কানাডায় দাম্পত্য পৃষ্ঠপোষকতা: স্বামী বা স্ত্রীকে নেওয়ার যোগ্যতা ও আবেদনপ্রক্রিয়া
প্রকৃত সম্পর্কের প্রমাণ ও সঠিক আবেদনেই কানাডায় পারিবারিক পুনর্মিলনের প্রস্তুতি।
কানাডার দাম্পত্য পৃষ্ঠপোষকতা হলো যোগ্য নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দার মাধ্যমে স্বামী বা স্ত্রীকে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নেওয়ার ব্যবস্থা। এটি কেবল ভ্রমণের অনুমতি নয়। আবেদন অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পান; নাগরিকত্বের জন্য পরে আলাদা যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।
কানাডায় শিক্ষার্থী বা অস্থায়ী কর্মী হিসেবে থাকলেই এই ব্যবস্থায় পৃষ্ঠপোষক হওয়া যায় না। তাঁদের সঙ্গীর কাজের অনুমতি বা অস্থায়ী অবস্থানের ব্যবস্থা আলাদা শর্তে পরিচালিত হয়। তাই প্রথমেই কানাডায় থাকা ব্যক্তির অভিবাসন মর্যাদা নির্ধারণ করুন।
বিবাহ ও সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা
স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে আবেদন করতে বৈধ বিবাহ থাকতে হবে। বিদেশে সম্পন্ন বিবাহ সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং কানাডার আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য হতে হবে। যাঁকে নেওয়া হবে, তাঁর বয়স অন্তত আঠারো বছর হতে হবে।
বিবাহ ছাড়াও নির্দিষ্ট শর্তে অন্তত বারো মাস একসঙ্গে দাম্পত্যভাবে বসবাসকারী সঙ্গীকে পৃষ্ঠপোষকতা করা যায়। অন্য একটি সীমিত সম্পর্কভিত্তিক বিভাগও রয়েছে, যেখানে গুরুতর বাধার কারণে বিবাহ বা সহবাস সম্ভব হয়নি। শুধু প্রেমের সম্পর্ক বা ভবিষ্যতে বিয়ের পরিকল্পনা এসব বিভাগের জন্য যথেষ্ট নয়।
পৃষ্ঠপোষক হওয়ার যোগ্যতা ও বাধাগুলো
পৃষ্ঠপোষককে অন্তত আঠারো বছর বয়সী কানাডীয় নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা অথবা আইনে স্বীকৃত নির্দিষ্ট নিবন্ধিত ব্যক্তি হতে হবে। সাধারণভাবে কানাডায় বসবাস করাও প্রয়োজন।
কানাডীয় নাগরিক বিদেশে থাকলে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারেন, তবে সঙ্গী স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সময় কানাডায় বসবাসের পরিকল্পনা দেখাতে হবে। বিপরীতে, কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা বিদেশে বসবাস করলে সাধারণত পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারেন না।
আগের পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস দেখুন
কেউ নিজে স্বামী বা স্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে থাকলে, সেই মর্যাদা পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন সঙ্গীর পৃষ্ঠপোষক হওয়ার বাধা থাকতে পারে। আগে অন্য সঙ্গীকে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকলে তাঁর স্থায়ী বসবাস শুরুর পর তিন বছরের আর্থিক দায়িত্ব শেষ হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবন্ধিতা ছাড়া অন্য কারণে সামাজিক সহায়তা গ্রহণ, পূর্ববর্তী দায়িত্ব ভঙ্গ, অনিষ্পন্ন দেউলিয়াত্ব বা নির্দিষ্ট অপরাধসংক্রান্ত পরিস্থিতি যোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিটি বাধার প্রযোজ্যতা আলাদা।
কুইবেকে বসবাসের পরিকল্পনা থাকলে প্রাদেশিক যোগ্যতা ও অঙ্গীকারের অতিরিক্ত ধাপ রয়েছে। সেখানে আবেদন গ্রহণের সীমা ও সময়সূচিও কার্যকর থাকতে পারে; অন্য প্রদেশের নিয়ম হুবহু অনুসরণ করবেন না।
সম্পর্কের প্রমাণ কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য করবেন?
বিবাহের সনদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু সনদ দিয়েই পুরো সম্পর্কের বাস্তবতা বোঝানো যায় না। কর্তৃপক্ষ দেখতে চায় সম্পর্কটি প্রকৃত এবং প্রধানত অভিবাসনের সুবিধা পাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি।
বাংলাদেশি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বিবাহের সনদ, কাবিননামা এবং প্রয়োজনীয় অনুবাদ প্রস্তুত করুন। নাম, জন্মতারিখ, বিয়ের তারিখ ও পূর্ববর্তী বৈবাহিক অবস্থার তথ্য পাসপোর্ট এবং আবেদনপত্রের সঙ্গে মিলতে হবে।
সম্পর্কের ধারাবাহিকতা তুলে ধরুন
পরিচয়, সম্পর্কের অগ্রগতি, পরিবারের জানাশোনা, বিয়ে এবং বিয়ের পর যোগাযোগের একটি পরিষ্কার সময়রেখা লিখুন। সহায়ক প্রমাণ হিসেবে রাখা যেতে পারে:
- বিয়ে ও বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে থাকার নির্বাচিত ছবি।
- দেখা করতে যাওয়ার বিমানভ্রমণ ও পাসপোর্টের প্রমাণ।
- নিয়মিত যোগাযোগের প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা।
- যৌথ বাসস্থান, ব্যয় বা আর্থিক সহায়তার নথি।
- পরিবার ও সামাজিক পরিসরে সম্পর্কের স্বীকৃতির প্রমাণ।
অসংখ্য একই ধরনের ছবি বা কথোপকথনের বদলে সময়ের ব্যবধানে সম্পর্কের অগ্রগতি বোঝায় এমন প্রমাণ বেছে নিন।
আয়োজন ছোট হওয়া, দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্ক কিংবা বয়সের ব্যবধান নিজে থেকেই অযোগ্যতা নয়। তবে পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করুন। আগের বিবাহ থাকলে বৈধ বিচ্ছেদ বা পূর্ববর্তী সঙ্গীর মৃত্যুর প্রমাণও প্রয়োজন হতে পারে।
আর্থিক দায়িত্ব ও সন্তানদের তথ্য
অধিকাংশ সাধারণ দাম্পত্য পৃষ্ঠপোষকতায় নির্দিষ্ট ন্যূনতম আয়ের সীমা নেই। তবে এর অর্থ পৃষ্ঠপোষকের কোনো আর্থিক দায়িত্ব নেই—এমন নয়। সঙ্গীর মৌলিক চাহিদা পূরণের বাস্তব পরিকল্পনা থাকতে হবে।
ব্যতিক্রম হিসেবে সঙ্গীর নির্ভরশীল সন্তানের আবার নির্ভরশীল সন্তান থাকলে আয়ের নির্দিষ্ট শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে। কুইবেকের প্রাদেশিক শর্তও আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
তিন বছরের অঙ্গীকার
স্বামী বা স্ত্রী স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার দিন থেকে সাধারণত তিন বছরের আর্থিক অঙ্গীকার শুরু হয়। খাবার, পোশাক, বাসস্থান এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকা প্রয়োজনীয় কিছু চিকিৎসাব্যয় এর অন্তর্ভুক্ত।
এই সময়ে সম্পর্ক ভেঙে গেলে, বিবাহবিচ্ছেদ হলে কিংবা পৃষ্ঠপোষকের চাকরি চলে গেলেও দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না। পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রযোজ্য সামাজিক সহায়তা নিলে তা ফেরত দেওয়ার দায়ও তৈরি হতে পারে।
সব সন্তান ঘোষণা করুন
সন্তান কানাডায় আসবে না, অন্য অভিভাবকের কাছে থাকে বা আপনার হেফাজতে নেই—এসব কারণে তথ্য বাদ দেওয়া যাবে না। প্রযোজ্য স্বাস্থ্য ও অন্যান্য যাচাইও লাগতে পারে। তথ্য গোপন করলে ভবিষ্যতে সেই সন্তানকে নেওয়ার সুযোগে গুরুতর সমস্যা হতে পারে।
নির্ভরশীল সন্তানের সাধারণ বয়সসীমা বাইশ বছরের কম এবং তার নিজের বিবাহিত বা স্বীকৃত সহবাসী সঙ্গী না থাকা; বিশেষ শারীরিক বা মানসিক পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম রয়েছে।
অনলাইন আবেদন, নথি ও খরচের ধাপ
পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন এবং সঙ্গীর স্থায়ী বসবাসের আবেদন একসঙ্গে জমা দিতে হয়। প্রধান আবেদনকারী সাধারণত স্থায়ী বসবাসের অনলাইন আবেদনব্যবস্থায় ফরম পূরণ, নথি সংযুক্ত ও প্রয়োজনীয় ঘোষণা সম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশে থাকা সঙ্গীর ক্ষেত্রে সাধারণত পারিবারিক শ্রেণির আবেদন প্রাসঙ্গিক। সঙ্গী কানাডায় থাকলে অবস্থান, একসঙ্গে বসবাস এবং ভবিষ্যৎ ভ্রমণ পরিকল্পনা বিবেচনায় সঠিক আবেদনশ্রেণি বেছে নিতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথির প্রধান অংশ
পৃষ্ঠপোষকের নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বাসিন্দা পরিচয়, আবেদনকারীর পাসপোর্ট, বিবাহ ও সম্পর্কের প্রমাণ, পারিবারিক তথ্য, প্রয়োজনীয় পুলিশি সনদ এবং আর্থিক সহায়তার তথ্য প্রস্তুত করুন। দেশ ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী বর্তমান নথিতালিকা অনুসরণ করুন।
বাংলা নথির জন্য নির্দেশনা অনুযায়ী ইংরেজি বা ফরাসি অনুবাদ এবং প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন দিন। পূর্ববর্তী ভিসা প্রত্যাখ্যান, অপরাধসংক্রান্ত তথ্য বা পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে প্রশ্নের সত্য উত্তর দিতে হবে।
বর্তমান সাধারণ মাশুলে একজন সঙ্গীর পৃষ্ঠপোষকতা, আবেদন মূল্যায়ন ও স্থায়ী বসবাসের অধিকার বাবদ মোট এক হাজার দুইশ ষাট কানাডীয় ডলার লাগে। আঙুলের ছাপসহ পরিচিতিমূলক তথ্য, সন্তান, চিকিৎসা পরীক্ষা ও অনুবাদের খরচ আলাদা হতে পারে। পরিশোধের আগে কার্যকর অঙ্ক যাচাই করুন।
আবেদন জমার পর কী হবে?
আবেদন গ্রহণের পর পূর্ণতা যাচাই, পৃষ্ঠপোষকের যোগ্যতা, সম্পর্ক এবং আবেদনকারীর গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচিতিমূলক তথ্য, চিকিৎসা পরীক্ষা, অতিরিক্ত নথি বা সাক্ষাৎকার চাওয়া হতে পারে।
আবেদন পাওয়ার স্বীকৃতিপত্র অনুমোদনের চিঠি নয়। ঠিকানা, সন্তান জন্ম, বৈবাহিক অবস্থা বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলে কর্তৃপক্ষকে জানান। প্রক্রিয়াকরণকাল দেশ, আবেদনশ্রেণি ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে বদলায়; নির্দিষ্ট মাসে সিদ্ধান্ত নিশ্চিত ধরে পরিকল্পনা করবেন না।
অপেক্ষার সময় কানাডায় যাওয়া ও কাজ
বাংলাদেশে থাকা সঙ্গী আলাদাভাবে ভ্রমণ ভিসার আবেদন করতে পারেন। স্থায়ী বসবাসের আবেদন চলমান থাকলেও ভ্রমণ ভিসার শর্ত পূরণ করতে হবে। স্বীকৃতিপত্র থাকলে দ্রুত মূল্যায়নের সুযোগ হতে পারে, কিন্তু অনুমোদন নিশ্চিত নয়।
কানাডায় এসে পৃষ্ঠপোষকের সঙ্গে বসবাস করলে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করলে উন্মুক্ত কাজের অনুমতির জন্য আলাদা আবেদন করা যেতে পারে। শুধু পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন জমা দেওয়া কাজ শুরু করার অনুমতি দেয় না।
শেষ অনুমোদনের পর কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত প্রক্রিয়ায় স্থায়ী বসবাস কার্যকর করতে হবে। পুরো আবেদনজুড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্য পৃষ্ঠপোষক, প্রকৃত সম্পর্ক এবং সম্পূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য।
কানাডা সুপার ভিসা কী? বাবা-মাকে দীর্ঘ সময় কাছে রাখার যোগ্যতা ও আবেদনপদ্ধতি
বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স ট্যুরিস্ট ভিসা: আবেদন পদ্ধতি, খরচ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
শেনজেন ভিসা কী? একটি ভিসায় ইউরোপের কোন ২৯টি দেশে যাওয়া যায়?
জার্মানি শিক্ষার্থী ভিসা: বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করবেন কীভাবে?
ভারত মালয়েশিয়া ভিসা, মালয়েশিয়া ভিসামুক্ত ভ্রমণ, ভারতীয় পর্যটক, ২০২৬ ভিসা নিয়ম
আমেরিকার ভিসা ইন্টারভিউতে কীভাবে উত্তর দেবেন? যেসব ভুল এড়ানো জরুরি