ম্যারাথনের প্রতিশোধ: ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জার্ক্সিসের গ্রিস আক্রমণ
সিরিজ: থার্মোপাইলির যুদ্ধ: পারস্য আক্রমণ ও গ্রিক প্রতিরোধ
ম্যারাথনের পরাজয় থেকে থার্মোপাইলির পথে পারস্যের অভিযান।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালের ম্যারাথনের যুদ্ধক্ষেত্রে পারস্যের সৈন্যরা পরাজিত হয়ে জাহাজে ফিরে গেলেও সংঘাতের শেষ হয়নি। এথেন্স ও তার মিত্র প্লাতেয়ার জন্য বিজয়টি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার অসাধারণ সাফল্য। কিন্তু আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের দৃষ্টিতে এটি ছিল পশ্চিম সীমান্তে এক অসমাপ্ত অভিযান। এশিয়া, মিসর ও বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের শাসক দারিয়ুসের পাঠানো বাহিনীকে একটি ছোট নগররাষ্ট্র প্রতিহত করেছে—এই সংবাদ সাম্রাজ্যের মর্যাদায় আঘাত করেছিল। দশ বছর পরে তাঁর উত্তরসূরি জার্ক্সিস যখন গ্রিসের দিকে এগোলেন, তিনি সঙ্গে আনলেন বহুজাতিক সেনাবাহিনী, শক্তিশালী নৌবহর এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল। ম্যারাথনের প্রতিশোধ ছিল এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা, সম্প্রসারণ ও রাজকীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন।
এই সংঘাতের শিকড় ম্যারাথনেরও আগে। এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলে বসবাসকারী আয়োনীয় গ্রিকদের নগরগুলো পারস্যের অধীন ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৯ সালে সেখানে বিদ্রোহ শুরু হলে এথেন্স ও এরেত্রিয়া বিদ্রোহীদের সাহায্য করে। পরের বছর বিদ্রোহী ও সহযোগী বাহিনীর আক্রমণে পারস্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র সার্দিসের অংশ পুড়ে যায়। গ্রিকদের কাছে ঘটনাটি ছিল স্বজাতীয় নগরগুলোর সংগ্রামে অংশগ্রহণ; পারস্যের কাছে বাইরের শক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ। বিদ্রোহ দমন হলেও এথেন্সের মতো স্বাধীন নগর সাম্রাজ্যের উপকূলীয় প্রজাদের আবার উৎসাহিত করতে পারত। ফলে এজিয়ান সাগরের ওপারের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বশে আনার পরিকল্পনার পেছনে একটি বাস্তব সীমান্তসংকটও ছিল।
দারিয়ুসের খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালের অভিযানে প্রথমে এরেত্রিয়া ধ্বংস হয় এবং সেখানকার বহু বাসিন্দাকে বন্দী করা হয়। এরপর পারস্যের বাহিনী এথেন্সের ভূখণ্ডে ম্যারাথনে অবতরণ করে। সেখানে গ্রিক ভারী পদাতিকদের আক্রমণে তাদের পরাজয় ঘটে। তবে এই পরাজয়ে পারস্যের মূল সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েনি, সাম্রাজ্যের বিস্তৃত সম্পদও নিঃশেষ হয়নি। ম্যারাথন এথেন্সকে রক্ষা করেছিল, কিন্তু পারস্যকে ভবিষ্যৎ আক্রমণে অক্ষম করেনি। গ্রিক বিজয়ের উচ্ছ্বাসের আড়ালে তাই একটি বিপজ্জনক সত্য রয়ে গিয়েছিল: প্রতিপক্ষ আরও বড় প্রস্তুতি নিয়ে ফিরতে পারত। দারিয়ুস নতুন অভিযানের জন্য সৈন্য ও রসদ সংগ্রহের উদ্যোগ নেন।
সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে মিসরে বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৬ সালে দারিয়ুস মারা যান। সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র জার্ক্সিস। নতুন সম্রাটকে প্রথমে নিজের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সামলাতে হয়। মিসরের বিদ্রোহ দমন জরুরি ছিল, কারণ একটি প্রধান প্রদেশ অশান্ত রেখে দূরবর্তী যুদ্ধে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিরতি বোঝায় কেন ম্যারাথনের পরপরই বৃহৎ আক্রমণ ঘটেনি। পারস্যের যুদ্ধযন্ত্রকে প্রস্তুত করতে সময় লাগছিল, আর নতুন শাসকের অগ্রাধিকারও ছিল একাধিক। পিতার অসমাপ্ত গ্রিক অভিযান শেষ পর্যন্ত জার্ক্সিসের নিজস্ব রাজকীয় কর্মসূচির অংশ হয়ে ওঠে।
জার্ক্সিসের ব্যক্তিগত চিন্তা আমরা সরাসরি জানতে পারি না। তাঁর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ প্রধানত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের রচনায় পাওয়া যায়। সেখানে সেনাপতি মার্দোনিয়ুসকে গ্রিস অভিযানের প্রবল সমর্থক হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজসভায় সতর্ক পরামর্শ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নের বিবরণও রয়েছে। এসবকে সম্রাটের কথোপকথনের হুবহু নথি ভাবা ঠিক হবে না। তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক যুক্তি স্পষ্ট: এথেন্সকে শাস্তি দেওয়া, এজিয়ান অঞ্চলে কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করা এবং নতুন ভূখণ্ড অধীনস্থ করা পরস্পর সম্পর্কিত লক্ষ্য ছিল। পিতার ব্যর্থতা কাটিয়ে একটি বড় বিজয় অর্জন নতুন সম্রাটের মর্যাদাও বাড়াতে পারত।
পারস্যের পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কারণ তখন গ্রিস কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না। এথেন্স, স্পার্টা, করিন্থসহ বহু নগররাষ্ট্রের নিজস্ব সরকার, স্বার্থ ও বিরোধ ছিল। সবাই পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুতও ছিল না। কিছু অঞ্চল আনুগত্য স্বীকার করেছিল, অন্যরা নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছিল। পারস্যের দূতদের কাছে ‘মাটি ও জল’ দেওয়া ছিল সম্রাটের অধীনতা গ্রহণের প্রতীক। এই কূটনীতি যুদ্ধের আগে প্রতিরোধ দুর্বল করতে পারত। জার্ক্সিসের সামনে ছিল বিভক্ত রাজনৈতিক ভূগোল; তাই তাঁর অভিযান কেবল সৈন্যের শক্তিতে নয়, স্থানীয় সহযোগিতা ও আত্মসমর্পণের ওপরও নির্ভর করেছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩ সালের দিকে বৃহৎ প্রস্তুতি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগের অভিযানে সমুদ্রপথে বাহিনী পাঠানো হলেও এবার স্থলবাহিনী ও নৌবহরকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এশিয়া মাইনর থেকে ইউরোপে প্রবেশ করে থ্রেস ও মেসিডোনিয়া হয়ে দক্ষিণে নামবে সেনাবাহিনী। উপকূল ধরে চলবে নৌবহর, যা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও অভিযানের সহায়তা দেবে। পথে খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলা হয়। এত সৈন্যকে নিয়মিত খাওয়ানো, পশুর খাদ্য জোগানো এবং পানির ব্যবস্থা করা ছিল বিরাট কাজ। যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর আগেই রসদের অভাবে অভিযান ব্যর্থ হতে পারত; প্রস্তুতিতে তাই সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্ব ছিল অসাধারণ।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৌশলকাজ ছিল হেলেস্পন্ট প্রণালির ওপর নৌকা দিয়ে ভাসমান সেতু নির্মাণ। বর্তমান দারদানেলস প্রণালির এই জলপথ এশিয়া ও ইউরোপকে পৃথক করে। সেতুর সাহায্যে সৈন্য, অশ্বারোহী, মালপত্র এবং সরবরাহবাহী দল পার হতে পারত। হেরোডোটাসের বিবরণে প্রথম সেতু ঝড়ে নষ্ট হওয়ার পর জার্ক্সিসের সমুদ্রকে শাস্তি দেওয়ার নাটকীয় গল্প আছে। সেটিকে পারসিক রাজদরবারের যাচাইকৃত ঘটনা হিসেবে গ্রহণে সতর্কতা প্রয়োজন। তবে সেতু পুনর্নির্মাণ এবং বাহিনীর ইউরোপে প্রবেশ অভিযানের কেন্দ্রীয় বাস্তবতা। সাম্রাজ্যের শ্রম, উপকরণ ও সংগঠনকে একত্র করার ক্ষমতা এখানে দৃশ্যমান হয়েছিল।
অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল আথোস উপদ্বীপের সরু স্থলভাগ কেটে খাল তৈরি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২ সালে আথোস ঘুরে যাওয়ার সময় ঝড়ে পারস্যের নৌবহর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নতুন খাল যুদ্ধজাহাজগুলোকে সেই বিপজ্জনক সমুদ্রপথ এড়ানোর সুযোগ দেয়। জার্ক্সিসের বিশাল প্রস্তুতিতে অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। স্থলবাহিনীর পথ, নৌবহরের চলাচল এবং সরবরাহ একসঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই উদ্যোগে সাম্রাজ্যিক শক্তি প্রদর্শনের দিক থাকলেও এর ব্যবহারিক সামরিক মূল্য ছিল যথেষ্ট। পারস্য এবার ছোট একটি শাস্তিমূলক অভিযানের বদলে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক আক্রমণের ব্যবস্থা করছিল।
বাহিনীতে পারসিক ও মিদীয় সৈন্যদের পাশাপাশি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের যোদ্ধা ছিল। তাদের পোশাক, অস্ত্র ও যুদ্ধের অভ্যাস এক রকম ছিল না। ধনুর্ধর, বর্শাধারী, অশ্বারোহী এবং অভিজাত সেনাদল মিলিয়ে বাহিনী গঠিত হয়; নৌবহরে ফিনিশীয়, মিসরীয় ও অধীনস্থ গ্রিক অঞ্চলের অবদানও ছিল। তবে সৈন্যসংখ্যা নিয়ে প্রবল বিতর্ক রয়েছে। হেরোডোটাসের বিপুল সংখ্যাকে আধুনিক গবেষকেরা সাধারণত আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করেন না, আর বিকল্প হিসাবেও ঐকমত্য নেই। ‘লক্ষ লক্ষ সৈন্য’কে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের চেয়ে বাহিনীর আকার নিয়ে অনিশ্চয়তা স্বীকার করা বেশি নির্ভুল। তবু গ্রিক প্রতিরক্ষাকারীদের তুলনায় পারস্যের জনবল ও সম্পদ ছিল অত্যন্ত বড়।
এদিকে এথেন্সে থেমিস্টোক্লিস বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যৎ আক্রমণ মোকাবিলায় নৌবাহিনী অপরিহার্য। লরিয়নের রুপার খনি থেকে পাওয়া আয় নাগরিকদের মধ্যে বিতরণের বদলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এজিনার সঙ্গে সংঘাত এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক যুক্তি দিলেও নতুন বহর পারস্যের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮১ সালে প্রতিরোধে আগ্রহী নগররাষ্ট্রগুলো সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়। স্থলযুদ্ধে স্পার্টার নেতৃত্ব এবং সমুদ্রে এথেন্সের শক্তি পরস্পরকে সম্পূরক করতে পারত। কিন্তু এই ঐক্য ছিল সীমিত; গোটা গ্রিক বিশ্ব একই শিবিরে যোগ দেয়নি।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে জার্ক্সিসের বাহিনী ইউরোপে প্রবেশ করে দক্ষিণমুখে এগোতে থাকলে গ্রিকদের সামনে জরুরি প্রশ্ন দাঁড়ায়—কোথায় তাকে থামানো যাবে? প্রথমে থেসালির টেম্পে উপত্যকায় প্রতিরক্ষার চেষ্টা হলেও অবস্থান পাশ কাটিয়ে শত্রুর এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাহিনী সরে আসে। এবার নজর পড়ে থার্মোপাইলির সংকীর্ণ গিরিপথে। সেখানে পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী সীমিত জায়গা পারস্যের সংখ্যাধিক্যের সুবিধা কমাতে পারত; কাছের আর্টেমিসিয়ামে নৌপ্রতিরক্ষা স্থলবাহিনীকে সহায়তা করবে। ম্যারাথনের দশ বছর পর প্রতিশোধের অভিযান পৌঁছে যাচ্ছিল নতুন পরীক্ষার সামনে। জার্ক্সিসের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে থার্মোপাইলির পথে এগিয়ে আসছিলেন স্পার্টার রাজা লিওনিদাস ও তাঁর নেতৃত্বাধীন গ্রিক যোদ্ধারা।
এফিয়াল্টিসের বিশ্বাসঘাতকতা: থার্মোপাইলিতে লিওনিডাসের শেষ প্রতিরোধ
থার্মোপাইলির যুদ্ধ: ৩০০ স্পার্টান ও গ্রিক মিত্রদের অসাধারণ প্রতিরোধ
আরব বসন্তের ফলাফল ও উত্তরাধিকার: গণতন্ত্র, পাল্টা বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ
আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ফেসবুক ও টুইটার যেভাবে আন্দোলন ছড়িয়েছিল
সালেমের ডাইনি বিচারের অবসান: ২০ জনের মৃত্যু, অনুশোচনা ও নির্দোষদের সম্মান ফেরানোর ইতিহাস