বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোজা লুক্সেমবার্গ: বিপ্লব, গণতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রামের অসাধারণ নারী

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

রোজা লুক্সেমবার্গ: বিপ্লব, গণতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রামের অসাধারণ নারী
বিপ্লবের মধ্যেও স্বাধীন চিন্তার অধিকার রক্ষায় আপসহীন রোজা লুক্সেমবার্গ।

১৯১৯ সালের জানুয়ারির বার্লিন ছিল পরাজিত যুদ্ধ, বিপ্লব এবং প্রতিশোধের উত্তাপে অস্থির। রাস্তায় অস্ত্রধারী দল, সংবাদপত্রের পাতায় তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ, আর শ্রমিক মহল্লায় নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন। এই পরিস্থিতিতে রোজা লুক্সেমবার্গ এমন এক কণ্ঠ, যিনি শাসকের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলতেন, নিজের রাজনৈতিক সহযাত্রীদের ভুলের বিরুদ্ধেও তেমনি দাঁড়াতেন। তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব চেয়েছিলেন, কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ ও ভিন্নমতের স্বাধীনতা ছাড়া সেই বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক ছিলেন। তাঁর জীবন তাই শুধু আন্দোলন ও হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস নয়; মুক্তির নামে গড়ে ওঠা ক্ষমতাকেও প্রশ্ন করার ইতিহাস।

১৮৭১ সালের ৫ মার্চ রোজার জন্ম হয় জামোশ্চ শহরে, যা তখন রুশ সাম্রাজ্যের অধীন পোল্যান্ডের অংশ। ইহুদি পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী মেয়ে শৈশব কাটান ওয়ারশতে। তাঁর চারপাশে ছিল সাম্রাজ্যিক শাসন, জাতিগত বৈষম্য এবং রাজনৈতিক নজরদারির পরিবেশ। কৈশোরেই তিনি বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৮৮৯ সালে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় সুইজারল্যান্ডে চলে যান। নির্বাসন তাঁর রাজনৈতিক জীবন থামায়নি; বরং তাঁকে ইউরোপের বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।

জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় তখন নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সেখানে রোজা প্রথমে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৮৯৭ সালে পোল্যান্ডের শিল্পোন্নয়ন নিয়ে গবেষণার জন্য ডক্টরেট অর্জন করেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের পেছনে তাই শুধু আবেগ ছিল না; উৎপাদন, বাজার, শ্রেণিসম্পর্ক ও রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন ছিল। সহকর্মী লেও যোগিখেসের সঙ্গে তিনি পোলিশ সমাজতান্ত্রিক সংগঠন গড়ার কাজেও যুক্ত হন। লেখালেখি, সংগঠন এবং তাত্ত্বিক বিতর্ক তাঁর জীবনে একসঙ্গে এগিয়েছিল।

১৮৯৮ সালে জার্মানিতে যাওয়ার পর রোজা সেখানকার শক্তিশালী সমাজগণতান্ত্রিক দলে সক্রিয় হন। দলটি শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ছিল। এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন মনে করতেন, সংসদীয় অংশগ্রহণ ও ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের দিকে এগোনো সম্ভব। রোজা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর ‘সামাজিক সংস্কার না বিপ্লব?’ রচনায় প্রশ্ন ওঠে: শ্রমিকের জীবন কিছুটা উন্নত হলেই কি উৎপাদন ও সম্পদের ওপর ক্ষমতার পুরোনো কাঠামো বদলে যায়?

রোজা মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমঘণ্টা কমানো কিংবা ভোটাধিকারের বিরোধী ছিলেন না। তাঁর কাছে এসব সংগ্রাম ছিল শ্রমিকের সংগঠন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের অপরিহার্য ক্ষেত্র। আপত্তি ছিল সংস্কারকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানোয়। তিনি আশঙ্কা করতেন, নির্বাচনী সাফল্য ও প্রশাসনিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শ্রমিকদল বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিচালকে পরিণত হতে পারে। এই বিতর্কের তাৎপর্য ছিল গভীর: মানুষের দৈনন্দিন উন্নতির সংগ্রামের সঙ্গে সমাজের মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষ্য কীভাবে যুক্ত থাকবে, সেটিই তিনি জানতে চেয়েছিলেন।

১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লব তাঁর চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করে। রুশশাসিত পোল্যান্ডে তিনি আন্দোলনে অংশ নেন এবং গ্রেপ্তার হন। ধর্মঘট, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক দাবির পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করে তিনি গণধর্মঘট সম্পর্কে লেখেন। তাঁর মতে, বড় আন্দোলন শুধু দলীয় দপ্তরের নির্দেশে তৈরি হয় না। কর্মক্ষেত্রের ক্ষোভ রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিতে পারে, আবার রাজনৈতিক সংঘাত নতুন অর্থনৈতিক আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে। সংগ্রামের মধ্যেই সাধারণ মানুষ সংগঠন, নেতৃত্ব ও সাহস শেখে। তবে এই ধারণা সংগঠনের প্রয়োজন অস্বীকার করেনি; নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের সক্রিয় সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিল।

অর্থনীতিবিদ হিসেবেও রোজা গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করেন। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘পুঁজির সঞ্চয়’ গ্রন্থে তিনি পুঁজিবাদের সম্প্রসারণের সঙ্গে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। তাঁর যুক্তিতে, পুঁজিবাদ নতুন বাজার ও নিজের বাইরের অর্থনৈতিক সমাজকে দখল করার দিকে অগ্রসর হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জীবিকা, জমির সম্পর্ক ও উৎপাদনব্যবস্থা ধ্বংস হতে পারে। তাঁর অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার বিভিন্ন অংশ অন্য অর্থনীতিবিদদের সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তবু ইউরোপের সমৃদ্ধির আলোচনায় উপনিবেশের মানুষের ওপর চাপানো সহিংসতাকে সামনে আনা তাঁর কাজের উল্লেখযোগ্য দিক।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রোজার রাজনৈতিক অবস্থান আরও কঠিন হয়ে ওঠে। জার্মান সমাজগণতান্ত্রিক দলের সংসদীয় প্রতিনিধিরা যুদ্ধের অর্থায়নের পক্ষে ভোট দেন। রোজার কাছে এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির গুরুতর ব্যর্থতা। তিনি মনে করতেন, বিভিন্ন দেশের শ্রমিককে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠিয়ে শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর যুদ্ধবিরোধিতা কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল না; সামরিক প্রতিযোগিতা, সাম্রাজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবন উৎসর্গ করার রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল।

কার্ল লিবকনেখটসহ অন্য যুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে তিনি যে সংগঠিত বিরোধিতা গড়ে তোলেন, তা পরবর্তীকালে স্পার্টাকাস গোষ্ঠীর বিকাশে ভূমিকা রাখে। যুদ্ধের সময় রোজা দীর্ঘদিন বন্দি থাকেন। ১৯১৫ সালে ‘জুনিয়ুস’ ছদ্মনামে লেখা তাঁর পুস্তিকা যুদ্ধের ধ্বংস এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করে। তাঁর আলোচনায় সমাজতন্ত্র অথবা বর্বরতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর অর্থ ছিল, ইতিহাস আপনাআপনি মানবকল্যাণের দিকে এগোবে না; সংগঠিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে আধুনিক সভ্যতাও ব্যাপক ধ্বংসের পথে যেতে পারে।

কারাগারের রোজাকে শুধু কঠোর রাজনৈতিক লেখক হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বন্দিজীবনেও তিনি উদ্ভিদ, পাখি, সাহিত্য এবং প্রকৃতি নিয়ে আগ্রহ ধরে রেখেছিলেন। চিঠি ও নোটে এই সংবেদনশীলতা প্রকাশ পায়। যে মানুষ জনসমাবেশে তীব্র ভাষায় রাষ্ট্রের সমালোচনা করতেন, তিনিই ছোট জীবের কষ্ট ও দৈনন্দিন সৌন্দর্যে গভীরভাবে সাড়া দিতেন। তাঁর মানবিক অনুভূতি রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরের কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না; মানুষের মর্যাদা নিয়ে ভাবনার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল।

নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়েও তাঁর স্পষ্ট অবস্থান ছিল। ক্লারা জেটকিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার পাশাপাশি তিনি নারীর ভোটাধিকারের পক্ষে লিখেছেন। তবে নারীপ্রশ্নকে তিনি প্রধানত শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন। শ্রমজীবী নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ তাঁর কাছে বৃহত্তর মুক্তির আন্দোলনকে শক্তিশালী করার উপায়। তাই তাঁকে কেবল নারী ভোটাধিকারের সংগঠক বললে যেমন কাজের ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়, তেমনি তাঁর চিন্তাকে আজকের সব নারীবাদী ধারণার সমান ধরে নিলেও ঐতিহাসিক পার্থক্য হারিয়ে যায়।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবকে রোজা স্বাগত জানালেও বলশেভিক নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি বিপ্লবের প্রতিকূল পরিস্থিতি বুঝতেন, কিন্তু সংবাদপত্র, সমাবেশ ও রাজনৈতিক মতবিনিময়ের স্বাধীনতা সংকুচিত করার বিপদও দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তিতে, জনগণ ভুল করবে, বিতর্ক করবে এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখবে; সেই সুযোগ বন্ধ হলে ক্ষমতা অল্পসংখ্যক নেতার হাতে জমা হয়। তাঁর কাছে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার ছিল সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির জীবনীশক্তি। এই সমালোচনামূলক রচনা তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়।

১৯১৮ সালের নভেম্বরে জার্মান রাজতন্ত্রের পতনের সময় মুক্ত হয়ে রোজা আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন। লিবকনেখটের সঙ্গে সংবাদপত্র সম্পাদনা করেন এবং জার্মান কমিউনিস্ট দল প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন। কিন্তু বিপ্লবী শিবিরেও কৌশল নিয়ে মতবিরোধ ছিল। ১৯১৯ সালের জানুয়ারির বার্লিন সংঘাতকে শুধু তাঁর পরিকল্পিত বিদ্রোহ বলা যথার্থ নয়। বিভিন্ন সংগঠন, ক্ষুব্ধ শ্রমিক ও বিপ্লবী নেতৃত্ব সেখানে জড়িত ছিল। আন্দোলনের প্রস্তুতি ও শক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাঁর সংশয় থাকা সত্ত্বেও তিনি সংগ্রামরত মানুষের পাশে থাকেন।

সংঘাত দমনের কয়েক দিন পরে, ১৫ জানুয়ারি রোজা ও লিবকনেখটকে আটক করে বার্লিনের এডেন হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের পরে সামরিক সদস্যরা তাঁদের হত্যা করে। রোজাকে গুরুতরভাবে আঘাত করার পর গুলি করা হয় এবং তাঁর দেহ লান্ডভের খালে ফেলে দেওয়া হয়। তখন তাঁর বয়স সাতচল্লিশ। এই মৃত্যু ইউরোপীয় বাম রাজনীতির বিভাজন ও রাজনৈতিক সহিংসতার নির্মম প্রতীক হয়ে ওঠে।

রোজা লুক্সেমবার্গের অসাধারণত্ব শুধু তাঁর সাহস বা মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দলীয় আনুগত্যের মধ্যেও স্বাধীন বিচার বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। শ্রমিকের মুক্তি, যুদ্ধের বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে একই রাজনৈতিক প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর সব বিশ্লেষণ বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না, কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও তীক্ষ্ণ: মানুষের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া আন্দোলন যদি মানুষের কথা বলার অধিকার সংকুচিত করে, তবে সেই মুক্তি কতটা পূর্ণ হতে পারে?


আপনার পছন্দ হতে পারে