বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লোহিত সাগরের নাম ‘লাল’ কেন? এর পানির বিশেষত্ব ও রহস্য

লোহিত সাগরের নাম ‘লাল’ কেন? এর পানির বিশেষত্ব ও রহস্য
নাম লাল, অথচ নীল পানির নিচে বিস্ময়কর এক সামুদ্রিক জগৎ।

লোহিত সাগরের নাম শুনলে চোখের সামনে লাল পানির বিশাল জলরাশি ভেসে উঠতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর অধিকাংশ দৃশ্য অনেক পরিচিত সমুদ্রের মতোই নীল, গাঢ় নীল কিংবা অগভীর উপকূলে ফিরোজা। কোথাও স্বচ্ছ পানির নিচে প্রবাল দেখা যায়, কোথাও গভীর জল এত গাঢ় যে তলদেশের কোনো চিহ্ন থাকে না। তাহলে নামের সঙ্গে রঙের এই অমিল কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে অণুজীব, প্রাচীন ভূগোল এবং ভাষার ইতিহাস একসঙ্গে সামনে আসে। আর পানির বিশেষত্ব বুঝতে হলে দেখতে হয়, মরুভূমির মাঝখানে থাকা এই সাগর কীভাবে পানি হারায়, লবণ জমায় এবং আশ্চর্য সামুদ্রিক জীবনকে টিকিয়ে রাখে।

লোহিত সাগর আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব অংশ ও আরব উপদ্বীপের মাঝখানে বিস্তৃত একটি দীর্ঘ, তুলনামূলক সরু সামুদ্রিক অববাহিকা। এর পশ্চিমে মিসর, সুদান ও ইরিত্রিয়ার উপকূল এবং পূর্বে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের উপকূল রয়েছে। উত্তরে এটি সুয়েজ ও আকাবা উপসাগরের দিকে বিভক্ত হয়েছে। দক্ষিণে বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় জলব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এই বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চারপাশে শুষ্ক ভূমি থাকলেও লোহিত সাগর কোনো বিচ্ছিন্ন হ্রদ নয়। বাইরের সমুদ্রের সঙ্গে পানির আদানপ্রদান তার অস্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে।

নামের সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যাটি হলো পানির ওপর কখনো কখনো দেখা দেওয়া লালচে-বাদামি অণুজীবের বিস্তার। ট্রাইকোডেসমিয়াম এরিথ্রেয়াম নামে পরিচিত এক ধরনের সায়ানোব্যাকটেরিয়া এর সঙ্গে যুক্ত। পুরোনো বর্ণনায় এগুলোকে নীলাভ-সবুজ শৈবাল বলা হলেও আধুনিক জীববিজ্ঞানে এরা ব্যাকটেরিয়ার একটি গোষ্ঠী। অনুকূল পরিস্থিতিতে এরা বিপুল সংখ্যায় বেড়ে পানির ওপর দৃশ্যমান আস্তরণ তৈরি করতে পারে। সেই আস্তরণের রঞ্জক পদার্থ ও অবস্থার কারণে কোনো কোনো অংশ লালচে বা বাদামি দেখায়। দূর থেকে এমন দৃশ্য সমুদ্রের রঙ বদলে যাওয়ার অনুভূতি দিতে পারে।

তবে এই ব্যাখ্যা থেকে “অণুজীবের জন্যই নিশ্চিতভাবে সাগরের নাম লাল হয়েছে” বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ। কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে নামের মিল থাকলেই নামকরণের ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। লালচে অণুজীবের বিস্তার বাস্তব ঘটনা, কিন্তু প্রাচীন মানুষ ঠিক কোন কারণে নামটি গ্রহণ করেছিল, তা নিয়ে মতভেদ আছে। লোহিত সাগরের পুরো পানি সারা বছর লাল থাকে না, এমনকি অধিকাংশ দর্শনার্থী এমন লালচে আস্তরণ দেখেনও না। তাই নামের ব্যাখ্যায় প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ ও ঐতিহাসিক অনিশ্চয়তাকে আলাদা রাখা দরকার।

আরেকটি আলোচিত ধারণা অনুযায়ী, প্রাচীন কিছু সংস্কৃতিতে রং দিয়ে দিক নির্দেশ করা হতো। সেই প্রেক্ষাপটে লাল রং দক্ষিণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আশপাশের লালচে পাহাড় বা ভূমির রঙও নামের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব ধারণা একে অপরের বিকল্প, এবং কোনো একটিকে সর্বসম্মত চূড়ান্ত উত্তর বলা কঠিন। প্রাচীন গ্রিকদের ব্যবহৃত এরিথ্রেয়ান সাগর নামটিও সব সময় আজকের লোহিত সাগরের সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না; কখনো আরও বিস্তৃত দক্ষিণের সমুদ্রাঞ্চল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আধুনিক মানচিত্র দিয়ে প্রাচীন নামের অর্থ ব্যাখ্যা করলে ভুল হতে পারে।

স্বাভাবিক অবস্থায় লোহিত সাগরের নীল রঙের ব্যাখ্যা অন্য সমুদ্রের মতোই আলোর আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। পানি লাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো তুলনামূলক দ্রুত শোষণ করে, আর নীল আলোর প্রভাব বেশি দূর পর্যন্ত থাকে। পানিতে ভাসমান কণা, অণুজীব, তলদেশের রং এবং গভীরতাও দৃশ্যমান রঙ বদলে দেয়। অগভীর বালুময় অংশে পানি ফিরোজা দেখাতে পারে, গভীর অংশে গাঢ় নীল। আকাশের প্রতিফলন কিছু ভূমিকা রাখলেও শুধু আকাশ নীল বলে সমুদ্র নীল—এমন ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। নামের ‘লাল’ আর স্বাভাবিক পানির রং তাই দুটি পৃথক বিষয়।

লোহিত সাগরের পানির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো বেশি লবণাক্ততা। সাধারণ উন্মুক্ত মহাসাগরের পানিতে প্রতি হাজার ভাগে প্রায় পঁয়ত্রিশ ভাগ দ্রবীভূত লবণ থাকে। লোহিত সাগরের বহু অঞ্চলে এই পরিমাণ প্রায় চল্লিশ ভাগের কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে। তবে পুরো সাগরে একই লবণাক্ততা নেই। দক্ষিণে বাইরের অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত পানির প্রভাব থাকে, আর উত্তরের কিছু অঞ্চলে লবণাক্ততা বেশি। ঋতু, গভীরতা ও জলসঞ্চালনের সঙ্গে পরিমাপ বদলায়। তাই একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো সাগরের পানি বর্ণনা করলে বাস্তব বৈচিত্র্য আড়াল হয়ে যায়।

এই বেশি লবণাক্ততার প্রধান কারণ প্রবল বাষ্পীভবন। চারপাশের শুষ্ক পরিবেশ, উষ্ণতা এবং বাতাস সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রচুর পানি বাষ্প হিসেবে সরিয়ে নেয়। কিন্তু পানির সঙ্গে দ্রবীভূত লবণ একইভাবে বাষ্প হয়ে চলে যায় না। ফলে অবশিষ্ট পানিতে লবণের ঘনত্ব বাড়ে। রান্নার পাত্রে লবণ মেশানো পানি দীর্ঘ সময় ফুটলে যেমন পানি কমে কিন্তু লবণ থেকে যায়, এখানে তার একটি বৃহৎ প্রাকৃতিক রূপ ঘটে। অবশ্য সাগর একটি চলমান ব্যবস্থা; বাইরের পানি প্রবেশ ও ভেতরের পানি বের হওয়ায় ঘনত্বের পরিবর্তন নিয়ন্ত্রিত হয়।

বাষ্পীভবনের প্রভাব আরও শক্তিশালী হয় কারণ লোহিত সাগরে বড়, স্থায়ী নদীর মিঠাপানির প্রবাহ নেই। বৃষ্টিপাতও সাধারণভাবে কম। মরু অঞ্চলের শুকনো খাত দিয়ে ভারী বৃষ্টির পরে সাময়িক পানি ও পলি আসতে পারে, কিন্তু তা বিশাল নদীব্যবস্থার নিয়মিত সরবরাহের সমান নয়। অনেক সাগরে নদীর পানি সমুদ্রের লবণাক্ততা কমায় এবং উপকূলে বিপুল পলি নিয়ে আসে। লোহিত সাগরে সেই প্রভাব তুলনামূলক সীমিত। বাষ্পীভবনে পানি হারানো এবং পর্যাপ্ত মিঠাপানি দিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ না হওয়া মিলেই এর লবণাক্ত পরিবেশ গড়ে তোলে।

এত পানি বাষ্প হয়ে গেলে সাগর শুকিয়ে যায় না কেন? কারণ দক্ষিণের প্রণালি দিয়ে বাইরের সামুদ্রিক পানি প্রবেশ করে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের বেশি লবণাক্ত পানি অন্য স্তর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এই আদানপ্রদান ঋতুভেদে জটিল হয়; বাতাস, ভারত মহাসাগরীয় মৌসুমি ব্যবস্থা এবং পানির ঘনত্ব প্রবাহের বিন্যাস বদলায়। একে শুধু একটি সরল ঢোকা ও বের হওয়ার পাইপ হিসেবে ভাবা ঠিক নয়। তবু মূল ধারণাটি স্পষ্ট: লোহিত সাগরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে বাইরের সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ অপরিহার্য।

লবণাক্ততা শুধু স্বাদের বিষয় নয়; এটি পানির ঘনত্বকে প্রভাবিত করে। বেশি লবণযুক্ত পানি অন্য সব অবস্থা সমান থাকলে তুলনামূলক ভারী হয়। আবার পানি ঠান্ডা হলে সাধারণ সামুদ্রিক তাপমাত্রার পরিসরে তার ঘনত্ব বাড়ে। উত্তরের অঞ্চলে শীতকালীন শীতলতা ও বেশি লবণাক্ততা মিলিয়ে ঘন পানি তৈরি হতে পারে, যা নিচের স্তরে নামার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই গভীর জলগঠন সাগরের ভেতরে তাপ, অক্সিজেন ও অন্যান্য উপাদান স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত। ওপরের শান্ত নীল দৃশ্যের নিচে তাই পানি ক্রমাগত স্তর বদলায় ও চলাচল করে।

লোহিত সাগরের গভীর পানিও বিশেষভাবে উষ্ণ। অনেক মহাসাগরে কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার মিটার গভীরে নামলে খুব ঠান্ডা পানি পাওয়া যায়। কিন্তু লোহিত সাগরের বিস্তৃত গভীর স্তরে তাপমাত্রা বিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর থাকে। চারপাশের উষ্ণ জলবায়ু, নিজস্ব গভীর জলগঠনের প্রক্রিয়া এবং দক্ষিণের অগভীর সংযোগপথের কারণে বাইরের মহাসাগরের ঠান্ডা গভীর পানি সহজে এখানে ঢুকতে পারে না। এই বৈশিষ্ট্য সমুদ্রটিকে ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র করেছে। পৃষ্ঠের উষ্ণতা ও গভীর জলের উষ্ণতা অবশ্য একই প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ সমার্থক নয়।

এর স্বচ্ছ পানিও মানুষের বিশেষ নজর কাড়ে। বড় নদীর নিয়মিত পলিপ্রবাহ না থাকা এবং বহু অঞ্চলে কম পুষ্টি উপাদানের পরিবেশ স্বচ্ছতায় সহায়তা করে। তবে সর্বত্র সব সময় পানি সমান স্বচ্ছ থাকে না। উপকূলীয় নির্মাণ, বাতাসে ওঠা পলি, অণুজীবের বিস্তার ও স্থানীয় স্রোত দৃশ্যমানতা কমাতে পারে। দক্ষিণের অংশে বাইরের পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির প্রভাবও বেশি হতে পারে। তাই লোহিত সাগরকে একটি সমান বৈশিষ্ট্যের জলরাশি হিসেবে না দেখে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পরিবর্তনশীল পরিবেশ হিসেবে বোঝা বেশি যথাযথ।

কম পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি থাকা সত্ত্বেও এখানে সমৃদ্ধ প্রবালপ্রাচীর কীভাবে গড়ে ওঠে, সেটি আরেকটি বিস্ময়। প্রবাল পাথর বা গাছ নয়; অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণী ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কাঠামো তৈরি করে প্রাচীর গড়ে তোলে। অনেক অগভীর জলের প্রবালের দেহে সহবাসী অণুশৈবাল থাকে। তারা সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে এবং তার একটি অংশ প্রবালকে দেয়। প্রবালও তাদের উপযুক্ত আশ্রয় ও কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে। এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং পুষ্টির কার্যকর পুনর্ব্যবহার তুলনামূলক দরিদ্র পানিতেও সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র তৈরিতে সাহায্য করে।

লোহিত সাগরের প্রবাল নিয়ে গবেষণার একটি বড় আকর্ষণ হলো কিছু প্রবালের তাপ সহ্য করার ক্ষমতা। বিশেষ করে উত্তরের আকাবা উপসাগরের পরীক্ষিত কিছু প্রবাল স্বাভাবিক গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রার চেয়ে বেশি উষ্ণতাতেও আশ্চর্য সহনশীলতা দেখিয়েছে। একটি গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা হলো, অতীতে দক্ষিণের উষ্ণ অঞ্চল অতিক্রম করে উত্তর দিকে বিস্তারের সময় তাপসহনশীল প্রবাল বেশি সফল হয়েছে। পরে উত্তরের তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশে বসবাস করায় তাদের সহ্যসীমা ও সাধারণ পরিবেশের তাপমাত্রার মধ্যে কিছু ব্যবধান রয়ে গেছে। এটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা; সব প্রজাতির জন্য একই ইতিহাস ধরে নেওয়া যায় না।

এই বৈশিষ্ট্যকে “লোহিত সাগরের প্রবাল কখনো সাদা হবে না” বলা ভুল। অতিরিক্ত তাপে প্রবাল ও তার সহবাসী অণুশৈবালের সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রবাল রং হারিয়ে সাদা দেখাতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী চাপ মৃত্যুও ঘটাতে পারে। লোহিত সাগরের সব অঞ্চলের প্রবাল একই মাত্রার সহনশীল নয়, এবং এখানেও তাপজনিত ক্ষতি দেখা গেছে। উত্তরের কিছু প্রবাল আশাব্যঞ্জক হলেও দূষণ, অতিরিক্ত পলি, রোগ এবং আবাস ধ্বংসের বিরুদ্ধে তারা অজেয় নয়। তাপ সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতা সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করে, নিশ্চিন্ত থাকার অনুমতি দেয় না।

লোহিত সাগরের ভূতাত্ত্বিক গঠনও এর পানির বিশেষত্বের পেছনে রয়েছে। আফ্রিকান ও আরবীয় ভূত্বকীয় পাতের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে এই দীর্ঘ অববাহিকার উৎপত্তি যুক্ত। এটি পৃথিবীর ভূত্বক প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মাঝের গভীর অঞ্চল, প্রান্তের অগভীর অংশ এবং বিভিন্ন তলদেশীয় গঠন পানির চলাচল ও আবাসের বিন্যাসে প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ সাগরের ওপরের রং বা লবণাক্ততা বোঝার গল্প শুধু আবহাওয়ার নয়; নিচের ভূতত্ত্বও এতে অংশ নেয়। বর্তমান জলরাশির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের ভূগঠনগত পরিবর্তন।

গভীর সমুদ্রতলের কিছু স্থানে অতিলবণাক্ত পানির পুকুর পাওয়া যায়। এদের পানি আশপাশের সাধারণ সমুদ্রজলের তুলনায় অনেক বেশি ঘন হওয়ায় তলদেশের নিচু অংশে জমে থাকতে পারে। ফলে পানির নিচে আবার আলাদা জলাশয়ের মতো সীমানা তৈরি হয়। ভূগর্ভস্থ প্রাচীন লবণস্তর দ্রবীভূত হওয়া এবং স্থানভেদে ভূতাপীয় প্রক্রিয়া এসব পরিবেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। এগুলো পুরো লোহিত সাগরের সাধারণ বৈশিষ্ট্য নয়, নির্দিষ্ট গভীর স্থানের বিশেষ পরিবেশ। সব পুকুরের তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠনও এক রকম নয়।

এসব অতিলবণাক্ত পুকুরে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং কঠিন রাসায়নিক পরিবেশ অনেক পরিচিত সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু তাই বলে সেখানে কোনো জীবনই নেই, এমন নয়। বিশেষ অভিযোজনসম্পন্ন অণুজীব এমন পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, আর সীমানার আশপাশে ভিন্ন ধরনের জীবসমাজ দেখা যায়। গবেষকেরা এসব অঞ্চল থেকে চরম পরিবেশে জীবনের সীমা, অণুজীবের বিপাক এবং তলদেশে জমা পরিবেশগত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান। সাধারণ প্রবালপ্রাচীরের প্রাণচাঞ্চল্য ও গভীর লবণাক্ত পুকুরের বিশেষ জীবন একই সাগরের বিস্ময়কর বৈপরীত্য।

লোহিত সাগরকে মৃত সাগরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাও উচিত নয়। মৃত সাগর একটি অত্যন্ত লবণাক্ত স্থলবেষ্টিত হ্রদ, আর লোহিত সাগর বাইরের সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত সামুদ্রিক অববাহিকা। লোহিত সাগর সাধারণ মহাসাগরের তুলনায় বেশি লবণাক্ত হলেও মৃত সাগরের মতো অতিরিক্ত লবণাক্ত নয়। এখানে প্রবাল, মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং নানা অমেরুদণ্ডী প্রাণীসহ সমৃদ্ধ জীবন রয়েছে। বেশি লবণাক্ত পানি কিছুটা বেশি ভাসমানতা দিতে পারে, কিন্তু তাই বলে সাঁতার বা ডুব দেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না; স্রোত ও গভীরতার নিজস্ব ঝুঁকি থাকে।

এই বিশেষ জলজগত মানুষের কার্যকলাপের চাপও বহন করে। উপকূলীয় নির্মাণ, বন্দর, জাহাজ চলাচল, অপরিশোধিত বর্জ্য এবং অসতর্ক পর্যটন স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সমুদ্রের পানি থেকে পানীয় পানি তৈরির ব্যবস্থায় উৎপন্ন ঘন লবণাক্ত বর্জ্য যথাযথভাবে ছড়িয়ে না দিলে নির্দিষ্ট এলাকায় পরিবেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে। প্রবালপ্রাচীরের ওপর পলি জমা বা সরাসরি ভাঙনও ক্ষতিকর। স্বচ্ছ নীল পানি দেখলেই পরিবেশ সম্পূর্ণ সুস্থ ধরে নেওয়া যায় না; দৃশ্যমান সৌন্দর্যের পাশাপাশি পানির রাসায়নিক অবস্থা ও জীবসমাজের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

লোহিত সাগরের নামের রহস্যের সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো, এর পানি সাধারণত লাল নয় এবং নামের উৎস নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। অণুজীবের লালচে বিস্তার একটি বাস্তব ও বহুল আলোচিত সম্ভাবনা, কিন্তু ইতিহাসের সব প্রশ্ন তার মাধ্যমে মেটে না। অন্যদিকে পানির বিশেষত্বের ব্যাখ্যা অনেক বেশি সুস্পষ্ট: শুষ্ক জলবায়ু, প্রবল বাষ্পীভবন, সামান্য মিঠাপানির সরবরাহ, সীমিত সামুদ্রিক সংযোগ এবং নিজস্ব জলসঞ্চালন। এই অবস্থার মধ্যেই স্বচ্ছ পানি, উষ্ণ গভীর স্তর, প্রবালপ্রাচীর ও অতিলবণাক্ত তলদেশীয় পুকুরের বিচিত্র জগৎ গড়ে উঠেছে। নামের রঙের চেয়ে সেই জগতের বিজ্ঞান অনেক বেশি বিস্ময়কর।