হারকিউলিসের রোমান কিংবদন্তি: বারোটি শ্রম ও ইতালির দানববধ
সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি
গ্রিক বীর হারকিউলিসের অভিযাত্রা ইতালিতে এসে রোমের পবিত্র স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
বাক্কাসের কাহিনি দেখিয়েছিল, দেবতার শক্তি মানুষের পরিচয় ও আত্মসংযমকে কত সহজে বদলে দিতে পারে। কিন্তু রোমান পুরাণে এমন এক বীরও ছিলেন, যিনি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়াবহ পরিণতি বহন করে অসাধ্য কাজের পথে নামেন। তিনি হারকিউলিস—গ্রিক হেরাক্লেসের রোমান পরিচয়। তাঁর শক্তি ছিল অতিমানবীয়, অথচ জীবন নিরাপদ ছিল না। দেবীর ক্রোধ, রাজাধীনে শ্রম, দানবের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং ব্যক্তিগত শোক তাঁকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। রোমানরা এই বিদেশি বীরকে গ্রহণ করে নিজেদের ভূমি, ধর্মীয় আচার এবং নগরের জন্মপূর্ব ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
হারকিউলিস ছিলেন জুপিটার ও মানবী আলকমেনের সন্তান। এই জন্ম তাঁকে দৈব শক্তি দিলেও জুনোর বিরোধিতার মুখে ফেলেছিল। শিশুকালে তাঁর শয্যায় পাঠানো সাপকে নিজের হাতে শ্বাসরোধ করার গল্প ভবিষ্যৎ শক্তির প্রথম প্রকাশ। তবে দেবতার সন্তান হওয়া মানেই দেবতাদের সুরক্ষা পাওয়া নয়। জুনোর শত্রুতা তাঁর জীবনের দীর্ঘ ছায়া। গ্রিক কাহিনি রোমান ভাষায় রূপান্তরিত হলে জিউস ও হেরার স্থানে জুপিটার ও জুনো আসেন, কিন্তু বীরের দুঃখের কাঠামো অনেকটাই বজায় থাকে। দৈব জন্ম এখানে বিশেষ সুবিধার পাশাপাশি দুর্ভোগের কারণও।
বারোটি শ্রমের পেছনে রয়েছে তাঁর পরিবারের এক মর্মান্তিক বিপর্যয়। বহুল পরিচিত কাহিনিতে দেবীর প্রভাবে উন্মত্ত হয়ে হারকিউলিস নিজের সন্তানদের হত্যা করেন; কিছু বর্ণনায় স্ত্রী মেগারাও নিহত হন। পরে তাঁকে ইউরিসথেউসের অধীনে কঠিন কাজ করতে হয়। তবে উন্মত্ততা ও শ্রমের ঘটনাক্রম সব প্রাচীন রচনায় এক নয়। বারোটি শ্রমকে শুধু বীরের স্বেচ্ছায় দুঃসাহসিক ভ্রমণ বলা তাই অসম্পূর্ণ। এগুলোর মধ্যে প্রায়শ্চিত্ত, বাধ্যতা এবং এমন এক মানুষের সংগ্রাম আছে, যিনি নিজের শক্তি দিয়েই অতীতের ক্ষতি মুছে ফেলতে পারেন না।
প্রথম শ্রম ছিল নেমিয়ান সিংহ বধ। সাধারণ অস্ত্র তার দুর্ভেদ্য চামড়া ভেদ করতে না পারায় হারকিউলিস তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে সেই চামড়াই তাঁর পরিচিত আবরণ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় শ্রমে লের্নার হাইড্রার মাথা কাটলে নতুন মাথা জন্মাত। সহযোগী ইওলাউস কাটা ঘাড় আগুনে দগ্ধ করে পুনর্জন্ম ঠেকান। এই বিজয় শুধু পেশিশক্তির নয়, কৌশল ও সহযোগিতারও ফল। হাইড্রার বিষে তীর মাখিয়ে হারকিউলিস ভবিষ্যতের অস্ত্র পান, কিন্তু সেই বিষই তাঁর জীবনের শেষ বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।
তৃতীয় শ্রমে সেরিনিয়ান হরিণকে জীবিত ধরতে হয়েছিল। দেবী ডায়ানার গ্রিক সমতুল্য আর্টেমিসের পবিত্র এই প্রাণীকে আঘাত না করে আটকানোর কাজ বীরের সংযম পরীক্ষা করে। চতুর্থ শ্রমে এরিমান্থিয়ান বন্য শূকরকে জীবিত ধরে আনা ছিল লক্ষ্য। বরফের মধ্যে তাকে তাড়িয়ে আটকে ফেলার কাহিনি এখানে শক্তির সঙ্গে পরিবেশ ব্যবহারের বুদ্ধি দেখায়। ইউরিসথেউসের আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়াও পরিচিত। যিনি শ্রমের নির্দেশ দেন, তিনি নিজে বিপদের সামনে দাঁড়াতে পারেন না—এই বৈপরীত্য বীর এবং কর্তৃত্বের সম্পর্ককে বিদ্রূপের ছায়া দেয়।
পঞ্চম শ্রম ছিল আউগিয়াসের বিপুল গোয়ালঘর এক দিনে পরিষ্কার করা। হারকিউলিস নদীর প্রবাহ ঘুরিয়ে জমে থাকা ময়লা সরিয়ে দেন। ষষ্ঠ শ্রমে স্টিম্ফালিয়ান পাখিদের মোকাবিলায় দেবী মিনার্ভার গ্রিক সমতুল্য এথেনার দেওয়া শব্দকারী যন্ত্র কাজে লাগে; পাখিদের আড়াল থেকে উড়িয়ে তিনি আক্রমণ করেন। প্রচলিত বিবরণে হাইড্রা বধে সহযোগিতা নেওয়া এবং গোয়াল পরিষ্কারের বিনিময়ে পুরস্কার দাবি করার কারণে ইউরিসথেউস দুটি কাজ গ্রহণ করেননি। ফলে দশটির বদলে বারোটি শ্রম সম্পন্ন করতে হয়। বীরের সাফল্যও ক্ষমতাবানের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করেছিল।
সপ্তম শ্রমে ক্রিটের ষাঁড়কে আটকাতে হয়। অষ্টম শ্রমে আসে ডায়োমিডেসের মানুষখেকো ঘোড়া, যাদের হিংস্রতা তাদের মালিকের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে যুক্ত। নবম শ্রমে অ্যামাজন রানি হিপোলিটার কোমরবন্ধ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে হারকিউলিস যাত্রা করেন। কিছু কাহিনিতে রানি সেটি দিতে সম্মত হলেও জুনোর প্ররোচনায় সংঘর্ষ বাধে। এই অভিযানে বীরের সাফল্য রক্তপাত এড়াতে পারে না। শ্রমের তালিকায় জয় মানেই নৈতিকভাবে নিখুঁত আচরণ নয়; প্রতারণা, ভুল বোঝাবুঝি এবং দেবতার হস্তক্ষেপ মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।
দশম শ্রমে সুদূর পশ্চিম থেকে গেরিয়নের গবাদিপশু আনতে হয়। বহু দেহবিশিষ্ট এই প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে পশুর পাল নিয়ে ফেরার দীর্ঘ পথই হারকিউলিসকে ইতালির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দেয়। একাদশ শ্রমে হেসপেরিদেসের সোনালি আপেল সংগ্রহ করতে হয়। একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় অ্যাটলাস আপেল আনতে গেলে হারকিউলিস তাঁর হয়ে আকাশের ভার বহন করেন; পরে বুদ্ধি খাটিয়ে সেই ভার ফিরিয়ে দেন। পৃথিবীর প্রান্তে পৌঁছানো এবং আকাশের বোঝা বহন তাঁর অভিযাত্রাকে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার অনেক বাইরে নিয়ে যায়।
দ্বাদশ শ্রমে পাতালজগৎ থেকে তিন মাথাওয়ালা প্রহরী সেরবেরাসকে আনতে হয়েছিল। মৃত্যু ও জীবনের সীমানা অতিক্রম করা এখানে শেষ পরীক্ষা। প্রচলিত কাহিনিতে পাতালশাসকের অনুমতি এবং অস্ত্র ছাড়া প্রাণীটিকে বশ করার শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেরবেরাসকে দেখানোর পরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ হারকিউলিস পাতালজগৎ ধ্বংস করেন না বা মৃত্যুর নিয়ম বাতিল করেন না। তিনি সীমা অতিক্রম করেন, কিন্তু সেই জগতের অস্তিত্ব স্বীকার করেই ফিরে আসেন। বারোটি শ্রমের ক্রম ও বিবরণে প্রাচীন উৎসভেদে কিছু পার্থক্যও আছে।
রোমানদের কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ স্থানীয় কাহিনি ছিল কাকুস বধ। গেরিয়নের পশু নিয়ে ফেরার সময় হারকিউলিস টাইবারের তীরে বিশ্রাম নেন। অ্যাভেন্টাইন পাহাড়ের গুহাবাসী কাকুস তাঁর কয়েকটি পশু চুরি করে। পদচিহ্ন দেখে যেন গুহার অবস্থান ধরা না পড়ে, সে পশুগুলোকে পেছন দিকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু লুকানো পশুর ডাক চুরির রহস্য প্রকাশ করে। ভার্জিলের বর্ণনায় কাকুস ভালকানের সন্তান, আগুন ও ধোঁয়ার সঙ্গে যুক্ত এক ভয়ংকর সত্তা। হারকিউলিস গুহায় পৌঁছে তাকে হত্যা করেন এবং পশু উদ্ধার করেন।
এই সংঘর্ষ বারোটি শ্রমের আলাদা কোনো সদস্য নয়; দশম শ্রমের প্রত্যাবর্তনপথে যুক্ত একটি ইতালীয় পর্ব। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। রোমানরা এর মাধ্যমে বহিরাগত বীরের অভিযাত্রাকে নিজেদের ভূগোলে স্থাপন করেছে। ভবিষ্যৎ রোমের স্থান তখন দানবের আতঙ্ক থেকে মুক্ত হয়, আর হারকিউলিস হয়ে ওঠেন এলাকার উপকারী রক্ষক। রোম প্রতিষ্ঠার আগেই তার ভূমিতে একটি পবিত্র বিজয় ঘটেছিল—এমন দাবি নগরের মর্যাদা বাড়াত। গুহা, পাহাড়, নদী এবং গবাদিপশুর পথ পৌরাণিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
এভান্ডার ও তাঁর বসতির সঙ্গে হারকিউলিসের সম্পর্ক এই স্থানীয় কাহিনিকে উপাসনায় রূপ দেয়। রোমান পরম্পরায় বিজয়ের স্মৃতি থেকে মহান বেদি, আরা ম্যাক্সিমা, প্রতিষ্ঠার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। ভবিষ্যৎ ফোরাম বোয়ারিয়াম বা গবাদিপশুর বাজার এলাকার সঙ্গে হারকিউলিসের ধর্মীয় উপস্থিতি বিশেষভাবে যুক্ত। তবে পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাকাহিনি উপাসনার প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের বিকল্প নয়। বাণিজ্যপথ, ইতালির বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং গ্রিক যোগাযোগও তাঁর উপাসনা বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল। চুরি করা পশু উদ্ধারকারী বীর তাই বাস্তব সম্পদ ও লেনদেনের জগতেও অর্থবহ হয়ে উঠেছিলেন।
হারকিউলিসের জীবনের শেষ পর্বে তাঁর শক্তি আর রক্ষা করতে পারে না। নেসাসের রক্তকে প্রেম ফিরিয়ে আনার উপায় ভেবে দেইয়ানিরা তাঁর পোশাকে লাগিয়ে দেন; সেই রক্তে হাইড্রার বিষ মিশে ছিল। বিষাক্ত পোশাক অসহনীয় যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। চিতার আগুনে মানবজীবনের অবসানের পরে তিনি দেবত্ব লাভ করেন—কাহিনির পরিচিত ধারায় এভাবেই মর্ত্য ও দেবলোকের দূরত্ব পেরোন। তাঁর উত্তরাধিকার নিছক দানববধ নয়: শ্রম, ভুল, সাহায্য এবং যন্ত্রণার মধ্য দিয়েও মানুষের সীমা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা। রোম সেই আকাঙ্ক্ষাকে নিজের নদীতীরের বেদিতে স্থায়ী স্থান দিয়েছিল।
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য
প্রথম কনসাল থেকে সম্রাট: নেপোলিয়নিক কোড, সংস্কার ও ১৮০৪ সালের অভিষেক
কোকো শ্যানেল: পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে নারীর জীবনধারা বদলে দেওয়ার ইতিহাস
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট: আটলান্টিকজয়ী নারী বৈমানিকের জীবন ও অন্তর্ধানের রহস্য
রোজা লুক্সেমবার্গ: বিপ্লব, গণতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রামের অসাধারণ নারী