কাহোকিয়া: ইউরোপীয়দের আগমনের আগেই হারিয়ে যাওয়া বিশাল নগরীর রহস্য
সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য
মাটির বিশাল ঢিবিতে টিকে আছে কাহোকিয়ার নগরসভ্যতার স্মৃতি।
মিসিসিপি নদীর পূর্ব তীরে ঘাসে ঢাকা একটি বিশাল মাটির স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে সেটিকে প্রাকৃতিক পাহাড় মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রতিটি স্তর মানুষের হাতে তৈরি। আশপাশের শান্ত ভূমিতে একসময় ছিল বাড়িঘর, কৃষক, কারিগর, আনুষ্ঠানিক সমাবেশ এবং দূরদেশ থেকে আসা মানুষ। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ে, সেন্ট লুইসের কাছে অবস্থিত এই প্রাচীন নগরের নাম কাহোকিয়া। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের বহু আগেই এখানে উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ নগরসমাজ গড়ে উঠেছিল। অথচ ইউরোপীয়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হওয়ার আগেই তার প্রধান নগরকেন্দ্র অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
কাহোকিয়া মিসিসিপীয় সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পরিচয় কোনো একক জাতি বা সর্বত্র একই শাসকের অধীন সাম্রাজ্য বোঝায় না। পূর্ব ও মধ্য উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সমাজের মধ্যে কৃষি, মাটির উঁচু মঞ্চ, বসতির বিন্যাস এবং ধর্মীয় প্রতীকের মিল বোঝাতে নামটি ব্যবহৃত হয়। কাহোকিয়ার প্রাচীন অধিবাসীরা নিজেদের কী নামে পরিচিত করতেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পরবর্তী কাহোকিয়া জনগোষ্ঠীর নাম থেকে প্রত্নস্থলটির বর্তমান নাম এসেছে। তাই প্রাচীন নগরবাসী এবং পরে একই অঞ্চলে পরিচিত জনগোষ্ঠীকে সরাসরি অভিন্ন ধরে নেওয়া যথাযথ নয়।
এ অঞ্চলে ছোট বসতি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আনুমানিক ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নগরের বিকাশে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। জনসংখ্যা বাড়ে, আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রের বিন্যাস বদলে যায় এবং বড় নির্মাণ শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে নতুন নগরজীবনে অংশ নেন। সমৃদ্ধির শীর্ষপর্বে কেন্দ্রীয় জনপদে আনুমানিক দশ থেকে বিশ হাজার মানুষের বসবাস ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই হিসাব সরাসরি জনগণনার ফল নয়; বসতির বিস্তার ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে তৈরি অনুমান। আশপাশের সংশ্লিষ্ট জনপদসহ বৃহত্তর কাহোকিয়ার পরিসর আরও বিস্তৃত ছিল।
নগরটির বিস্তৃত এলাকায় প্রায় ১২০টি মাটির ঢিবি নির্মিত হয়েছিল। সব ঢিবির কাজ এক ছিল না। সমতল মাথার মঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভবন বহন করত, কিছু ঢিবি সমাধির সঙ্গে যুক্ত ছিল, আবার অন্যগুলোর আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকতে পারে। এগুলো তৈরির জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করে ঝুড়িতে বহন করতে হতো। স্তরে স্তরে মাটি বসিয়ে নির্মাণের আকার ও স্থায়িত্ব বজায় রাখা ছিল দক্ষতার কাজ। এই শ্রমের সংগঠন কাহোকিয়ার সামাজিক শক্তি বোঝায়, যদিও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ কতটা স্বেচ্ছামূলক বা বাধ্যতামূলক ছিল, তা পুরোপুরি জানা যায়নি।
সবচেয়ে বড় স্থাপনাটি মঙ্কস মাউন্ড। প্রায় ত্রিশ মিটার উঁচু এবং পাঁচ হেক্টরের বেশি ভিত্তিবিশিষ্ট এই নির্মাণ মেক্সিকোর উত্তরে আদিবাসীদের তৈরি বৃহত্তম মাটির স্থাপনা। এর ধাপযুক্ত আকৃতি ও ওপরের বড় ভবনের প্রমাণ নেতৃত্ব এবং আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক নির্দেশ করে। মঙ্কস মাউন্ড কোনো পাথরের পিরামিড নয়; এটি বিপুল পরিমাণ মাটি দিয়ে গড়া উঁচু মঞ্চ। একাধিক নির্মাণপর্বে এর আকার বদলেছে। নিচের বসতি থেকে দৃশ্যমান এই উচ্চতা নগরের ক্ষমতাকেন্দ্রকে সাধারণ বাড়িঘর থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
মঙ্কস মাউন্ডের দক্ষিণে প্রধান চত্বর ছিল নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভূমি পরিবর্তন করে সেখানে বড় খোলা স্থান তৈরি করা হয়েছিল। সমাবেশ, আনুষ্ঠানিকতা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য এমন জায়গা উপযোগী ছিল। কাহোকিয়ার সঙ্গে চাঙ্কি নামে পরিচিত একটি খেলারও সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে গড়ানো পাথরের চাকতির সম্ভাব্য থামার স্থান লক্ষ্য করে দণ্ড নিক্ষেপ করা হতো। তবে প্রতিটি খোলা স্থানকে নিশ্চিতভাবে বাজার বা খেলার মাঠ বলা যায় না। স্থানের বিন্যাস ও উদ্ধার করা বস্তু মিলিয়ে তার ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কাহোকিয়ার জনসংখ্যাকে টিকিয়ে রাখার প্রধান ভিত্তি ছিল খাদ্য উৎপাদন। ভুট্টার পাশাপাশি অন্যান্য ফসল, মাছ, শিকার এবং বুনো উদ্ভিদ মানুষের খাদ্যের অংশ হতে পারত। নদীর প্লাবনভূমি উর্বর জমি ও জলজ সম্পদ দিয়েছিল। আশপাশের উঁচু এলাকার কৃষিজনপদও বৃহত্তর অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখত। ফলে নগরের জীবন শুধু কেন্দ্রীয় বাড়িঘরের ওপর নির্ভর করত না; দূরের কৃষক ও উৎপাদনক্ষেত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। এই বিস্তৃত নির্ভরতা সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করলেও খাদ্য সরবরাহের ব্যাঘাতকে নগরব্যাপী সংকটে পরিণত করতে পারত।
নগরটি মানুষের চলাচলেরও কেন্দ্র ছিল। দাঁতের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন অধিবাসীদের শনাক্ত করেছেন, যারা সম্ভবত অন্য অঞ্চলে শৈশব কাটিয়েছিলেন। খাবার ও পানির স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের কিছু সংকেত দাঁতে সংরক্ষিত থাকতে পারে। সেগুলো তুলনা করে মানুষের জন্মস্থান বা বেড়ে ওঠার এলাকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই গবেষণা কাহোকিয়ায় অভিবাসনের গুরুত্ব দেখায়। তবে সীমিত সমাধির নমুনা থেকে সমগ্র নগরের অভিবাসীর নির্ভুল অনুপাত নির্ধারণ কঠিন। তবু বোঝা যায়, বিভিন্ন এলাকার মানুষ নগরটির সমাজ গঠনে অংশ নিয়েছিলেন।
দূরবর্তী অঞ্চলের পাথর, খোলস ও অন্যান্য উপকরণ কাহোকিয়ার যোগাযোগের বিস্তার প্রকাশ করে। কিছু বস্তু বিনিময় বা বাণিজ্যের মাধ্যমে এসেছে, কিছু অভিবাসীরা সঙ্গে এনেছেন, আবার কিছু উপহার ও ধর্মীয় নিবেদনের অংশ হতে পারে। মূল্যবান সামগ্রী মর্যাদা প্রদর্শনের কাজও করত। তাই সব নিদর্শনকে একই ধরনের বাজারভিত্তিক বাণিজ্যের প্রমাণ বলা ঠিক নয়। নদীপথ মানুষ ও পণ্য চলাচলে সহায়তা করেছিল বলে ধারণা করা হয়। কাহোকিয়া ছিল বৃহত্তর আদিবাসী যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ নয়।
ধর্মীয় ও ঋতুভিত্তিক জীবনের পরিচিত নিদর্শন হলো উডহেঞ্জ। বৃত্তাকারে স্থাপিত কাঠের খুঁটির গর্ত শনাক্ত করে এই বিন্যাস উদ্ধার করা হয়েছে। নির্দিষ্ট খুঁটির সঙ্গে বছরের বিশেষ সময়ে সূর্যোদয়ের অবস্থানের সম্পর্ক ছিল। ঋতু নির্ধারণ, কৃষির সময় এবং আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে এমন পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে। উডহেঞ্জে আকাশ পর্যবেক্ষণ ও সামাজিক জীবনের সংযোগ দেখা যায়। তবে আধুনিক পর্যবেক্ষণাগারের সমস্ত কাজ এখানে হতো, এমন ধরে নেওয়া যায় না; প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সীমার মধ্যেই তার ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে হয়।
কাহোকিয়ার সমাজে মর্যাদার পার্থক্য ও সহিংসতার প্রমাণও রয়েছে। মাউন্ড ৭২-এর বিভিন্ন সমাধি জটিল আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রকাশ করে; কিছু মৃত্যুকে মানববলির সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নতুন বিশ্লেষণে উচ্চমর্যাদার সমাধিতে নারীদের উপস্থিতি পুরোনো ব্যাখ্যা সংশোধন করেছে। ফলে ক্ষমতা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ইতিহাস শুধু পুরুষ যোদ্ধার ধারণায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। কেন্দ্রীয় অংশের কাঠের প্রাচীর নিরাপত্তা বা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু প্রাচীর কিংবা সহিংস সমাধি দেখেই নগরের পতনের একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধকাহিনি তৈরি করা সম্ভব নয়।
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কাহোকিয়ার বিভিন্ন অংশে জনসংখ্যা ও বসতির পরিবর্তন ঘটে। আনুমানিক ১৪০০ সালের মধ্যে প্রধান নগরকেন্দ্র অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দীর্ঘ খরা, বড় বন্যা, খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক বিরোধ আলোচিত হয়। কিছু গবেষণায় দ্বাদশ শতকের বন্যার সঙ্গে অবক্ষয়ের সময়গত সম্পর্ক পাওয়া গেছে; অন্য গবেষণায় খরার সঙ্গে কৃষিজনপদের দুর্বলতার যোগসূত্র রয়েছে। তবে একই সময়ে পরিবেশগত পরিবর্তন ও নগরের অবক্ষয় ঘটলেই একটিকে অন্যটির একমাত্র কারণ বলা যায় না। সামাজিক ব্যবস্থা সংকট সামলাতে কতটা সক্ষম ছিল, সেটিও জরুরি।
বন উজাড় থেকে মাটির ক্ষয় ও স্থানীয় বন্যা সৃষ্টি হয়ে নগর ধ্বংসের প্রচলিত ধারণাটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিছু খননে এই ধারাবাহিক ঘটনার প্রত্যাশিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর অর্থ সব পরিবেশগত সমস্যা অস্বীকার করা নয়; বরং পৃথক সমস্যার জন্য পৃথক প্রমাণ দরকার। সবচেয়ে সতর্ক ব্যাখ্যা হলো, পরিবেশ ও সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন মিলিয়ে নগরজীবন দুর্বল হয়েছিল। পরিবারগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আর মানুষ কমলে সরবরাহ ও সহযোগিতার পুরোনো ব্যবস্থা আরও বদলে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া একদিনে ঘটেনি।
কাহোকিয়া ছেড়ে যাওয়া মানে তার অধিবাসীদের সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়। পরে এলাকায় আদিবাসী বসতির প্রমাণও রয়েছে। তাই একটি নগরের পতনকে উত্তর আমেরিকার আদিবাসী ইতিহাসের সমাপ্তি হিসেবে দেখা ভুল। আজকের ঘাসে ঢাকা ঢিবিগুলো দেখায়, ইউরোপীয়দের আগমনের আগেই এখানে পরিকল্পিত স্থাপত্য, কৃষি, অভিবাসন ও বিস্তৃত যোগাযোগের ভিত্তিতে বড় সমাজ গড়ে উঠেছিল। কাহোকিয়ার রহস্য শুধু কেন মানুষ চলে গেলেন, সেই প্রশ্নে নয়; কীভাবে তারা এত বড় নগর তৈরি ও দীর্ঘদিন পরিচালনা করেছিলেন, সেই বিস্ময়েও।
জানুস: দুই মুখের রোমান দেবতা, দরজা ও নতুন শুরুর রহস্য
স্যাটার্ন ও স্বর্ণযুগ: রোমান পুরাণে স্যাটার্নালিয়া উৎসবের গল্প
সেরেস ও প্রোসারপিনা: পাতালজগৎ, ঋতুর জন্ম ও ফসলের রোমান কিংবদন্তি
রিগ্যান যুগ ও স্নায়ুযুদ্ধ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্টার ওয়ার্স এবং সোভিয়েত সংকট
সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ: ১৯৭৯ সালের আক্রমণ ও স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়
দেতান্ত ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: নিক্সন, ব্রেজনেভ ও SALT চুক্তির ইতিহাস