বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অপারেশন কনডর: দক্ষিণ আমেরিকার স্বৈরশাসকদের সীমান্তপারের গোপন দমনযন্ত্র

অপারেশন কনডর: দক্ষিণ আমেরিকার স্বৈরশাসকদের সীমান্তপারের গোপন দমনযন্ত্র
রাজনৈতিক আশ্রয়ের সীমান্তও যেখানে স্বৈরশাসনের অনুসরণ থামাতে পারেনি।

নির্বাসনেও নিরাপত্তা ছিল না

সত্তরের দশকে দক্ষিণ আমেরিকার বহু রাজনৈতিক কর্মীর কাছে প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে যাওয়া ছিল বাঁচার উপায়। নিজের দেশের সামরিক শাসন থেকে দূরে গেলে অন্তত গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের আশঙ্কা কমবে—এমন আশা ছিল তাঁদের। অপারেশন কনডর সেই আশ্রয়কে বিপজ্জনক করে তোলে। এক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা অন্য দেশের সহায়তায় নির্বাসিত বিরোধীকে খুঁজে বের করতে, অপহরণ করতে এবং গোপনে সরিয়ে নিতে পারত।

অপারেশন কনডর ছিল দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি স্বৈরশাসনের মধ্যে গড়ে ওঠা গোয়েন্দা ও দমনমূলক সহযোগিতাব্যবস্থা। এর সবচেয়ে সক্রিয় সময় সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ, যদিও সংশ্লিষ্ট সহযোগিতা ও অপরাধের ইতিহাস আশির দশকেও বিস্তৃত।

একটি সংগঠন, বহু রাষ্ট্রের যন্ত্র

এটি কোনো একক সেনাবাহিনী বা প্রকাশ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক, পুলিশ ও গোয়েন্দা কাঠামো পরস্পরের সঙ্গে কাজ করত। তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে যৌথ অভিযান ও গোপন বন্দি স্থানান্তর পর্যন্ত সহযোগিতা বিস্তৃত ছিল।

সব দেশ একই সময়ে বা সমান মাত্রায় অংশ নেয়নি। আবার সংশ্লিষ্ট স্বৈরশাসনগুলোর প্রতিটি অপরাধও কনডরের অভিযান ছিল না। দেশীয় দমন এবং আন্তদেশীয় সমন্বিত অপরাধ আলাদা করে বোঝা জরুরি।

স্নায়ুযুদ্ধের পটভূমি ও কনডরের প্রতিষ্ঠা

দক্ষিণ আমেরিকার সামরিক শাসকেরা নিজেদের কমিউনিজম ও বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কিউবার বিপ্লব, বামপন্থী সংগঠন এবং সশস্ত্র আন্দোলন তাঁদের নিরাপত্তাচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের শত্রুর সংজ্ঞা ক্রমে অনেক বিস্তৃত হয়।

শুধু সশস্ত্র যোদ্ধা নয়, শ্রমিকনেতা, ছাত্র, রাজনৈতিক বিরোধী এবং নির্বাসিত সমালোচকেরাও নজরদারির লক্ষ্য হন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মত প্রকাশকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।

সান্তিয়াগোর গোপন বৈঠক

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের শেষে চিলির সান্তিয়াগোতে গোয়েন্দা প্রতিনিধিদের বৈঠক কনডরের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। আয়োজক ছিল অগুস্তো পিনোশের শাসনের গোপন পুলিশ দিনা, যার প্রধান ছিলেন মানুয়েল কনত্রেরাস।

প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থায় চিলি, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়া যুক্ত ছিল। ব্রাজিল ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিক সদস্য হয়। পরে সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়ে।

এই বৈঠকের আগেও সীমান্তপারের দমনমূলক সহযোগিতা ছিল। কনডর সেই বিচ্ছিন্ন সম্পর্ককে বেশি নিয়মিত ও সংগঠিত কাঠামো দেয়। ফলে একজন বিরোধীর ওপর নজর রাখা আর শুধু তাঁর নিজের দেশের সংস্থার কাজ থাকল না; প্রতিবেশী রাষ্ট্রের তথ্য ও লোকবলও ব্যবহার করা সম্ভব হলো।

তথ্যভান্ডার থেকে অপহরণ: ব্যবস্থাটি কীভাবে চলত?

কনডরের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল তথ্য। কোন ব্যক্তি কোথায় থাকেন, কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কোথায় যাতায়াত করেন—এসব বিনিময় করা হতো। যৌথ যোগাযোগব্যবস্থা তথ্য দ্রুত পাঠানো ও অভিযানের সমন্বয়ে সাহায্য করত।

রাষ্ট্রগুলোর কাছে নির্বাসিত বিরোধীরা সীমান্ত পেরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও তাই সীমান্তের মধ্যে আটকে রাখা হয়নি।

প্রকাশ্য আইনকে পাশ কাটানো

বৈধ প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আদালত, প্রমাণ ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকে। কনডরের অভিযানে প্রায়ই এসব এড়িয়ে গোপনে মানুষকে আটক ও স্থানান্তর করা হতো। পরিবারের কাছে গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি না থাকায় আইনগত প্রতিকার চাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ত।

গুমের এই পদ্ধতি শুধু বন্দিকে আঘাত করত না। স্বজনেরা জানতেন না তিনি জীবিত কি না, কোথায় আছেন বা কোন কর্তৃপক্ষের কাছে যাবেন। অনিশ্চয়তা নিজেই দীর্ঘস্থায়ী দমনের উপায় হয়ে উঠত।

আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের অটোমোতোরেস অর্লেত্তি ছিল আন্তদেশীয় দমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোপন আটককেন্দ্র। সেখানে আর্জেন্টিনীয় ও উরুগুয়ীয় কর্মকর্তাদের সহযোগিতার প্রমাণ পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে আসে।

কিছু গোয়েন্দা নথিতে সদস্যদেশের বাইরেও বিশেষ দল পাঠিয়ে হত্যার পরিকল্পনার কথা রয়েছে। ফলে দমনের পরিসর দক্ষিণ আমেরিকার সীমানাতেও সীমিত ছিল না।

ওয়াশিংটনে হত্যাকাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞাতসার

১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে গাড়িবোমায় নিহত হন চিলির সাবেক মন্ত্রী ও কূটনীতিক ওরলান্দো লেতেলিয়ের এবং তাঁর মার্কিন সহকর্মী রনি মফিট। লেতেলিয়ের ছিলেন পিনোশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাসিত বিরোধী। হত্যাকাণ্ডে চিলির গোপন পুলিশ দিনার সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই ঘটনা কনডরের আন্তর্জাতিক দমননীতির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। একটি বিদেশি স্বৈরশাসনের বিরোধীকে মার্কিন রাজধানীতে হত্যা করা হয়েছিল—রাজনৈতিক আশ্রয়ের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর হয়ে উঠেছিল, তা স্পষ্ট করে দেয় ঘটনাটি।

ওয়াশিংটন কী জানত?

প্রকাশিত মার্কিন গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নথি দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কনডরের সহযোগিতা এবং হত্যামূলক পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিলেন। কিছু কর্মকর্তা বিপদ বুঝে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে সতর্ক করার উদ্যোগও নেন।

তবে পরিকল্পিত সতর্কবার্তা যথাযথভাবে পৌঁছানো হয়নি। এই ব্যর্থতা লেতেলিয়ের হত্যাকাণ্ডের আগে সম্ভাব্য প্রতিরোধের সুযোগ হারানোর প্রশ্ন তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচনা করতে তথ্য জানা, রাজনৈতিক সমর্থন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং নির্দিষ্ট হত্যার নির্দেশ দেওয়া—এসব পৃথক করতে হবে। নথি গুরুত্বপূর্ণ দায় ও ব্যর্থতা দেখায়, কিন্তু সব অভিযান ওয়াশিংটন সরাসরি পরিচালনা করেছে—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া টানা যায় না।

গোপন নথি কীভাবে অপরাধের প্রমাণ হয়ে উঠল?

স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ বহুদিন ধরে ভুক্তভোগী, পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের অস্বীকারের সামনে তাঁদের সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন ছিল। পরে সরকারি নথি উদ্ধার ও গোপন তথ্য প্রকাশ সেই সংগ্রামকে নতুন শক্তি দেয়।

প্যারাগুয়েতে ১৯৯২ সালে আবিষ্কৃত দমনসংক্রান্ত নথিসংগ্রহ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকারকর্মী মার্তিন আলমাদার অনুসন্ধান এতে বড় ভূমিকা রাখে। সংগ্রহটি ‘সন্ত্রাসের আর্কাইভ’ নামে পরিচিত হয়।

রাষ্ট্রের নিজের কাগজে রাষ্ট্রের অপরাধ

এই নথিতে নজরদারি, বন্দি, যোগাযোগ এবং সীমান্তপারের সহযোগিতার তথ্য পাওয়া যায়। ফলে কনডরকে শুধু সন্দেহ বা মৌখিক অভিযোগ হিসেবে দেখানোর সুযোগ কমে।

তবে একটি নথি একা পুরো ঘটনা প্রমাণ করে না। আদালতে তার উৎস, তারিখ এবং অন্য সাক্ষ্যের সঙ্গে মিল পরীক্ষা করা হয়। বেঁচে ফেরা বন্দিদের বিবরণ, কর্মকর্তাদের নথি এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনার তথ্য একত্রে অপরাধের কাঠামো বোঝায়।

ইউনেস্কো নথিসংগ্রহটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মূল্য শুধু গবেষণায় নয়; হারিয়ে যাওয়া মানুষের পরিচয় ও পরিণতি খুঁজতে এবং বিচার প্রতিষ্ঠাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

কনডরের নির্দিষ্ট শিকারসংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামগ্রিক দমনের শিকারসংখ্যা এক করে দেওয়া উচিত নয়। দুই ধরনের হিসাবের পরিধি আলাদা।

বিচার, স্মৃতি ও কনডরের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার

গণতন্ত্র ফিরে এলেও বিচার দ্রুত শুরু হয়নি। ক্ষমতার পুরোনো কাঠামো, দায়মুক্তির ব্যবস্থা এবং নথির অভাব বাধা তৈরি করে। পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বিভিন্ন দেশে মামলা এগোয়।

আর্জেন্টিনায় কনডর ও অর্লেত্তিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিচার ২০১৩ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের ২৭ মে রায়ে পৌঁছায়। বিচারপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জাতীয়তার ১৭৪ জন ভুক্তভোগীর ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। একাধিক সাবেক কর্মকর্তা দণ্ডিত হন।

সীমান্তপারের অপরাধের দায়

এই বিচার দেখায়, অন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা অপরাধের দায় মুছে দেয় না। কোনো গোপন সমঝোতা অপহরণ, নির্যাতন বা গুমকে বৈধ করে না। অপরাধের প্রমাণও এক দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

অপারেশন কনডরের বিশেষত্ব ছিল রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতাকে মানুষের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। আশ্রয় নেওয়া দেশই যখন অপহরণে সহায়তা করে, তখন নির্বাসিত মানুষের কাছে পালানোর পথও সংকুচিত হয়ে যায়।

এই ইতিহাসের উত্তরাধিকার তাই শুধু স্বৈরশাসকদের বিচার নয়। রাজনৈতিক আশ্রয়, আইনগত প্রত্যর্পণ, গোয়েন্দা সহযোগিতার জবাবদিহি এবং নিখোঁজ মানুষের সত্য জানার অধিকার—এসব রক্ষার প্রয়োজনও কনডর সামনে নিয়ে আসে।