বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বাংলাদেশ থেকে স্পেন পর্যটন ভিসা: শেনজেন আবেদন, খরচ ও নথির সম্পূর্ণ নিয়ম

বাংলাদেশ থেকে স্পেন পর্যটন ভিসা: শেনজেন আবেদন, খরচ ও নথির সম্পূর্ণ নিয়ম
সঠিক গন্তব্য, স্বচ্ছ অর্থের প্রমাণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নথিতে স্পেন ভ্রমণের প্রস্তুতি।

বাংলাদেশি সাধারণ পাসপোর্টধারীর স্পেনে পর্যটনের জন্য সাধারণত স্বল্পমেয়াদি শেনজেন ভিসা প্রয়োজন। এটি ‘সি’ শ্রেণির ভিসা। অনুমোদিত শর্ত অনুযায়ী শেনজেন অঞ্চলে যেকোনো একশ আশি দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ নব্বই দিন থাকা যায়। তবে আপনার ভিসায় অনুমোদিত অবস্থানকাল এর চেয়ে কম হতে পারে।

স্পেনের ভিসা পেলে অন্য শেনজেন দেশেও ভ্রমণ করা যায়। কিন্তু আবেদন কোথায় করবেন, সেটি প্রকৃত ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। শুধু স্পেনের সাক্ষাতের সময় পাওয়া সহজ মনে হচ্ছে বলে সেখানে আবেদন করা সঠিক পদ্ধতি নয়।

প্রধান গন্তব্যের নিয়ম

শুধু স্পেনে গেলে স্পেনের কাছে আবেদন করবেন। একাধিক দেশে পর্যটনের ক্ষেত্রে যে দেশে সবচেয়ে বেশি সময় থাকবেন, সাধারণত সেই দেশের কাছে আবেদন করতে হয়। সমান সময় থাকলে প্রথম প্রবেশের দেশের কাছে আবেদন করবেন।

উদাহরণস্বরূপ, স্পেনে সাত দিন ও ফ্রান্সে তিন দিন থাকলে স্পেন প্রধান গন্তব্য। প্রথমে ফ্রান্সে নামলেও পরিকল্পনাটি স্পেনের আবেদন সমর্থন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ফ্রান্সে বেশি দিন থাকলে স্পেনকে প্রধান গন্তব্য দেখানো অসংগতি তৈরি করবে।

এই ভিসা পর্যটনের জন্য; চাকরি করা বা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

বাংলাদেশে আবেদন জমার ধাপ ও সময়সীমা

বাংলাদেশে স্পেনের স্বল্পমেয়াদি ভিসার আবেদন গ্রহণ করে অনুমোদিত বিএলএস আবেদনকেন্দ্র। ভিসার সিদ্ধান্ত দেয় স্পেনের দূতাবাস। আবেদনকেন্দ্র নথি গ্রহণ, পরিচিতিমূলক তথ্য সংগ্রহ ও পাসপোর্ট ফেরতের কাজ করলেও অনুমোদনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

প্রথমে পর্যটন ভিসার বর্তমান নথিতালিকা ও আবেদনপত্র সংগ্রহ করুন। এরপর অনুমোদিত ব্যবস্থায় সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করুন। পাসপোর্ট অনুযায়ী ফরম পূরণ করে স্বাক্ষর দিন এবং নির্ধারিত দিনে নথি, মূল কাগজ ও প্রয়োজনীয় অনুলিপি নিয়ে উপস্থিত হন।

কত আগে আবেদন করবেন?

বর্তমান সাধারণ শেনজেন নিয়ম অনুযায়ী যাত্রার সর্বোচ্চ ছয় মাস আগে এবং অন্তত পনেরো দিন আগে আবেদন জমা দেওয়া যায়। তবে শেষ পনেরো দিনের ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়। সাক্ষাতের সময় পেতে দেরি, অতিরিক্ত নথি বা দীর্ঘ মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখুন।

কিছু পুরোনো স্থানীয় তালিকায় তিন মাসের সীমা লেখা থাকতে পারে। আবেদনকালে হালনাগাদ নিয়ম ও কার্যকর সময় নির্ধারণের ব্যবস্থা মিলিয়ে নিন।

জমার পর রসিদ ও আবেদন শনাক্তকরণ নম্বর সংরক্ষণ করুন। যোগাযোগের ঠিকানা, কেন্দ্রের অবস্থান ও উপস্থিতির সময় নিজের সাক্ষাতের চিঠি থেকে নিশ্চিত করুন।

পাসপোর্ট, ভ্রমণসূচি ও আবাসনের নথি

পাসপোর্ট গত দশ বছরের মধ্যে ইস্যু হওয়া এবং শেনজেন অঞ্চল ত্যাগের পরিকল্পিত তারিখের পর অন্তত তিন মাস বৈধ থাকা দরকার। অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা রাখুন। বর্তমান ও পূর্ববর্তী পাসপোর্টের প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠা এবং আগের ভিসার অনুলিপিও প্রস্তুত করুন।

মূল ভ্রমণসংক্রান্ত নথিগুলো হলো:

  • পূরণ ও স্বাক্ষর করা আবেদনপত্র এবং নির্ধারিত মানের সাম্প্রতিক ছবি।
  • পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠার অনুলিপি।
  • যাতায়াতের সংরক্ষণ এবং পুরো ভ্রমণের আবাসনের প্রমাণ।
  • দিনভিত্তিক ভ্রমণসূচি ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যার চিঠি।
  • অর্থ, পেশা ও দেশে ফেরার কারণের প্রমাণ।
  • প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ভ্রমণবিমার সনদ।

সব তারিখের মধ্যে মিল রাখুন

ফরম, বিমান সংরক্ষণ, হোটেল, বিমা ও চাকরির ছুটির তারিখ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বার্সেলোনায় পাঁচ রাতের হোটেল দেখিয়ে সেই সময় মাদ্রিদে থাকার পরিকল্পনা লিখলে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিমান সংরক্ষণের প্রমাণ এবং ফেরতযোগ্য নয় এমন টিকিট কেনা আলাদা বিষয়। সিদ্ধান্তের আগে ব্যয়বহুল অপ্রত্যর্পণযোগ্য টিকিট কেনার প্রয়োজন ধরে নেবেন না। কোনো ভুয়া সংরক্ষণ ব্যবহার করবেন না।

বন্ধু বা আত্মীয়ের বাসায় থাকলে প্রযোজ্য আমন্ত্রণ ও আবাসনের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ লাগতে পারে। সাধারণ পর্যটনের হোটেলভিত্তিক নথি সরাসরি সেই পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

ব্যাংকের অর্থ ও দেশে ফেরার প্রমাণ

অর্থের প্রমাণে শুধু শেষ দিনের ব্যাংক স্থিতি দেখানো যথেষ্ট নয়। ঢাকার প্রকাশিত পর্যটন তালিকায় সর্বশেষ ছয় মাসের হালনাগাদ, ব্যাংকের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত বিবরণী চাওয়া হয়েছে। নিজের আয়, লেনদেন এবং ভ্রমণের ব্যয়ের মধ্যে যুক্তিসংগত সম্পর্ক দেখান।

বর্তমান অর্থের নির্দেশক অঙ্ক

দুই হাজার ছাব্বিশ সালের প্রকাশিত সরকারি হালনাগাদ অনুযায়ী স্পেনে প্রবেশের জন্য প্রতি ব্যক্তির দৈনিক অর্থের নির্দেশক অঙ্ক একশ বাইশ দশমিক এক শূন্য ইউরো। অবস্থান যত সংক্ষিপ্তই হোক, প্রতি ব্যক্তির ন্যূনতম অঙ্ক এক হাজার আটানব্বই দশমিক নয় শূন্য ইউরো।

দশ দিনের জন্য দৈনিক হিসাবে এক হাজার দুইশ একুশ ইউরো হয়। এই অঙ্ক সীমান্তে অর্থের সক্ষমতা যাচাইয়ের মানদণ্ড; শুধু ব্যাংকে সমপরিমাণ থাকলেই ভিসা নিশ্চিত হয় না। বিমানভাড়া, আবাসন ও অন্যান্য ব্যয়ের বাস্তব হিসাবও প্রস্তুত করুন।

পেশাভিত্তিক প্রমাণ

চাকরিজীবী হলে পদ, বেতন, চাকরির মেয়াদ ও অনুমোদিত ছুটির চিঠি দিন। ব্যবসায়ী হলে প্রযোজ্য নিবন্ধন, ব্যবসার অনুমতিপত্র ও করসংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করুন। শিক্ষার্থী হলে চলমান পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় ছুটির প্রমাণ দিন।

হঠাৎ বড় অঙ্ক জমা হলে বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করুন। অন্য কেউ খরচ দিলে তাঁর পরিচয়, সম্পর্ক, সহায়তার পরিমাণ ও সামর্থ্যের প্রমাণ রাখুন। সম্পত্তির দলিল সহায়ক হলেও ব্যবহারযোগ্য অর্থের বিকল্প নয়।

ভ্রমণবিমা, অনুবাদ, শিশু ও আবেদন মাশুল

চিকিৎসা ভ্রমণবিমায় অন্তত ত্রিশ হাজার ইউরোর সুরক্ষা থাকতে হবে। পুরো অবস্থানকাল ও সব শেনজেন দেশে জরুরি চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি এবং প্রয়োজনীয় দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

নাম, পাসপোর্ট নম্বর ও সুরক্ষার তারিখ পরীক্ষা করুন। শুধু বিমা কেনার রসিদ দিলে সুরক্ষার শর্ত বোঝা যায় না; সনদও জমা দিন। অনুমোদিত গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানের বিমা নেওয়া যায়, আবেদনকেন্দ্রের ঐচ্ছিক বিক্রয়ব্যবস্থা ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়।

অনুবাদ ও সত্যায়ন

ঢাকার প্রকাশিত তালিকায় স্প্যানিশ অনুবাদের নির্দেশনা রয়েছে। তাই ইংরেজি নথি হলেই অনুবাদ লাগবে না ধরে নেবেন না। নির্দিষ্ট সরকারি, ব্যবসায়িক ও পারিবারিক নথির সত্যায়ন এবং অনুমোদিত অনুবাদের বর্তমান শর্ত আগেই নিশ্চিত করুন।

শিশুর জন্য জন্মসনদ, অভিভাবকের পাসপোর্ট এবং প্রযোজ্য সম্মতিপত্র প্রস্তুত করুন। একজন অভিভাবক সঙ্গে গেলে অন্যজনের সম্মতির নিয়ম বিশেষভাবে যাচাই করুন।

সাধারণ ভিসা মাশুল বারো বছর বা তার বেশি বয়সে নব্বই ইউরো; ছয় থেকে বারো বছরের কম বয়সে পঁয়তাল্লিশ ইউরো। ছয় বছরের কম বয়সীদের সাধারণত ভিসা মাশুল লাগে না। আবেদনকেন্দ্রের সেবামাশুল আলাদা। টাকায় কার্যকর অঙ্ক ও পরিশোধপদ্ধতি জমার আগে মিলিয়ে নিন।

আঙুলের ছাপ, সিদ্ধান্ত ও ভিসা পাওয়ার পরের নিয়ম

আবেদন জমার সময় সাধারণত আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। বারো বছরের কম শিশুদের ছাড় রয়েছে। আগের শেনজেন আঙুলের ছাপ ঊনষাট মাসের মধ্যে দেওয়া থাকলে পুনর্ব্যবহার সম্ভব হতে পারে; তবুও আবার উপস্থিতি বা ছাপ চাওয়া হতে পারে।

সাধারণ প্রক্রিয়াকরণকাল পনেরো দিন, তবে বিস্তারিত যাচাইয়ে পঁয়তাল্লিশ দিন পর্যন্ত লাগতে পারে। সাক্ষাতের সময়ের অপেক্ষাকে এই মূল্যায়নকালের সঙ্গে এক করে দেখবেন না। দূতাবাস অতিরিক্ত নথি বা সাক্ষাৎকারও চাইতে পারে।

ভিসার তথ্য পরীক্ষা করুন

পাসপোর্ট ফেরত পেয়ে নাম, বৈধতার তারিখ, অনুমোদিত অবস্থানের দিন এবং প্রবেশের সংখ্যা দেখুন। ছয় মাস বৈধ ভিসা মানেই ছয় মাস থাকা যাবে না। একবার প্রবেশের ভিসায় শেনজেন অঞ্চল ছেড়ে আবার ঢোকা সাধারণত সম্ভব নয়।

সীমান্তে আবাসন, ফেরার টিকিট, অর্থ ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য জানতে চাওয়া হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ নথি সঙ্গে রাখুন। প্রত্যাখ্যাত হলে সিদ্ধান্তপত্রের কারণ ও আপিলের নির্দেশনা পড়ে পদক্ষেপ নিন।

একটি শক্তিশালী আবেদন একই গল্প বলে: আপনি কোথায় যাবেন, ব্যয় কীভাবে দেবেন এবং কখন দেশে ফিরবেন। সেই গল্পের প্রতিটি অংশ যেন বাস্তব ও যাচাইযোগ্য নথিতে সমর্থিত থাকে।


আপনার পছন্দ হতে পারে