লিন জেশু ও হুমেনে আফিম ধ্বংস: প্রথম আফিম যুদ্ধের সূচনা
সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত
হুমেনে নিষিদ্ধ আফিম ধ্বংস থেকে দুই সাম্রাজ্যের যুদ্ধের পথে যাত্রা।
চীনের ভূখণ্ডে বিদেশি ব্যবসায়ীদের চীনের আইন মানতে বাধ্য করা যাবে কি না—আগের ঘটনাপ্রবাহ এসে এই প্রশ্নেই দাঁড়িয়েছিল। ১৮৩৯ সালের মার্চে গুয়াংঝৌতে পৌঁছে লিন জেশু তার বাস্তব উত্তর দেওয়ার উদ্যোগ নেন। সম্রাট দাওগুয়াং তাঁকে বিশেষ কমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন আফিমের বিস্তার বন্ধ করতে। তাঁর সামনে ছিল বিদেশি সরবরাহকারী, চীনা চোরাকারবারি এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিশাল ব্যবসা। এই ব্যবস্থাকে ভাঙতে গিয়েই একটি মাদকবিরোধী অভিযান আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসে।
লিন জেশু ছিলেন অভিজ্ঞ প্রশাসক। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করার সময় তিনি রাজস্ব, জনজীবন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। আফিম সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগও তাই শুধু নৈতিক আপত্তিতে সীমিত ছিল না। আসক্তি সৈন্যদের কর্মক্ষমতা দুর্বল করতে পারে, পরিবারের সম্পদ নিঃশেষ করতে পারে এবং রুপার বহির্গমন রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে—এই আশঙ্কাগুলো তাঁর অবস্থানকে কঠোর করেছিল। বিদেশিদের বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে সম্রাটের আইন কার্যকর করাকে তিনি অগ্রাধিকার দেন।
গুয়াংঝৌতে এসে লিন প্রথমে দেশীয় ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ান। আফিম বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান, মজুত ও ধূমপানের সরঞ্জাম উদ্ধার এবং ব্যবহারকারীদের অভ্যাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও সতর্ক করা হয়। কারণ বিদেশি জাহাজ থেকে মাদক নামলেও চীনা মধ্যস্থতাকারী ও স্থানীয় সুরক্ষা ছাড়া তা দেশের ভেতরে ছড়াতে পারত না। দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা ভাঙা এবং বিদেশি মজুত বন্ধ করা—দুটি কাজকে তিনি একই অভিযানের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
মার্চের মাঝামাঝি লিন বিদেশি বণিকদের কাছে তাঁদের আফিম সমর্পণের দাবি জানান। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আফিম না আনার লিখিত অঙ্গীকার চান। অঙ্গীকার ভাঙলে পণ্য বাজেয়াপ্ত এবং কঠোর শাস্তির বিধান থাকবে। এই দাবি ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের ছিল, কারণ তাঁদের লাভজনক ব্যবসার ভবিষ্যৎই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। চীনের অনুমোদিত কোহং বণিকদের ওপরও চাপ দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কমিশনারের নির্দেশ কার্যকর করাতে সাহায্য করেন।
বিদেশি বণিকদের প্রাথমিক সাড়া লিনকে সন্তুষ্ট করেনি। তিনি গুয়াংঝৌর বিদেশি বাণিজ্যকুঠি এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সেখানকার সরবরাহ ও কর্মচারীদের সেবা বন্ধ করার ব্যবস্থা নেন। ফলে বাণিজ্যিক চাপ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকটে রূপ নেয়। সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সবাই সরাসরি আফিমের মালিক ছিলেন না। একটি নিষিদ্ধ ব্যবসা বন্ধ করার অভিযানে সমগ্র বিদেশি বাণিজ্যসমাজকে চাপে ফেলা ব্রিটিশ অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই অবস্থায় ব্রিটিশ বাণিজ্যের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক চার্লস এলিয়ট ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি ছিলেন, ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নন। অবরুদ্ধ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি তাঁদের আফিম তাঁর কাছে সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের নামে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেন। কিন্তু এমন বিপুল ক্ষতিপূরণের জন্য লন্ডনের পূর্বানুমোদন তাঁর ছিল না। সংকট সামাল দিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী বিরোধের চরিত্রই বদলে দেয়।
এলিয়টের পদক্ষেপের আগে বিষয়টি ছিল চীনের আইন ভেঙে ব্যবসা করা ব্যক্তিদের মজুত বাজেয়াপ্ত করার প্রশ্ন। তাঁর প্রতিশ্রুতির পরে সেই ক্ষতি ব্রিটিশ সরকারের দায় ও দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়। ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্দেশে সম্পত্তি সমর্পণ করেছেন—এই যুক্তি সামনে আসে। অন্যদিকে চীনা প্রশাসনের কাছে সেগুলো ছিল নিষিদ্ধ মাদক। একই আফিমকে চীন দেখছিল বেআইনি পণ্য হিসেবে, আর ব্রিটিশ পক্ষ তার বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দাবি করার ভিত্তি তৈরি করছিল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে জাহাজে থাকা আফিম সংগ্রহ করে চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সমর্পণের বহুল ব্যবহৃত হিসাব অনুযায়ী এর পরিমাণ ছিল ২০,২৮৩ সিন্দুক। সিন্দুকের ধরন ও ওজনের পার্থক্যের কারণে মোট ওজনের হিসাবে ভিন্নতা দেখা যায়, তবে মজুতটি ছিল বিপুল। প্রশাসনকে পণ্য গণনা, পরিবহন ও পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। এত বড় চালান হাতে পাওয়ার পরে লিনের সামনে প্রশ্ন ছিল: এটি কীভাবে ধ্বংস করলে আবার বাজারে ফেরার সুযোগ বন্ধ হবে?
ধ্বংসের জন্য বেছে নেওয়া হয় পার্ল নদীর মোহনার কাছে হুমেন। স্থানটি গুয়াংঝৌর সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হওয়ায় এর প্রতীকী তাৎপর্যও ছিল। যে জলপথে আফিম আসত, সেখানেই তা প্রকাশ্যে নষ্ট করা হবে। ১৮৩৯ সালের ৩ জুন থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত, মোট তেইশ দিন এই কাজ চলে। লিন ও অন্যান্য কর্মকর্তা তদারকি করেন। এটি গোপনে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না; দৃশ্যমানভাবে নিষিদ্ধ মজুত ধ্বংস করার প্রশাসনিক প্রদর্শনও ছিল।
ঘটনাটিকে প্রায়ই আফিম পোড়ানো বলা হয়, কিন্তু প্রধান পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। আফিমের প্যাকেট খুলে টুকরা করে বড় জলাধার বা গর্তে ফেলা হয়। সেখানে পানি, লবণ ও চুন ব্যবহার করে মিশ্রণ তৈরি করা হয়; শ্রমিকেরা তা নেড়ে আফিম নষ্ট করেন। পরে অবশিষ্ট মিশ্রণ সমুদ্রের দিকে নিষ্কাশন করা হয়। হুমেনের ঘটনাকে বিশাল অগ্নিকুণ্ডে সিন্দুক পোড়ানোর দৃশ্য হিসেবে কল্পনা করলে প্রকৃত প্রক্রিয়াটি ভুল বোঝা হয়।
লিন বিদেশি শাসকদের কাছেও নিজের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করেন। রানি ভিক্টোরিয়াকে উদ্দেশ করে লেখা তাঁর চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়, লাভের জন্য চীনে ক্ষতিকর মাদক সরবরাহ কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে চিঠিটি রানির হাতে পৌঁছেছিল—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাঁর বক্তব্যের নৈতিক শক্তি ছিল, কিন্তু ব্রিটেনেও তখন আফিম চিকিৎসা ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হতো। ফলে দুই দেশের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ একই ধরে তাঁর যুক্তি মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
হুমেনে ধ্বংস শেষ হলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। লিনের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতের আফিম সরবরাহও বন্ধ করা। এলিয়ট কঠোর শাস্তির শর্তযুক্ত অঙ্গীকারে ব্রিটিশদের স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেন। বৈধ পণ্যবাহী জাহাজের ব্যবসাও এই বিরোধে আটকে যায়। ব্রিটিশ বণিকসমাজ গুয়াংঝৌ ছেড়ে প্রথমে মাকাও এবং পরে হংকংয়ের আশপাশের জাহাজে আশ্রয় নেয়। তখন হংকং দ্বীপ ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল না; সেটি ছিল চীনা ভূখণ্ডের কাছাকাছি একটি আশ্রয়স্থল।
জুলাইয়ে কাউলুনে মাতাল বিদেশি নাবিকদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সংঘর্ষে লিন ওয়েইসি নামে এক চীনা ব্যক্তি নিহত হন। চীনা কর্তৃপক্ষ অপরাধীকে বিচারের জন্য সমর্পণের দাবি জানায়। এলিয়ট নিজস্ব তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও চীনা আদালতে অভিযুক্তকে তুলে দেননি। এতে মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে ফৌজদারি বিচার ও এখতিয়ারের বিরোধ যুক্ত হয়। কোনো বিদেশি চীনে অপরাধ করলে তার বিচার কে করবে—এই প্রশ্নও দুই পক্ষের অবস্থানকে আরও অনমনীয় করে তোলে।
খাদ্য ও অন্যান্য সরবরাহে বাধা, জাহাজ চলাচলের বিরোধ এবং পারস্পরিক চাপের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে কাউলুনের কাছে সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটে। নভেম্বরের শুরুতে চুয়ানবির কাছে ব্রিটিশ ও চীনা নৌবাহিনীর মধ্যে আরেকটি সংঘর্ষ হয়। তাই ৩ জুন আফিম ধ্বংস শুরু হওয়াকেই সরাসরি যুদ্ধের প্রথম গুলি বলা যায় না। ঘটনাটি সংকটের কেন্দ্রীয় মোড় ছিল; তার পরে কয়েক মাস ধরে বিচার, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার বিরোধ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
লন্ডনে পৌঁছানো সংবাদে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি, অবরুদ্ধ ব্রিটিশদের দুর্দশা এবং সরকারি প্রতিনিধির মর্যাদার প্রশ্ন গুরুত্ব পায়। বিদেশসচিব পামারস্টনের নেতৃত্বে সরকার ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা আদায়ে শক্তি ব্যবহারের পথে এগোয়। ব্রিটেনে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও ছিল; আফিম ব্যবসার নৈতিকতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। কিন্তু সরকার শেষ পর্যন্ত নৌ-অভিযানের প্রস্তুতি নেয়। ১৮৪০ সালের মাঝামাঝি ব্রিটিশ অভিযাত্রী বহর চীনের উপকূলে এসে পৌঁছালে সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে প্রবেশ করে।
লিন জেশু হুমেনে নিষিদ্ধ মজুত ধ্বংস করেছিলেন সম্রাটের আইন কার্যকর করতে। সেই পদক্ষেপকে যুদ্ধের অজুহাত ও দাবির ভিত্তিতে পরিণত করার পেছনে ছিল ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিরোধ। আফিম ধ্বংস যুদ্ধকে অনিবার্য করে দিয়েছিল—এমন বক্তব্য তাই মানুষের সিদ্ধান্তগুলো আড়াল করে। এখন চীনের সামনে হাজির হলো আরও কঠিন পরীক্ষা: উপকূলে আসা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজকে তার দুর্গ, নৌবাহিনী ও প্রশাসন কীভাবে মোকাবিলা করবে?
লারেস, পেনেটেস ও গৃহদেবতা: রোমান পরিবারের উপাসনার জগৎ
কিউপিড ও সাইকির প্রেমকাহিনি: অভিশাপ, চার পরীক্ষা ও অমর মিলন
হারকিউলিসের রোমান কিংবদন্তি: বারোটি শ্রম ও ইতালির দানববধ
কন্টিনেন্টাল সিস্টেম: ব্রিটেনকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য কেন বিপদে পড়েছিল?
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য