছিল?
১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসের আঙিনায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইৎসহাক রাবিন এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত হাত মেলান। তাঁদের পাশে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। দীর্ঘ সংঘাতের দুই পক্ষের এই দৃশ্য শুধু আনুষ্ঠানিক ছবি ছিল না; এতদিন পরস্পরের বৈধতা অস্বীকার করা নেতৃত্ব সরাসরি আলোচনার নতুন পথ গ্রহণ করেছিল।
অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী স্বশাসনসংক্রান্ত নীতিঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। ইসরায়েলের পক্ষে শিমন পেরেস এবং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার পক্ষে মাহমুদ আব্বাস এতে স্বাক্ষর করেন। অসলোতে গোপন আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় এটি অসলো চুক্তি নামে পরিচিত হয়।
চূড়ান্ত শান্তির বদলে একটি সূচনা
চুক্তিটি যুদ্ধ, দখল ও জাতীয় অধিকারের সব প্রশ্নের সমাধান করেনি। স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রও সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেনি। এর লক্ষ্য ছিল সীমিত স্বশাসন ও ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোনো।
রাবিনের জন্য এই পদক্ষেপ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সামরিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রধানমন্ত্রীকে এখন নিজের জনগণকে বোঝাতে হতো, এতদিনের প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা নিরাপত্তার পথ হতে পারে। আরাফাতকেও বোঝাতে হতো, অসম্পূর্ণ চুক্তি গ্রহণ জাতীয় দাবির পরিত্যাগ নয়।
সংঘাতের পটভূমি ও অসলোতে গোপন আলোচনা
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ও গাজা ইসরায়েলি দখলে আসে। পরবর্তী দশকগুলোতে দখল, বসতি, নিরাপত্তা অভিযান এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংঘাতকে গভীর করে। ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া প্রথম ইন্তিফাদা দীর্ঘমেয়াদি শাসনের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট সামনে আনে।
১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন আলোচনার একটি প্রকাশ্য কাঠামো তৈরি করলেও অগ্রগতি সীমিত ছিল। ওয়াশিংটনের আলোচনা অচল হয়ে পড়লে নরওয়ের গোপন যোগাযোগপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ছোট পরিসর থেকে সরকারি আলোচনায়
প্রথম দিকের যোগাযোগ তুলনামূলক অনানুষ্ঠানিক ছিল। পরে ইসরায়েলি সরকারি প্রতিনিধি এবং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি সমঝোতা এগোয়। নরওয়ে বৈঠকের পরিবেশ, গোপনীয়তা ও যোগাযোগে সহায়তা করে।
ইসরায়েলের পক্ষে পেরেস এবং তাঁর সহযোগীরা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাবিনের রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়া সেই সমঝোতা রাষ্ট্রের নীতিতে পরিণত হতে পারত না।
যুক্তরাষ্ট্র পরে চুক্তির প্রকাশ্য গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা নিলেও গোপন অসলো আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল না। ওয়াশিংটনের করমর্দন আর অসলোতে সমঝোতা তৈরির প্রক্রিয়া তাই আলাদা করে দেখা দরকার।
গোপনীয়তা আলোচকদের কিছু স্বাধীনতা দিয়েছিল। একই সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্তের প্রস্তুতিতে যুক্ত করার সুযোগও সীমিত করেছিল।
পারস্পরিক স্বীকৃতি: পরিবর্তনটি কতটা বড় ছিল?
চুক্তির কয়েক দিন আগে, ৯ সেপ্টেম্বর, রাবিন ও আরাফাত স্বীকৃতিসংক্রান্ত চিঠি বিনিময় করেন। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা ইসরায়েলের শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করে। তারা সন্ত্রাস ও সহিংসতা পরিত্যাগ এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের অঙ্গীকার করে।
ইসরায়েল ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তার সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়।
স্বীকৃতির দুই দিক এক ছিল না
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করেছিল। ইসরায়েল তখন স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি; স্বীকৃতি দিয়েছিল ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনকে।
তবুও পরিবর্তনটি মৌলিক ছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আলোচনার বৈধ অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করার ফলে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের দরজা খুলে যায়।
রাবিনের সমর্থকেরা মনে করতেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘ সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিরোধীরা আশঙ্কা করতেন, ক্ষমতা হস্তান্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা দুর্বল করবে। ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও মতভেদ ছিল: কেউ এটিকে স্বশাসনের ভিত্তি, অন্যরা দখল অবসানের নিশ্চয়তাহীন ছাড় হিসেবে দেখতেন।
এই ভিন্ন প্রত্যাশা পরবর্তী বাস্তবায়নকে কঠিন করে তোলে।
অসলো চুক্তিতে কী ছিল এবং কী বাদ পড়েছিল?
নীতিঘোষণায় পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তী স্বশাসনের ব্যবস্থা তৈরির কথা ছিল। একটি নির্বাচিত পরিষদ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা রাখা হয়। অন্তর্বর্তী সময় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হওয়ার কথা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বেসামরিক ক্ষেত্রের দায়িত্ব ধাপে ধাপে ফিলিস্তিনিদের কাছে দেওয়ার পথ তৈরি হয়। গাজা ও জেরিকো থেকে প্রাথমিক প্রত্যাহারের ব্যবস্থাও চুক্তির অংশ ছিল।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো পরে রাখা হয়
জেরুজালেম, শরণার্থী, ইসরায়েলি বসতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সীমান্তের মতো বিষয় চূড়ান্ত মর্যাদার আলোচনার জন্য স্থগিত থাকে। সেই আলোচনা অন্তর্বর্তী সময়ের তৃতীয় বছরের মধ্যে শুরু করার কথা ছিল।
পদ্ধতিটির যুক্তি ছিল, ছোট পদক্ষেপে সহযোগিতা ও আস্থা বাড়লে কঠিন প্রশ্ন সমাধান সহজ হবে। কিন্তু দুর্বলতাও ছিল: মানুষ দৈনন্দিন পরিবর্তন পেলেও সংঘাতের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর উত্তর পায়নি।
চুক্তিতে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট নিশ্চয়তা কিংবা তখনই বসতি নির্মাণ বন্ধের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। ফলে দুই পক্ষ একই প্রক্রিয়াকে ভিন্ন ভবিষ্যতের পথে যাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারত।
এখানে নিরাপত্তা ও ক্ষমতার অসম অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল ছিল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সামরিক শক্তি; ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব সীমিত প্রশাসনিক কর্তৃত্ব অর্জন করছিল। কাগজে সমঝোতা হলেও বাস্তব ক্ষমতা সমান ছিল না।
বাস্তবায়ন, সহিংসতা ও রাবিনের রাজনৈতিক ঝুঁকি
১৯৯৪ সালের কায়রো চুক্তি গাজা ও জেরিকোসংক্রান্ত ব্যবস্থা এগিয়ে নেয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আরাফাত ফিরে আসেন। প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
১৯৯৫ সালের দ্বিতীয় অসলো চুক্তি পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা নির্ধারণ করে। কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক ও নিরাপত্তা কর্তৃত্ব, কিছুতে ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলি নিরাপত্তা দায়িত্ব এবং অন্য এলাকায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
সহযোগিতার পাশে আস্থার ক্ষয়
এই অগ্রগতির মধ্যেও সহিংসতা থামেনি। ১৯৯৪ সালে হেবরনে ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের হত্যাকাণ্ড এবং হামাসের বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা পারস্পরিক ভয় ও ক্ষোভ বাড়ায়। হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ড পৃথক হলেও শান্তির পক্ষে জনসমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাবিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলে তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন ও উসকানিমূলক প্রচার চলতে থাকে। তবে চুক্তির সমালোচনা এবং হত্যাকারীর সহিংস সিদ্ধান্তকে এক করে দেখা উচিত নয়।
রাবিন, পেরেস ও আরাফাত ১৯৯৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ঘরের বিরোধ দূর করতে পারেনি।
১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর তেল আবিবে শান্তিসমাবেশের পর রাবিনকে হত্যা করে ইসরায়েলি চরমপন্থী ইয়িগাল আমির। সে অসলো প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিল। এই হত্যাকাণ্ড শান্তিপ্রক্রিয়ার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ভিত্তিতে গুরুতর আঘাত করে।
অসলো কি ব্যর্থতা, নাকি অসমাপ্ত সুযোগ?
অসলো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নির্ধারিত সময়ে চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। পরবর্তী আলোচনা, রাজনৈতিক পরিবর্তন, সহিংসতা এবং বাস্তবায়নের বিরোধ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে।
তবে রাবিনের হত্যাকাণ্ডকেই সব ব্যর্থতার একমাত্র কারণ বলা ইতিহাসকে সরল করে। চুক্তির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অমীমাংসিত দাবি, বসতি নিয়ে বিরোধ এবং নিরাপত্তার সংকট আগে থেকেই ছিল।
যা বদলেছিল, যা বদলায়নি
অসলো আনুষ্ঠানিক ইসরায়েলি–ফিলিস্তিনি আলোচনা এবং ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গঠনের ভিত্তি দেয়। কিন্তু স্বশাসন সার্বভৌমত্বের সমান হয়নি, আর প্রতিনিধিত্বের স্বীকৃতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে পরিণত হয়নি।
রাবিন বেঁচে থাকলে শান্তি নিশ্চিত হতো—এমন দাবি যাচাই করা যায় না। বলা যায়, তাঁর মৃত্যু একজন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণকারীকে সরিয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে দেয়।
অসলোর শিক্ষা হলো, ঐতিহাসিক করমর্দন দরজা খুলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার জন্য বাস্তব পরিবর্তন, নির্ভরযোগ্য বাস্তবায়ন এবং কঠিন প্রশ্নের উত্তর দরকার। রাবিনের ঝুঁকি ছিল প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনা বেছে নেওয়া; প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ছিল সেই আলোচনাকে নিশ্চিত চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়া।
সুন্দরবন কীভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলকে রক্ষা করে?
মাউন্ট ফুজি: জাপানের শঙ্কু আকৃতির আগ্নেয়গিরি এত বিখ্যাত কেন?
ক্যাস্পিয়ান সাগর: নাম সাগর হলেও কেন এটি পৃথিবীর বৃহত্তম হ্রদ?
নীল নদ: হাজার বছর ধরে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার জীবন ও সভ্যতা গড়ে তোলার গল্প
গ্রিনল্যান্ড: পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপের অধিকাংশ বরফে ঢাকা কেন?
১১ সেপ্টেম্বরের হামলা: ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটেছিল এবং বিশ্ব কীভাবে বদলে গেল?